২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ৩
পর্ব ৩
বিকেলের আলোটা আজ অদ্ভুত রকমের নরম। রোদের তেজ নেই, তবু আলো আছে—ম্লান, ধুলোমাখা, একটু কুয়াশার মতো ঝাপসা। গলির মুখে দাঁড়িয়ে শামসুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার সামনে সেই একই পাড়া—দুই পাশে টিনের ঘর, কোথাও রঙ উঠে যাওয়া দেয়াল, কোথাও নতুন করে লাগানো সিমেন্টের প্যাচ। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটা পরিবর্তনের গন্ধ।
আট বছর আগে সে এই গলি ছেড়েছিল পুলিশের গাড়িতে। সেদিন তার হাতে হ্যান্ডকাফ ছিল, মুখে রক্তের শুকনো দাগ, আর চোখে ছিল একধরনের আগুন। আজ সে ফিরেছে হেঁটে। পায়ে ধুলো, কাঁধে ছোট ব্যাগ, চোখে আগের মতোই তীক্ষ্ণতা—তবে আগুনের জায়গায় এখন ঠান্ডা ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া অনেক কিছু ঢেকে রাখে।
মানুষের মুখ বদলে যায়। চুল পাকে, শরীর মোটা হয় বা শুকিয়ে যায়। কিন্তু চোখ বদলায় না। শামসুর জানে—এই পাড়ার মানুষ তার চোখ চিনবে।
প্রথমে কেউ খেয়াল করেনি। রাস্তায় কয়েকজন বাচ্চা ক্রিকেট খেলছিল, বল গিয়ে পড়ল তার পায়ের কাছে। সে ঝুঁকে বল তুলে ছুঁড়ে দিল। বাচ্চারা ধন্যবাদ না দিয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিসানি—
“ওইটা কি…?”
“না রে…?”
“দাঁড়া, দ্যাখ, দাড়িটা কেমন…”
খবর আগুনের মতো ছড়ায়। অল্প সময়েই কয়েকটা দরজা আধখোলা হলো, কয়েকটা জানালার পর্দা সরে গেল। এক মহিলার গলা শোনা গেল—“শামসুর আইছে।”
এই তিনটা শব্দে আট বছরের ইতিহাস, গুজব, ভয়, ঘৃণা আর কৌতূহল একসাথে জড়িয়ে আছে।
পাড়ার জানা গল্প—সে খুন করেছিল। কেন? কার? কীভাবে? এসবের উত্তর কেউ জানে না। কেউ জানতে চায়ও না। মানুষের দরকার শুধু একটা নাম আর একটা অপরাধ। বাকিটা কল্পনা নিজে থেকে বানিয়ে নেয়।
শামসুর ধীরে ধীরে হাঁটে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে জানে, এই রাস্তা তাকে এড়াতে পারবে না। চা দোকানের সামনে এসে সে থামে। টিনের চালের নিচে পুরনো কাঠের বেঞ্চ, পাশে একটা ভাঙা কাচের জার, যার ভেতরে বিস্কুট। কেটলিতে চা ফুটছে।
রহিম চাচা চা ছাঁকছেন। তার চুল আগের চেয়ে বেশি পেকে গেছে। মুখে ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু হাতের গতি আগের মতোই অভ্যস্ত। তিনি প্রথমে তাকাননি। কিন্তু যখন দোকানের সামনে একটা ছায়া এসে থামল, তিনি মাথা তুললেন।
দুই জোড়া চোখের মিলন।
কয়েক সেকেন্ড সময় থেমে থাকল। তারপর শামসুর শান্ত গলায় বলল, “চাচা, এক কাপ চা দেন।”
রহিম চাচা হাত থামালেন। খুব সামান্য সময়ের জন্য। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বললেন, “চিনি কম দিব?”
শামসুরের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “আগের মতো।”
এই “আগের মতো” শব্দের ভেতরে আট বছর জমে আছে। আগের মতো মানে কী? আগের মতো চিনি? আগের মতো সম্পর্ক? আগের মতো সম্মান? নাকি আগের মতো ভয়?
চা এগিয়ে দিলেন রহিম চাচা। তাদের হাত এক মুহূর্ত ছুঁয়ে গেল। স্পর্শটা নিরপেক্ষ, কিন্তু ভেতরে অনেক কথা।
পাড়ায় একটা অস্বস্তি নেমে আসে। কারণ অপরাধ করে ফিরে আসা মানুষকে সবাই দেখে—কিন্তু কেউ জানে না কীভাবে আচরণ করতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ ফিসফিস করছে। রকি, যে এই কয়েক বছরে নিজেকে পাড়ার অঘোষিত নেতা ভাবতে শুরু করেছে, সেও দোকানের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। তার চোখে বিরক্তি।
শামসুর চুপচাপ চা খায়। চায়ের ভাপ তার মুখে উঠে গিয়ে মিলিয়ে যায়। সে বলে, “এলাকায় এখন শান্তি আছে তো?”
রহিম চাচা একটু তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে বলেন, “শান্তি বাইরে থাকে না। ভেতরে থাকে।”
শামসুর হেসে ফেলে। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই। “ভেতরটা কেমন আছে, চাচা?”
রহিম চাচা উত্তর দেন না। শুধু চুলায় আরও চা চাপান।
চা শেষ করে শামসুর চলে যায়। কিন্তু তার পায়ের শব্দে বোঝা যায়—সে ফিরে এসেছে থাকতে। শুধু থাকা না, নিজের জায়গা ফেরত নিতে।
এই পাড়ায় পরিবর্তন শুধু শামসুরের ফেরা না। রহিম চাচার জীবনেও গত মাসে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বিয়ে করেছেন।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী পাঁচ বছর আগে চলে গিয়েছিল। কেউ বলেছিল, অন্য কারও সাথে। কেউ বলেছিল, দারিদ্র্য সহ্য করতে পারেনি। রহিম চাচা কাউকে দোষ দেননি। শুধু একদিন দোকানের পেছনে বসে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। কেউ তাকে কাঁদতে দেখেনি, কিন্তু তার চোখের লালচে ভাব দেখে সবাই বুঝেছিল—কিছু ভেঙে গেছে।
তারপর তিনি একা থাকতে শিখেছিলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বানানো, বিস্কুট বিক্রি, হিসাব রাখা—এইসবের ভেতর দিয়ে দিন কেটে যেত। কিন্তু রাতের বেলা ঘরে ঢুকলে নীরবতা তাকে গিলে ফেলত।
মানুষ পুরোপুরি একা থাকতে পারে না। সে যতই অভ্যাস করুক, বুকের ভেতর কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।
এই ফাঁকাটার মাঝেই এল মমতা।
মমতা বিধবা। বয়সে কম। মুখে স্থায়ী লজ্জার ছাপ। তার চোখে একটা সংযত দূরত্ব—যেন সে সবসময় একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের স্বামীর বয়স ছিল প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। বিয়ের পর যৌবনের রস তো দূর, যৌবনের রঙই দেখতে পারেনি। তিন মাসের মাথায়, এক রাতে সে নেশা করে এসেছিল। রাতটা মমতার জন্য একটু অন্যরকম ছিল। হয়তো এটাই যৌবনের রঙ। হয়তো এটাকে যৌবন বলে। কিন্তু মমতা বুঝতে পারেনি, পরের দিন তার সমস্ত রং মুছে সাদা হয়ে যাবে। ও হ্যাঁ বলা হয়নি, মমতা * ছিল। পাড়ার কিছু শকুনের চোখ এড়াতেই তার এই বিয়ে। বাপের বাড়ি বলতে কোনোকালেই কিছু ছিল না। এ পাড়ায় অবশ্য রহিমের সাথে বিয়ের পর কেউ জানে না যে সে * ছিল। রহিম নিজেই লুকিয়ে রাখতে বলেছিল। পাড়ায় ফিসফাস শুরু হলো—
“এই বয়সে বিয়া?”
“মেয়েটা এত ছোট!”
“চা দোকানদার কই পাইলো?”
রহিম চাচা শুনে শুধু হাসেন। কিন্তু রাতে ঘরে ঢোকার সময় তার বুক ধড়ফড় করে। তিনি জানেন, মানুষের কথা থামে না। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ হলে দুজন মানুষকে মুখোমুখি হতে হয় নিজেদের সঙ্গে।
প্রথমদিকে মমতা দূরত্ব রেখে চলত। এক বিছানায় দুজন মানুষ, কিন্তু মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল। কথা কম। চোখাচোখি কম।
এক রাতে বিদ্যুৎ ছিল না। ঘর গরম। টিনের ছাদ যেন আগুন হয়ে আছে। মমতা হাতে পাখা নিয়ে বাতাস করছে। তার কপালে ঘাম জমেছে। রহিম চাচা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন।
“তোমার কষ্ট হচ্ছে?” তিনি জিজ্ঞেস করেন।
মমতা মাথা নাড়ে। “না।” কিন্তু গলায় কাঁপন।
রহিম চাচার ভেতরে একটা ভয় কাজ করে—তিনি কি এখনও যথেষ্ট? তিনি কি শুধু একজন চা-ওয়ালা? একজন বয়স্ক মানুষ? মমতা কি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবে?
মমতারও ভয় আছে। তার আগের সংসার ছিল কঠিন, রুক্ষ। এখানে মানুষটা নরম। এই নরমত্বে সে অস্বস্তি পায়—কারণ সে অভ্যস্ত না।
সেই রাতে হঠাৎ বৃষ্টি এল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ ছন্দ তুলল। মমতা বলল, “আপনি এত চুপ কেন?”
রহিম চাচা হালকা হেসে বললেন, “চুপ থাকলে শব্দ কম হয়।”
মমতা প্রথমবার খোলা হাসি হাসল। সেই হাসি ঘর ভরিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে তাদের মাঝের দেয়াল পাতলা হতে লাগল। রহিম চাচা কখনও তাড়াহুড়ো করেন না। স্পর্শ করার আগে চোখে অনুমতি খোঁজেন। এক রাতে মমতা নিজেই তার হাত ধরল। শব্দ ছিল না। কিন্তু সেই স্পর্শে এতদিনের একাকীত্ব কেঁপে উঠল।
এই স্পর্শে কামনার চেয়ে বেশি ছিল নিরাপত্তা। ছিল স্বস্তি।
এদিকে শামসুর নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে। মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে বলছে, “কোনো সমস্যা হলে আমারে বলবেন।” তার আশেপাশে কয়েকটা তরুণ ছেলেপুলে ঘোরে। তাদের চোখে মুগ্ধতা। একজন শক্তিশালী মানুষের পাশে থাকার একটা নেশা আছে।
রকি অস্বস্তিতে। এতদিন সে-ই ছিল পাড়ার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। এখন বাতাস বদলাচ্ছে। দুই ক্ষমতার সংঘর্ষের আগে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রাফি দূর থেকে সব দেখে। তার নিজের ভেতরেও ঝড়। চাকরির ইমেইল এসেছে—ইন্টারভিউর জন্য শর্টলিস্টেড। সে কাউকে বলেনি। তার মনে হয়, যদি বলে ফেলে, স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
নীলার বাড়িতে সম্বন্ধ এগোচ্ছে। নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—পাড়া বদলাচ্ছে। মানুষ বদলাচ্ছে। সে কি পারবে? সে কি নিজের জীবন নিজের মতো বেছে নিতে পারবে?
রাতে রহিম চাচা মমতার পাশে শুয়ে বৃষ্টির শব্দ শোনেন। টিনের ওপর ফোঁটার টুপটাপ। তিনি ভাবেন—এই জীবনে কি সত্যি দ্বিতীয় সুযোগ থাকে?
মমতা ঘুমানোর আগে আস্তে করে তার কাঁধে মাথা রাখে। এই স্পর্শে কোনো দাবী নেই। আছে ভরসা।
বাইরে পাড়ায় গুজব, ভয়, ক্ষমতার খেলা।
ভেতরে—দুজন মানুষের ধীরে ধীরে কাছে আসা।
(চলবে)