একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ৪
চ্যাপ্টার ৪ – অস্থির অনুভূতি
সকালের আলো জানালা দিয়ে ধীরে ধীরে ঢুকছে, কিন্তু আকাশে এখনো গত রাতের মেঘের গাঢ় ছায়া লেগে আছে। আফতাবনগরের এই ফ্ল্যাটে বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে, বৃষ্টির পরের সেই তাজা, মিষ্টি ঘ্রাণ যা ঘরের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়েছে। রাহাতের ঘরে বিছানা অগোছালো, চাদরটা গুটিয়ে একপাশে পড়ে আছে। তার ঘুম ভাঙল অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ শব্দে... ঘড়িতে সাতটা বেজে দশ। সে চোখ খুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। গত রাতের বারান্দার ছবিটা আবার ভেসে উঠল... মায়ের ভিজে চুল যা হাওয়ায় উড়ছিল, সেই গানের কাঁপা সুর যা তার কানে এখনো বাজছে, আর সেই দৃষ্টি... যেন মায়ের চোখে শুধু মাতৃত্ব নয়, একটা গভীর, অজানা আকাঙ্ক্ষা ছিল। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে উঠে বসল, কপালে হাত রাখল। সারা রাত চোখ বন্ধ করলেই সেই মুহূর্ত ফিরে আসছিল... বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাওয়া শরীর, মায়ের কাছাকাছি দাঁড়ানো, সেই চোখের দৃষ্টি যা তার মনের ভেতরে ঢুকে গেছে। ঘুম হয়নি। শরীর অস্থির, গরম। একটা অদ্ভুত টান... লজ্জা, ভয়, আর একটা মিষ্টি ভালো লাগা মিশে। সে নিজেকে বলল, “এটা কিছু না। শুধু বৃষ্টির রাতের প্রভাব। বৃষ্টি থামলে সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু মন মানল না। সে জানে... কিছু একটা বদলে গেছে। তার মধ্যে একটা নতুন অনুভূতি জেগে উঠেছে, যা আর ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে না। সে বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে রাস্তায় পড়ে থাকা পাতা ভিজে চকচক করছে, দূরে খালের জলে সকালের আলোর প্রতিফলন। কিন্তু তার মন সেখানে নেই। মনটা বার বার ফিরে যাচ্ছে মায়ের কাছে... তাঁর ভিজে শাড়ি, সেই নরম শরীরের রেখা, সেই চোখের গভীরতা যা তার বুকের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রান্নাঘরে শিউলি দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছেন। চুলায় হাঁড়িতে রুটি ভাজছেন, পাশে ডিমের ভাজি হচ্ছে... পেঁয়াজের সোনালি রঙ আর কাঁচা মরিচের ঝাঁঝালো গন্ধ মিশে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর পরনে গাঢ় নীল শাড়ি, আঁচলটা কাঁধে জড়ানো, চুল খোঁপায় বাঁধা। তাঁর হাত কাঁপছে হালকা, চোখের নিচে গাঢ় কালি পড়েছে। মুখটা ফ্যাকাশে, যেন রাতের অস্থিরতা এখনো লেগে আছে। গত রাতে তিনি ঘুমাননি। বিছানায় শুয়ে বার বার সেই মুহূর্ত মনে পড়ছিল... ছেলের কাঁধের সাথে শরীরের ঘেঁষা লাগা, বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাওয়া কাপড় যা তার শরীরের প্রতিটা রেখা স্পষ্ট করে তুলেছিল, আর সেই চোখের দৃষ্টি যা তিনি নিজের চোখেই ফিরে দেখছিলেন। লজ্জায় গাল জ্বলে উঠছিল। অপরাধবোধে বুক ভারী হচ্ছিল... আমি তার মা। এভাবে ভাবা ঠিক না। কিন্তু সেই অপরাধবোধের পেছনে একটা মিষ্টি, অদ্ভুত ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ছিল। যেন অনেক বছর পর কেউ তাকে নারী হিসেবে দেখছে, তার শরীরের সৌন্দর্য লক্ষ্য করছে। সে নিজেকে বলেছিল, “এটা ভুল। থামাতে হবে।” কিন্তু মন শুনছে না। বুকের ভেতরে একটা গরম অনুভূতি জেগে উঠেছে, যা লজ্জা আর ভালো লাগার মিশ্রণে আরও তীব্র হচ্ছে। তাঁর শরীরে এখনো সেখানে বৃষ্টির ঠান্ডা লেগে আছে, কিন্তু ভেতরে একটা আগুন জ্বলছে।
রাহাত টেবিলে এসে বসল। দুজনের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল। শুধু চামচ আর প্লেটের ছোট্ট শব্দ। শিউলি চায়ের কাপ এগিয়ে দিলেন। তাঁর হাতটা একটু কাঁপল।
“আজ কলেজে কি আছে?” গলা একটু ভারী, যেন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে।
রাহাত রুটিতে কামড় দিয়ে বলল, “সাধারণ ক্লাস। ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি। প্রথম ক্লাস দশটায়।”
শিউলি চুপ করে খাচ্ছেন। তারপর আস্তে করে বললেন, “আজ দুপুরে ফিরবি? আমি তোর পছন্দের চিকেন কারি করব। তেল কম দিয়ে। গতকালের মতো।”
রাহাত মাথা নাড়ল। “ফিরব। ক্লাস শেষ হলে।”
দুজনেই জানে... গত রাতের সেই মুহূর্তটা তাদের মাঝে ঘুরছে। কিন্তু কেউ বলল না। তারা অন্য কথায় চলে গেল। রাহাত বলল, “মা, গতকালের চিকেনটা ভালো ছিল। আজও যেন সেরকম হয়। মশলাটা ঠিকঠাক।”
শিউলি হাসার চেষ্টা করলেন। হাসিটা একটু অস্বাভাবিক। “চেষ্টা করব। তোর জন্য রান্না করতে তো ভালো লাগে।”
নাশতা শেষ। রাহাত উঠে প্লেট নিয়ে সিঙ্কে রাখল। শিউলি পেছনে এলেন। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ধুচ্ছেন। হাত ঘেঁষাঘেঁষি। রাহাতের চোখ অজান্তে মায়ের গলার দিকে চলে গেল... শাড়ির আঁচল সামান্য সরে গেছে, গলার নিচে সামান্য উন্মুক্ত ত্বক, যেখানে একটা ছোট্ট নীল শিরা দৃশ্যমান, আর সকালের আলোয় সেই ত্বক যেন আরও নরম লাগছে। তার বুকটা আবার স্পন্দিত হলো। অপরাধবোধ হলো... এভাবে তাকানো ঠিক না। মা তো। কিন্তু চোখ সরাতে পারল না। ভালো লাগাটা তার মনে ছড়িয়ে পড়ছে... যেন মায়ের সেই নরমতা, সেই সৌন্দর্য আজ প্রথমবার এভাবে ধরা পড়ছে। শিউলি লক্ষ্য করলেন সেই চাহনি। তাঁর গাল লাল হয়ে উঠল। হাতটা থেমে গেল। তিনি জানেন... ছেলের চোখে আজ অন্য কিছু আছে। লজ্জা হচ্ছে। অপরাধবোধ হচ্ছে... এটা ভুল। কিন্তু সেই লজ্জার পেছনে একটা মিষ্টি অনুভূতি... যেন অনেকদিন পর কেউ তাকে নারী হিসেবে দেখছে, তার শরীরের সৌন্দর্য লক্ষ্য করছে। তাঁর বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। তিনি চোখ নামালেন, কিন্তু হাতটা সরালেন না।
রাহাত কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজার কাছে এসে পেছনে তাকাল। শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে। তাঁর চোখে একটা নীরব প্রশ্ন, একটা লজ্জামিশ্রিত উষ্ণতা। রাহাতের বুকটা কেঁপে উঠল। সে বলল, “আমি চললাম মা।”
শিউলি বললেন, “সাবধানে যাস। আর ক্লাস শেষে ফোন করিস। খেয়ে নিস কলেজে।”
কলেজে যাওয়ার পথে রাহাতের মন অস্থির। রাস্তায় লোকজন, বাসের শব্দ, কিন্তু তার কানে শুধু মায়ের গলার সেই নরমতা বাজছে। কলেজে পৌঁছে ক্লাসে বসল। লেকচার চলছে... ফিজিক্সের মেক্যানিক্স। টিচার বোর্ডে ডায়াগ্রাম আঁকছেন। বন্ধুরা নোট নিচ্ছে। কিন্তু রাহাতের মন বাড়ির দিকে। প্রতিটা ফাঁকা মুহূর্তে মায়ের সেই লজ্জামিশ্রিত চাহনি মনে পড়ে যাচ্ছে। তার শরীর অস্থির। অপরাধবোধ... মাকে এভাবে ভাবা ভুল। কিন্তু ভালো লাগাটা তার মনে একটা মিষ্টি কষ্ট জাগাচ্ছে। যেন মা আর শুধু মা নয়... একটা নতুন আকর্ষণ, একটা অজানা টান। লাঞ্চ ব্রেকে বন্ধুরা গল্প করছে, কিন্তু সে চুপ। তার মনে হচ্ছে... আজ দুপুরে বাড়ি ফিরলে কী হবে? এই অনুভূতি কি থামবে? না কি আরও বাড়বে?
বিকেল চারটার দিকে ফিরল। দরজা খুলতেই চিকেন কারির গভীর, মশলাদার গন্ধ ভেসে এল... জিরা, ধনে, গরম মশলার সেই তীব্র ঘ্রাণ যা ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। শিউলি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে হাঁড়ি নাড়ছেন, গ্যাসের আঁচে তাঁর মুখে হালকা ঘাম, চুলের কয়েকটা গোছা গালে লেগে আছে। তাঁর শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরে গেছে, কাঁধ আর ব্লাউজের উপরের অংশে ঘামের হালকা চকচকানি। তিনি ছেলেকে দেখে হাসলেন। হাসিটা স্বাভাবিক, কিন্তু চোখে একটা অস্থিরতা। “ফিরে এসেছিস? ক্লাস কেমন হলো? অনেক লেকচার?”
রাহাত ব্যাগ রেখে বলল, “ভালো। অনেক লেকচার। ক্লান্ত লাগছে। গন্ধটা দারুণ।”
দুজনে টেবিলে বসল। খেতে খেতে শিউলি বললেন, “আজ তোর বাবা ফোন করেছিলেন। বললেন কাল সন্ধ্যায় ফিরবেন। অডিট শেষ।”
রাহাতের মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। কাল থেকে আবার সবাই একসাথে। সেই কাছাকাছি থাকার মুহূর্তগুলো কমে যাবে। সে চুপ করে খেল। শিউলি লক্ষ্য করলেন ছেলের মুখের পরিবর্তন। তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন... ছেলের মন খারাপ। সেই একই কারণটা যা তাঁর মনেও লুকিয়ে আছে।
ডিনারের সময় রাহাতের চোখ অজান্তে মায়ের বুকের দিকে চলে গেল। শাড়ির আঁচল সামান্য সরে গেছে, গলার নিচে সামান্য উন্মুক্ত ত্বক, আর তার নিচে বুকের নরম উঁচু-নিচু যা শাড়ির পাতলা কাপড়ে আরও স্পষ্ট। তার বুকটা স্পন্দিত। অপরাধবোধ হচ্ছে... এটা ঠিক না। কিন্তু চোখ সরাতে পারছে না। ভালো লাগাটা তার মনে ছড়িয়ে পড়ছে। শিউলি রাহাতের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারলেন ছেলে কী দেখছে। তাঁর গাল লাল হয়ে উঠল। লজ্জা। কিন্তু সেই লজ্জায় ভালো লাগা মিশে। তিনি জানেন... ছেলের চোখে আজ অন্য কিছু আছে। তাঁর শরীর কেঁপে উঠল হালকা। তারপর তিনি রাহাতের চোখের দিকে তাকালেন। রাহাত লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। তার গাল লাল। সে চামচ নিয়ে খাবার নাড়তে লাগল। শিউলি চোখ নামালেন। তাঁর বুক ধুকপুক করছে। দুজনেই চুপ। কিন্তু সেই চুপে একটা অদৃশ্য কথা বলছে।
রাতে রাহাত ঘরে পড়তে বসল। বই খুলে বসে আছে। শিউলি এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলেন। টেবিলে রাখলেন। তারপর পাশের চেয়ারে বসলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। রাহাত পড়ছে, কিন্তু মন অন্যদিকে। শিউলি তার পাশে। তাঁর চোখ ছেলের মুখে, চুলে, হাতে। তার মনে হচ্ছে... ছেলেটা কত সুন্দর হয়ে উঠেছে। লম্বা, ফর্সা, চোখের গভীরতা, হাতের শিরা। অপরাধবোধ হচ্ছে... এভাবে ভাবা ঠিক না। কিন্তু ভালো লাগাটা থামছে না।
পড়া শেষ হয়ে গেছে। রাহাতের খাতা বন্ধ, পেন্সিলটা টেবিলে গড়িয়ে পড়েছে। ঘরের আলোটা হলদে, টেবিল ল্যাম্পের নরম আলোয় তার মুখটা আরও গম্ভীর লাগছে। শিউলি অনেকক্ষণ ধরে পাশে বসে ছিলেন, দুধের গ্লাসটা এখনো টেবিলে অর্ধেক পড়ে আছে। তাঁর চোখ ছেলের মুখে, চুলে, হাতে... যেন প্রতিটা লাইন মুখস্থ করতে চান। রাহাতের মন অন্যদিকে। দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়ে সে চুপ করে বসে রইল। হঠাৎ বাইরে মেঘ ডাকল। ঝমঝম করে আবার ঝুম বৃষ্টি নামল। যেন গত রাতের ঝড় ফিরে এসেছে। ঘরের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে, ছাদে টপটপ শব্দ। শিউলি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরে গেছে, কাঁধের নরম ত্বক একটু উন্মুক্ত। তিনি বললেন, “ঘুমের সময় লাইট অফ করে ঘুমাবি। আমি যাই ঘুমাই।”
রাহাত মাথা নাড়ল। “গুড নাইট মা।”
শিউলি দরজার দিকে এগোলেন। কিন্তু দরজায় পৌঁছে থেমে গেলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। রাহাতের গলা শোনা গেল... খুব নিচু, একটু কাঁপা। “মা... একটা কথা বলি?”
শিউলি ঘুরে তাকালেন। তাঁর বুকটা ধুক করে উঠল। এখনি কিছু শোনার জন্যে তিনি প্রস্তুত নন। হৃদয়ের স্পন্দন যেন হঠাৎ দ্রুত হয়ে গেল, একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। ছেলের গলার সেই কাঁপা স্বর, সেই অনুরোধ... যেন গত রাতের সেই মুহূর্তটা আবার ফিরে আসছে। তাঁর গলা শুকিয়ে গেল। চোখে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা, কিন্তু লজ্জা মিশে। তিনি এক পা এগিয়ে এলেন। “কী বলবি?”
রাহাত চোখ নামাল। তার হাতটা টেবিলের কিনারায় আঙুল দিয়ে ঘষছে। “না... থাক। তুমি যাও।”
শিউলির বুকের ধুকধুকানি থামছে না। তিনি এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর গলায় স্নেহ, কিন্তু তার পেছনে একটা অস্থিরতা। “কী বলবি বল।”
রাহাত অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে, যেন কথাগুলো তার গলা থেকে জোর করে বেরোচ্ছে, বলল, “বাবা... বাবা আরো কিছুদিন পরে আসলে ভালো হতো।”
শিউলি থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর বুকটা আবার ধুক করে উঠল, এবার আরও জোরে। তাঁর চোখে অবাক ভাব, কিন্তু সাথে সাথে একটা গভীর বোঝাপড়া। তিনি বুঝতে পারলেন... ছেলের মনের কথা। গত কয়েকদিনের সেই কাছাকাছি থাকা, সিনেমা দেখা, বারান্দায় দাঁড়ানো, সেই বৃষ্টির রাত... সব মিলে একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়েছে। বাবা ফিরলে সেই বন্ধনটা আবার দূরে সরে যাবে। তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। অবাক হলেন, কিন্তু সেই অবাকের পেছনে একটা মিষ্টি অনুভূতি... ছেলে তার সঙ্গ চাইছে। তবু তিনি বললেন, গলা একটু কাঁপা, “কেন রে?”
রাহাত চোখ তুলল না। তার গাল লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়। “না... এমনি। তুমি যাও ঘুমাও।”
শিউলি আর কিছু বললেন না। তাঁর চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে হালকা হাসি। তিনি বুঝতে পেরেছেন... ছেলের মনের কথা তার মনের সাথে মিলে গেছে। তিনি আস্তে করে বললেন, “তুইও বেশি রাত জাগিস না। ঘুমিয়ে পড়।”
শিউলি তার ঘরে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে ছিলেন। ছেলের কথাটা বার বার মনে পড়ছে... “বাবা আরো কিছুদিন পরে আসলে ভালো হতো।” তাঁর বুকটা ধুকপুক করছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন... ছেলে তার সঙ্গ চায়। সেই চাওয়াটা যে তার নিজেরও। লজ্জা হচ্ছে। অপরাধবোধ হচ্ছে। কিন্তু ভালো লাগাটা থামছে না। হঠাৎ বাইরে আবার ঝুম বৃষ্টি নামল। ঝমঝম শব্দ, ছাদে টপটপ। তাঁর মনটা হঠাৎ ছটফট করে উঠল। খুব ইচ্ছে করছে... রাহাতকে ডেকে আনতে। গতকালের মতো দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে। সেই কাছাকাছি থাকা, সেই ভেজা শরীরের উষ্ণতা, সেই নীরব মুহূর্ত। তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। লজ্জায় গাল গরম হয়ে গেল। কিন্তু ইচ্ছেটা থামছে না। যেন এই বৃষ্টি তাঁকে ডাকছে... আয়, আবার সেই মুহূর্তটা ফিরিয়ে আন। তিনি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। পায়ে পায়ে রাহাতের দরজার কাছে গেলেন। হাতটা রাহাতের রুমের দরজার হাতলে। কিন্তু থেমে গেলেন। না। ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। এত রাতে ডাকা ঠিক না। তবু মনটা মানছে না। বৃষ্টির শব্দ তাঁকে টানছে। তিনি একাই বারান্দার দিকে এগোলেন।
রাহাত তার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির শব্দ শুনে সে জানালা খুলল। বৃষ্টির ছাট তার মুখে লাগল। সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি দেখতে দেখতে তার মন ভাবনার জগতে হারিয়ে গেল... মায়ের সেই দৃষ্টি, সেই কাছাকাছি থাকা, যেন বৃষ্টির ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে সব সীমা। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সেই কাঁপনিতে একটা অদম্য শান্তি। যেন এই বৃষ্টি তার মনের ঝড়কে ধুয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেই ঝড়কে আরও গভীর করছে। তার হাতটা জানালার গ্রিলে চেপে ধরল, যেন সেই গ্রিলটা তার মনের সীমানা... কিন্তু সেই সীমানা ভেঙে পড়তে চাইছে। তার শ্বাস ভারী হয়ে এল, যেন রাতের নীরবতা তার মনের ঝড়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তার মনেও একই চিন্তা। যদি মায়ের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা যেত... গতকালের মতো। সেই কাছাকাছি থাকা, সেই ভেজা শরীরের উষ্ণতা। তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে উঠে বসল। মা ঘুমিয়েছে কি? দেখে আসি। সে চুপ করে উঠে দরজা খুলল। ঘরের বাইরে এসে দেখল... বারান্দার দরজা খোলা। একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। মা। সে ধীরে ধীরে এগোল। বারান্দায় পা রাখল। বৃষ্টির ছাট লাগছে। শিউলি পেছনে তাকালেন। চোখে চোখ পড়ল। দুজনেই চুপ। কিন্তু সেই চুপে অনেক কথা।
শিউলি আস্তে করে বললেন, “ঘুম আসেনি?”
রাহাত মাথা নাড়ল। “না। বৃষ্টির শব্দে।”
দুজনে পাশাপাশি দাঁড়াল। বৃষ্টি দেখছে। কিন্তু মন অন্যদিকে। বৃষ্টির ছাট দুজনের গায়ে লাগছে। শিউলির শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। রাহাতের টি-শার্ট গায়ে লেগে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ সরছে না। যেন এই বৃষ্টি তাদের মাঝের ফাঁকটা ভরিয়ে দিচ্ছে।
শিউলি গুনগুন করে গান ধরলেন। খুব নিচু গলায়, যেন নিজের মনকে শান্ত করতে। নজরুলের গান... শ্রাবণের গান।
“শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে
শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে
শাওন রাতে যদি
ভুলিয়ো স্মৃতি মম, নিশীথ স্বপনসম
ভুলিয়ো স্মৃতি মম, নিশীথ স্বপনসম
আঁচলের গাঁথা মালা ফেলিয়ো পথ 'পরে
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে
শাওন রাতে যদি”
গলাটা কাঁপছে। কিন্তু সুরটা বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছে। রাহাত তার পাশে এসে দাঁড়াল। আরও কাছে। দুজনের শরীর ঘেঁষাঘেঁষি। বৃষ্টির ছাট দুজনের গায়ে লাগছে। শিউলির শাড়ি ভিজে গেছে, কাপড়টা শরীরে লেগে তার শরিরের অবয়ব স্পষ্ট করে তুলেছে। রাহাতের টি-শার্টও ভিজে গায়ে লেগে গেছে, তার কাঁধের শক্তি আর বুকের পেশি ফুটে উঠেছে। দুজনেই ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ সরছে না। যেন এই ভেজাটা তাদের মাঝের শেষ ফাঁকটাও ভরিয়ে দিচ্ছে।
এই মুহূর্তে যেন প্রকৃতি নিজেই তাদের কানে ফিসফিস করে বলছে... থেমো না, এই মুহূর্তটা থামিও না। বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন তার কথা... আরও কাছে এসো, আরও গভীরে ডুবো। হাওয়ার ঝাপটা যেন তার হাত... তোমাদের মাঝের শেষ ফাঁকটাও সরিয়ে দিচ্ছি। মেঘের গর্জন যেন তার হাসি... এই টানটা আমিই জাগিয়েছি, এটা আমারই খেলা। বিদ্যুতের চমকানো আলোয় যেন তার চোখ... দেখো, তোমাদের ছায়া এক হয়ে গেছে, আর আলাদা হবে না। এই ঝড় যেন তার আদেশ... ভয় পেয়ো না, লজ্জা কোরো না, এই নিষিদ্ধতাকে গ্রহণ করো, কারণ আমি প্রকৃতি, আমি সব সীমা ভাঙতে জানি। আরও কাছে এসো, আরও জড়িয়ে ধরো... এই রাতটা তোমাদের জন্যই, এই বৃষ্টি তোমাদের মাঝের আগুনকে আরও জ্বালিয়ে তুলতে এসেছে। থামিও না। আরও গভীরে যাও। আমি তোমাদের পথ করে দিচ্ছি।
সেই মুহূর্তে দুজনের মাঝে একটা প্রচণ্ড, নিষিদ্ধ টান জেগে উঠল... যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের শরীরকে একে অপরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, অপ্রতিরোধ্যভাবে। ভিজে শরীরের উষ্ণতা একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলছে, কিন্তু সেই ছোঁয়া শুধু ত্বকের নয়... মনের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। শিউলির বুকটা ধুকপুক করছে, তার শরীর কাঁপছে লজ্জায় আর অপরাধবোধে... এটা ঠিক না, এটা পাপ... কিন্তু সেই টানটা থামাতে পারছেন না। রাহাতেরও শরীর গরম হয়ে উঠছে, তার হাত মায়ের কোমরের কাছে থমকে আছে, যেন আর একটু এগোলেই সব সীমা ভেঙে পড়বে। দুজনের মনে একই চিন্তা... এই টানটা কেন এত অদম্য? কেন এই নিষিদ্ধতা এত মিষ্টি লাগছে? যেন প্রকৃতি নিজে তাদের এই পাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর তারা প্রতিরোধ করতে পারছে না। সেই টানটা তাদের শরীরকে আরও কাছে নিয়ে আসছে, যেন আর কোনো ফাঁক থাকবে না।
দুজনে চোখে চোখ রাখল। অনেকক্ষণ। চোখের দৃষ্টি গভীর, জ্বলন্ত। শিউলির চোখে লজ্জা, কষ্ট, আর একটা অদম্য টান। রাহাতের চোখে অবাক ভাব, ভয়, আর একটা মিষ্টি আকর্ষণ। বৃষ্টির তাদের মুখে লাগছে, গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে... কান্না না বৃষ্টি, কেউ বুঝতে পারছে না। তাদের শ্বাস ভারী, একসাথে উঠছে-নামছে। দুজনের শরীর আরও কাছে এসে গেল। ঘেঁষাঘেঁষি। ভিজে শরীরের উষ্ণতা একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলল। শিউলির বুক রাহাতের বুকে লাগল হালকা। রাহাতের হাত অজান্তে মায়ের কোমরের কাছে এসে থেমে গেল। দুজনেই কাঁপছে। কিন্তু সরছে না। যেন এই মুহূর্তটা চিরকাল থেমে থাকুক।
রাহাত আর সহ্য করতে পারল না। তার হাত দুটো উঠে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল। জোরে। শিউলিকে বুকে টেনে নিল। তার বুকের সাথে মায়ের বুক লেগে গেল। ভিজে শাড়ির উষ্ণতা, নরমতা তার বুকে চেপে বসল। রাহাতের শরীর কেঁপে উঠল। মেয়েদের শরীর কি এত নরম হয়? এত উষ্ণ? এত পূর্ণ? এই প্রথম... কোনো নারীর শরীর এভাবে তার বুকে। সেই নরমতা যেন তার শরীরের প্রতিটা কোষে ঢুকে যাচ্ছে, তার হাত মায়ের পিঠে বোলাতে লাগল, ভিজে শাড়ির উপর দিয়ে... আঙুলগুলো যেন নিজে থেকে চলছে, মায়ের মেরুদণ্ড বরাবর নিচে নামছে, কোমরের সরু বাঁকে থামছে। তার শ্বাস ভারী হয়ে এল, বুকের ভেতরে একটা অদম্য আগুন জ্বলে উঠল। এই অনুভূতি তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন... কোনো নারীর শরীরের এই কাছাকাছি, এই জড়িয়ে ধরা, যেখানে প্রতিটা ছোঁয়া তার শরীরে ঝড় তুলছে। তার মনে হচ্ছে... এই উষ্ণতা, এই নরমতা তার সব অস্থিরতাকে শান্ত করছে, কিন্তু একই সাথে আরও তীব্র করে তুলছে। তার শরীরের প্রতিটা অংশ সাড়া দিচ্ছে, যেন এই ছোঁয়ায় তার সব চাপা চাহিদা জেগে উঠছে। কিন্তু সেই চাহিদার পেছনে একটা গভীর অপরাধবোধ... এ তো তার মা। যাকে সে ছোটবেলা থেকে মা বলে ডেকেছে। এই টানটা কেন এত অদম্য? কেন এই নিষিদ্ধতা এত মিষ্টি লাগছে? তার চোখ বন্ধ। সে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে রাখল। তার শরীর কাঁপছে... উত্তেজনায়, লজ্জায়, আর সেই অপরিহার্য টানে।
শিউলি চমকে উঠলেন। ছেলের হাতের ছোঁয়ায় তার শরীর কেঁপে উঠল। তারপর সব ভেঙে পড়ল। তিনি শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। জোরে। কান্না বুকে চেপে রাখতে পারলেন না। “রাহাত... এটা কি হচ্ছে?” তার গলা ভেঙে যাচ্ছে। তিনি রাহাতকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরলেন। তার শরীর কাঁপছে। কান্নায় ভিজে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে... এই নিষিদ্ধ টানটা পূর্ণ হচ্ছে না, কিন্তু এত কাছে এসে গেছে যে আর থামানো যাচ্ছে না। এত বছরের চাপা চাহিদা, সেই শূন্যতা, সেই একাকিত্ব... সব যেন এই জড়িয়ে ধরায় একটু হলেও ভরে উঠছে, কিন্তু পূর্ণতা আসছে না। তার শরীরের প্রতিটা অংশ সাড়া দিচ্ছে... ছেলের হাতের ছোঁয়ায় তার পিঠে শিহরন খেলে যাচ্ছে, বুকের উষ্ণতা তার বুকে চেপে তার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তার শ্বাস ভারী, যেন এই ছোঁয়ায় তার সব দমিত চাহিদা জেগে উঠছে। কিন্তু কেন? কেন প্রকৃতি তার মধ্যে এই অনুভূতি দিয়েছে? রাহাত তো তার নিজের ছেলে। যাকে সে কোলে করে বড় করেছে, যার জন্য সে সব সহ্য করেছে। এই টানটা কেন এত তীব্র? কেন এই ছোঁয়ায় তার শরীর এভাবে সাড়া দিচ্ছে? কান্নায় তার বুক ভেঙে যাচ্ছে। লজ্জা, অপরাধবোধ, আর সেই অদম্য টান... সব মিশে একাকার। তিনি রাহাতের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলেন। শব্দ করে। বৃষ্টির শব্দে সেই কান্না মিশে যাচ্ছে। তার হাত রাহাতের পিঠে চেপে ধরল, নখ বসিয়ে দিল হালকা... যেন এই কান্নায় সবকিছু ধুয়ে যাক, কিন্তু সেই টানটা থেকে যাক।
দুজনে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ। দুজনের ভেজা শরীর একসাথে। কিন্তু তারা সরছে না। যেন এই কান্না, এই জড়িয়ে ধরা... সবকিছু এই বৃষ্টির মতো অবিরাম। রাহাতের হাত মায়ের পিঠে বোলাচ্ছে, শিউলির হাত ছেলের চুলে ঢুকে গেছে। দুজনের শ্বাস একসাথে। হৃৎস্পন্দন একসাথে। যেন এই মুহূর্তে তারা আর মা-ছেলে নয়... দুটো আত্মা যারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। কান্না থামছে না। কিন্তু সেই কান্নায় একটা অদ্ভুত শান্তি মিশে গেছে। যেন এই কান্নায় সব লজ্জা, সব অপরাধবোধ ধুয়ে যাচ্ছে। শুধু বাকি থাকছে একটা অপরিহার্য টান... যা তাদের দুজনকে এক করে দিয়েছে।
বৃষ্টি থামেনি। দুজনে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ। যেন এই রাতটা শেষ না হোক। যেন এই মুহূর্তটা চিরকাল থেকে যাক। কিন্তু রাত কেটে যাবে। কাল বাবা ফিরবে। কিন্তু এই অনুভূতি থামবে না। বরং আরও গভীর হবে। আরও অদম্য। যেন প্রকৃতি নিজে তার দাবার ঘুটি চালছে... ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, একটা অদৃশ্য খেলায় যেখানে দুজনেই ঘুটি, আর খেলোয়াড় প্রকৃতি নিজে। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু প্রকৃতির সেই খেলা চলছে... যেন আকাশের মেঘগুলো তাদের মনের মেঘকে আরও গাঢ় করছে, যেন বাতাস তাদের মাঝের ফাঁকটা আরও কমিয়ে দিচ্ছে, যেন রাতের নীরবতা তাদের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলছে। আর সেই খেলায় তারা দুজনে হাঁটতে শুরু করেছে, একটা অজানা পথে... যেখানে সব সীমা মিলিয়ে যায়, যেখানে শুধু অনুভূতি বাকি থাকে, গভীর, অন্ধকার, কিন্তু উষ্ণ... যেন একটা সমুদ্র যার ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া যায়, চিরকালের জন্য।