২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৭

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6267499.html#pid6267499

🕰️ Posted on July 18, 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3378 words / 15 min read

Parent
পর্ব ১৬  রাফির ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কলটা আসার আগেই দুপুরটা একধরনের নির্লিপ্ত ক্লান্তিতে ভরা ছিল—অফিসের ঘড়ির কাঁটা যেন এগোচ্ছিল, কিন্তু সময় এগোচ্ছিল না। তার সামনে ফাইলের স্তূপ, মনিটরের আলোয় চোখ শুকিয়ে আসছে, আর টেবিলের পাশে রাখা কফিটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে—তবুও সে খেয়াল করেনি। এই ধরনের দিনগুলোতে মানুষ নিজের ভেতরটাকে একটু বন্ধ করে রাখে, যেন কিছুই তাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন মুহূর্ত বেছে নেয়, যখন সবকিছু একসাথে খুলে যায়। ফোনটা কেঁপে উঠতেই সে একবার তাকাল—অচেনা নম্বর। খুব সাধারণ একটা দৃশ্য, প্রতিদিনই এমন কল আসে। কিন্তু আজকের এই নম্বরটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর হালকা একটা টান লাগল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাকে সতর্ক করে দিল। সে ধরতে চায়নি, সত্যি বলতে একটু ভয়ই পেয়েছিল—যে ভয়টার কোনো স্পষ্ট কারণ নেই, কিন্তু তবুও খুব বাস্তব। তারপরও সে ধরল। “হ্যালো…” বলতেই ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সেই নীরবতা অস্বস্তিকর না—বরং ভয়ংকর। যেন কেউ ইচ্ছে করে চুপ করে আছে, শুধু তার শ্বাসের শব্দ শুনছে। তারপর হঠাৎ একটা হাসি। শুকনো, ধীর, আর অদ্ভুতভাবে পরিচিত। “অনেক দিন পর তোর নাম্বারটা পাইলাম…”—এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল তার শরীরের সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে যাওয়ার জন্য। কথাটা কানে ঢোকার সাথে সাথে তার আঙুল কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল, স্ক্রিনের অক্ষরগুলো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগল, তারপর সেই ধাক্কাটা ধীরে ধীরে নেমে গেল—যেন শরীর নিজেই বুঝে নিচ্ছে, সামনে একটা ঝড় আসছে, আর তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে কথা বলল না, শুধু শ্বাস নিচ্ছিল—গভীর, ভারী শ্বাস। ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠটা এল, এবার একটু নরম, একটু খেলাচ্ছলে—“শুনলাম ভালো আছিস, চাকরি করিস… ব্যাংকের লোক হইছিস। বাহ…” এই “বাহ” শব্দটার ভেতরে কোনো প্রশংসা ছিল না, বরং একটা তিরস্কার, একটা তাচ্ছিল্য, একটা পুরনো হিসাবের গন্ধ। তারপর হালকা বিরতি। সেই বিরতিটা ইচ্ছাকৃত—যেন সে জানে, ঠিক এই জায়গাতেই রাফির বুক কেঁপে উঠবে। “কিন্তু পুরোনো কথা মনে আছে না?”—এই প্রশ্নটা ছিল না, এটা ছিল একটা দরজা খুলে দেওয়া, যেটা রাফি অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছিল। রাফির গলা শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ আটকে গেল গলার কোথাও। তার সামনে অফিসের স্বাভাবিক দৃশ্যটা হঠাৎ অচেনা লাগতে শুরু করল—লোকজন টাইপ করছে, ফোনে কথা বলছে, কেউ হাসছে—সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলো। যেন সে এই জায়গার অংশ না, বরং বাইরে থেকে দেখছে। “যখন বেকার ছিলি, তখন আমার কাছেই তো আসতি…”—ওপাশের কণ্ঠটা এবার একটু গভীর হলো। এই একটা লাইনে কতগুলো রাত লুকিয়ে আছে—অন্ধকার গলি, ক্লান্তি, হতাশা, আর সেই ছোট ছোট ভুল, যেগুলো তখন খুব ছোট মনে হয়েছিল। রাফির আঙুল ফোনের চারপাশে শক্ত হয়ে গেল। সে বলতে চাইল—“আমি এখন ওইসব করি না…” কিন্তু সে জানে, এই কথাটা বলার কোনো মানে নেই। কারণ এই মানুষটার সামনে “এখন” বলে কিছু নেই—সবকিছু একসাথে, একই রকম বাস্তব। রকি হেসে উঠল—সেই একই হাসি, যেটা কখনো জোরে হয় না, কিন্তু শুনলে মনে হয় ভেতরে কিছু একটা ফেটে যাচ্ছে। “জানতে চাচ্ছি না যে এখন করিস কি না,” সে বলল, খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিকভাবে। “মানুষ বদলায়, না? তুই তো বদলাইছিস… জামা-জুতা, অফিস, গাড়ি… সব।” কথাগুলো শুনতে সাধারণ, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন সূচের মতো ঢুকছিল। রাফির চোখের সামনে ভেসে উঠল তার নতুন জীবন—পরিপাটি অফিস, পরিচ্ছন্ন পোশাক, ব্যাংকের সম্মানজনক পদ—সবকিছু। আর ঠিক তার পাশেই আরেকটা ছবি—অন্ধকার গলি, সিগারেটের ধোঁয়া, আর একটা ছায়া, যেটা সে কখনো পুরোপুরি পেছনে ফেলতে পারেনি। “তোর বউ জানলে কেমন নেয়?”—এই প্রশ্নটা আসার সাথে সাথে তার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিল। সে হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল, চারপাশে তাকাল—কেউ শুনছে না, কেউ জানে না। তবুও তার মনে হচ্ছিল—সবাই জানে, সবাই দেখছে, সবাই বুঝে ফেলেছে। “তোর শ্বশুর মরার আগে সন্দেহ করছিল,” রকি বলল, এবার তার কণ্ঠে একটা ঠান্ডা নিশ্চয়তা। “কিন্তু পুরোটা জানে না… আমি তো রেখেই দিয়েছিলাম তোর ওই ছোট্ট অভ্যাসটা।” এই কথাটা শুধু হুমকি না—এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, একটা নিয়ন্ত্রণ। রাফির ঠোঁট কেঁপে উঠল—“চুপ…” সে বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ এত আস্তে বের হলো যে নিজেই ঠিকমতো শুনতে পেল না। তার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে, হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। “চিন্তা করিস না,” রকি আবার বলল, এবার কণ্ঠটা নরম। “আমি তোরে ফাঁসাইতে চাই না। তুই আমার লোক ছিলি… আছিসও। আমি একটু সাহায্য চাই। চাপ নিস না।” এই “চাপ নিস না” কথাটার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল—যে চাপের কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ওজন আছে। রাফির বুকের ভেতর ধকধক শব্দ উঠতে লাগল—একটা ছন্দ, যেটা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। “কিসের সাহায্য?”—সে অবশেষে বলতে পারল, গলা শুকনো, কণ্ঠ কাঁপা। রকি একটু থামল, যেন শব্দগুলো বেছে নিচ্ছে। “ব্যাংকের ভেতরে একটা জিনিস…” সে বলল। “বিস্তারিত পরে বলুম। তুই চিন্তা করে বলবি। তাড়াহুড়া নাই।” এই “তাড়াহুড়া নাই” শব্দটা যেন সময়কে আরও ভারী করে দিল। কারণ যখন কেউ বলে তাড়াহুড়া নাই, তখন আসলে সে জানে—সময় তার হাতেই আছে। রাফি আর কিছু বলল না। ফোন কেটে দিল। কিন্তু কলটা শেষ হলেও কথাগুলো শেষ হলো না—ওগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল, বারবার, থামল না। ফোন কেটে যাওয়ার পরও সে দাঁড়িয়ে রইল, যেন শরীরটা ভুলে গেছে বসতে হয়। অফিসের ভেতর সবকিছু আগের মতোই চলছে—কেউ হাসছে, কেউ কাজ করছে, কেউ চা খাচ্ছে। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে—এই জায়গাটা বদলে গেছে। যেন কেউ একটা অদৃশ্য ফাটল তৈরি করে দিয়েছে, যেটা শুধু সে দেখতে পাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল, কিন্তু হাত এখনও কাঁপছে। মাউস ধরতে গিয়ে বুঝল—তার আঙুল ঠিকমতো কাজ করছে না। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে—রাতের গলি, অন্ধকার কোণ, রকির হাসি, সিগারেটের ধোঁয়া, আর সেই ছোট ছোট প্যাকেট। সে চোখ বন্ধ করল, নিজেকে বলল—“শেষ… সব শেষ হয়ে গেছে…” কিন্তু ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ উঠল—“শেষ হয়নি।” সেই কণ্ঠটা তার নিজের না, তবুও খুব পরিচিত। সারাদিন সে ঠিকমতো কাজ করতে পারল না। একটা রিপোর্ট তিনবার লিখে আবার মুছল, একটা মেইল পাঠাতে গিয়ে দশবার পড়ল। তার সহকর্মী জিজ্ঞেস করল—“সব ঠিক আছে?” সে হেসে বলল—“হ্যাঁ।” এই “হ্যাঁ” শব্দটা খুব হালকা, কিন্তু ভেতরে একটা ঝড় চলছিল—অস্থির, অদৃশ্য, কিন্তু ভাঙার মতো শক্তিশালী। সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরল, দরজা খুলতেই ভেতর থেকে রান্নার গন্ধ এল—ভাত, ডাল, ভাজি। এই গন্ধটা সবসময় তার কাছে নিরাপত্তার মতো ছিল, একটা আশ্রয়। কিন্তু আজ সেই একই গন্ধের ভেতরেও অস্বস্তি। যেন এই ঘরের ভেতরেও তার অতীত ঢুকে পড়েছে, নিঃশব্দে, কারও অজান্তে। নীলা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল, পিঠ দেখা যাচ্ছে, চুল বাঁধা, হাতের ভঙ্গি শান্ত। “আইছো?”—সে বলল, না ঘুরেই। “হুম…”—রাফির গলায় ক্লান্তি, না, ক্লান্তি না—ভয়। সে জুতা খুলে বসে পড়ল, ফোনটা টেবিলে রাখল। ঠিক তখনই ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। একই নম্বর। রাফি তাকাল, কিন্তু ধরল না। নীলা একবার তাকাল, কিছু বলল না। এই না-বলা জিনিসগুলোই সবচেয়ে ভারী—কারণ এগুলোর ভেতরে প্রশ্ন থাকে, সন্দেহ থাকে, আর একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। রাতের খাবারের সময় তিনজন বসে। শুভ্র পাশে বসে গল্প করছে—কলেজে কী হয়েছে, কে কী বলেছে, সে হাসছে, হাত নেড়ে দেখাচ্ছে। রাফি মাথা নেড়ে শুনছে, কিন্তু কিছুই শুনছে না। তার মাথার ভেতর শুধু একটা কণ্ঠ ঘুরছে—“তোর বউ জানলে কেমন নেয়…” নীলা ধীরে ধীরে খাচ্ছে, তার চোখ মাঝে মাঝে রাফির দিকে যাচ্ছে। সে কিছু জিজ্ঞেস করছে না, কিন্তু দেখছে—খুব গভীরভাবে। এই দেখাটার ভেতরেই একটা প্রশ্ন আছে, একটা সন্দেহ, একটা অজানা অনুভূতি। রাফির মনে হচ্ছে—সে যেন ধরা পড়ে গেছে, যদিও কেউ কিছু বলেনি। রাত গভীর হলে সে বিছানায় গেল, কিন্তু ঘুম এল না। সে এপাশ-ওপাশ করছে, চোখ বন্ধ করলেই সেই কণ্ঠ ফিরে আসে। “তোর বউ জানলে কেমন নেয়…”—এই লাইনটা বারবার ফিরে আসে, যেন কেউ ইচ্ছে করে তার মাথার ভেতরে বাজাচ্ছে। সে উঠে বসে পানি খেল, হাত এখনও কাঁপছে। পাশে নীলা শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। কিন্তু সে ঘুমাচ্ছে না। সে শুধু কিছু বলছে না। এই না-বলা, না-ঘুমানো, না-প্রশ্ন করা—সবকিছু মিলে একটা চাপা বিস্ফোরণের মতো। রাফি বুঝতে পারে—তার জীবনটা এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে এই শান্ত, নিরাপদ ঘর। আরেকদিকে সেই অন্ধকার, যেটা সে ভেবেছিল পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু অন্ধকারের একটা স্বভাব আছে—ওটা কখনো পুরোপুরি যায় না, শুধু অপেক্ষা করে। ঠিক সময়ের জন্য। কিছু কিছু নীরবতা থাকে যেগুলো শব্দের থেকেও বেশি জোরে কথা বলে—সাইফ সেই নীরবতার ভেতরেই দিন কাটাচ্ছিল। আরিবার চিঠিটা পড়ার পর তার ভেতরের পৃথিবীটা যেন একটু একটু করে সরে গেছে, জায়গা বদলেছে, কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। অফিসে সে আগের মতোই যায়, চেয়ারে বসে, ফাইল খোলে, কল রিসিভ করে, মিটিংয়ে মাথা নাড়ে—সবকিছু নিখুঁত, সবকিছু ঠিকঠাক। তবুও মাঝেমাঝে সে হঠাৎ থেমে যায়, যেন মাথার ভেতর কোনো অদৃশ্য শব্দ তাকে ডেকে ওঠে। লিফটের আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে—এই চোখ তার চেনা না, এখানে একটা ক্লান্তি আছে, একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ, যেন সে নিজের কাছেই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রাতে ঘুমানোর আগে সে চিঠিটার লাইনগুলো মনে মনে পড়ে—একই শব্দ, একই অনুভূতি, বারবার। “আমার অভাব দিয়ে কাউকে ভরাইও না…” এই বাক্যটা তার ভেতরে আটকে থাকে, যেন একটা সূক্ষ্ম কাঁটা। সে চেষ্টা করে ভুলে যেতে, কিন্তু যতই ভুলতে চায়, ততই সেটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তার মনে হয়—সে কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবেসেছে, নাকি শুধু নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকতে একটা সম্পর্ক ধরে রেখেছে? এই প্রশ্নটা এতটাই ব্যক্তিগত, এতটাই কাঁচা যে সে নিজেকেও পুরোপুরি উত্তর দিতে পারে না। দিনগুলো চলে যায়, কিন্তু ভেতরের এই টান থামে না—বরং ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আরও ভারী হয়। অবশেষে একদিন বিকেলে, যখন সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আলোটা একটু নরম হয়ে আসে, সে বুঝতে পারে—আর পালিয়ে থাকা যাবে না, এবার তাকে বলতে হবে, যেটা এতদিন এড়িয়ে গেছে। সেদিন বাসায় ঢোকার সময় তার হাতটা হালকা কেঁপে উঠেছিল, দরজার হাতলটা ধরতে গিয়ে সে একটু থেমে গিয়েছিল, যেন এই দরজার ওপাশেই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কথাগুলো অপেক্ষা করছে। ঘরের ভেতর ঢুকতেই সে বুঝতে পারল—আজ নীরবতাটা অন্যরকম, ভারী, স্থির। টিভি বন্ধ, রান্নাঘরে কোনো শব্দ নেই, শুধু দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট। শিউলি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল, কোলে একটা বই—পাতা খোলা, কিন্তু চোখ বইয়ের ওপর নেই, দূরে কোথাও আটকে আছে। তার মুখে একটা শান্ত ভাব, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে ক্লান্তি মিশে আছে, যেটা শুধু খুব কাছে গেলে বোঝা যায়। সাইফ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে গিয়ে তার সামনে বসে পড়ল। “একটু কথা আছে,” সে বলল, গলা একটু শুকনো, শব্দগুলো বের হতে কষ্ট হচ্ছিল। শিউলি বইটা বন্ধ করল, কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু তাকাল—সোজা, স্থির, অপেক্ষা নিয়ে। এই দৃষ্টি সাইফকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল, কারণ এখানে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তাড়াহুড়া নেই—শুধু শোনা। সে কথা শুরু করল—ধীরে, থেমে থেমে, যেন প্রতিটা শব্দ বের করতে তাকে নিজের ভেতর থেকে টেনে আনতে হচ্ছে। আরিবার কথা, সেই বাড়ি, সেই জন্মদিন, সেই চিঠি—সবকিছু একে একে বের হতে লাগল, আর প্রতিটা কথার সাথে তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু একটু করে বাইরে আসতে লাগল। সে বলছিল, কিন্তু বলতে বলতে নিজেই বুঝতে পারছিল—সে এতদিন কতটা নিজেকে এড়িয়ে গেছে। শিউলির পাশে থেকেও সে পুরোটা উপস্থিত ছিল না, তার চোখে তাকিয়েও অন্য কাউকে খুঁজেছে, তার স্পর্শে থেকেও একটা দূরত্ব রেখে দিয়েছে। সে নিজের অপরাধবোধের কথা বলল—কীভাবে প্রতিটা রাতে সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কিন্তু উত্তর দেয়নি। বলল সেই ভয়টার কথা—যে ভয় তাকে সামনে এগোতে দেয় না, আবার পেছনেও ফিরতে দেয় না। মাঝে মাঝে সে থেমে যাচ্ছিল, শ্বাস নিচ্ছিল, চোখ নামিয়ে ফেলছিল—কারণ কিছু কিছু কথা এতটাই নগ্ন যে সেগুলো বলা মানে নিজেকে সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া। ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল, ফ্যান ঘুরছিল, কিন্তু সেই হাওয়া যেন তাদের ছুঁতে পারছিল না। শিউলি চুপ করে শুনছিল, তার মুখে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো অশ্রু নেই—শুধু একটা গভীর মনোযোগ। সাইফ যখন শেষ করল, তখন তার গলা একেবারে শুকিয়ে গেছে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত হালকা ভাবও আছে—যেন অনেকদিন পর সে সত্যি কথা বলেছে। কিন্তু সেই হালকা ভাবের ভেতরেও একটা ভয় আছে—এই কথাগুলোর পর কী হবে, কীভাবে সব বদলাবে। শিউলি অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তার চোখ স্থির, মুখ শান্ত, কিন্তু তার ভেতরে কী চলছে সেটা বোঝা যায় না। তারপর খুব ধীরে তার ডান হাতটা নিজের তলপেটের ওপর চলে গেল—একটা স্বাভাবিক, প্রায় অচেতন ভঙ্গি, কিন্তু এই ছোট্ট নড়াচড়াটাই যেন পুরো ঘরের ভারসাম্য বদলে দিল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা—এমন নীরবতা, যেখানে শব্দ থাকলে সহজ হতো। তারপর সে খুব আস্তে বলল, “জানো, আরো কিছু আছে…” তার গলার স্বর নরম, কিন্তু তার ভেতরে একটা দৃঢ়তা। সাইফ তাকাল, বুকের ভেতর আবার সেই ধকধক শুরু হলো। “আমি মা হতে চলেছি,”—এই তিনটা শব্দ বের হতে সময় লাগল না, কিন্তু শোনার পর সময় থেমে গেল। এই কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, দেয়ালে লেগে রইল, তাদের মাঝখানে একটা নতুন বাস্তবতা তৈরি করল। সাইফ প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না—শব্দগুলো মাথায় ঢুকছে, কিন্তু অর্থ বসছে না। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হতে লাগল—মা… বাচ্চা… তাদের ভবিষ্যৎ… তার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল, চোখ ঝাপসা হয়ে গেল, সে বুঝতে পারল না এটা ভয়, না আনন্দ, না দুটো একসাথে। সে শিউলির দিকে তাকাল—এই মেয়েটাকে সে এতদিন ধরে চেনে, তবুও আজ যেন প্রথমবার দেখছে। এতদিন সে শিউলির ভেতর দিয়ে অন্য কাউকে খুঁজেছে, আজ বুঝল—এই মানুষটা আলাদা, সম্পূর্ণ, নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি বলল, “আমি জানি, তুমি এখনো ঠিক করোনি আমার জায়গাটা কোথায়।” তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তীক্ষ্ণতা নেই—শুধু একধরনের স্বচ্ছ ক্লান্তি, যেটা অনেক ভাবার পর আসে। “কিন্তু আমি ঠিক করেছি,” সে বলল, “আমার ভেতরে যে বাচ্চা আসছে, তার কাছে আমি কখনো ছায়া হতে চাই না।” এই কথাটা বলার সময় তার চোখে হালকা একটা শক্ত ভাব আসে—একটা সিদ্ধান্তের ছাপ। “তুমি যদি অতীতেই আটকে থাকো… তবে আমি একাই ওকে মানুষ করব,”—এই বাক্যটা খুব নরম, কিন্তু ভেতরে লোহার মতো শক্ত। “কিন্তু যদি সত্যি ফিরতে চাও… তবে এই মুহূর্তটাকে ধরে চলো।” এই কথার ভেতরে কোনো চাপ নেই, শুধু একটা দরজা খোলা—যেটা দিয়ে সে চাইলে ঢুকতে পারে, না চাইলে বাইরে থাকতে পারে। সাইফ কিছু বলতে পারল না। তার মাথার ভেতর যেন দুইটা জগত লড়াই করছে—একদিকে সেই অতীত, যেখানে আরিবার স্মৃতি, অপরাধবোধ, আর অসমাপ্ত অনুভূতি। অন্যদিকে এই বর্তমান—যেখানে একটা নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে তার একটা ভূমিকা আছে, দায়িত্ব আছে, ভালোবাসার নতুন সুযোগ আছে। সে ধীরে ধীরে উঠে এসে হাঁটু গেড়ে বসল শিউলির সামনে, তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে থামল না। সে হাত বাড়িয়ে শিউলির পেটের ওপর রাখল—সেখানে এখনো কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই, কোনো স্পষ্টতা নেই। তবুও মনে হলো—একটা সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ সেখানে লুকিয়ে আছে, নীরবে, অপেক্ষা করছে। তার গলা শুকিয়ে গেল, সে বলল, “আমি ভয় পাই…”—এই স্বীকারোক্তিটা তার নিজের কাছেও নতুন। “হয়তো আবার কাউকে হারাব… হয়তো ঠিকমতো ভালোবাসতে পারব না…” এই ভয়টা সত্যি, কাঁচা, আর একেবারে মানুষের মতো। শিউলি তার দিকে তাকাল, তারপর খুব ধীরে বলল, “ভয় থাকবেই… কিন্তু ভালোবাসা মানে ভয় না থাকা না—ভয় থাকার পরও পাশে থাকা।” সে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল—এই স্পর্শে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু উষ্ণতা, বাস্তবতা। পরের কয়েকটা দিন বাইরে থেকে খুব বেশি বদল আনেনি, কিন্তু ভেতরে ছোট ছোট পরিবর্তন শুরু হলো—যেগুলো চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সকালে তারা একসাথে চা খায়, যেখানে আগে নীরবতা ছিল, এখন ছোট ছোট কথাবার্তা—“চিনি কম হয়েছে?” “আজকে ডাক্তার কয়টায়?”—এই সাধারণ প্রশ্নগুলোই নতুন হয়ে ওঠে। একদিন সাইফ নিজে থেকে বলে—“চলো, ডাক্তারের কাছে যাই।” শিউলি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে, তারপর মাথা নাড়ে—এই ছোট্ট সম্মতিটাও একটা বিশ্বাসের মতো। তারা রিকশায় যায়—রাস্তার ধুলো, হর্ন, মানুষের ভিড়—সব আগের মতো, কিন্তু তাদের মাঝে একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়। ডাক্তারের চেম্বারে বসে থাকতে থাকতে সাইফ মাঝে মাঝে শিউলির দিকে তাকায়—তার মনে হয়, এই মানুষটাকে সে নতুন করে চিনছে। তার ভেতরের ভয় পুরো যায়নি, দ্বিধাও আছে, কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না। আরিবার চিঠিটা এখনও টেবিলের কোণে রাখা—কেউ সেটা সরায় না, কেউ সেটা নিয়ে কথা বলে না। তবুও সেটা আর আগের মতো ভারী না—এখন সেটা একটা স্মৃতি, যেটা আছে, কিন্তু শ্বাস নিতে দেয়। একদিন সন্ধ্যায়, যখন আকাশে হালকা লালচে রং ছড়িয়ে পড়ে, শিউলি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে একটা পাখি উড়ছিল—ধীরে, একা, কিন্তু স্থির। সাইফ পেছন থেকে এসে একটা শাল তুলে তার কাঁধে জড়িয়ে দিল—শালটা নরম, উষ্ণ। শিউলি একটু ঘুরে তাকাল, তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরে আলোও আছে। “তুমি কি ঠিক আছো?”—সে জিজ্ঞেস করল, খুব সহজভাবে। এই প্রশ্নটা ছোট, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু—দুশ্চিন্তা, আশা, আর একটু ভয়। সাইফ একটু হাসল—এই হাসিটা পুরো না, কিন্তু সত্যি। “আমি জানি না… কিন্তু আমি আছি,”—সে বলল। এই “আমি আছি” কথাটা বাতাসে ভেসে রইল—একটা প্রতিশ্রুতি না, কিন্তু একটা শুরু। শিউলি কিছু বলল না, শুধু আবার আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো—সবকিছু একসাথে ঠিক হয়ে যায় না, কিন্তু কিছু শুরু হয়। ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু সত্যি করে। এবার—বাস্তবের মাটিতে পা রেখে। ঘরের ভেতর নীরবতা এমনভাবে বসে আছে যেন সে এই বাড়ির আরেকজন সদস্য। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা এখন আর শুধু সময়ের শব্দ না, সেটা যেন কারও শ্বাসের মতো শোনাচ্ছে—একটা অদৃশ্য উপস্থিতি, যে সবকিছু দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। রাফি টেবিলের এক পাশে বসে আছে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা যেন অনেক আগেই উঠে দাঁড়িয়েছে। নীলা তার বিপরীতে বসে, চুপচাপ, কিন্তু এই চুপ থাকা কোনো শান্তি না—এটা একটা অপেক্ষা, যেটা ধীরে ধীরে মানুষকে খালি করে দেয়। টেবিলের ওপর থাকা কাগজটা এখন আর শুধু কাগজ না, সেটা যেন একটা দরজা—যেটা খুললেই ভেতরের সবকিছু বের হয়ে আসবে, আর বন্ধ করার কোনো উপায় থাকবে না। শুভ্র পাশের ঘরে খেলছে, তার ছোট ছোট শব্দ এই বড় অস্থিরতার সাথে অদ্ভুতভাবে মিশে যাচ্ছে, যেন সে জানেই না পৃথিবীর কোথাও কিছু ভাঙছে। বাইরের জানালা দিয়ে খুব হালকা আলো ঢুকছে, কিন্তু সেটা ঘরের অন্ধকার কমাতে পারছে না, বরং আরও স্পষ্ট করছে ভেতরের ভার। রাফির হাত টেবিলের নিচে কাঁপছে, সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নীলা ঠিকই বুঝতে পারছে। নীলা তাকিয়ে আছে, কিন্তু সেই তাকানোতে কোনো চিৎকার নেই, শুধু একটা স্থির দেখার অভ্যাস—যেটা মানুষ তখনই শেখে যখন সে আর অন্ধ থাকতে চায় না। আর এই দেখার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছে, যেটা কেউ উচ্চারণ করেনি, কিন্তু ঘরটা সেটা আগেই বুঝে গেছে। রাফির মুখ খোলা নেই অনেকক্ষণ, কিন্তু তার ভেতরে শব্দ জমে আছে—অগোছালো, টুকরো টুকরো, অসম্পূর্ণ। সে একসময় ভাবে কিছু বলবে না, আবার পরের মুহূর্তে মনে হয় না বললে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে। নীলা তাকে চাপ দেয় না, কিন্তু এই না-চাপ দেওয়াটাই সবচেয়ে ভারী চাপ, কারণ এতে পালানোর কোনো পথ থাকে না। রাফি শেষমেশ মাথা নিচু করে নেয়, যেন সেই অবস্থানেই সে নিজের অতীতকে দেখতে পারবে কম কষ্টে। তার গলা শুকিয়ে আসে, কিন্তু তবুও সে শুরু করে—প্রথমে ভাঙা ভাঙা, তারপর একটু একটু করে স্পষ্ট। বেকারত্বের দিনগুলো তার কণ্ঠে ফিরে আসে, যেভাবে মানুষ নিজের পুরোনো দাগ ছুঁয়ে দেখে কিন্তু ছিঁড়ে ফেলতে পারে না। সে বলে কীভাবে প্রতিদিন নিজেকে ব্যর্থ মনে হতো, কীভাবে আয়নায় তাকালে নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারত না। নীলা শোনে, কিন্তু তার চোখে কোনো নাটকীয় প্রতিক্রিয়া নেই—শুধু বোঝার চেষ্টা আছে, যেন সে কারও ভেতরের ধ্বংসাবশেষ পড়ছে। রাফি থেমে থেমে বলে, মাঝে মাঝে শব্দ খুঁজে পায় না, কারণ কিছু জিনিস শব্দে ধরা যায় না, শুধু ভার হয়ে বসে থাকে। আর এই বলার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা সত্য বের হয়ে আসে—যেটা শুধু ঘটনা না, একটা ভাঙা সময়ের ইতিহাস। রাফি যখন রকির নামটা আনে না, তখনও রকি সেখানে থাকে—তার কথার ফাঁকে, তার শ্বাসের মাঝে, তার থেমে যাওয়ার ভেতরে। নীলা প্রথমে কিছু বলে না, কারণ সে বুঝতে চায় এই গল্পটা শেষ পর্যন্ত কতটা সত্যি হতে চায়। রাফি বলে “পালাইতাম”—এই শব্দটা বলার সময় তার চোখে কোনো নাটক নেই, শুধু ক্লান্তি আছে, যেটা অনেকদিন ধরে জমে আছে। নীলা তখন প্রথমবার অনুভব করে, এটা শুধু একটা ভুল না, এটা একটা অভ্যাস হয়ে যাওয়া বেঁচে থাকা। মানুষ কখনো কখনো ভুলের ভেতরে এত গভীরভাবে ঢুকে যায় যে সেটাই তার শ্বাস নেওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। রাফি ব্যাখ্যা করে না, নিজেকে রক্ষা করে না, শুধু স্বীকার করে যায়, আর এই স্বীকারোক্তির ভেতরেই তার মুখোশ একটু একটু করে খুলে পড়ে। নীলা তার বাবার ডায়েরির কথা মনে করে, সেই লাইনগুলো যা এতদিন সন্দেহ ছিল, এখন হঠাৎ করে ভিন্নভাবে দাঁড়িয়ে যায়। তার মাথায় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—সবাই কি শুধু “খারাপ” না, বরং কোথাও না কোথাও ভাঙা? এই প্রশ্নের উত্তর নেই, কিন্তু এই প্রশ্নটাই তাকে বদলে দিতে শুরু করে। ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে যায়, কিন্তু সেই ভার এখন আর শুধু ভয় না, বরং বোঝার ভার। রাফি যখন শেষ করে, তখন মনে হয় ঘরের ভেতর কিছু একটা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে শুরু হয়েছে। নীলা অনেকক্ষণ চুপ থাকে, তার চোখে কোনো অতি আবেগ নেই, শুধু একটা স্থির গভীরতা আছে, যেন সে নতুন কোনো সত্যকে জায়গা দিচ্ছে নিজের ভেতরে। সে ধীরে ধীরে বলে “আর কোনো মিথ্যা না”—এই বাক্যটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা শর্ত আছে, একটা সীমা আছে, একটা নতুন নিয়ম। রাফি মাথা নিচু করে “বেরোব” বলে, কিন্তু এই শব্দটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো বিজয় নেই, বরং একটা ভয় আছে—কারণ বের হওয়া মানে শুধু জায়গা বদলানো না, নিজেকে বদলানো। নীলা এই “বেরোব” শব্দটাকে বিশ্বাস করার আগে আরও অনেক কিছু দেখতে চায়, কারণ সে জানে শব্দ অনেক কিছু বলে, কিন্তু কাজ সবকিছু প্রমাণ করে। শুভ্র পাশের ঘরে হঠাৎ হাসে, সেই হাসি যেন এই ভারী ঘরকে এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে যায়, তারপর আবার চলে যায়। নীলা রাফির দিকে তাকায়, আর এই তাকানোর ভেতর এখন আর শুধু সন্দেহ নেই, আছে একটা নিয়ন্ত্রণ—যেটা সে নিজের ভেতরেই তৈরি করছে। রাফি প্রথমবার বুঝতে পারে, সে শুধু রকির সাথে লড়ছে না, সে এখন নিজের বানানো জীবনের সাথেও লড়ছে। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা আবার শোনা যায়, কিন্তু এবার সেটা আর বিরক্তিকর না, বরং মনে হয় সময়ও অপেক্ষা করছে। ঘরের বাইরে রাত আরও গভীর হয়ে যায়, কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত স্থিরতা জন্ম নেয়। টেবিলের ওপর থাকা খামটা এখনো আছে, কিন্তু তার ওজন আর আগের মতো নেই—এটা এখন প্রশ্ন না, এটা সম্ভাবনা। নীলা বুঝতে পারে, সে এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পুরোনো জীবন আর নতুন জীবনের মাঝখানে একটা পাতলা রেখা আছে। রাফি সেই রেখার এক পাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু সে জানে অন্য পাশে যাওয়া মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা না, বরং নতুন করে খুঁজে পাওয়া। দুজনের কেউই আর আগের মতো নেই, কিন্তু কেউই পুরোপুরি নতুনও না—এই মাঝামাঝি অবস্থাটাই সবচেয়ে অস্থির। ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে হালকা হয়, কিন্তু সেই হালকা হওয়া শান্তি না, বরং একটা প্রস্তুতি। নীলা শেষবারের মতো রাফির দিকে তাকায়, আর এই তাকানোতে আর প্রশ্ন নেই, শুধু অপেক্ষা আছে। কারণ সে জানে, এই গল্প এখন কথায় না, কাজে লেখা হবে। আর বাইরে অন্ধকার যত গভীরই হোক, ভেতরে একটা ছোট্ট সিদ্ধান্ত জেগে উঠেছে—যেটা আর সহজে ঘুমাবে না। (চলবে...)
Parent