একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ৩
চ্যাপ্টার ৩ – একটা ঝরের রাত
পরদিন সকালে রাহাত উঠে দেখে মা রান্নাঘরে। পরোটা আর ডিম ভাজা। রাহাত টেবিলে বসে বলে,
“আজ পরোটা?”
শিউলি হেসে বলেন,
“হ্যাঁ। গতকাল তোর সাথে সিনেমা দেখে মনটা ভালো ছিল। তাই ভাবলাম... আজও একটু স্পেশাল।”
রাহাত খেতে খেতে বলে,
“ভালো লেগেছে। আজকের রাতে কিন্তু আরেকটা সিনেমা দেখব।”
শিউলি চুপ করে থাকেন। তারপর আস্তে করে বলেন,
“দেখব রে।”
শিউলির গলায় সেই শান্ত উষ্ণতা মিশে আছে, যেন গতকাল রাতের স্মৃতিটা এখনো তাঁর হৃদয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাহাত পরোটায় কামড় দিয়ে চিবোয়, গরম তেলের স্বাদ জিভে লেগে থাকে, কিন্তু তার মনটা অন্যদিকে—মায়ের সেই ভাঙা হাসি, সেই গানের সুর কানে বাজছে। শিউলি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসেন, তাঁর চোখে একটা নরম চিন্তা—ছেলেটা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো ছোটবেলার মতো স্পেশাল নাশতায় খুশি হয়। তিনি ভাবেন, এতদিন ওর বাবা না থাকলে বাড়িটা যেন একটা খাঁচা হয়ে যেত, কিন্তু রাহাতের এই ছোট ছোট কথাগুলো সেই খাঁচায় আলো ঢোকায়।
নাশতা শেষ হলে রাহাত ঘরে গিয়ে পড়তে বসে। বই খুলে গণিতের অংশটা দেখে, সে পেন্সিল হাতে নিয়ে জানালার দিকে তাকায়, বাইরে আফতাবনগরের সবুজ গাছপালা, দূরে খালের জল চিকচিক করছে। শিউলি রান্নাঘর থেকে প্লেট ধুয়ে আসেন, তারপর ছেলের ঘরে ঢোকেন।
“পড়ছিস?” তাঁর গলা নরম, চোখে মায়াময় উদ্বেগ।
রাহাত খাতা এগিয়ে দেয়। শিউলি পাশে বসে দেখেন। একটু পরে বলেন,
“এই অংশটা আবার দেখ। এখানে ভুল হয়েছে। আর হাতের লেখা একটু পরিষ্কার কর, পরীক্ষায় দেখতে অসুবিধা হবে না তো?”
রাহাত মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ মা, ঠিক করে নিচ্ছি।”
শিউলি আর কিছু বলেন না, শুধু পাশে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর উঠে বলেন,
“আমি বাজারে যাই। ফিরে এসে দুপুরের রান্না করব।”
রাহাত বলে,
“আচ্ছা।”
শিউলি বেরিয়ে যাওয়ার পর রাহাত দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে টিভি চালায়। একটা পুরোনো Adventure Time ক্লিপ চালিয়ে দেয়, হাসতে হাসতে দেখে।
শিউলি বাজারে যান, হাতে ঝুড়ি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে পুরোনো দিনগুলো। রাহাতের বাবার সাথে প্রথম বাজার যাওয়া, হাত ধরে সবজি কেনা, হাসি-ঠাট্টা। এখন সেই হাত নেই। মাসের মধ্যে বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকেন না, ঢাকার বাইরে অডিটের কাজে ব্যস্ত। বাজার থেকে ফিরে আসেন মাছ, শাক-সবজি নিয়ে। রাহাত তখন টিভিতে হাসছে। শিউলি দেখে মুখে হাসি ফোটে, কিন্তু বুকের ভেতরটা গরম হয়ে যায়—ছেলেটা এখনো ছেলেমানুষ, কিন্তু কতদিন এমন থাকবে?
দুপুরের খাবার রান্না করেন শিউলি। মাছের ঝোল, ভাত, আলু ভর্তা। গন্ধটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। রাহাত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
“মা, কী সুন্দর গন্ধ!”
দুজনে টেবিলে বসে খান। খেতে খেতে রাহাত বলে,
“মা, তোমার রান্না সত্যি স্পেশাল।”
শিউলি হেসে বলেন,
“তোর জন্য রান্না করতে ভালো লাগে। আজ মাছটা একটু বেশি ঝাঁল হয়েছে কি না?”
রাহাত বলে,
“না না, পারফেক্ট। আর আলু ভর্তাটা তো দারুণ। তুমি কীভাবে এত ভালো করো?”
শিউলি হালকা হেসে বলেন,
“অভ্যাস রে। আর তোর বাবা তো বলতেন, আমার হাতের রান্না না খেলে খাওয়াই হয় না।”
রাহাত বলে,
“বাবা ঠিকই বলতেন।”
খাওয়া শেষ হলে রাহাত বলে,
“মা, বিকেলে খেলতে যাই। বন্ধুরা অপেক্ষা করছে মাঠে।”
শিউলি মাথা নেড়ে বলেন,
“যা, কিন্তু সন্ধ্যার আগে ফিরিস। আর সাবধানে খেলিস, ঘামে ভিজে না যেন জ্বর আসে।”
রাহাত খেলতে যাওয়ার পর শিউলি একা বাড়িতে। বিকেলের নরম আলো জানালা দিয়ে ঢোকে, কিন্তু বাড়িটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে। তিনি সোফায় বসে ফেসবুকে উপলোড করা পুরোনো ছবিগুলো দেখতে থাকেন। রাহাতের ছোটবেলার ছবি—কোলে নিয়ে হাসছেন, তার ছোট হাত দিয়ে মায়ের গাল ছুঁয়ে আছে। আরেকটা ছবি—রাহাতের বাবার সাথে বিয়ের দিনের, হাত ধরে দাঁড়িয়ে, চোখে সেই প্রথম প্রেমের উজ্জ্বলতা। শিউলির চোখ ভিজে আসে। মনে পড়ে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রাহাতের বাবার সাথে গল্প করা, তার হাতের ছোঁয়ায় যে উষ্ণতা ছিল, সেটা এখনো শরীরে লেগে আছে। কিন্তু এখন সেই উষ্ণতা দূরে—অডিটের কাজে ব্যস্ত। রাহাত যখন ছোট ছিল, তখন তাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন, তার ছোট হাতটা ধরে হাঁটতেন। এখন সে বড় হয়ে গেছে, কলেজে পড়ে, বন্ধুদের সাথে খেলতে যায়। শিউলির মনে হয়, ছেলেটা যত বড় হচ্ছে, ততই শূন্যতা বাড়ছে। কিন্তু গতকাল রাতের সেই সিনেমা, সেই গান—একটা নতুন আশা জাগিয়েছে। যেন ছেলেটা না শুধু ছেলে, একটা সঙ্গী হয়ে উঠছে। রাহাতের বাবার ফোন আসে।
“হ্যালো? সব ঠিক আছে?” বাবার গলা ক্লান্ত কিন্তু স্নেহময়।
শিউলি বলেন,
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। তুমি কেমন আছ? খেয়েছ?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি। রাহাত কী করছে?”
“খেলতে গেছে বন্ধুদের সাথে। তুমি কবে ফিরবে?”
“আর কয়েকদিন লাগবে। তুমি ভালো থেকো।”
ফোন রাখার পর শিউলি সোফায় শুয়ে পুরোনো গান শোনেন, চোখ বন্ধ করে। “যদি ডেকে বলি এসো...” সেই সুরটা মনে পড়ে, গাইতে গেলে গলা ভেঙে যায়, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। একাকিত্বটা গভীর, কিন্তু রাহাত ফিরলে যেন সব ভুলে যান।
সন্ধ্যায় রাহাত ফিরে আসে। দরজা খুলতেই চেঁচিয়ে ওঠে,
“মা! আমরা জিতেছি! আমি ৩৩ রান করেছি! না হলে হারতাম। শেষ ওভারে দুটো ছক্কা মেরেছি!”
শিউলি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসেন,
“ওরে বাবা! তাই নাকি? তাহলে তো তুই হিরো হয়ে গেছিস আজ।”
রাহাত হাসতে হাসতে বলে,
“হ্যাঁ, আর শেষ বলটা ফুলটস ছিল, আমি ড্রাইভ করে বাউন্ডারি মেরেছি। সবাই চেঁচাচ্ছিল।”
শিউলি বলেন,
“ভালো লাগলো শুনে। এখন হাত-মুখ ধুয়ে নে, ঘামে ভিজে গেছিস। চা দিচ্ছি।”
রাহাত হাত-মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসে। শিউলি চা নিয়ে এসে টেবিলে রাখেন।
রাতে ডিনার শেষ করে দুজনে সোফায় বসেন। রাহাত রিমোট হাতে নিয়ে বলে,
“মা, আজ কী দেখব? Kill Bill দেখি? অ্যাকশনটা দারুণ।”
শিউলি হেসে বলেন,
“আচ্ছা, দেখি। তুই যা বলবি। তবে রক্ত দেখলে আমার গা ছমছম করে।”
রাহাত Netflix চালিয়ে Kill Bill প্লে করে। সিনেমা শুরু হয়। প্রথম অ্যাকশন সিনে রাহাত চেঁচিয়ে ওঠে,
“মা, দেখো এই সিনটা! উমা থুরম্যান কী স্টাইলে লড়াই করছে! ওর কাতানাটা দেখো!”
শিউলি হেসে বলেন,
“আরে বাবা, এত রক্ত! আমার ভালো লাগে না এসব। কিন্তু এই সিনেমার অ্যাকশনটা আলাদা, অন্যরকম স্টাইল। চোখ ফেরানো যায় না।”
রাহাত বলে,
“হ্যাঁ, কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর স্টাইলই এরকম। মা, এটা তো শুরু। পরের পার্টে আরও কী হবে দেখো।”
শিউলি মাথা নেড়ে বলেন,
“আমারও ভালো লাগছে তোর সাথে দেখতে। একা একা দেখলে মজা হয় না।”
রাহাত বলে,
“আমারও। তোমার সাথে দেখলে অন্যরকম লাগে।”
শিউলি চুপ করে যান। তাঁর মনে পুরোনো স্মৃতি ভেসে ওঠে—রাহাতের বাবার সাথে সিনেমা হলে যাওয়া, হাত ধরে বসা, পপকর্ন শেয়ার করা। বাইরে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়, প্রায় ঝড়ের মতো বাতাস। শিউলি উঠে জানালা বন্ধ করতে যান। এসে আবার ছেলের পাশে বসেন।
হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া, যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। রাহাত আর শিউলি অন্ধকারে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন।
শিউলি বলেন,
“যাই মোমবাতি নিয়ে আসি। তুই বস।”
রাহাত বলে,
“লাগবে না মা। চলো বারান্দায় যাই। বৃষ্টি দেখি।”
শিউলি কী যেন ভাবেন। চোখে একটা অদ্ভুত চিন্তা। তারপর নরম গলায় বলেন,
“চল।”
দুজনে উঠে বারান্দার দিকে যান। অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ঝড়ো হাওয়ার একটা তীব্র ঝাপটা মুখে লাগে, যেন প্রকৃতি নিজেই তাদের ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। বারান্দাটা বড়, আফতাবনগরের এই ফ্ল্যাট থেকে দূরের রাস্তা, গাছপালা আর খালের দিক দেখা যায়। কিন্তু এখন সবকিছু গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেছে, শুধু বৃষ্টির অবিরাম শব্দ আর হাওয়ার গর্জন। শিউলি আগে এগিয়ে যায়, রাহাত তার পেছনে। দুজনেই চুপ। কিন্তু সেই নীরবতায় একটা অদ্ভুত উত্তেজনা মিশে আছে—যেন এই মুহূর্তটা তাদের মাঝে একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। গ্রিল ধরে দাঁড়ান দুজন, একটু দূরত্ব রেখে। গ্রিলটা ঠান্ডা লোহার, হাতে লাগতেই একটা শিহরন ওঠে, কিন্তু সেই ঠান্ডা বাইরের ঝড়ের সাথে মিশে যায়।
দূরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো কাঁপছে অন্ধকারে। আজ যেন আকাশের সব জল একসাথে ঝরে পড়ছে, ছাদে আর রাস্তায় টপটপ করে আছড়ে পড়ছে আর সেটা একটা গভীর, অবিরাম শব্দ তৈরি করে যা কান ভরে যায়। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো হাওয়ায় উড়ে এসে বারান্দায় ছিটকে পড়ছে। ছাট আসে দুজনের মুখে, গালে, গায়ে—হালকা ভিজে যায় শরীর। শিউলির গাঢ় নীল শাড়িটা ভিজে ত্বকের সাথে লেগে গেছে। ভেজা কাপড় তার শরীরের প্রতিটা বাঁক স্পষ্ট করে তুলেছে—কোমরের সরু লাইন, বুকের পূর্ণতা, নিতম্বের নরম ভাঁজ—সবকিছু অন্ধকারে আরও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। কিন্তু কেউ সরে না। সেই ভেজাটা অস্বস্তি নয়, বরং একটা নতুন অনুভূতি—ঠান্ডা কিন্তু উত্তেজক, প্রকৃতি নিজেই তাদের মাঝে মিশে যাচ্ছে।
রাহাতের মনে হয়—এভাবে বৃষ্টি দেখতে কখনো এত ভালো লাগেনি। সাধারণত সে জানালায় দাঁড়িয়ে দেখে, কিন্তু আজ এই বারান্দায়, মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে, সবকিছু অন্যরকম। তার বুকের ভেতরটা দুরু দুরু করছে, একটা অদ্ভুত গরম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে—যেন এই ঝড়টা তার মনের মধ্যেও উঠেছে। কেন এমন লাগছে? তার চোখ অজান্তেই মায়ের দিকে চলে যায়—ভিজে নীল শাড়িটা তার শরীরকে আরও আলাদা করে তুলেছে, নারী শরীরের সেই পূর্ণতা, সেই নরম বাঁক, যা সে আগে কখনো এভাবে লক্ষ্য করেনি। তার শরীর কাঁপছে হালকা ঠান্ডায়, কিন্তু সেই কাঁপনটা আনন্দের, একটা অজানা টানের।
শিউলির মনেও মিশ্র অনুভূতি—একাকিত্বের ছায়া এখনো লেগে আছে, রাহাতের বাবা দূরে, বাড়িটা খালি। কিন্তু পাশে এই ছেলেটা, যে এখন বড় হয়ে গেছে, তার উপস্থিতি একটা নতুন আশ্রয়। তার বুকের ভেতরটাও গরম হয়ে উঠছে, একটা অদ্ভুত মায়া মিশে যাচ্ছে—যেন এই বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে সে আবার জীবন্ত বোধ করছেন, কিন্তু সেই জীবন্ততায় একটা অন্যরকম ছোঁয়া মিশে আছে। আর এখানেই প্রকৃতি কিছু সময়ের জন্য সময়কে থামিয়ে দিয়েছে—এই পৃথিবী তোলপাড় করে ঝড় হচ্ছে আর কোথাও কোনো মানুষ নেই এই দুজন ছাড়া। তারা একজন নারী আরেকজন পুরুষ। প্রকৃতি যে তাদের নিয়ে কী পরিকল্পনা করছে, তখনও তাদের দুজনের কেউ জানে না।
মনে হয় অনন্তকাল পার হয়ে গেছে। হঠাৎ রাহাত সেই নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে,
“মা, একটা গান গাও না। গতকালের মতো। তোমার গান শুনলে বৃষ্টিটা আরও সুন্দর লাগবে।”
শিউলি যেন সম্ভিত হয়ে ওঠেন। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেন,
“আরে ধুর, কী গান! আমি কি গান গাইতে পারি নাকি? লজ্জা লাগে।”
“প্লিজ মা। এখানে তো কেউ নেই। শুধু তুমি আর আমি।”
শিউলি লজ্জা পেয়ে মুখ নামান। তারপর বলেন,
“আচ্ছা... কোন গান শুনবি?”
“তোমার যা ভালো লাগে। যেটা তোমার ইচ্ছে করছে গাইতে।”
শিউলি একটু চুপ করে থেকে গান ধরেন। গলাটা নরম, কাঁপা, কিন্তু গভীর। বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যায়, যেন প্রকৃতি নিজেই তার কণ্ঠে গান গাইছে।
“আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,
পরানসখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ-সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম,
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম,
চাই যে বারে বার।
পরানসখা বন্ধু হে আমার।”
গানের মাঝে রাহাত কখন যেন মায়ের একদম পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। শরীর ঘেঁষে, প্রায় লেগে। বৃষ্টির ছাটে দুজনের শরীর আরও ভিজে যাচ্ছে। শিউলির ভেজা নীল শাড়ি তার শরীরের প্রতিটা রেখাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে—তার কোমরের নরম বাঁক, বুকের উষ্ণ পূর্ণতা, নিতম্বের গোলাকার ভাঁজ—যেন অন্ধকারে একটা জীবন্ত মূর্তি, যা রাহাতের চোখে অজান্তেই ধরা পড়ছে বার বার। তার নিজের শরীরও ভিজে গেছে, টি-শার্টটা ত্বকের সাথে লেগে, বুকের হালকা পেশি আর কাঁধের শক্তি ফুটে উঠেছে। হাওয়া তাদের চুল উড়িয়ে দিচ্ছে—শিউলির খোঁপা পুরোপুরি খুলে গেছে, লম্বা ভেজা চুল মুখে, কাঁধে, পিঠে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন বৃষ্টির সাথে নাচছে। রাহাতের চুলও ভিজে মাথায় লেগে গেছে, কপালে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। তাদের শরীর কাঁপছে ঠান্ডায়, ত্বক শিরশির করছে, কিন্তু সেই কাঁপন শুধু ঠান্ডার নয়—একটা গভীর, অদৃশ্য টান, যা তাদের মাঝে বাতাসের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে।
গানের শেষ লাইন, “পরানসখা বন্ধু হে আমার” বলার সময় শিউলি ধীরে ধীরে ঘুরে রাহাতের চোখের দিকে তাকান। সেই দৃষ্টি গভীর, জ্বলন্ত, উষ্ণ—মাতৃত্বের সীমা ছুঁয়ে আরও একটু দূরে চলে গেছে। ভিজে চোখে বৃষ্টির জল মিশে, যেন তার দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জাগছে, একটা নিষিদ্ধ মায়া, যা কথায় প্রকাশ করা যায় না। রাহাতের বুক কেঁপে ওঠে। তার শরীর গরম হয়ে যায়, যেন বৃষ্টির ঠান্ডা জল তার ত্বকের নিচে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সে চোখ সরাতে পারে না। শিউলির চোখে একটা নরম আলো, কিন্তু সেই আলোর পেছনে একটা ঝড়—যেন সে নিজেও জানে না এই মুহূর্তটা তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। গান শেষ হয়। কিন্তু সেই দৃষ্টি বাতাসে ভাসতে থাকে, যেন সময়ের সীমানা ভেঙে তাদের মাঝে একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টি চলতে থাকে, অবিরাম, উন্মাদ। দূরে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে, আকাশের কালো পর্দায় যেন একটা ক্ষণিক আলোর রেখা আঁকে। হাওয়া তাদের শরীরে ছুঁয়ে যায়, ভেজা কাপড়ের নিচে ত্বক শিহরিত হয়। শিউলির আঁচল হাওয়ায় উড়ে রাহাতের বুকের কাছে এসে লাগে, যেন প্রকৃতি তাদের নিয়ে খেলছে, নিজেই তাদের আরও কাছে টেনে আনছে। রাহাতের হাত গ্রিল থেকে নেমে আস্তে আস্তে শিউলির দিকে এগোয়, কিন্তু ছোয় না—শুধু কাছাকাছি থাকে। শিউলি চোখ নামান, কিন্তু সরে যান না। দুজনের শ্বাস যেন এক হয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাওয়া শরীর দুটো যেন একই তাপমাত্রায় এসে পৌঁছেছে।
শিউলির বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। তার মনে হয়, এই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত—যেন সে কখনো এত জীবন্ত বোধ করেনি। রাহাতের পাশে দাঁড়িয়ে, এই ঝড়ের মাঝে, তার শরীর প্রকৃতির সাথে এক হয়ে গেছে, কিন্তু তার মন একটা অজানা সমুদ্রে ভাসছে—যেখানে মাতৃত্ব আর একটা অচেনা মায়া একসাথে মিশে যাচ্ছে। রাহাতের মনেও একটা ঝড়। তার চোখে মায়ের ভিজে মুখ, ভিজে চুল, ভিজে শাড়ি—সবকিছু একটা স্বপ্নের মতো, যেন সে কখনো এই নারীকে এভাবে দেখেনি। তার বুকের ভেতরটা গরম, কিন্তু সেই গরমে একটা অদ্ভুত শান্তি—যেন এই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে পূর্ণ মুহূর্ত।
এই মুহূর্তে তারা আর মা আর ছেলে নয়—দুটো আলাদা মানুষ, যাদের মাঝে একটা অজানা, অব্যক্ত টান জন্ম নিয়েছে। বাইরে ঝড় চলছে, কিন্তু ভেতরে আরও বড় ঝড় উঠেছে। আর সেই ঝড়ের মাঝে তারা দুজনেই হারিয়ে যাচ্ছে—একটা অন্য দুনিয়ায়, যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো উত্তর নেই, শুধু একটা গভীর, নিঃশব্দ অনুভূতি।