আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ৮
পর্ব ৮
সন্ধ্যা নেমে এসেছিল মেদিনীপুর প্রাসাদের উপর। আকাশে লাল-কমলা রঙের আভা মিলিয়ে যাচ্ছিল গাঢ় নীলের সঙ্গে। প্রাসাদের বাগানে তখন জ্বলে উঠেছিল অসংখ্য মশাল ও আগুনের কুণ্ড। আগুনের লেলিহান শিখা লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছিল, যেন অন্ধকারকে গিলে খেতে চাইছে।
বাগানের মাঝখানে তিনটি বড় শূকরকে কাঁচা অবস্থায় আগুনে চড়ানো হয়েছে। নরপিশাচেরা ভালো করে না সেঁকে, অর্ধেক কাঁচা মাংসই ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খাচ্ছিল। রক্ত মাখা মাংসের টুকরো তাদের মুখে-হাতে লেগে ছিল। চারদিকে মদের বড় বড় কলসি খোলা, আর তার তীব্র গন্ধ বাতাসকে ভারী করে তুলছিল।
উৎসবের পরিবেশ ছিল একেবারে বর্বর ও জংলি। পুরুষেরা তাদের সেই লতাপাতা ও চামড়ার সামান্য আবরণ পরে উদ্দাম নাচছে। তাদের শরীরে মদ ঢেলে একে অপরকে ঘষছে, চিৎকার করে হাসছে। নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। যে কয়েকজন নারী এসেছিল, তাদেরকে ঘিরে তিন-চারজন করে পুরুষ নাচছিল। একজন নারীকে তিনজন মিলে মদ ঢেলে দিচ্ছিল মাথায়, গলায়, বুকে। মেয়েটি হাসতে হাসতে তাদের সঙ্গে ঘুরছিল, তার শরীরের সামান্য আবরণও প্রায় খসে পড়ার অবস্থা।
তারা জংলি ঢংয়ে নাচছিল — কেউ কারো ঘাড় কামড়াচ্ছিল, কেউ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, কেউ আবার আগুনের চারপাশে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে চিৎকার করছিল। তাদের গলায় অদ্ভুত সুরের গান, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। ডঙ্কা আর বাঁশির তালে তালে সমস্ত বাগানটা যেন এক জীবন্ত দানবের মতো নড়ছিল। আগুনের আলোয় তাদের তেল চকচকে শরীর, রক্তমাখা মুখ আর লোভাতুর চোখগুলো আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছিল।
---
এদিকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে, আলোচনা কক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ।
ঘরের মাঝখানে বড় কাঠের টেবিলে মোমবাতির আলো জ্বলছিল। আমি যুবরাজ ঈশানচন্দ্র রায় হিসেবে মাঝখানের উঁচু আসনে বসেছিলাম। আমার ডান পাশে মা রানী চন্দ্রাবতী এবং বাম পাশে বয়স্ক মন্ত্রী বীর কুমার। সামনে বিভিন্ন দলিল ও পুঁথি ছড়ানো।
মা ও বীর কুমার একটু পর পরই একেকটা দলিল আমার সামনে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। আমাকে শুধু নাম স্বাক্ষরে সিলমোহর লাগাতে হতো। আমার ছোট হাতে কলমটা ধরে আমি সই করছিলাম, যদিও অনেক কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
বীর কুমার গম্ভীর গলায় বলছিলেন,
“রাজকুমার, সমুদ্রের কাছে দুটি গ্রাম — মত্স্যগ্রাম ও নীলকণ্ঠপুর — এদের মধ্যে মাছ ধরার এলাকা নিয়ে বড় বিরোধ চলছে। একদল বলছে, তারা যেখান থেকে শুরু করে মাছ ধরে সেটা তাদের পিতৃপুরুষের অধিকার। অন্যদল বলছে, জোয়ারের সময় পুরো এলাকা তাদের। এই বিরোধ থামাতে নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে।”
মা শান্তভাবে ব্যাখ্যা করছিলেন,
“আজ থেকে নিয়ম হবে — জোয়ারের সময় দুই গ্রামের নৌকাই মাছ ধরতে পারবে, কিন্তু জোয়ার নামার পর প্রত্যেক গ্রামের নির্দিষ্ট সীমানায় থাকতে হবে। কেউ সীমানা লঙ্ঘন করলে জরিমানা দিতে হবে।”
বীর কুমার মাথা নেড়ে সমর্থন করলেন। তারপর আরেকটা দলিল এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“স্বাক্ষর করুন, যুবরাজ।”
আমি কলমটা তুলে সই করলাম। বাইরে থেকে ভেসে আসছিল নরপিশাচদের উদ্দাম চিৎকার, হাসি আর ডঙ্কার শব্দ। ভিতরে আমরা তিনজন নীরবে রাজ্যের শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছিলাম।
মাঝে মাঝে মা জানালার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। বাইরের আগুনের আলো তাঁর মুখে পড়ে এক অদ্ভুত ছায়া ফেলছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম — এই শান্তির ভিতরেও কত বড় একটা আগুন জ্বলছে।
বীর কুমার ফিসফিস করে মাকে বললেন,
“রানী, আজ রাতে ওদের উৎসব আরও জোরে চলবে। সাবধানে থাকবেন।”
মা শুধু মাথা নেড়ে পরের দলিলটা আমার সামনে এগিয়ে দিলেন।
আলোচনা কক্ষে মোমবাতির আলোয় মা পরের দলিলটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়েছিল। ঠিক তখনই দরজার বাইরে প্রহরীর ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। একজন রাজপ্রহরী দ্রুত প্রবেশ করে মাথা নত করে বলল,
“রানী মা, দুজন অন্ধকার বাহিনীর মহিলা এসেছে। তারা ভিতরে আসতে চায়।”
মা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে অনুমতি দিলেন।
দুজন নারী ঘরে ঢুকল। তাদের পরনে প্রায় কিছুই নেই — শুধু লতাপাতা আর পশুর চামড়ার ছোট ছোট আচ্ছাদন, যা শরীরের খুব সামান্য অংশই ঢেকে রেখেছিল। তাদের শরীরে তেল মাখানো, চুল এলোমেলো। তারা মায়ের সামনে এসে মাথা নত করে সম্মান জানাল। তারপর একজন মারাঠি ভাষায় বলল,
**“রাণী, সেনাপতি মহাশূল আপনাকে ডাকছেন। যিনি এই মেদিনীপুরের রাজা।”**
মা মারাঠি ভাষা কিছুটা বুঝতে পারলেও পুরোটা নয়। তিনি বীর কুমারের দিকে তাকালেন। বীর কুমার গম্ভীর মুখে অনুবাদ করে দিলেন।
মা প্রথমে না করতে চাইলেন। তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল। কিন্তু বীর কুমার ধীরে ধীরে বললেন,
“রানী মা, এ সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার। তবে আপনি না গেলে অন্ধকার বাহিনী কখনো আপনাকে সত্যিকারের রানী হিসেবে মেনে নেবে না। মহাশূল শুধু সেনাপতি নয়, তাদের নেতা এবং রাজার ভাই হিসেবে এ অঞ্চলের রাজা বলে পরিচিত। আর আপনার সঙ্গে তার... (একটু থেমে) তাদের নিয়ম অনুসারে যে সম্পর্ক হয়েছে, সেটাই তাদের কাছে বিয়ে। আপনি না গেলে এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কখনোই পুরোপুরি আমাদের হাতে আসবে না।”
মা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর মুখে এক ধরনের অসহায়তা ও দায়িত্বের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অবশেষে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“ঠিক আছে। আমি আসছি। তোমরা যাও।”
বীর কুমার তাদেরকে সেই কথা মারাঠিতে জানিয়ে দিলেন।
কিন্তু দুই নারী তখনও দাঁড়িয়ে রইল। একজন আবার বলল,
“রানীকে আজ আমাদের মতো পোশাক পরতে হবে।”
বীর কুমার এবার কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তাঁর মুখ লাল হয়ে উঠল।
মা তাঁর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কী হলো ওস্তাদজি? বলুন।”
বীর কুমার কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,
“আসলে... ওরা চায় আপনি যেন তাদের মতোই পোশাক পরে যান।”
মায়ের মুখ ক্রোধে রক্তিম হয়ে উঠল। তিনি প্রায় উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেলেন। বাইরে এখনও নরপিশাচদের উদ্দাম চিৎকার ও ডঙ্কার শব্দ ভেসে আসছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন — এই মুহূর্তে তাদের রাগালে আবার পুরো রাজ্য অশান্ত হয়ে উঠবে। প্রজাদের উপর অত্যাচার ফিরে আসবে।
মা দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন,
“বেশ। আমি রাজি।”
ওস্তাদ বীর কুমার তা ওদের ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন।
দুই নারী মাথা নত করে বেরিয়ে গেল। মা জানালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বীর কুমার চুপ করে বসে রইলেন। আমি সব শুনছিলাম, কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে পারছিলাম না কেন মা এত কষ্ট করছেন।
বাইরের আগুনের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। উৎসবের শব্দ ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল।
মা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চেহারায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।