একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ৫
চ্যাপ্টার ৫ – জ্বরের আগুন
সকালের রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ধীরে ধীরে ঢুকছে। কিন্তু আজ সেই আলো যেন একটু দেরিতে এসেছে, ফ্যাকাশে আর নিস্তেজ। আফতাবনগরের ফ্ল্যাটে বাইরে রাস্তার শব্দ শুরু হয়ে গেছে। পায়ের আওয়াজ, বাসের হর্ন, দোকান খোলার ধাতব ঝনঝনানি, সব মিলে একটা সকালের গুঞ্জন। ভেতরে ঘরটা এখনো গত রাতের ছায়ায় ঢাকা। বৃষ্টির পরের ভেজা মাটির গন্ধ লেগে আছে দেওয়ালে, ছাদে, চাদরের ভাঁজে।
শিউলি বিছানা থেকে উঠলেন আস্তে। শরীরটা যেন ভারী হয়ে গেছে। গত রাতের সেই মুহূর্তগুলো এখনো তার শরীরে লেগে আছে। ছেলের হাতের চাপ কোমরে, তার বুকের উষ্ণতা যা তাঁর শাড়ির ভেজা কাপড়ের মধ্য দিয়ে ঢুকে গিয়েছিল, সেই কান্না যা বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গিয়েছিল। তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। চোখে চোখ রেখে নিজেকে দেখলেন। চোখের নিচে কালি, গালে হালকা লালচে ভাব, যেন লজ্জার ছাপ এখনো লেগে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
(পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো, শিউলির স্বামী আছে, সংসার আছে, ছেলে আছে। তাহলে কেন এত হতাশা? কেন এই শরীরের ভেতরে একটা চাপা কষ্ট যা বছরের পর বছর জমে উঠেছে? আব্দুর রহমান, তার স্বামী, একটা ভালো মানুষ। ব্যাংকে ভালো চাকরি করে, সংসার চালায়, কখনো কথা উঁচু করে বলেনি, কখনো হাত তুলেনি। কিন্তু সেই ভালোত্বের পেছনে একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে, যা শিউলিকে খেয়ে খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। রাহাতের জন্মের পর প্রথম দু-তিন বছর সব ঠিক ছিল। তখন রাতের অন্ধকারে দুজনের মাঝে সেই ঘনিষ্ঠতা ছিল। হাতের ছোঁয়া, শরীরের উষ্ণতা, সেই মিষ্টি কাঁপন যা একটা নারীকে পূর্ণতা দেয়। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে সব বদলে গেল। আব্দুর রহমানের শরীরে যেন কোনো অদৃশ্য রোগ ঢুকে গেল। প্রথমে ক্লান্তি, তারপর দূরত্ব। রাতে বিছানায় শুয়ে শিউলি অপেক্ষা করত, কিন্তু স্বামী পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ত। “ক্লান্ত আছি আজ,” বলে এড়িয়ে যেত। শিউলি প্রথমে ভাবতেন অফিসের চাপ। কিন্তু মাস যায়, বছর যায়, সেই দূরত্ব আরও বাড়তে লাগল। যৌনতা কমে এল, একসময় পুরোপুরি থেমে গেল। ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। কোনো বড় রোগ নয়, হয়তো হরমোনের সমস্যা, মানসিক চাপ। কিন্তু আব্দুর রহমান চিকিৎসা নিতে চাননি। “এসব তো বয়সের সাথে হয়,” বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। শিউলি চুপ করে সহ্য করেছিলেন। সংসারের কথা ভেবে, ছেলের কথা ভেবে। তার যৌন চাহিদা, সেই শরীরের গভীর টান, সেই অস্থিরতা, সব মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছিলেন। রাতে একা শুয়ে কাঁদতেন, কিন্তু দিনের আলোয় হাসতেন। “সংসার তো চলছে, এটাই যথেষ্ট,” বলে নিজেকে বোঝাতেন। কিন্তু সেই চাপা আগুন কখনো নিভেনি, শুধু ঘুমিয়ে ছিল। আর গত কয়েকদিনে, রাহাতের সাথে সেই অদ্ভুত কাছাকাছি মুহূর্তগুলো যেন সেই আগুনকে ঝালিয়ে তুলেছে। ছেলের চোখের দৃষ্টি, তার ছোঁয়া, সব যেন শিউলির শরীরে নতুন করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। লজ্জা হয়, অপরাধবোধ হয়, কিন্তু সেই অনুভূতিটা এত মিষ্টি যে থামাতে পারছেন না। যেন একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে, আর তার লাভা এখন ছড়িয়ে পড়ছে।)
রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় হাঁড়ি চাপালেন। রুটি ভাজতে লাগলেন, প্রতিটা রুটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। যেন হাতের কাজে মনকে বাঁধতে চান। পেঁয়াজ কুচি করে ভাজি বানাচ্ছেন। কাঁচা মরিচের ঝাঁঝালো গন্ধ মিশে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু মনটা স্থির নেই। গত রাতের সেই ছোঁয়া এখনো তাঁর ত্বকে অনুভূত হচ্ছে। ছেলের আঙুল যেন এখনো পিঠ বেয়ে নামছে, তার শ্বাস যেন এখনো কানের কাছে। তিনি চোখ বন্ধ করলেন এক মুহূর্তের জন্য। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এটা কী হয়ে গেল? এত বছরের একাকিত্ব, স্বামীর দূরত্ব, রোজকার ছোট ছোট শূন্যতা, সব যেন একসাথে জমে একটা অদ্ভুত টানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই টানটা তো অন্যরকম। এটা তো মা-ছেলের সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে চলে গেছে। তাঁর হাত কাঁপতে লাগল। চামচটা পড়ে গেল টেবিলে। তিনি নিজের হাতের দিকে তাকালেন। এই হাতই তো ছেলেকে কোলে নিয়ে বড় করেছে, এই হাতই তো তার চুলে বিলি কেটেছে হাজারবার। আর এখন এই হাত কাঁপছে একটা নিষিদ্ধ অনুভূতিতে। লজ্জা হচ্ছে, গভীর লজ্জা। কিন্তু তার সাথে একটা অদ্ভুত কষ্টও। যেন এই অনুভূতিটা তাঁর শরীরের ভেতরে কোথাও লুকিয়ে ছিল অনেকদিন ধরে, আর এখন সেটা জেগে উঠেছে।
তিনি মনে মনে বললেন,
“এটা চলতে দেওয়া যাবে না। এটা পাপ। রাহাত আমার সন্তান। আমি তার মা। এই পথে গেলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাকে নিজেকে সামলাতে হবে। দূরত্ব রাখতে হবে। আজ থেকেই।”
কিন্তু সেই কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলা শুকিয়ে গেল। কারণ মনের এক কোণে এখনো সেই মিষ্টি কাঁপনটা রয়ে গেছে। যেন ছেলের চোখের দৃষ্টি এখনো তাঁকে দেখছে, সেই দৃষ্টিতে যে মাতৃত্বের বাইরে অন্য কিছু আছে। তিনি চোখ মুছলেন, নিজেকে সোজা করে দাঁড়ালেন।
“আজ থেকে শুধু মা। আর কিছু না।”
ঘড়িতে নয়টা তিরিশ বেজে গেছে। রাহাত এখনো উঠেনি। শিউলি অবাক। সাধারণত এতক্ষণে ছেলে উঠে পড়ে, কলেজের জন্য তৈরি হয়। উদ্বেগ হলো। রান্নাঘর থেকে ডাকলেন,
“রাহাত! উঠ বাবু, নাশতা রেডি।”
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলেন, একটু জোরে,
“রাহাত! শুনছিস?”
এবারও চুপ। উদ্বেগটা আরও বাড়ল। তিনি হাত মুছে রাহাতের ঘরের দরজায় গেলেন। দরজা হালকা ঠেলে খুললেন। ভেতরে অন্ধকার, পর্দা টানা। বিছানায় রাহাত শুয়ে আছে, চাদরটা গায়ে জড়ানো, কিন্তু শরীরটা কুঁকড়ে আছে, হালকা কাঁপছে।
“রাহাত?”
নরম গলায় ডাকলেন। কোনো উত্তর নেই। তিনি আলো জ্বালালেন, ছুটে বিছানার কাছে গেলেন। ছেলের কপালে হাত রাখলেন। গরম, যেন আগুন জ্বলছে। শরীরটা ঘামে ভিজে গেছে, চাদর ভিজে চটচট করছে।
“জ্বর! এত জ্বর!”
গলা কেঁপে উঠল। চোখে জল এসে গেল। গত রাতের সেই বৃষ্টিতে ভেজা, সেই কাছাকাছি থাকা, সব যেন এই জ্বরের কারণ।
“সব আমার জন্য। আমি কেন তাকে এত ভিজতে দিলাম?”
কেঁদে ফেললেন, ছেলের পাশে বসে পড়লেন। হাতটা রাহাতের গালে বোলাতে লাগলেন, চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছে।
দ্রুত উঠে থার্মোমিটার নিয়ে এলেন। রাহাতের মুখে দিলেন। কয়েক মিনিট পর দেখলেন, ১০২ ডিগ্রি। হাত কাঁপতে লাগল। তিনি দৌড়ে নাপা ট্যাবলেট নিয়ে এলেন। রাহাতের চোখ খুলেছে আস্তে, মুখ ফ্যাকাশে, চোখ লাল।
“মা…”
দুর্বল গলায় বলল।
শিউলি ছেলেকে ধরে উঠিয়ে বসালেন।
“উঠ বাবু, একটা বিস্কুট খেয়ে এই ওষুধটা খা। আমি নাশতা বানিয়ে আনছি। নাশতা খাওয়ার পর মাথায় পানি দেব। জ্বর কমবে।”
গলা কাঁপছে, চোখে জল। রাহাত মাথা নাড়ল দুর্বলভাবে।
“না লাগবে না মা। তুমি বসে থাকো আমার পাশে।”
বলে মায়ের হাতটা ধরল, আঙুল জড়িয়ে। সেই ছোঁয়ায় শিউলির বুক কেঁপে উঠল। গত রাতের স্মৃতি ফিরে এল। কিন্তু তিনি হাতটা ছাড়ালেন না, শুধু চোখ নামালেন।
“না বাবু, ওষুধ খেয়ে নে। মা এখানেই আছে।”
রাহাত বিস্কুট খেল আস্তে, ওষুধ গিলল। শিউলি উঠে গেলেন নাশতা নিয়ে আসতে। কিন্তু মনটা ভারী। এই জ্বর যেন তাঁর দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করে তুলছে।
শিউলি নাশতার ট্রে হাতে রাহাতের ঘরে ফিরলেন। ট্রেতে দুটো গরম রুটি, পেঁয়াজ-ডিমের ভাজি, এক কাপ চা আর এক গ্লাস পানি। ঘরের হালকা আলোয় রাহাতের মুখটা আরও ফ্যাকাশে লাগছে, কিন্তু চোখ দুটো খোলা, মায়ের দিকে তাকিয়ে। তিনি ট্রেটা সাইড টেবিলে রেখে ছেলেকে ধরে আস্তে উঠিয়ে বসালেন, পিঠে বালিশ গুঁজে দিলেন।
“এই নে বাবু, খা। খুব অল্প করে খা, জোর করে না।”
শিউলি একটা রুটি ছিঁড়ে ভাজির সাথে মুড়ে দিলেন ছেলের হাতে। রাহাত আস্তে আস্তে খেতে লাগল, প্রতিটা কামড়ে যেন শক্তি সঞ্চয় করছে। শিউলি পাশে বসে আছেন, চোখ তার মুখে। ছেলের খাওয়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।
খাওয়া শেষ হলে শিউলি একটা বালতিতে ঠান্ডা পানি নিয়ে এলেন। তারপর বালতি থেকে একটা ছোট মগে পানি তুলে নিলেন। তোয়ালেটা ভিজিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে রাহাতের কপালে রাখলেন। ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় রাহাত চোখ বন্ধ করল, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শিউলি ধীরে ধীরে মগ থেকে পানি তুলে মাথায় দিতে লাগলেন। কপাল থেকে চুলের মাঝে, কানের পেছনে। মগের পানি আস্তে আস্তে গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, চুল ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু রাহাতের মুখে একটা শান্তির ছাপ ফুটে উঠল।
হঠাৎ রাহাত নরম গলায় বলল,
“মা… একটা কথা বলি?”
শিউলির হাত থেমে গেল। তিনি আস্তে বললেন,
“বল।”
রাহাত চোখ খুলল না। যেন চোখ বন্ধ রাখলে কথাগুলো বলা সহজ হয়।
“জানো… কালকের রাতটা আমার জীবনের সেরা রাত ছিল।”
শিউলির হাতটা কেঁপে উঠল। পানির ফোঁটা তোয়ালে থেকে গড়িয়ে পড়ল। তাঁর চোখ দুটো ভিজে উঠল হঠাৎ। দ্রুত একটা নিঃশ্বাস নিলেন যেন কান্না চেপে রাখতে। কিন্তু কিছু বললেন না, চুপ করে থাকলেন। শুধু হাতটা আবার চলতে লাগল মাথায় পানি দিতে।
রাহাত আবার বলল, একটু দুর্বল কিন্তু নরম গলায়,
“তোমারও কি সেরা রাত ছিল?”
শিউলি এবারও চুপ। তাঁর গলা আটকে গেছে। কী বলবেন? বলতে চান না। কারণ বললে সব স্বীকার করা হয়ে যাবে। আর এই স্বীকারোক্তি যদি মুখ থেকে বেরোয়, তাহলে আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকবে না। কিন্তু মনটা চিৎকার করে বলছে, হ্যাঁ, ছিল। অনেক বছর পর প্রথমবার শরীরটা এমন কাঁপল, এমন জেগে উঠল। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না।
রাহাত আবার বলল, এবার একটু জোর দিয়ে,
“বলো না মা… তোমারও কি সেরা রাত ছিল?”
শিউলি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর খুব আস্তে, যেন কথাগুলো তার গলা থেকে জোর করে বের করছেন, বললেন,
“হ্যাঁ… আমারও সেরা রাত ছিল।”
রাহাতের ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল, চোখ বন্ধ রেখেই। যেন এই স্বীকারোক্তিটাই তার জ্বরের মধ্যে একমাত্র শান্তি।
শিউলি তোয়ালেটা আবার ভিজিয়ে কপালে রাখলেন। পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। কিন্তু রাহাতের মুখে একটা শান্ত ভাব। কিছুক্ষণ নীরবতা। শুধু রাহাতের হালকা শ্বাস আর বাইরের রাস্তার দূরের শব্দ।
রাহাত চোখ খুলল না, কিন্তু খুব নিচু গলায় বলল,
“মা… জানো, আমার কোনো ক্লোজ ফ্রেন্ড নেই।”
শিউলির হাত থেমে গেল। তিনি আস্তে করে বললেন,
“কেন রে? কলেজে তো তোর অনেক বন্ধু…”
রাহাত হালকা হাসল, চোখ এখনো বন্ধ।
“ওরা বন্ধু তো, কিন্তু ক্লোজ না। কারো সাথে এমন কথা বলতে পারি না যে… মনে হয় সবটা বলে দিলাম। যে কথা বললে লুকিয়ে রাখার দরকার নেই। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।”
শিউলির বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি তোয়ালেটা সরিয়ে রাহাতের চুলে আঙুল চালাতে লাগলেন।
“তুই এতদিন এসব বলিসনি কেন?”
“বলতে লজ্জা লাগত। আর তুমি তো সবসময় ব্যস্ত… বাবার সাথে, সংসার নিয়ে। ভাবতাম বিরক্ত করব। কিন্তু এখন… মনে হচ্ছে আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না।”
রাহাত একটু থামল, তারপর আবার বলল,
“জানো মা, তুমি আমার ফ্রেন্ড হবে? আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড। যার সাথে সব বলা যায়। যার সাথে লুকোচুরি করতে হয় না।”
শিউলির চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি খুব আস্তে বললেন,
“আমি তো তোর মা রাহাত…”
“জানি। কিন্তু মা হওয়ার পাশাপাশি… আমার ফ্রেন্ডও হতে পারো না? যে কথা বললে কোনো জাজমেন্ট নেই, শুধু শোনে আর বোঝে। যার সাথে রাত জেগে গল্প করা যায়, সিনেমা দেখা যায়, এমনকি ছোট ছোট রাগারাগি করা যায়।”
শিউলি হালকা হেসে ফেললেন, চোখের জল মুছলেন।
“তুই এখন জ্বরে পড়ে আছিস, আর এসব কথা ভাবছিস?”
রাহাত চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে জ্বরের ক্লান্তি, কিন্তু একটা ছোট্ট দুষ্টুমি।
“জ্বরে পড়ে থাকলেই তো মনে হয় সব কথা বলে ফেলি। সাধারণ সময়ে তো লজ্জা লাগে।”
শিউলি হাসলেন, এবার একটু জোরে।
“তাহলে বল, কী খুনসুটি করবি আমার সাথে?”
রাহাত মুচকি হাসল।
“প্রথমে তোমাকে বলব, তোমার শাড়ির রঙটা আজ খুব সুন্দর। কিন্তু তুমি যদি আমার জন্য লাল পরতে, তাহলে আরও ভালো লাগত।”
শিউলি ভুরু তুললেন।
“ওরে বাবা! এখন থেকে তোর ফ্রেন্ড হলেই শাড়ির রঙ নিয়ে মন্তব্য শুরু করবি?”
“হ্যাঁ। আর তুমি বলবে, ‘আরে ছেলে, লাল পরলে তো তোর বাবা অবাক হয়ে যাবে।’ তারপর আমি বলব, ‘তাহলে বাবাকে বলব না। আর তোমার ফ্রেন্ড তো আমি, বাবা না।’”
শিউলি হেসে ফেললেন, হাত দিয়ে মুখ ঢেকে।
“তুই পুরো পাগল হয়ে গেছিস জ্বরে।”
রাহাত হালকা হাসল।
“হ্যাঁ। কিন্তু এই পাগলামিটা আমি তোমার সাথেই করতে চাই। আর কারো সাথে না। আর জানো মা, তুমি যদি আমার ফ্রেন্ড হও, তাহলে আমি তোমাকে আমার সব সিক্রেট বলব। যেমন… কলেজে একটা মেয়ে আমাকে প্রপোজ করেছিল, কিন্তু আমি রিজেক্ট করেছি।”
শিউলি অবাক চোখে তাকালেন।
“কেন রে? কেমন মেয়ে?”
রাহাত হাসল।
“ভালো মেয়ে। কিন্তু আমার মনে হয়নি কিছু। মনে হয়েছে… আমার কাছে তোমার মতো কেউ নেই। তাই কেন অন্য কারো সাথে?”
শিউলির গাল লাল হয়ে উঠল। তিনি হালকা করে রাহাতের কাঁধে চাপড় মারলেন।
“এসব কথা ফ্রেন্ডকে বলা যায় না রাহাত। এটা… এটা অন্যরকম।”
রাহাত চোখ বুজে হাসল।
“ফ্রেন্ডকে তো সব বলা যায়। তুমি বলো না, তোমার কোনো সিক্রেট আছে যা আমাকে বলতে চাও?”
শিউলি চুপ করে গেলেন। তারপর আস্তে করে রাহাতের হাতটা ধরলেন।
“ঠিক আছে… আমি তোর ফ্রেন্ড হব। কিন্তু শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“প্রথমত, তুই সুস্থ হয়ে উঠবি। দ্বিতীয়ত, আমরা দুজনেই জানব যে এই ফ্রেন্ডশিপটা… আমাদের মধ্যে থাকবে। বাইরে কাউকে বলা যাবে না। আর তৃতীয়ত… আমরা সবসময় সত্যি কথা বলব। লুকোচুরি নয়। আর খুনসুটি করব, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে না।”
রাহাত চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।
“ডিল। কিন্তু সীমা কে ঠিক করবে? তুমি?”
শিউলি হেসে ফেললেন।
“হ্যাঁ, আমি। কারণ আমি তোর ফ্রেন্ড হলেও, তোর মা তো।”
রাহাত হাসল।
“ঠিক আছে। প্রথম খুনসুটি… তুমি আমাকে চুমু দাও না, আমার জ্বর কমবে।”
শিউলি লজ্জায় গাল লাল করে ফেললেন, কিন্তু হেসে কপালে একটা চুমু খেলেন, যেন ছোটবেলায় করতেন।
“এখন চুপ করে শুয়ে থাক। ফ্রেন্ড তো এখন থেকেই, কিন্তু জ্বর কমলে আরও খুনসুটি করব।”
রাহাত হাসল, চোখ বন্ধ রেখেই।
“প্রমিস?”
“প্রমিস।”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। কিন্তু এবারের নীরবতায় ভয় নেই, অপরাধবোধ নেই। শুধু একটা নতুন, নরম বন্ধন যা দুজনের মাঝে আরও গভীর হয়ে বসে গেল। বাইরে সকাল এগোচ্ছে, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে সময় যেন থেমে গেছে। দুজনের জন্য, শুধু দুজনের।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশে কয়েকটা মেঘের ছায়া, কিন্তু বৃষ্টি নেই। ফ্ল্যাটের জানালায় হালকা হাওয়া আসছে, যা রাহাতের ঘরে ঢুকে তার চাদরটা একটু নড়িয়ে দিচ্ছে। জ্বরটা একটু কমেছে। থার্মোমিটারে ১০০ ডিগ্রি। কিন্তু শরীর এখনো দুর্বল, ঘামে ভেজা। রাহাত বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, একটা বই হাতে, কিন্তু চোখ অন্যদিকে। সকালের সেই কথা, মায়ের সাথে সেই নতুন বন্ধুত্ব, সব মনে ঘুরছে।
শিউলি পাশে বসে আছেন, ছেলের কপালে হাত রেখে।
“জ্বর কমেছে রে। কিন্তু উঠিস না। শুয়ে থাক।”
রাত নয়টা বাজে। দরজায় টোকা পড়ল। শিউলি উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। আব্দুর রহমান ঢুকলেন, ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু হাসি।
“কী হয়েছে? রাহাত কেন বিছানায়?”
তিনি ছেলের ঘরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। শিউলি আস্তে বললেন,
“জ্বর। সকাল থেকে। ওষুধ দিয়েছি, কমেছে একটু।”
আব্দুর রহমান ছুটে ছেলের পাশে গেলেন। হাতটা কপালে রাখলেন।
“ওরে বাবা, এখনো গরম! কী করে হলো?”
তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখে উদ্বেগ। রাহাত চোখ খুলে বলল,
“ভালো আছি বাবা। বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম কাল।”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
“এত অসতর্ক! ডাক্তার দেখিয়েছিস?”
তারপর শিউলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“তুমি ডাক্তার দেখিয়েছ? না হলে চল, এখনই যাই।”
শিউলি বললেন,
“কমেছে তো। ওষুধ দিয়েছি। কাল দেখিয়ে নেব যদি না কমে।”
আব্দুর রহমান ছেলের পাশে বসলেন।
“কেমন লাগছে রে? মাথা ঘুরছে? খেতে পেরেছিস?”
তিনি ছেলের হাতটা ধরলেন, চোখে চিন্তা।
“আমি অফিস থেকে ছুটি নেব কাল। তোকে দেখতে হবে।”
তার গলা ভারী, মন খারাপ। রাহাত মাথা নেড়ে বলল,
“লাগবে না বাবা। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
কিন্তু তার চোখ মায়ের দিকে। শিউলি দূরে দাঁড়িয়ে, চোখ নামিয়ে। বাবা আরও কিছুক্ষণ কথা বললেন, ওষুধের কথা, খাওয়ার কথা, তারপর উঠে গেলেন গোসল করতে। শিউলি ছেলের পাশে এসে বললেন,
“বাবা চিন্তা করছেন। তুই শুয়ে থাক।”
রাতের ডিনারের টেবিলে তিনজন বসে। শিউলি হালকা খিচুড়ি বানিয়েছেন, ছেলের জন্য তেল কম দিয়ে। রাহাতকে ধরে ধরে টেবিলে বসিয়েছেন। আব্দুর রহমান খাচ্ছেন, কিন্তু চোখ ছেলের দিকে।
“আমি তো সারা মাস বাইরে বাইরে থাকি, তুমি সব সামলাও। একদিন না থাকলেই এমন হয়ে যায়।”
তিনি শিউলির দিকে তাকিয়ে হাসলেন, গলায় স্নেহ।
“তুমি না থাকলে এ সংসার চলত না।”
শিউলি হাসলেন, গলা নরম।
“আরে না না, এমন কিছু না। ছেলে তো ছোট্ট অসুখে পড়েছে। আমি তো সামলাই। তুমি চিন্তা কোরো না।”
তাঁর হাসিটা স্বাভাবিক, চোখে স্নেহ। আব্দুর রহমান হাত বাড়িয়ে শিউলির হাতটা ধরে আদর করলেন হালকা।
“তুমি তো সবসময় এমনই। আমার ভাগ্য যে তোমাকে পেয়েছি।”
রাহাত একদৃষ্টিতে দেখছে। মায়ের হাসি, বাবার সাথে সেই নরম কথা, হাত ধরা—সব যেন তার বুকের ভেতরে ছুরির মতো বিঁধছে। কেন যেন ভালো লাগছে না। মা তো তার, তার সাথে এমন হাসি, এমন কথা… বাবার সাথে কেন? তার মুখটা কঠিন হয়ে গেল, খাবার নাড়তে লাগল চামচ দিয়ে।
“বাবা… তোমার অফিস কেমন চলছে?”
বলল, কিন্তু গলা শুকনো।
ডিনার শেষ হলে শিউলি একটা বালতিতে ঠান্ডা পানি নিয়ে এলেন। মগ ভরে রাহাতের ঘরে গেলেন। ছেলেকে ধরে বসালেন, তারপর তোয়ালে ভিজিয়ে কপালে, গলায়, হাতে-পায়ে আস্তে আস্তে মুছতে লাগলেন। জলপট্টি দিলেন রুমাল দিয়ে। প্রথমে কপালে, তারপর গলায়। রাহাত চোখ বন্ধ করে রইল, মায়ের হাতের ছোঁয়ায় শান্তি পাচ্ছে। শিউলি খুব আস্তে বললেন,
“আর একটু সহ্য কর। জ্বর আরও কমবে।”
রাত গভীর হল। সবাই ঘুমোতে গেল। রাহাত তার ঘরে শুয়ে, চোখ খোলা। মায়ের কথা ভাবছে। মা কি এখন বাবার পাশে শুয়ে? কি বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে? সেই ছবিটা তার মনে আসতেই বুকটা জ্বলে উঠল। প্রচণ্ড জেলাসি, যেন কেউ তার জিনিস ছিনিয়ে নিচ্ছে।
“মা তো আমার…”
মনে মনে বলল, কিন্তু অপরাধবোধ হলো। তার শরীর গরম হয়ে উঠল আবার, জ্বরের সাথে মিশে সেই অস্থিরতা।
শিউলি তার ঘরে শুয়ে, স্বামীর পাশে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই ছেলের মুখ ভাসছে। তার দুর্বল হাসি, সেই কথা, সেই ফ্রেন্ডশিপ। স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু তাঁর ঘুম আসছে না। বুকটা অস্থির, যেন ছেলের কাছে যেতে চাইছে।
“এটা কী হচ্ছে আমার?”
মনে মনে বললেন, কিন্তু উত্তর নেই। শুধু একটা গভীর টান। যেন শরীরের প্রতিটা কোষ চাইছে ছেলের কাছে যেতে, তার কপালে হাত রাখতে, তার চুলে আঙুল চালাতে। লজ্জা হয়, ভয় হয়, অপরাধবোধ হয়। কিন্তু তার মাঝে একটা অদ্ভুত শান্তি। যেন এই অনুভূতিটাই তাঁর জীবনের একমাত্র সত্যি। বছরের পর বছরের শূন্যতা যেন এই টানে ভরে উঠছে।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন, কিন্তু ছেলের মুখ ভাসছে। তার দুর্বল হাসি, তার চোখের সেই নরম আলো। হঠাৎ বাইরে হাওয়ার একটা ঝাপটা এল, পর্দা কাঁপিয়ে দিল। যেন প্রকৃতি ফিসফিস করে বলছে—যা, যা তার কাছে। এই রাতটা তোদের।
শিউলি উঠে বসলেন। ঘড়িতে রাত একটা বাজে। তিনি আস্তে করে বিছানা থেকে নামলেন, পায়ে পায়ে রাহাতের ঘরের দিকে এগোলেন। দরজা হালকা খোলা। ভেতরে হলদে আলো, রাহাত শুয়ে আছে, চাদরটা গায়ে জড়ানো। তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলেন। ছেলের চোখ বন্ধ, কিন্তু শ্বাস অস্থির। যেন সেও ঘুমোচ্ছে না।
শিউলি আস্তে করে ঢুকলেন, বিছানার পাশে বসলেন। রাহাতের কপালে হাত রাখলেন। এখনো হালকা গরম, কিন্তু কমেছে। তাঁর হাত কাঁপছে, কিন্তু সরাতে পারছেন না। রাহাত চোখ খুলল আস্তে। মায়ের মুখ দেখে তার চোখে একটা নরম আলো জ্বলে উঠল।
“মা… তুমি?”
দুর্বল গলায় বলল। শিউলি চোখ নামিয়ে বললেন,
“জ্বর দেখতে এলাম। ঘুম আসছে না?”
রাহাত মাথা নাড়ল।
“না। তোমার কথা ভাবছিলাম।”
শিউলির বুকটা ধুক করে উঠল। তিনি আস্তে করে বললেন,
“আমিও তোর কথা ভাবছিলাম।”
রাহাত হাত বাড়িয়ে মায়ের হাতটা ধরল।
“মা… আমার কাছে বসো।”
শিউলি কোনো কথা বললেন না, শুধু বিছানার কিনারায় বসলেন। রাহাত তার হাতটা চেপে ধরল জোরে।
“আমার খুব ভালো লাগছে যে তুমি এসেছ।”
শিউলি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমারও ভালো লাগছে… কিন্তু রাহাত, এটা কী করছি আমরা?”
রাহাত চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকাল, তার চোখে জ্বরের ক্লান্তি মিশে আছে, কিন্তু মুখে একটা ছোট্ট দুষ্টু হাসি।
“কী করছি? এখন তো শুধু বসে আছি। জ্বর দেখতে এসেছ, দেখছ। আর কী করব?”
শিউলি হালকা হেসে ফেললেন, কিন্তু হাসিটা লজ্জায় মিশে গেল।
রাহাত মায়ের হাতটা তার গালে চেপে ধরল, নরম করে।
শিউলি চুপ করে রইলেন। বাইরে হাওয়ার ঝাপটা পর্দা কাঁপিয়ে দিল, চাঁদের আলো এসে পড়ল দুজনের মুখে। তিনি খুব আস্তে বললেন,
“তোর বাবা ঘুমোচ্ছেন… আর আমি এখানে বসে আছি। কী হচ্ছে এসব?”
রাহাত হালকা হেসে বলল,
“আমার বন্ধু রাতে কী পরে ঘুমায় জানো? আমি তো কখনো জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু তুমি তো আমার বন্ধু… বলো না, তুমি কী পরে ঘুমাও?”
শিউলি অবাক হয়ে তাকালেন, তারপর হেসে ফেললেন। একটা ছোট্ট, লজ্জামিশ্রিত হাসি।
“পাগল হয়ে গেছিস তুই! এসব কথা ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞেস করা যায়?”
“কেন যাবে না? ফ্রেন্ড তো সব জানতে চায়। আমি তো তোমাকে বলতে পারি। আমি সাধারণত টি-শার্ট আর পাজামা পরি। আর তুমি?”
শিউলি গাল লাল করে বললেন,
“তুই থাম। আমি তো তোর মা…”
“আর ফ্রেন্ডও। দুটোই। বলো না, কী পরে ঘুমাও? শাড়ি না খুলে?”
শিউলি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাসলেন।
“না বোকা, শাড়ি খুলে নাইটি পরি। সাধারণ নাইটি।”
রাহাত মুচকি হেসে বলল,
“দেখো, এখন বললে। ফ্রেন্ড হওয়ার পর কত সহজ হয়ে গেল। এখন আর লজ্জা লাগছে না?”
শিউলি চোখ নামিয়ে বললেন,
“লাগছে। কিন্তু… তোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে। অনেকদিন পর এমন লাগছে।”
রাহাত তার মায়ের হাতটা চেপে ধরে বলল,
“তাহলে আর লুকোচুরি করব না। আমি তোমার সব জানতে চাই। তোমার ছোট ছোট সিক্রেট, তোমার পছন্দ, তোমার রাগ… সব। আর তুমি আমার।”
শিউলি চুপ করে রইলেন। তারপর আস্তে করে বললেন,
“ঠিক আছে… কিন্তু সবকিছু একসাথে না। ধীরে ধীরে। আর এখন তুই ঘুমো। জ্বর আছে এখনো।”
রাহাত চোখ বন্ধ করল, কিন্তু হাত ছাড়ল না।
“আজ রাতটা এখানে থাকো। শুধু বসে থাকো। আমি ঘুমিয়ে পড়লে চলে যেয়ো।”
শিউলি কোনো কথা বললেন না। তিনি ছেলের পাশে বসে রইলেন, তার চুলে আঙুল চালাতে লাগলেন। বাইরে হাওয়া বইছে, চাঁদের আলো পড়ছে। যেন প্রকৃতি নিজে বলছে—এই রাতটা তোদের। কোনো তাড়া নেই। কাল সকাল হলে আবার সব স্বাভাবিক। কিন্তু এখন… শুধু এই মুহূর্ত। শুধু দুজন।
রাহাতের শ্বাস ধীর হয়ে এল। শিউলি তার কপালে হাত রেখে বসে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছে এই ছোট ছোট কথা, এই হালকা খুনসুটি, যেন অনেক বছরের শূন্যতা ভরিয়ে দিচ্ছে। লজ্জা আছে, ভয় আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় একটা অনুভূতি। যেন প্রথমবার কেউ তাঁকে এভাবে চাইছে, শুধু তাঁকে।
রাত আরও গভীর হল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর রাহাত খুব নিচু গলায় বলল,
“মা… আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না?”
শিউলির শরীর কেঁপে উঠল। তিনি চোখ নামালেন, কিন্তু হাতটা ছাড়লেন না।
“রাহাত…”
“শুধু একটু। জ্বরের জন্য। ঠান্ডা লাগছে।”
রাহাতের গলায় একটা ছোট্ট অনুরোধ, কিন্তু তার চোখে অন্য কিছু। সেই গভীর টান।
শিউলি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
রাহাত হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে বসল। তার শরীর এখনো দুর্বল, কিন্তু চোখে একটা অদম্য জেদ। সে আস্তে করে পা নামাল মেঝেতে, তারপর হাত বাড়িয়ে মায়ের হাতটা ধরে তাকে বসা থেকে দাড়া করালো। শিউলির হাত কাঁপছে, কিন্তু সে ছাড়ল না। রাহাত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, পা কাঁপছে জ্বরের কারণে, কিন্তু মায়ের হাত ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দুজনেই দাঁড়িয়ে রইল—ঘরের হলদে আলোয় দুজনের ছায়া দেওয়ালে লম্বা হয়ে পড়েছে। শিউলির শ্বাস ভারী, গলা শুকিয়ে গেছে। রাহাতের চোখে একটা নরম, কিন্তু তীব্র অনুরোধ।
দুজনেই নার্ভাস। রাহাতের হাতটা মায়ের হাতে ঘামে ভিজে গেছে, শিউলির আঙুল কাঁপছে। কোনো কথা নেই। শুধু দুজনের শ্বাসের শব্দ। রাহাত আস্তে আস্তে এক পা এগোল, তারপর আরেক পা। শিউলি পেছাতে চাইলেন না, কিন্তু পা সরছে না। দুজনের মাঝের ফাঁকটা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। রাহাতের বুকের উষ্ণতা শিউলির বুকে লাগল—প্রথমে হালকা, তারপর পুরোপুরি। রাহাতের হাত উঠে এল, মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল—জোরে, কিন্তু নরম করে। শিউলির নরম বুক ছেলের শক্ত বুকের সাথে চেপে বসল। দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। শিউলির বুকের নরমতা রাহাতের বুকে মিশে গেল—একটা গভীর, তীব্র অনুভূতি। শিউলির শরীর কেঁপে উঠল, তার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল। রাহাতের হাত তার পিঠে চেপে ধরল, আঙুলগুলো পিঠের উপর দিয়ে বোলাতে লাগল। শিউলির শ্বাস ভারী হয়ে এল, তার গলা থেকে একটা নিচু শব্দ বেরিয়ে এল—যেন কান্না আর আনন্দ মিশে।
রাহাত মুখ তুলল। তার চোখ মায়ের চোখে। দুজনের মুখ এত কাছে যে ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। রাহাতের ঠোঁট প্রথমে তার গালে ছুঁয়ে গেল—ধীরে, নরম করে। শিউলির চোখ বন্ধ হয়ে গেল, গাল গরম হয়ে উঠল। রাহাতের ঠোঁট তার গাল বেয়ে নেমে এল গলার দিকে—একটা লম্বা, গভীর চুমু। শিউলির শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল, তার পিঠ কেঁপে উঠল। রাহাতের হাত তার কোমরে আরও জোরে চেপে ধরল। শিউলি আর সহ্য করতে পারলেন না—তার ঠোঁট রাহাতের কপালে রাখলেন, তারপর গালে। চুমুটা লম্বা হলো, নরম, কিন্তু তীব্র। রাহাতের গালে তার ঠোঁটের উষ্ণতা জ্বলে উঠল। রাহাতের ঠোঁট তার গলায় আবার নেমে এল—এবার একটু জোরে, একটু লম্বা সময় ধরে। শিউলির গলা থেকে একটা কাঁপা শব্দ বেরিয়ে এল—যেন কান্না আর আনন্দ এক হয়ে গেছে। তার হাত রাহাতের পিঠে চেপে ধরল, নখ হালকা বসে গেল। দুজনের শরীর একে অপরের সাথে মিশে গেছে—নরম বুক শক্ত বুকে চেপে, শ্বাস এক হয়ে, হৃৎস্পন্দন এক হয়ে। প্রতিটা চুমুতে শিউলির শরীরে নতুন করে আগুন জ্বলে উঠছে—তার বুকের নিচে গরম ঢেউ উঠছে-নামছে, পা কাঁপছে, শ্বাস ভারী। রাহাতের হাত তার পিঠ বেয়ে নিচে নামছে, কোমরের সরু বাঁকে থেমে গেছে।
কিন্তু হঠাৎ শিউলির মাথায় সব ফিরে এল—ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, স্বামীর মুখ, সংসারের দায়িত্ব। বুকটা এত জোরে ধুক করে উঠল যে শ্বাস আটকে গেল। তিনি আস্তে করে ছেলেকে ছাড়লেন, পিছিয়ে গেলেন। রাহাতের চোখ খুলে গেল—তার চোখে একটা অসহায়, কিন্তু তীব্র অনুরোধ। শিউলি উঠে দাঁড়ালেন, পা কাঁপছে।
“রাহাত... আমি যাই।”
“মা...” রাহাতের গলা ভেঙে গেল, তার হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইল।
শিউলি চোখ নামিয়ে বললেন, “ঘুমো। আমি... আছি। কিন্তু এখন যাই।”
তিনি দ্রুত দরজার দিকে এগোলেন। পেছনে ফিরে তাকালেন না। দরজা টেনে বন্ধ করলেন। বাইরে বেরিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। শরীর কাঁপছে, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। গালে, গলায়, কপালে ছেলের ঠোঁটের উষ্ণতা এখনো জ্বলছে। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে—একটা তীব্র, অসহ্য আগুন। তিনি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন, কান্না চেপে রাখতে। কিন্তু শরীর বলছে—আবার ফিরে যাও, আবার তার কাছে যাও।
ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। স্বামী পাশে ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু তার মনে শুধু ছেলের মুখ। তার ঠোঁটের ছোঁয়া, তার হাতের চাপ, তার শ্বাসের উষ্ণতা—সব যেন তার শরীরে লেগে আছে। তিনি চোখ বন্ধ করলেন, কিন্তু ঘুম আসছে না। শরীরের প্রতিটা অংশ এখনো কাঁপছে, এখনো চাইছে।
রাহাত তার ঘরে দাঁড়িয়ে রইল। তার গালে, গলায় মায়ের চুমুর উষ্ণতা এখনো জ্বলছে। সে বিছানায় বসে পড়ল, হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল, “মা... এটা আর থামবে না। আমি তোমাকে ছাড়ব না।”
রাত আরও গভীর হল। প্রকৃতি যেন চুপ করে দেখছে—দুজনের এই অদম্য টান, যা এখন আর কোনো সীমা মানছে না।