আমার স্বপ্ন তুমি - অধ্যায় ২২
লাল স্লিভলেস ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরিহিতা দেবিকার মাথায় পিঠে সস্নেহে হাত বোলানোর পর ওর কান্না কিছুটা ধরে এলো।
কান্নাভেজা গলায় আমার বুকের ওপর নরম মুঠির কিল মেরে বলল, তুমি এতো দেরি করলে কেন? ভয়ে, চিন্তায় আমি মরে যাচ্ছিলাম।
দুই হাতের করতলে ওর কাঁপতে থাকা গাল ধরে কপালে একটা প্রেমচুম্বন এঁকে আস্বস্ত গলায় বললাম, এইতো আমি এসে গেছি, কোনও ভয় নেই আর, তাকাও আমার দিকে।
দেবিকা মুখ তুলে চাইলো। চোখের জলে ওর কালো কাজল আর আইশ্যাডো ঘেঁটে গেছে।
দু’হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ওর নরম গাল বেয়ে নেমে আসা অস্রুধারা মুছিয়ে বললাম, তুমি ঠিক আছো তো ?
দেবিকা শঙ্কিত স্বরে বললো, হ্যাঁ ঠিক আছি তবে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলাম, দুর্বল লাগছে। জানো আমি এখানে... কথা শেষ হওয়ার আগেই দেবিকাকে থামিয়ে বললাম, ঠিক আছে পরে শুনবো সব কথা, এখন শীঘ্রই আমার বাড়ি চলো আগে। বাইরে একজনকে মেরে অজ্ঞান করে রেখেছি, সে জেগে ওঠার আগে বা অন্য কেউ এসে যাবার আগে আমাদের বেরোতে হবে এখান থেকে।
দরজার বাইরে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর রক্তাক্ত মুখের ওপর থুতু ছিটিয়ে দিল দেবিকা। আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত দেবিকাকে নিয়ে হোটেলের বাইরে এসে বাইকে উঠে স্টার্ট দিলাম। গন্তব্য সোজা আমার দমদমের আপার্টমেন্ট।
ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেবিকাকে এক গ্লাস ঠান্ডা জল দিলাম। ঢকঢক করে এক চুমুকে পুরোটা খেয়ে নিয়ে সোফায় বসে পড়ল। ওর মুখের ফ্যাকাশে আতঙ্কিত ভাবটা অনেকটা কেটেছে।
একটা চেয়ার টেনে ওর সামনে বসে বললাম, হ্যাঁ এবার বলো।
দেবিকা বড়ো করে একটা শ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো, কয়েক মাস আগে একজন বিজনেসম্যানকে এসকর্ট দিতে একটা পার্টিতে যেতে হয়েছিল। সেখানে উনি মিঃ তেবরেওয়ালের সঙ্গে আমার পরিচয় করান। সে ফিল্ম প্রোডিউসারের লোক। আমাকে বলেছিল সিনেমায় নতুন মুখের দরকার হলে আমার সাথে যোগাযোগ করবে। আমি তো বেশ অবাক হয়েছিলাম শুনে।
একটু থেমে দেবিকা বললো, আর এসব কথা তোমার সাথে আলাপ হওয়ার অনেক আগের ঘটনা। ভুলেও গেছিলাম লোকটার ব্যাপারে। তোমাকে কিছু বলাও হয়নি তাই ওই নিয়ে।
জিজ্ঞেস করলাম, ওই তেবরেওয়াল কি একটু স্থূল, বেঁটে আর পাতলা চুলের ?
দেবিকা অবাক হয়ে বললো, হ্যাঁ, তুমি কি করে জানলে ?
মুচকি হেসে বললাম, ওর একটা দাঁত ভেঙে দিয়েছি। বেচারার কেঁদেকেটে একশা অবস্থা।
দেবিকার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠলো। গর্বের হাসি, যা দেখে আমার ভালো লাগল।
সময় নিয়ে চোখের পলক ফেলে দেবিকা বললো, আজকে সকালে সেই তেবরেওয়াল ফোন করেছিল। বললো যে অভিনয়ের জন্য এখন ওরা ফ্রেশ নায়িকা খুঁজছে তাই আমার সাথে কথা বলতে চায়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা এটা তুমি আমাকে জানালে না তখন ?
দেবিকা আর্ত চোখে তাকিয়ে করুন সুরে বললো, আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম উজান। আমি এই কলগার্লের পেশা ছাড়তে চেয়েছিলাম মনে প্রাণে। তাই বিকেলবেলা সময় মতো দেখা করতে যাই ওর সাথে। জানতে পারি একটা ওয়েবসিরিজে অভিনয়ের জন্য ওরা নতুন মুখ চাইছে। একটু সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে। জিজ্ঞেস করলো আমি রাজি কিনা। আমি বললাম ডিরেক্টরের সাথে কথা বলবো এ বিষয়ে। ও বললো ডিরেক্টর আধ ঘন্টার মধ্যে আসছে। কিন্তু আমি কি আর তখন জানতাম যে এসব আসলে সুরজের কারসাজি।
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, এই সুরজটা আবার কে ?
-প্রায় বছর খানেক আগে ক্লায়েন্ট ছিল এই সুরজ। রুলিং পার্টির ভাড়াটে ক্যাডার। অত্যন্ত নোংরা আর বাজে ব্যবহার। বেশ কয়েকদিন ধরে আমাকে ফোন করে বিরক্ত করছিলো। আমি এড়িয়ে গেছি, পাত্তা দিই নি।
উত্তেজিত গলায় বললাম, এসব কথা তুমি চেপে গেছো আমার থেকে ? আগে জানলে তোমাকে সাবধান করে দিতাম।
দেবিকা ছলছল চোখে বললো, তোমাকে আমার অতীত বলে আর ঘাঁটাতে চাইনি ওই সব দুর্বিসহ দিনের কথা, যখন আমি এই লাইন ছেড়ে দিয়েছি। আমি তাও রাগত ভাবে বলে গেলাম, আর তোমার কোনো আক্কেল হল না ? অভিনয়ের জন্য এতো ড্রামা ইনস্টিটিউট আছে, সেখানে না গিয়ে কেউ কেন তোমাকে ডাকবে ? তাও আবার স্টুডিওতে না ডেকে কোনো হোটেলের রুমে দেখা করতে বলবে ?
দেবিকা আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে বললো, আমি কি করে বুঝবো যে ওই শয়তান সুরজের সাথে এসবের যোগসাজশ থাকবে ? তেবরেওয়াল আমাকে ড্রিঙ্কস অফার করছিলো, আমি নিতে চাইনি। কিন্তু খুব পিড়াপিড়ি করায় খেলাম। খাওয়ার পরেই চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। মাথা ঘুরতে লাগল। বুঝলাম ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল পানীয়তে। আবছা ভাবে শুনতে পেলাম ফোনে কথা বলছে, হ্যালো সুরজ ভাইয়া, কাম হো গ্যায়া, আপ আজাইয়ে। তেবরেওয়াল বাইরে থেকে দরজা আটকে চলে যেতেই আমি টলতে টলতে রুম লাগোয়া বাথরুমে গিয়ে গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বেসিনে বমি করলাম। তারপর কিছুটা ধাতস্ত হয়ে দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে তোমাকে ফোন করি।
দেবিকা কাঁদতে কাঁদতে বললো, আর তুমি আমাকে ভুল বুঝলে, আমাকে বকলে। বুঝলাম সরল মনের দেবিকা ওদের ষড়যন্ত্র বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারে নি, তাই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত সদ্য বিপদ থেকে মুক্ত হওয়া আমার মিষ্টি প্রেয়সীর সাথে আমি একটু বেশিই জোরে কথা বলেছি। আমারই অনুতাপ হচ্ছে এ জন্য।
দেবিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললাম, ঠিক আছে দেবিকা এখন চুপ করো আর কাঁদে না। আমি সব বুঝতে পেরেছি, আর কোনো দুর্বৃত্ত তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। আমি আছি তো।
দেবিকা মাথা তুলে দুই দীঘল আঁখির সজল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি এই নিয়ে তিনবার আমাকে রক্ষা করলে। তোমার কাছে আমি চিরঋণী, কিভাবে এই ঋণ শোধ করবো আমি জানি না।
আমি অবাক হয়ে দেবিকাকে বললাম, একবার সেই বৃষ্টির রাতে আর দ্বিতীয়বার আজকে সন্ধ্যায়। তাহলে তিনবার কি করে হল ?