একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ৮
চ্যাপটার ৮ : হিংসার আগুন
শিউলি রান্নাঘরের কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাতে চায়ের কাপ, কিন্তু চুমুক দেওয়ার কথা মনে পড়ছে না।
রাহমান শাহেব সকাল সকাল অফিসে চলে গেছেন।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা এখনো কানে বাজছে।
ফ্ল্যাটটা এখন নিস্তব্ধ, শুধু ফ্রিজের হালকা গুনগুন আর দূরের রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ।
তার মাথায় গত রাতের সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।
রাহাতের হাত যখন নাইটির ভেতর ঢুকেছিল, আঙুল দিয়ে নিপল ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
সেই মুহূর্তে তার শরীরটা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল, নিচে গরম ভেজা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছিল, প্যান্টি চপচপে হয়ে গিয়েছিল।
আর সে নিজে? চুপ করে থাকতে পারেনি।
চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল, হাত দিয়ে রাহাতের চুল টেনে ধরেছিল।
লজ্জায় এখনো গা পুড়ে যাচ্ছে।
“আমি কী করলাম?”
মনে মনে বললেন, গলা শুকিয়ে গেছে।
“আমি তার মা... তার মা...”
কথাটা নিজের কানেই অদ্ভুত লাগছে।
চোখ বন্ধ করলেন, কিন্তু ছবিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রাহাতের শ্বাস তার গলায়, তার ঠোঁট গলায় চেপে চুষছে, দাঁত দিয়ে হালকা কামড়... আর তার নিজের শরীরের সেই বিশ্বাসঘাতক সাড়া।
হঠাৎ মনে পড়ল রাহমানের মুখ।
যদি সে জানে? যদি একদিন দরজা খুলে দেখে ফেলে?
তার চোখের সেই ঘৃণা, রাগ, হয়তো হাত তুলবে।
না, খুন করবে না। কিন্তু যা করবে তা আরও খারাপ।
সংসার ভেঙে যাবে, ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট, সমাজে মুখ দেখানো যাবে না।
লোকে বলবে, “ওই বউটা... ছেলের সাথে...”
চিন্তাটা এতটাই ভয়ঙ্কর যে তার বুকটা চেপে ধরল, শ্বাস আটকে এল।
হাত দিয়ে বুক চেপে ধরলেন, যেন হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।
“না... আর না,”
ফিসফিস করে বললেন।
“আজ থেকে শেষ। কোনোদিন আর না।”
ঠিক তখনই রাহাতের ঘর থেকে শব্দ এল।
বিছানার ক্রিক, পায়ের আওয়াজ।
শিউলি চমকে উঠলেন।
সে উঠেছে।
হাতটা কাঁপতে লাগল আরও জোরে।
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে দিলেন, যেন ছুঁয়ে থাকতে পারছেন না।
রাহাত বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল।
চুল ভেজা, মুখে পানির ছিটা, টি-শার্ট আর জিন্স।
চোখে গত রাতের সেই অসমাপ্ত ক্ষুধা এখনো জ্বলজ্বল করছে।
কিন্তু মুখে হালকা হাসি।
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে শিউলিকে দেখল।
তারপর ধীরে ধীরে পিছন থেকে এগিয়ে এল।
শিউলি পিঠে তার উপস্থিতি টের পেলেন।
শরীরটা কেঁপে উঠল।
রাহাত পিঠ থেকে জড়িয়ে ধরল, দুহাত কোমরে।
তার শ্বাস গরম গলায় লাগল।
হালকা চুমু খেল গলার নরম ত্বকে।
“গুড মর্নিং... আমার জিএফ,”
ফিসফিস করে বলল।
গলায় সেই চেনা দুষ্টুমি, কিন্তু তার নিচে লুকানো তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
শিউলি তার হাত সরিয়ে দিলেন, জোর করে।
পিছিয়ে গিয়ে বললেন,
“রাহাত... না। আর না। আমরা এসব করব না।”
গলা শুকনো, কথা বলতে গিয়ে গলা আটকে যাচ্ছে।
“তুই যা... তোর চা টেবিলে আছে। খেয়ে নে।”
রাহাত হাসল, কিন্তু হাসিটা একটু জোর করে।
চোখে বিস্ময়।
এক পা এগিয়ে এল।
“কী হলো মা? গত রাতে... আমি বেশি করে ফেলেছি? সরি... কিন্তু তুমি তো... তুমি তো থামতে চাওনি। তোমার শরীর তো বলছিল...”
“চুপ কর!”
শিউলি ফিসফিস করে বললেন, গলা কাঁপছে।
চোখে জল চলে এসেছে।
“এসব আর না। বুঝলি? এটা ঠিক না। আমি তোর মা। তোর মা! এটা পাপ। বাবা যদি জানে... সে আমাদের দুজনকেই... শেষ করে দেবে।”
কথাটা বলতে গিয়ে গলা ভেঙে গেল।
“তুই কলেজে যা। পড়ায় মন দে। তোর বয়সী মেয়েরা আছে... তাদের সাথে...”
রাহাত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে হতাশা, কিন্তু ভেতরে আগুন জ্বলছে।
সে চা-টা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল, কিন্তু চোখ শিউলির উপর।
তারপর উঠে শিউলির কাছে গেল।
হাত ধরতে গেল।
শিউলি পিছিয়ে গেলেন।
“মা... প্লিজ। গত রাতে তুমি কাঁপছিলে। তোমার চোখে... তুমি চাইছিলে। আমি জানি।”
শিউলি মাথা নাড়লেন।
চোখে জল গড়িয়ে পড়ল।
“না রাহাত। আমি চাইনি। আমার শরীর... আমার শরীরটা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু আমি চাই না। এটা আর হবে না। কখনো না।”
গলা ভারী হয়ে গেছে।
“তুই যা। কলেজ যা।”
রাহাতের মনটা খারাপ হয়ে গেল।
“ঠিক আছে মা। যেমন তুমি বলছ।”
ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল।
দরজার দিকে এগোল।
দরজা খোলার আগে ফিরে তাকাল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
শিউলি একা দাঁড়িয়ে রইলেন।
বুকটা ধুকধুক করছে।
হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন।
জল গড়িয়ে পড়ছে।
“আমি কী করব এখন?”
মনে মনে বললেন।
শরীরটা এখনো জ্বলছে।
মনটা জানে এই দূরত্বটা বেশিদিন টিকবে না।
আর সেই ভয়টা, সেই লজ্জা, সেই ক্ষুধা সব মিলিয়ে তাকে গিলে খাচ্ছে।
রাহাত কলেজের গেট দিয়ে ঢুকতেই মনে হলো আজকের দিনটা অন্যরকম।
ক্লাসে বসে প্রফেসরের লেকচার শুনছে, কিন্তু কানে ঢুকছে না কিছু।
মায়ের সকালের কথাগুলো বারবার ফিরে আসছে।
“তোর বয়সী মেয়েরা আছে... তাদের সাথে...”
কথাটা যেন তার মাথায় একটা আইডিয়া জাগিয়ে দিয়েছে।
কাশফিয়া।
সে তো অনেকদিন ধরে তার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদি একটু কাছে যায়, মা নিশ্চয় জেলাস হয়ে যাবে।
আর জেলাসি হলে... হয়তো মা নিজেই সব ভুলে কাছে চলে আসবে।
টিফিন টাইমে ক্যান্টিনে গেল।
এক কোণায় বসে চা আর সিঙ্গারা নিল।
কাশফিয়া তার গ্রুপ থেকে দেখতে পেয়ে উঠে এল।
আজ সে একটা কালো টাইট টপ আর হাই-ওয়েস্ট জিন্স পরে আছে, চুল খোলা, চোখে হালকা কাজল।
হাসি দিয়ে বসল।
“হাই রাহাত! আজও একা একা? বসি?”
রাহাত মাথা তুলে তাকাল, হালকা হাসল।
“হ্যাঁ, বস। কেমন আছিস?”
কাশফিয়া চুল একপাশে ঝাঁকিয়ে বসল।
“ভালোই তো। তুই? মুখটা একদম অফ লাগছে। কী হয়েছে? জ্বরটা ফিরে এসেছে নাকি?”
রাহাত কাঁধ ঝাঁকাল।
“না রে, ঠিক আছি। শুধু একটু মাথা ধরছে।”
কাশফিয়া কাছে ঝুঁকে এল।
“আরে, তাহলে লাইব্রেরিতে চল না আজ? তোর নোটস দেখব। কাল তোর সাথে কথা বলে খুব ভালো লেগেছে। তুই তো একটু শান্ত টাইপ, কিন্তু যখন কথা বলিস, খুব ইন্টারেস্টিং লাগে।”
রাহাত হাসল।
“তুইও তো খুব ফান। তোর গ্রুপে সবসময় হাসি-ঠাট্টা।”
কাশফিয়া হাসতে হাসতে বলল,
“আরে, গ্রুপ তো গ্রুপ। কিন্তু তোর সাথে কথা বললে আলাদা লাগে। তুই শান্ত, কিন্তু যা বলিস, মনে থেকে যায়। আচ্ছা, তোর কলেজ লাইফ কেমন লাগে? আমার তো বান্ধবীরা ছাড়া বোরিং লাগে কখনো।”
রাহাত বলল,
“ভালোই লাগে। ক্লাস, লাইব্রেরি, বাড়ি। তুই তো সবসময় ব্যস্ত থাকিস।”
কাশফিয়া হাসল।
“হ্যাঁ, কিন্তু তোর মতো কেউ থাকলে আরও মজা হয়। আচ্ছা, তোর কোনো কলেজের ফেভারিট স্পট আছে? আমার তো ছাদটা খুব ভালো লাগে। বিকেলে গিয়ে বসলে মনটা ফ্রেশ হয়ে যায়। তুই কখনো যাস?”
রাহাত বলল,
“কখনো কখনো। ছাদে বসে বই পড়ি। শান্ত লাগে। তুই কী করিস সেখানে?”
কাশফিয়া চোখ চকচক করে বলল,
“আমি তো গান শুনি, আর কখনো ফ্রেন্ডদের সাথে গল্প করি। তুই যদি চাস, কোনোদিন একসাথে যাব? মানে... ফ্রেন্ড হিসেবে।”
রাহাত হাসল।
“দেখা যাবে।”
কাশফিয়া বলল,
“আচ্ছা, তোর কোনো কলেজের ক্যান্টিনের ফেভারিট ফুড আছে? আমার তো চিকেন ফ্রাই আর চা। কিন্তু তোর মতো শান্ত ছেলেরা কী খায়?”
রাহাত বলল,
“আমার স্যান্ডউইচ আর চা। সিম্পল।”
কাশফিয়া হাসল।
“আচ্ছা, শোন, আজকে চল লাইব্রেরিতে। তুই আমাকে ম্যাথটা একটু দেখিয়ে দে। আমি তো ক্লাসে কিছু ধরতে পারি না।”
ক্লাসের পর লাইব্রেরিতে গেল।
এক কোণায় টেবিলে বসল।
কাশফিয়া নোটবুক খুলে বসল।
“এই অংশটা বুঝিয়ে দে না। প্রফেসর যখন বলেন, আমি শুধু নোট কপি করি। কিন্তু পরে বুঝতে পারি না।”
রাহাত নোটবুকটা দেখে বলল,
“আচ্ছা, দেখ। এখানে মূল কথাটা কী। প্রথমে বেসিকটা ক্লিয়ার করি। তুই যদি এটা বুঝে নিস, পরের অংশ অনেক সহজ হয়ে যাবে।”
কাশফিয়া মন দিয়ে শুনল।
“হ্যাঁ, বল। আমি লিখছি।”
রাহাত ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিল।
“দেখ, এটা মূলত এইভাবে কাজ করে। প্রথমে এই ফর্মুলাটা মনে রাখ। তারপর যখন প্রবলেম আসে, স্টেপ বাই স্টেপ অ্যাপ্লাই কর। এখানে একটা সিম্পল এক্সাম্পল দিই। যদি x=৫ হয়, তাহলে y কত হবে?”
কাশফিয়া কলম নিয়ে লিখল।
“আমি তো ভুল করে ফেলি। দেখ, আমি এখানে কী করলাম?”
রাহাত দেখে বলল,
“এখানে তুই ভুল করেছিস। এই স্টেপটা এভাবে না, এভাবে কর। দেখ, এখন ঠিক হয়েছে।”
কাশফিয়া খুশি হয়ে বলল,
“ওহ... এখন বুঝলাম। তুই তো দারুণ বুঝিয়ে দিস। আমার তো ক্লাসে প্রফেসর যখন বলেন, আমি শুধু নোট কপি করি। কিন্তু তুই যখন বলিস, সত্যি বুঝতে পারছি। তুই যদি আমাকে একটা টাইম দিস, আমি তোর কাছে রোজ একটু করে শিখব।”
রাহাত বলল,
“আচ্ছা, চল। কাল থেকে শুরু করি। তুই যা বুঝতে চাস, বলিস। আমি হেল্প করব।”
কাশফিয়া খুশি হয়ে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ! তুই তো সত্যি সুপার। আচ্ছা, তোর ম্যাথ কেন এত ফেভারিট?”
রাহাত বলল,
“ম্যাথের প্র্যাকটিক্যাল অংশ ভালো লাগে। কারণ রিয়েল লাইফে ইউজ হয়। তুই?”
কাশফিয়া বলল,
“আমার বায়োলজির পার্ট। লাইফ সায়েন্স। কিন্তু ম্যাথে আমি ফেল। তাই তো তোর হেল্প লাগবে।”
রাহাত বলল,
“আচ্ছা, আমি তোকে হেল্প করব। তুই যা চাস।”
কাশফিয়া হাসল।
“তোর পেশেন্স তো দারুণ। আমি তো একটু পরেই বিরক্ত হয়ে যাই। তুই কীভাবে এত শান্ত থাকিস?”
রাহাত বলল,
“আমি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। তুই তো সবসময় এনার্জেটিক। ভালো লাগে।”
কাশফিয়া হাসল।
“থ্যাঙ্কস। তুইও তো ভালো। আচ্ছা, তোর কোনো কলেজের প্রোজেক্ট আছে এখন? আমার তো পরের মাসে একটা প্রেজেন্টেশন। খুব টেনশন লাগছে।”
রাহাত বলল,
“হ্যাঁ, আমারও একটা আছে। গ্রুপ প্রোজেক্ট। কিন্তু আমি একা করি বেশি। তুই যদি চাস, আমি তোকে আইডিয়া দিতে পারি।”
কাশফিয়া বলল,
“সত্যি? তুই যদি হেল্প করিস, তাহলে আমি তোর সাথে একই টপিক নিতে পারি। না হলে আমি একা একা করব।”
রাহাত বলল,
“আচ্ছা, দেখা যাবে। তুই কী টপিক নিতে চাস?”
কাশফিয়া বলল,
“আমি তো এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট নিয়ে করতে চাই। কিন্তু কীভাবে শুরু করব, জানি না। তুই কী করবি?”
রাহাত বলল,
“আমি ডেটা অ্যানালাইসিস নিয়ে। কিন্তু তোর টপিকও ভালো। আমি তোকে কিছু রেফারেন্স দিতে পারি।”
কাশফিয়া খুশি হয়ে বলল,
“তোর সাথে কথা বললে সব সহজ লাগে। তুই তো সত্যি ভালো ফ্রেন্ড হতে পারিস।”
রাহাত হাসল।
“তুইও।”
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর কাশফিয়া ঘড়ি দেখল।
“ওরে বাবা, সময় হয়ে গেছে। চল, বেরোই। আজ তো অনেক দেরি হয়ে গেল।”
রাহাত ব্যাগ গুছিয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
দুজনে উঠে দাঁড়াল।
লাইব্রেরির দরজার কাছে এসে কাশফিয়া বলল,
“আচ্ছা, একটা সেলফি তুলি? আজকের দিনটা মনে রাখার জন্য। এই বইয়ের সেলফের সামনে।”
রাহাত রাজি হল।
“আচ্ছা।”
কাশফিয়া কাছে সরে এল, কাঁধ ঠেকিয়ে ফোন তুলল।
দুজনে হাসল।
কাশফিয়া তার গালের কাছে গাল নিয়ে আরেকটা তুলল।
“এটা তো সুপার কিউট! পাঠাই তোকে?”
রাহাত বলল,
“হ্যাঁ, পাঠা।”
কাশফিয়া ছবি পাঠিয়ে দিল।
“কাল আবার লাইব্রেরি? তোর নোটস থেকে আরও শিখব।”
রাহাত মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
রাহাত লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে কলেজের মেইন গেটের কাছে একটা বেঞ্চে বসল।
ব্যাগটা পাশে রেখে ফোন বের করল।
কাশফিয়ার পাঠানো সেলফিগুলো খুলে দেখল।
সবচেয়ে কাছেরটা কাঁধ ঠেকিয়ে, গাল প্রায় কাছাকাছি, দুজনেই হাসছে।
মেয়েটার চুল রাহাতের কাঁধে লেগেছে, তার মুখ রাহাতের গালের এত কাছে যেন আর একটু হলে লাগবে।
ছবিটা দেখে তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“এটাই পারফেক্ট,” মনে মনে ভাবল।
সে ছবিটা ওপেন করে শিউলির চ্যাটে গেল।
কোনো ক্যাপশন না দিয়ে শুধু ছবিটা পাঠিয়ে দিল।
তারপর ফোনটা পকেটে রেখে বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসল।
মনে মনে ভাবল,
“দেখি এখন কী হয়। মা... তুমি কী করবে এখন?”
বাড়িতে শিউলি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
চা বানাচ্ছিলেন, কিন্তু হাতটা যেন নিজের মতো চলছে না।
ফোনটা কাউন্টারে রাখা।
হঠাৎ নোটিফিকেশনের শব্দ হল।
তিনি ফোনটা তুলে দেখলেন রাহাতের মেসেজ।
ছবি।
ছবিটা খুলতেই তার শ্বাস আটকে গেল।
হাতটা কেঁপে উঠল।
ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
রাহাত আর সেই মেয়ে কাঁধ ঠেকিয়ে, গাল প্রায় কাছাকাছি, দুজনেই হাসছে।
মেয়েটার চুল রাহাতের কাঁধে লেগেছে, তার মুখ রাহাতের গালের এত কাছে যেন আর একটু হলে লাগবে।
রাহাতের চোখে সেই হাসি যা সে শুধু তার সামনে দেখায়, তার জন্য রাখে।
শিউলির বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছে।
তিনি ছবিটা জুম করলেন।
আঙুল কাঁপছে।
মেয়েটার ঠোঁট পুরো, লালচে, যেন রাহাতের দিকে টানছে।
চোখ চকচকে, দুষ্টু, যেন রাহাতকে গিলে খাচ্ছে।
তার গাল রাহাতের গালের এত কাছে, যেন শ্বাস মিশছে।
শিউলির চোখে জল চলে এল।
গলা শুকিয়ে গেছে।
বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে, যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
“রাহাত...”
ফিসফিস করে বললেন।
গলা ভেঙে গেল।
“তুই... তুই এত কাছে... ওর সাথে...”
তিনি ফোনটা টেবিলে রেখে দুহাতে মুখ চেপে ধরলেন।
জল গড়িয়ে পড়ছে।
“এটা কী করলি তুই? আমাকে... আমাকে এই ছবি পাঠিয়ে... কেন? তুই জানিস না আমার কী হচ্ছে? তুই... তুই আমার... শুধু আমার... এই মেয়েটা... ও কে? কেন তোর গালে ওর গাল এত কাছে... কেন তোর হাত ওর কাঁধে... ওরা... ওরা কী করছে? হাসছে... কাছে বসছে... গাল কাছে... যেন... যেন চুমু খেতে যাবে...”
তিনি ঘরে পায়চারি করতে লাগলেন।
পা কাঁপছে।
হাত দিয়ে বুক চেপে ধরলেন।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
“আমি কী করেছি? সকালে ওকে দূরে সরিয়ে দিলাম... বললাম তোর বয়সী মেয়েরা আছে... আর ও এখন... ওই মেয়ের সাথে... হাসছে... কাছে বসছে... আমার জায়গা... আমার রাহাত... ও নিয়ে যাবে... আমার থেকে দূরে করে দেবে...”
চিন্তাটা যেন ছুরি দিয়ে বুক চিরে দিচ্ছে।
তিনি সোফায় বসে পড়লেন।
ফোনটা আবার তুলে ছবিটা দেখলেন।
আবার জুম করলেন।
মেয়েটার চুল রাহাতের কাঁধে পড়েছে।
রাহাতের চোখে সেই হাসি।
“ওর হাসি... ওই মেয়েটার জন্য... আমার জন্য নয়... আমি কী করলাম? কেন বললাম ওকে দূরে থাকতে? এখন ও অন্য কারো কাছে... ওর গালে ওর গাল এত কাছে... ওর হাত ওর কাঁধে... ওরা... ওরা একসাথে...”
তিনি ফোনটা বুকে চেপে ধরলেন।
চোখ বন্ধ করে কাঁদতে লাগলেন।
জল গড়িয়ে পড়ছে।
“রাহাত... তুই আমার... শুধু আমার... কোনো মেয়ে নয়... আমি তোকে হারাতে পারব না... আমি পাগল হয়ে যাবো... এই ছবি... এই ছবি দেখে আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে... ওরা কী করছে? ওরা কী কথা বলছে? ওরা কি... কি হাত ধরেছে? না... না... আমি ভাবতে পারছি না... আমার রাহাত... আমার ছেলে... আমার...”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
ঘরে ঘুরতে লাগলেন।
হাত কাঁপছে।
“আমি কী করব? ওকে মেসেজ করব? জিজ্ঞেস করব কে এই মেয়ে? না... না... লজ্জা লাগবে... আমি তো ওর মা... কিন্তু আমি ওকে চাই... শুধু আমার... এই মেয়েটা... ওকে নিয়ে যাবে... আমার রাহাত... আমার...”
তিনি আবার সোফায় বসলেন।
ফোনটা খুলে ছবিটা আবার দেখলেন।
আবার কাঁদলেন।
“রাহাত... তুই শুধু আমার... আমি তোকে ছাড়ব না... রাতে... রাতে তোর ঘরে যাব... তোকে জড়িয়ে ধরব... যাতে তুই আর কারো দিকে না তাকাস... কিন্তু... কিন্তু বাবা? সমাজ? পাপ? না... আর ভাবতে পারছি না... এই জেলাসি... এটা আমাকে মেরে ফেলছে...”
তিনি ফোনটা বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন।
শ্বাস ভারী।
জল গড়িয়ে পড়ছে।
বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে।
“রাহাত... তুই আমার... শুধু আমার... আমি তোকে হারাতে পারব না... আমি পাগল হয়ে যাবো... এই ছবি... এই মেয়ে... না... না... তুই শুধু আমার... আমার... আমার...”
মনে মনে বারবার বলছেন।
জেলাসি তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে।
পাগলের মতো করে দিচ্ছে।
তিনি জানেন রাতে সে রাহাতের ঘরে যাবে।
আর এবার আর ফিরে আসার পথ থাকবে না।
তিনি ফোনটা আবার তুলে ছবিটা দেখলেন।
আঙুল দিয়ে রাহাতের মুখ ছুঁলেন স্ক্রিনে।
“তুই আমার... শুধু আমার... কোনোদিন কারো না...”
ফিসফিস করে বললেন।
চোখের জল ফোনের স্ক্রিনে পড়ে গেল।
তিনি জানেন এই জ্বালা আর সহ্য হবে না।
রাত হলেই সে রাহাতের কাছে যাবে।
আর সবকিছু ভুলে যাবে।
তিনি ভাবলেন, রাতে... রাতে তোকে সব দেব।
যা দেখতে চাস, যা ধরতে চাস... বাধা দেব না।
তোকে আমার করে রাখব।
তোর চোখ শুধু আমার দিকে থাকবে।
তোর হাত শুধু আমার শরীরে।
তোর ঠোঁট শুধু আমার।
আর কোনো মেয়ে না।
কোনো কাশফিয়া না।
আমি তোকে পুরোপুরি আমার করে নেব।
তোর শরীর... তোর মন... সব আমার।
আমি তোর মা... কিন্তু আমি তোকে চাই... যেভাবে কোনো মা চায় না... কিন্তু চাই।
আর থামতে পারছি না।
এই জেলাসি আমাকে পাগল করে দিয়েছে।
রাতে... রাতে তোকে সব দেব।
তোকে দেখতে দেব যা চাস।
ধরতে দেব যা চাস।
আমার বুক... আমার যোনি... সব তোর।
বাধা দেব না।
শুধু তোকে আমার করে রাখব।
তোকে হারাতে পারব না... না... না...
চিন্তাটা তার শরীরে একটা গরম টান জাগিয়ে তুলল।
তার নিচে ভেজা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল, কিন্তু জেলাসির আগুন তাকে পুড়িয়ে চলেছে।
তিনি জানেন রাত হলেই সে রাহাতের ঘরে যাবে।
আর এবার সবকিছু ভেঙে যাবে।
এগুলো ভাবতে ভাবতে শিউলির চোখ ভিজে উঠল।
তিনি সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন, দুহাতে মুখ ঢেকে চুপচাপ কাঁদতে লাগলেন।
বুকের ভেতরটা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যেন কিছু একটা ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে।
ছবিটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে রাহাতের গালের কাছে কাশফিয়ার গাল, তার হাসি, চুলের ঝাপটা।
“তুই কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?”
মনে মনে বললেন।
ঈর্ষার আগুন একটুও কমছে না।
ঘড়ির দিকে তাকালেন বিকেল চারটে পেরিয়ে গেছে।
রাহাত এখনো ফেরেনি।
কলেজ তো অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে।
কী করছে ও?
ওই মেয়েটার সাথে আরও সময় কাটাচ্ছে?
লাইব্রেরিতে বসে গল্প?
ক্যান্টিনে হাসাহাসি?
নাকি কোথাও একা একা হাত ধরাধরি?
চিন্তাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে, বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন।
জানালার কাছে গিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে রইলেন।
প্রতিটা গাড়ির শব্দে মনে হয় ও এসে গেছে, কিন্তু না।
“কেন এত দেরি করছিস?”
ফিসফিস করে বললেন।
হাত দিয়ে বুক চেপে ধরলেন ধকধকানি থামছে না।
আর সহ্য হচ্ছে না।
রাতের জন্য অপেক্ষা করাও কঠিন।
কিন্তু রহমান আজ বিকেলেই ফিরবেন বলে সকালে জানিয়েছেন অফিসে কোনো মিটিং নেই।
হঠাৎ দরজার তালা ঘোরার শব্দ।
শিউলি চমকে উঠলেন।