বাংলা গল্প - পড়লে হ্যান্ডেল মারতেই হবে - অধ্যায় ২৫

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-69531-post-6091461.html#pid6091461

🕰️ Posted on December 5, 2025 by ✍️ rajusen25 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 3486 words / 16 min read

Parent
তরমুজ - ওপরে সবুজ ভেতরে লাল =========================== মসজিদের সাদা গম্বুজটা সন্ধের লাল-কমলা আলোয় সোনা হয়ে জ্বলছে। মনে হচ্ছিল, সূর্য যেন কিছুক্ষণের জন্য সেখানে থেমে গেছে, একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ভেতর থেকে মুসল্লিরা ধীরে ধীরে বের হচ্ছেন। তাদের কাপড়ে ধূপের তীব্র গন্ধ লেগে আছে, সঙ্গে মেশানো আতরের মিষ্টি সৌরভ। বাতাসে ভাসছে নামাজ শেষে পাওয়া এক ধরনের শান্ত ক্লান্তি, ভক্তির পরের নীরবতা। প্রধান গেট দিয়ে তখনই বেরিয়ে এলো একজন লোক। তার গায়ের রঙ ছিল কালচে, যেন তেলের আস্তরণ। কিন্তু পরনে ছিল ঝকঝকে সাদা কুর্তা-পায়জামা, পায়ে সাদা চটি আর মাথায় টুপি। তার হাঁটায় একধরনের দাপাদাপি ছিল। পা ফেলার আওয়াজ, হাত দোলানোর ভঙ্গি—সবকিছু মিলে মনে হচ্ছিল এই জায়গাটা তারই রাজ্য। "আসসালাম আলাইকুম, সিরাজুল ভাই!" বারান্দা থেকে মৌলভী সাহেবরা এগিয়ে এলেন, তাদের লম্বা দাড়িতে এখনো সিজদার দাগ বসে আছে। সিরাজুল ইসলাম ভারী, গমগমে গলায় জবাব দিল, "ওয়া আলাইকুম আসসালাম, মৌলানা সাহেব।" তার গলা যেন মসজিদের পুরনো লাউডস্পিকারের মতোই ভারী আর গম্ভীর শোনালো। "মাদ্রাসার অবস্থা কী?" সিরাজুল জানতে চাইল। এক মৌলভী হাসিমুখে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর মেহেরবানিতে সব চলছে। আপনার দোয়া আর সাহায্যতো আছেই..." সিরাজুল কথাটা শেষ হতে না দিয়েই কুর্তার পকেট থেকে এক মোটা টাকার বান্ডিল বের করল। নোটগুলো এত নতুন যে কাগজের টাটকা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। "এই নিন, মাদ্রাসার গরিব ছেলেদের দেবেন," সে টাকা বাড়িয়ে দিল, "নাহলে ওরা তো মাদ্রাসায় আসবেই না!" এক মৌলভী তাড়াতাড়ি দুই হাত বাড়িয়ে বান্ডিল নিলেন, মুখে চাপা হাসি, "বিসমিল্লাহ... ইনশাআল্লাহ, আমরা গরিব বাচ্চাদের মাদ্রাসা ছাড়তে দেব না। আখেরাতের জন্য নসিহত তো দিতেই হবে!" **পরিচয়:** সিরাজুল ইসলাম, বয়স ৫২। মোমিনপুরে এই নাম শুনলেই লোকজনের মুখ শক্ত হয়ে যায়। চামড়ার ব্যবসার পাশাপাশি চলে তার 'অন্ধকার ব্যবসা' — এলাকার সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলে না। কারণ, মসজিদ-মাদ্রাসায় যার টাকা যায়, তার বিরুদ্ধে কথা বলাটা যেন পাপ! সিরাজুল তাই একইসাথে দানবীর আর দাপুটে ব্যবসায়ী। তার কালো চেহারা আর মাঝারি গড়ন সুন্দর না হলেও, সাদা পোশাকের আড়ালে লুকানো ক্ষমতা আর ধর্মের ছায়ায় সবাই তার সামনে মাথা নত করে। সে যেন মোমিনপুরের জীবন্ত প্রতীক — যেখানে ধর্ম আর ক্ষমতা পাশাপাশি হেঁটে চলে। *** শপিং মলের বিশাল ফটকে ঝলমলে স্পটলাইট পড়েছে মার্বেল মেঝের ওপর। হঠাৎই 'টক, টক, টক' — হাইহিলের তীক্ষ্ণ শব্দে চারপাশের মানুষের দৃষ্টি ঘুরে গেল এক মধ্যবয়সী হি..জাবি নারীর দিকে। গায়ের কালো বো..রখাটা সাধারণ নয়, দামি কাপড়ের সূক্ষ্ম ডিজাইন, আলোয় একটু ঝলক দিচ্ছে। মলের প্রবেশপথে দাঁড়ানো তরুণ থেকে বয়স্ক — সবার চোখই যেন আটকে গেল তার দিকে। বো..রখার আড়ালে কী লুকানো আছে, সেই রহস্যে সবাই কৌতূহলী। বো..রখার বাইরে দেখা যাওয়া হাতের নিখুঁত ত্বক, আঙুলের গড়ন, সোনালি চুড়ির মৃদু খনখনানি, আর বো..রখার নিচ থেকে একটু দেখা যাওয়া হাইহিলের ফাঁকে পায়ের পাতার ঈষৎ দেখা — এই সামান্য ইশারাই যেন সবার কল্পনাকে দারুণভাবে উসকে দিচ্ছিল। কেউ আড়চোখে দেখছে, কেউ স্পষ্টই তাকিয়ে — মনে হচ্ছিল এই বো..রখার আড়ালে কোনো রহস্যময়ী নারী লুকিয়ে, যার সামান্য ইঙ্গিতে অনেকের বুকের ভেতর কেঁপে উঠছে। তিনি যখন ফটক পেরোলেন, ঠিক তখনই পার্কিং থেকে এসে থেমে গেল ঝকঝকে কালো একটা হন্ডা সিটি। গাড়ির পালিশ করা বডিতে সূর্যের আলো পড়ে ঝলক দিচ্ছিল। ড্রাইভার দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিতেই মহিলা পেছনের সিটে আরাম করে বসলেন, বো..রখাটা একটু ঠিক করে নিলেন। "চালিয়ে নাও..." তিনি আদেশ দিলেন ড্রাইভারকে। কণ্ঠ মিষ্টি, কিন্তু এর ভেতরে ছিল ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা। হাসিনা বানু বেগম। বয়স ৪৫। সিরাজুল ইসলাম এর স্ত্রী। স্বামীর মতো তিনিও ধর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুবর্তী। নিয়মিত নামাজ, রোজা, আর পর্দার বিধান মেনে চলেন অত্যন্ত কঠোরভাবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তার হি..জাব ও বো..রখার আড়ালে লুকিয়ে থাকা লম্বা, সুগঠিত শরীরের ভরাট উপস্থিতি একটা অদৃশ্য আকর্ষণের মতো কাজ করে। বো..রখাটা তাকে পুরোপুরি ঢেকে রাখলেও, তার চলাফেরার ভঙ্গি, উচ্চতা, কাঁধের রেখা — সবই বোঝা যায়। বো..রখার নিচে তার হাতের নড়াচড়া কিংবা পায়ের ছন্দময় চলন মানুষের কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকের মনে হয়, এই পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই অসাধারণ কিছু লুকিয়ে আছে। তিনি যখন শপিং মলে প্রবেশ করেন, তার বো..রখার গুণগত মান আর চলার ভঙ্গিমা থেকেই বোঝা যায়, তিনি সাধারণ কোনো নারী নন। তার পুরো শরীরটাই যেন এক অদৃশ্য ভাষায় কথা বলে — একদিকে ইসলামী শালীনতার প্রতীক, অন্যদিকে এক অপ্রকাশিত, শক্তিশালী আকর্ষণের উৎস। *** বিশাল হাভেলির উঁচু দেয়াল ঘেরা উঠোনে বিকেলের রোদ ঝিলমিল করছে। মোহাম্মদ রুবেল, সিরাজুল ইসলাম এর একমাত্র ছেলে, তার বন্ধু শিবু দাসের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলছে। রুবেলের গায়ের রং বাবার মতোই কালো, পরনে ব্র্যান্ডেড কালো শর্টস আর হাফ হাতা টি-শার্ট। চেহারা মাঝারি, কিন্তু শরীরে বাবার টাকার ছাপ স্পষ্ট। শিবু দাস, পাতলা চেহারার এক কিশোর, পরনে সাধারণ প্যান্ট আর সাদা টি-শার্ট — যাতে মোটরসাইকেল মেরামতের গ্রিসের দাগ স্পষ্ট। সে অক্লান্তভাবে ব্যাডমিন্টন খেলে যাচ্ছে, মাথার ঘাম মুছতে মুছতে। পাতলা হলেও প্রচণ্ড পরিশ্রমী। "শিবু ভাই, একটু কম মার না!" রুবেল হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, "তোর গায়ে অনেক জোর।" শিবু হাসতে হাসতে বলে, "কেন, মাংস-চর্বি যে খাস, যায় কোথায়!" রুবেল কিছু বলার আগেই শিবু আবার শাটলকক মারল জোরে। রুবেলের চোখে একটা ক্ষণিক রাগ, কিন্তু সে চেপে যায়। সে জানে, শিবুই তার আসল বন্ধু। শিবুর অনেক বন্ধু থাকলেও রুবেলের একটাই বন্ধু — এই 'শিবু'। শিবুর শটটা যখন নেটের ওপর দিয়ে উড়ে গেল, রুবেল মৃদু হেসে বলল, "তুইই জিতলি... আসলে, তোর মতো বন্ধু আমার একটা-ই।" শিবু র্যাকেট নামিয়ে হাসল, "তা কি আর বলতে হবে! এখন উঠি? সন্ধ্যা হয়ে এল।" দূর থেকে হাভেলির বারান্দায় সিরাজুল ইসলাম এর কালো সিলুয়েট দেখা গেল। রুবেল তাড়াতাড়ি বলল, "হ্যাঁ, উঠ। কাল আবার খেলব।" শিবুর জীবন কঠিন বাস্তবতার ইঁট-পাথরে গাঁথা। বাবা-মা হারানোর পর থেকেই জীবনযুদ্ধে নামতে হয়েছে তাকে। মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপের গ্রিস-মাখা হাত, সাধারণ পোশাক — সবই তার সংগ্রামী জীবনের সাক্ষ্য। তবু তার মধ্যে অটুট আছে সততা। সিরাজুল ইসলাম এর হাভেলিতে তার অবাধ যাতায়াত, কিন্তু টাকার প্রতি তার কোনো লোভ নেই। রুবেলের বন্ধুত্বই তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। রুবেলের জীবন সম্পূর্ণ বিপরীত। বাবা-মায়ের আদরে, বিত্তের ছায়ায় বড় হওয়া। কিন্তু তার হৃদয়ে এক গভীর নিঃসঙ্গতা। সমাজে তার আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হয় — সে সমকামী। এই গোপনীয়তা তাকে প্রচণ্ড একা করে তোলে। শিবুই তার একমাত্র বিশ্বস্ত মানুষ, যে তাকে তার সমস্ত সত্যতা নিয়েই গ্রহণ করেছে। এই দুই বন্ধুর সম্পর্কে কোনো লেনদেন নেই, আছে শুধু সহমর্মিতা। শিবু জানে রুবেলের রুচি, আর রুবেল বোঝে শিবুর সংগ্রাম। তাদের মধ্যে আর্থিক ব্যবধান কখনই বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়নি। বরং শিবুর সততা আর রুবেলের একাকিত্বই তাদের আরও কাছাকাছি এনেছে। শিবুর জীবন খুব সরল রেখায় বাঁধা নয়। সে নিজেকে কখনও সমকামী ভাবে না। তার কল্পনায় নারীর স্থানই আলাদা। কিন্তু রুবেল... রুবেল তার জন্য শুধু বন্ধু নয়। রুবেল তার সেই একমাত্র মানুষ, যে তাকে দিয়েছে সম্মান, দেখিয়েছে ভাইয়ের মতো ভালোবাসা, টাকাপয়সার হিসাব না করেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যখনই প্রয়োজন হয়েছে। রুবেলের নিঃসঙ্গতা, তার অন্তর্দহন — শিবু তা গভীরভাবে বুঝতে পারে, কারণ তার নিজের জীবনও কষ্টের সাগরে ভেলা ভাসানোর মতো। তাই যখন রুবেলের আকুলতা, তার স্পর্শের ক্ষুধা দেখে, শিবু প্রথমে অবাক হয়, বিব্রত বোধ করে। কিন্তু রুবেলের চোখে সেই উৎকণ্ঠা, সেই ভয় — "তুইও কি এখন আমাকে ছেড়ে যাবি?" — তা দেখে শিবুর মন নরম হয়। এ তার জন্য কামনা না, এ এক ধরনের ত্যাগ। বন্ধুর তীব্র যন্ত্রণা, গভীর একাকিত্বের কাছে এটাই কি তার দেওয়া একমাত্র স্বস্তি হতে পারে? সে তাই নিজেকে বলতে থাকে — এটা একটা রোগের মতো, রুবেল এর জন্য দায়ী না। আর সে যদি এইটুকু দিয়েও তার একমাত্র বন্ধুকে এক মুহূর্তের শান্তি দিতে পারে, তাহলে কী আর। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে মনে করিয়ে দেয় — এটা তার জন্য ভালোবাসারই আরেক রূপ, এক ধরনের অসহায় সমর্থন। সে অনুভব করে তার বন্ধুর কান্না, তার ভেতরের যন্ত্রণা। এই স্পর্শ, এই ঘনিষ্ঠতা তার জন্য কামনা থেকে জন্ম নেয়নি, জন্ম নিয়েছে এক গভীর মমতা থেকে। রুবেল যেন তার ছায়া হয়ে গেছে — একা, ভীত, গোপনীয়তায় জর্জরিত। শিবু জানে, এটা বাইরের কারো বোঝার কথা নয়। রুবেলের মতোই সে-ও এ গোপনীয়তা লালন করে। এরপরও যখন তারা একসাথে বসে, একই থালায় খায়, মোটরসাইকেলে করে শহর ঘোরে — তখন আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। শুধু তার ভেতরে একটা ক্ষত থাকে — সে জানে, সে যা দেয়, তা তার নিজের পরিচয়ের সাথে সংঘাত করে। কিন্তু সে থামেও না। কারণ রুবেলের হাসি, তার নির্ভরতা — সেটাই তার কাছে বড়। বন্ধুত্বের এই গভীর, জটিল ও বিষাদময় বিনিময়কে সে টিকিয়ে রাখে, শুধু এই ভেবে যে সে হয়তো তার বন্ধুর জন্য একটু মানসিক আশ্রয় দিচ্ছে, একটি গাঢ় একাকিত্বের ভেতরে একটু প্রশান্তির ছায়া দিচ্ছে। এই সব কিছুরই নীরব সাক্ষী 'মীরজাফর হুসেন' — ৬০ বছরের বৃদ্ধ কাজের লোক, যে ছোট বেলা থেকেই সিরাজুল ইসলাম এর বাবার ছত্রছায়ায় বড় হয়েছে আর এখন সিরাজুল ইসলাম এর বিশ্বস্ত চাকর। মীরজাফর হুসেন, এই বাড়ির প্রাণস্বরূপ বিশ্বস্ত চাকর। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত—বাড়ির প্রতিটি কাজ তার হাত দিয়েই হয়। কিন্তু কাজের চেয়েও বড় গুণ তার চোখ-কান খোলা রেখেও চুপ থাকার ক্ষমতা। বাড়ির দেয়ালের মতই সে নীরব, অথচ সব দেখে। মোমিনপুরের এই বিশাল হাভেলির প্রতিটি কোণা, প্রতিটি আড়ালের গল্প তার চোখে আটকা পড়েছে। সে জানে রুবেলের নিঃসঙ্গতা কত গভীর, আর তার বন্ধু শিবুর সাথে সেই নিঃসঙ্গতা ভাঙার অদ্ভুত, গোপন রীতি। অনেক রাত, যখন বাড়ি নিস্তব্ধ, মীরজাফর বারান্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখেছে রুবেলের ঘরে অন্ধকারে কী ঘটছে—দেখেছে রুবেল কিভাবে শিবুর ধোন চোষে, যা সমাজ কখনো বুঝবে না বা মেনে নেবে না। আর বেগম হাসিনা বানু… তার পর্দার আড়ালের আসল চেহারা মীরজাফরের চোখ এড়ায়নি। সে দেখেছে বো..রখা খুলে সেই মুখ, যেটা কখনো প্রকাশ্যে দেখা যায় না। দেখেছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপ নিয়ে বেগমের নীরব প্রশংসা, বিলাসী প্রসাধনীর গন্ধে ভরা ঘরে একাকী সময় কাটানো। সেইসব দৃশ্য যেন চুরি করা মুহূর্ত, যা বাইরের জগতের জন্য নয়। মীরজাফর সব জানে। কিন্তু তার জিভে যেন তালা পড়ে আছে। সে জানে, এই গোপনীয়তা গুলোই তার রোজগারের মূলধন। একবার যদি মুখ ফসকে কিছু বেরিয়ে যায়, তাহলে তার ঠাঁই এই বাড়িতে থাকবে না। তাই সে চুপ। বাড়ির কর্তা সিরাজুল ইসলাম এর কঠোর নিয়ম, রুবেলের ভিন্ন ভালোবাসা, বেগমের আড়ালের জীবন—সবই সে মনের মধ্যে পুঁতে রাখে, যেন কখনো না ফুটে উঠে। তার জন্য, এই চুপ থাকাটাই বেঁচে থাকার কৌশল। দেখেও না দেখার ভান করা, শুনেও না শোনার অভিনয় করা—এটাই তার রক্ষাকবচ। মোমিনপুরের এই প্রভাবশালী বাড়িতে তার টিকে থাকা নির্ভর করে এই নীরবতার ওপর। আর তাই, সে নিঃশব্দে কাজ করে যায়, যেন একটা ছায়া—সব দেখে, সব জানে, কিন্তু কখনো কিছু বলে না। *** জুম্মার দিন। মাগরিবের সময় ঘনিয়ে আসছিল, হাভেলির তিনটি আলাদা ঘরে তিনজন মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নামাজের। সিরাজুল ইসলাম এর শয়নকক্ষে গামছা থেকে আতরের মৃদু গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তিনি পাশের বাথরুমে ওজু করছিলেন, জল পড়ার ধারালো শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছিল তার নাক থেকে নিঃশ্বাসের গমগম আওয়াজ। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে এক নজর তাকিয়ে, টুপিটা ঠিক করে নিলেন। তার মুখমণ্ডলে ছিল এক গম্ভীর আধ্যাত্মিক মনোযোগ। অন্যদিকে হাসিনা বানু বেগমের পড়ার ঘরটি ছিল নিঃসৃত ও শান্ত। তিনি সযত্নে তার বো..রখাটি ঝাড়তে ঝাড়তে রাখলেন আলনার দিকে, তারপর একটি পরিষ্কার, ল্যাভেন্ডার সুগন্ধি ওড়না বেছে নিলেন। ধীর, সুপরিচিত আচরণে ওজুর জন্য পানি তৈরি করছিলেন, প্রতিটি মুহূর্ত যেন রীতির অংশ। রুবেলের ঘরে ছিল ভিন্ন এক পরিবেশ। হেডফোনে কোরআনের তিলাওয়াত চালু ছিল, কিন্তু তার আঙুল নার্ভাসলি ফোনের স্ক্রোল করছিল। সামাজিক মাধ্যমের নোটিফিকেশন — মন অন্য দিকে ছুটছিল। তবুও, সে চেষ্টা করছিল মনোযোগ দিতে। ওজুর সময় তার হাতের মুভমেন্টে ছিল এক ধরনের তাড়াহুড়ো, যেন এই আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার চেয়ে বাইরের অপেক্ষমান মুহূর্তটাই বেশি জরুরি। ডাইনিং রুমে, শিবু একা বসে ছিল। দীর্ঘ টেবিলের উপর মীরজাফর নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রেখেছে ইফতারির সমস্ত আয়োজন — পিয়াজু, বেগুনি, ছোলা, জিলাপি, আর ঠান্ডা লাচ্ছির পিচকারি। খাবারের নানা গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। শিবু তার ফোন নিয়ে বসেছিল, কিন্তু মন ছিল না। সে চুপচাপ শুনতে পাচ্ছিল তিনটি আলাদা দিক থেকে আসা জলের শব্দ, পায়ের শব্দ, আর মৃদু জিকিরের আওয়াজ। সে সনাতনী, তার জন্য নামাজের এই প্রথা অতিপরিচিত নয়, তবুও এই পরিবেশের প্রতি তার একটা শ্রদ্ধা কাজ করছিল। সে অপেক্ষা করছিল, যখন সবাই একত্রে বসবে — রুবেল, তার বাবা-মা — এবং সে এই পারিবারিক মুহূর্তের অংশ হতে পারবে, যদিও সে শুধুই একজন অতিথি, একজন বন্ধু। মীরজাফর নিজের ছোট্ট কুঁড়েঘরটিতে, একটি পুরনো মাদুর পেতে, নীরবে ওজু করছিল। তার আচরণেও ছিল এক গভীর নিষ্ঠা, অনেক বছরের অভ্যাসে ডোবা। সে সবাইকে ডাকতে আসবে যখন নামাজ শেষ হবে, যখন এই বাড়ির অদৃশ্য তালা খুলে যাবে এবং দৈনন্দিন জীবনের কথোপকথন আবার শুরু হবে। শিবু জানালার দিকে তাকাল। বাইরে আকাশ রঙ বদলাচ্ছিল, মাগরিবের নীলচে আলো আস্তে আস্তে গাঢ় হয়ে আসছিল। সে নিজের জন্য একটা গ্লাসে পানি নিল। অপেক্ষার এই সময়টুকু তার জন্য ছিল এক ধরনের মধুর নির্জনতা, এই বিশাল হাভেলির সুসমাচিত গতির মাঝে একটু নিশ্চলতা। নামাজ শেষ হতেই সবচেয়ে আগে রুবেল ডাইনিং রুমে ঢুকল। সে হাফ ছেড়ে বসল যেন ভারী একটা দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। শিবুর পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল আর সাথে সাথেই গল্প শুরু করে দিল। "আরে শিবু, আজকে মসজিদে কী দেখলাম জানিস?" — রুবেলের গলায় একটা উত্তেজনা, "নতুন ইমাম সাহেব তো সুর দিয়ে আজান দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল যেন গান গাচ্ছেন!" শিবু হেসে উঠল, "তোর কান যে সবসময় গানের সুর খোঁজে।" তারপরে সিরাজুল ইসলাম প্রবেশ করলেন। ধবধবে সাদা সুতির পোশাকে তিনি যেন ঘরে একটা ভিন্ন ঠাণ্ডা, গুরুতর পরিমণ্ডল নিয়ে এলেন। তাঁর টুপি এখনও মাথায়, ঠোঁট নাড়াচ্ছেন নীরব জিকিরে। তিনি হাতের রুমাল দিয়ে কপালের শেষ বিন্দু ঘাম মুছলেন, তারপর প্রধান চেয়ারে গম্ভীর ভাবে বসলেন। ঘরের প্রধান হলেও রূপে কোনো ভাবে প্রধান মনে হয়না, তার কালো বর্ণের জন্য। মীরজাফর নিঃশব্দে, একদম সময়মতো হাজির। সে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে, নির্বিকার চেহারায় খাবার সাজাতে লাগল। পিয়াজু থেকে বেগুনি, ডাল থেকে গোশত – প্রতিটি বাটি ঠিক জায়গায় রাখল, যেন সে এই রীতির একজন অদৃশ্য পরিচালক। তার হাতের নড়াচড়ায় কোনো অনাবশ্যক শব্দ নেই, শুধু থালাবাসনের মৃদু ঠোকাঠুকি। রুবেল আর শিবুর গল্প থেমে গেল না, কিন্তু স্বর একটু নিচু হয়ে এল। তারা এখন আলাপ করছে কলেজ-কলেজের স্মৃতির কথা, মোটরসাইকেল নিয়ে দুঃসাহসিকতার গল্প। শিবুর হাসি ফেটে পড়ছে মাঝেমাঝেই, আর রুবেলের চোখে সেই স্বস্তির ঝিলিক – যে কষ্টের ভারে ক্লান্ত সে, বন্ধুর সামনে এসে যেন হালকা হয়ে আসছে। সিরাজুল ইসলাম চোখ বন্ধ করে দুআ করলেন, তারপর খাবার শুরু করার ইশারা করলেন। মীরজাফর গ্লাসে জল ভরতে ভরতে চোখের কোণে দেখে নিল—খাসির মাংসের বাটিটা শিবুর দিকে একটু ঠেলে দিল। গরুর মাংস শিবুর ধর্মে নিষেধ, এ কথা মীরজাফরের মাথায় গাঁথা। এই ডাইনিং রুমে তিনটি পৃথক জগত এক টেবিলে মিলেছে – একপাশে বাবা-মায়ের ধর্মীয় নিষ্ঠা ও গাম্ভীর্যের জগৎ, অন্যপাশে দুই তরুণের হাসি-গল্পের উষ্ণ জগৎ, আর মাঝখানে নিঃশব্দে ঘোরাফেরা করা মীরজাফরের কর্মব্যস্ত, অদৃশ্য জগৎ। ডাইনিং রুমের জ্বলজ্বলে আলো থেকে একটু দূরে, রান্নাঘরের ম্লান হলুদ আলোয় মীরজাফর দাঁড়িয়ে। তার সামনে দুটো আলাদা থালা – একটা বড়, একটা ছোট। বড় থালায় সাজাচ্ছে সবার সাধারণ খাবার: গরুর মাংসের কোরমা, ডাল, সবজি। কিন্তু ছোট থালাটায় যত্ন পড়েছে আলাদা। সেখানে সাজানো হচ্ছে খাসির মাংসের হাড়ছাড়া টুকরো, একটু বাড়তি ঘি মাখানো বেগুন ভর্তা, আর চিকন করে কাটা পেঁয়াজের ফাঁক – সবই বেগম সাহেবের বিশেষ পছন্দ। মীরজাফরের হাত কাজ করছে, কিন্তু মনটা আছে যেন অন্য কোথায়। সে জানে, এই ছোট থালাটির যাত্রাপথ লম্বা। ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডোর পেরিয়ে উপরের তলায় বেগম সাহেবের নিজস্ব ঘর পর্যন্ত। পৌঁছানোর পরেও খাবারটা সরাসরি তার হাতে যাবে না। থালাটা রাখা হবে দরজার বাইরে একটা ছোট টেবিলে, তারপর মীরজাফর সরে যাবে, আর বেগম সাহেব নিজেই ভেতরে নিয়ে যাবেন। এই পুরো রীতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই বাড়ির এক অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব দেয়াল। বেগম হাসিনা বানু পর্দানশীন, কিন্তু এই পর্দা শুধু কাপড়ের না। এটা এক জীবন্ত, নিঃশ্বাস নেওয়া সীমানা, যে তাকে ঘিরে রেখেছে। ইসলাম ধর্মের নিয়মে শিবু আর মীরজাফর – এমনকি বাড়ির পুরনো চাকরটাও – তার জন্য 'গাইর মাহরাম' বা পরপুরুষ। তাই এই বাড়িতে তার থাকাটাই এক রকমের উল্টাপাল্টা ব্যাপার: তিনি সবখানেই আছেন, তবু চোখে পড়েন না; তিনি গিন্নী, তবু নিজেরই ডাইনিং টেবিলে তার জায়গা নেই। তার খাওয়ার জায়গাটা – উপরের তলার সেই নিভৃত ঘরটা – এক নিরব সাক্ষী হয়ে আছে। সেখানে তিনি একা বসে খান, কিন্তু এই একাকিত্ব কখনো নিরবতা না। নিচের ডাইনিং রুম থেকে ভেসে আসা গল্পের অস্পষ্ট গুঞ্জন, থালাবাসনের ঠোকাঠুকি শব্দ, দূর রাস্তায় গাড়ির হর্ন – সবই তার খাবারের সঙ্গী। মাঝে মাঝে খোলা জানালা দিয়ে ঢোকে রাতের ঠাণ্ডা হাওয়া, সঙ্গে আনে গাঁটছড়া বাঁধা ফুলের সুবাস কিংবা পাশের বাড়ির রান্নার মম্ময় গন্ধ। এটাই তার দুনিয়া – পরোক্ষ, দ্বিতীয় পর্যায়ের, কিন্তু প্রবলভাবে বাস্তব। পর্দা তাকে রক্ষা করে, কিন্তু আবার বেঁধেও রাখে। বো..রখার কাপড় তার দেহ ঢেকে দেয়, কিন্তু ঠিক তখনই অন্যদের কল্পনাকে আরো জোরালো করে তোলে। ডাইনিং রুমের গরম, মুখোমুখি মেলামেশার জগৎ থেকে তিনি দূরে, কিন্তু তার প্রভাব পড়ছে সবখানে। তার সিদ্ধান্তেই রান্নাঘরে আজ কোন তরকারি পড়বে, তার পছন্দেই বাজার হবে, তার হুকুমেই মীরজাফর এই বিশেষ থালাটা সাজাচ্ছে। মীরজাফর থালাটাকে একটা ট্রেতে সাজায়, তার উপরে স্টিলের একটা ঢাকনা চাপা দেয়। এটা একটা শিষ্টাচার – খাবার যাতে গরম থাকে, আর পথে কারো নজর না পড়ে। সে ট্রেটা হাতে নিয়ে ডাইনিং রুমের উজ্জ্বল আলো ফেলে করিডোরের নরম আলোয় পা বাড়ায়। তার পায়ের আওয়াজ মৃদু, কিন্তু প্রতিটা পা ফেলায় যেন কেঁপে ওঠে এই বাড়ির জটিল সামাজিক কাঠামো। উপরে, তার ঘরে, বেগম হাসিনা বানু অপেক্ষায় আছেন। তিনি হয়তো নামাজ শেষ করেছেন, না হয় কুরআন পড়ছিলেন। তিনি জানেন, ঠিক এই সময়টাতেই তার খাবার আসবে। তিনি শুনতে পাবেন দরজার বাইরে ট্রে নামানোর মৃদু ঠং আওয়াজ, তারপর মীরজাফরের চলে যাওয়ার পায়ের শব্দ। তারপরই তিনি দরজা খুলে ট্রেটা ভেতরে তুলে নেবেন। এই মুহূর্তে, ডাইনিং রুমে রুবেলের হাসি, শিবুর গল্প, সিরাজুল ইসলাম এর গম্ভীর চেহারা – সবই চলছে। আর ঠিক একই সময়ে, উপরের ঘরে, এক নারী একা বসে খাবেন, পর্দার আড়ালে, কিন্তু এই সংসারের হৃদয়স্পন্দন থেকে একেবারে আলাদা না। তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় প্রতিবার খাবারের পছন্দে, ঘর সাজানোর ধরনে, আর পরিবারের নীরব নিয়মকানুনে। তিনি দৃশ্যের বাইরে, কিন্তু দৃশ্য বানানোর কাজে তার হাত আছে – এক অদৃশ্য কিন্তু জরুরি শক্তি, যাকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় প্রতিটা মুহূর্তে। শিবু রুবেলের দিকে তাকিয়ে একটু কুণ্ঠিত হাসি হেসে বলল, "আরে ভাই, তুইই তো জানিস আমি ছোট থেকেই কাজ করছি। আর এখন তো আর সমস্যা তেমন নেই।" মীরজাফর এই সব শুনছে নিঃশব্দে। সে জানে শিবুর গর্ব, জানে রুবেলের মনের কষ্ট, আর জানে সাহেবের সেই দানশীলতার নেপথ্যের হিসাব-নিকাশ। সে টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে শিবুর ফিরনীর বাটি আরেকটু ভরে দিলো, নিঃশব্দে, ছায়ার মতো। তার এই ছোট্ট কাজটার মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এই বাড়ির সব সম্পর্কের জটিল সমীকরণের এক নীরব স্বীকৃতি। "চাচা, আপনার মেহেরবানি আমি বুঝতে পারছি," শিবু এবার একটু গম্ভীর সুরে বলল, "কিন্তু আমি নিজে কিছু করতে চাই।" রুবেল চুপ করে বসে আছে। তার বুকে একটু খচখচ করছে। সে একদিকে চায় শিবু স্বীকৃতি নিক, সম্মান পাক, তার জীবনটা একটু সহজ হোক। কিন্তু অন্যদিকে, সে জানে—এই সাহায্য নিলে তাদের বন্ধুত্বের সূক্ষ্ম সাম্যতাটা একটু হেলে পড়বে। শিবু আর ‘শিবু’ থাকবে না, হয়ে যাবে ‘সিরাজুল ইসলাম সাহেবের অনুগ্রহপুষ্ট শিবু’। সিরাজুল ইসলাম একটু পিছনে সরে চেয়ারে হেলান দিলেন। তার মুখে জমে থাকা গাম্ভীর্যের আড়ালে একটা সূক্ষ্ম খচখচানি দেখা গেল। হয়তো এত সহজে ‘না’ শুনতে তাঁর অভ্যাস নেই। তিনি তাঁর হাতের আংটাটা একটু ঘুরিয়ে নিলেন, তারপর বললেন, "তোমার এই মনোভাবটা ভালো, বেটা। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। আল্লাহ তোমাকে আরও বরকত দিক।" কথাটা তিনি বললেন বটে, কিন্তু গলার সুরে সেই আগের মোলায়েম ভাবটা আর নেই। এটা একটা সাময়িক পশ্চাদপসরণ, পরাজয় নয়। তিনি জানেন, শিবুর মত একটা সৎ, মেহনতি মানুষকে তাঁর ছেলের বন্ধু হিসেবে পাওয়াটা একটা পাওনা। কিন্তু এই পাওনাকে তিনি তাঁর নিয়ন্ত্রণে আনতে চান। আজ না হয় গ্যারেজের প্রস্তাবটা ফিরে গেল, কিন্তু তিনি আবার আরেকটা সুযোগ খোঁজবেন। মীরজাফর এইসবের নীরব সাক্ষী। সে আরেক গ্লাস জল এনে শিবুর পাশে রাখল। তার নিচু নেমে আসা দৃষ্টি যেন বলে, "তুমি ঠিক করেছ।" মীরজাফর সিরাজুল ইসলাম-কে চেনে। সে জানে, সাহেবের দয়ার হাতটা অনেক লম্বা, কিন্তু সেই হাতের মুঠোর ভেতরেও একটা শৃঙ্খল লুকিয়ে থাকতে পারে। উপরে, বেগম সাহেবের ঘরে, একা বসে খাওয়া শেষ করে তিনি হয়তো জানালার পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিচের ডাইনিং রুম থেকে ভেসে আসা গলার আওয়াজগুলো অস্পষ্ট, কিন্তু উত্তাপটা স্পষ্ট। তিনি বুঝতে পারেন, নিচের সেই টেবিলে কেবল খাবারই পরিবেশন হয় না, স্বার্থ, আব্দার, ভালোবাসা আর লেনদেনের এক জটিল খাবারও পরিবেশন হয়, যার স্বাদ তিনি দূর থেকেই বুঝতে পারেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে ডাইনিং রুমের পাশেই সুসজ্জিত বসার ঘরে গিয়ে বসলেন সিরাজুল ইসলাম, সারা দিনের হিসেব-নিকাশ নিয়ে। বিশাল ঘরের এক পাশে কেরাম বোর্ড পাতা, শিবু আর রুবেল গিয়ে বসলো খেলতে। মীরজাফর চুপচাপ ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার করে, থালাবাসন গুছিয়ে রান্নাঘরের এক কোণে বসে নিজের খাবার নিয়ে বসল। আস্তে আস্তে ভাত-তরকারি খেতে খেতেই তার কানে ভেসে আসছে কেরাম বোর্ডে গুটি চলার ঠুক্ ঠুক্ শব্দ, আর শিবুর উচ্ছ্বসিত গলার কথা— "সাদা গুটি আমার আর কালো তোর!" রুবেলও চুপ নেই, প্রতিযোগিতার সুরে বলে উঠল, "আজ আমিই জিতবি দেখিস!" ঘরের অন্যপাশে সিরাজুল ইসলাম চশমার ফ্রেমটা একটু ঠিক করে নিয়ে নিঃশব্দে হিসেবের খাতায় কলম চালিয়ে যাচ্ছেন। কেরাম বোর্ড থেকে আবার শব্দ এল—একটা জোরালো 'টক' শব্দ, তারপর শিবুর বিজয়গর্বি কণ্ঠস্বর: "আজও রানী নিয়ে নিলাম, রুবেল!" খানিক বিরতি, তারপর আবার তারই গলা, "শটটা দেখলি, কেমন দিলাম! রানী তো আমার।" রুবেল হাল্কা চালে উত্তর দিল, গলায় একটু কৌতুকের আভাস, "আমার রানীর প্রতি ইন্টারেস্ট নেই, ইনশাল্লাহ… কেরামে রাজা থাকলে আমিই নিতাম!" ঘর জুড়ে তখন তিনটি পৃথক পৃথক পৃথিবী। একদিকে হিসেবের খাতায় ডুবে থাকা কর্তা, যার কলমের শব্দই যেন একমাত্র কথোপকথন। মাঝখানে কেরাম বোর্ডের চারপাশে দুই তরুণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর হাসি-তামাশা, গুটির শব্দ আর কথার মিশেলে তৈরি এক প্রাণবন্ত ফেনিল পরিবেশ। আর রান্নাঘরের নরম আলোয় মীরজাফরের একলা খাওয়া—তার কানে ভেসে আসা সব আওয়াজ যেন দূরের কোনো নদীর স্রোতের শব্দের মতো, পরিচিত কিন্তু স্পর্শের বাইরে। সে চিবোতে চিবোতে শুনে যায়, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, শুধু চোখ দুটো একবার বোর্ডের দিকে, একবার সাহেবের দিকে তাকায়—নিরব, সতর্ক, সবকিছু দেখে রাখা এক প্রহরীর মতো। মীরজাফর জানে, এখন তো খেলা আর আড্ডা চলতেই থাকবে। সে এখানে এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, বাইরের লোক। রান্নাঘরের সব কাজ সেরে, সে আস্তে আস্তে ঢুকল বসার ঘরে। গোল বিছানা-সোফার কভারটা টেনে ঠিকঠাক করে দিল, কোনো এক কোণে আলগা হয়ে থাকা কুশনটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিল। তারপর নিঃশব্দে সিরাজুল ইসলাম এর দিকে এগিয়ে গেল, হাত দুটো জোড় করে একটু নুইয়ে বলল, "আল্লা হাফিজ, সাহেব।" সিরাজুল ইসলাম হিসেবের খাতা থেকে চোখ না তুলেই মাথা নাড়লেন, একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন দিলেন যেন—"উম্ম।" মীরজাফর পিছিয়ে এল, পায়ের আওয়াজ না ফেলে বারান্দা পার হয়ে চলে গেল অন্ধকার উঠোনের দিকে। দূরের কুঁড়েঘরটার দরজা খোলা, ভেতর থেকে একটা ম্লান বাতির আলো বেরিয়ে আসছে। বাইরে রাতের হিমটা নামতে শুরু করেছে, পাতায় পাতায় জমছে শিশির। সে যখন তার ঘরের দরজায় পৌঁছাল, পিছন থেকে ভেসে এল কেরাম বোর্ডের গুটির শব্দ আর রুবেলের উচ্চহাসি—"আরে না, এটা কী মারলি!" শিবুর প্রতিবাদী চিৎকারের সঙ্গে মিশে। মীরজাফর দরজা বন্ধ করল। বাইরের সব আওয়াজ যেন একসাথে ঢাকা পড়ে গেল। ভেতরে শুধু তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ, আর দেয়ালের ঘড়িটার টিকটিক। সে চৌকির উপর বসে হাফ ছেড়ে বসল। বাইরের সেই জগৎ, যেখানে রানী নিয়ে তর্ক, জয়-পরাজয়, আর হিসেবের খাতা—সবই এখন শুধুই দূরের একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন। তার নিজের জগৎটা শুরু হয় এখান থেকেই। নীরব, স্থির, এবং শুধুই তার নিজের। -চলবে
Parent