বাংলা গল্প- লালপট্টি - অধ্যায় ৩৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-70110-post-6053699.html#pid6053699

🕰️ Posted on October 9, 2025 by ✍️ rajusen25 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 3796 words / 17 min read

Parent
দুপুরের রোদটা যেন আগুন ছড়াচ্ছে ফুটপাথ জুড়ে। রেস্তোরাঁর বাইরের এই পথটায় গরমের তাপে বাতাস কাঁপছে, মসৃণ কংক্রিটের ওপর থেকে উঠছে তাপের ঝাঁজালো তরঙ্গ। চারপাশের দোকানপাট, হকারদের গলাগলি, দূরে ট্রামের কর্কশ ঘণ্টাধ্বনি, রিকশাওয়ালাদের হাঁকডাক—এ সব মিলিয়ে কলকাতার এই চিরচেনা সিম্ফনিটি যেন একটুও থামতে চায় না, এক জীবন্ত নিসর্গের মতো। আমিশা দাঁড়িয়ে আছে টুকুনের বিপরীতে, তার চোখদুটো আবেগে ভরপুর, স্নিগ্ধ আলোয় ভিজে ভিজে, যেন সদ্য ঝরে পড়া শিশিরের মতো কচি। সে বলল, গলাটা একটু ভারী করে, "তুমি তো আসলেই Great! ওইভাবে সবার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া... সবার চোখের সামনে... এত সহজ কথা না, টুকুন।" টুকুনের ঠোঁটে হালকা এক ঝিলিক তুলে হাসি ফুটে উঠল, ঠিক যেমন করে ভোরের প্রথম রোদ ফুটে ওঠে পূর্বাকাশে। বলল, "কিছু কিছু সময় চুপ থাকা যায় না, আমিশা। বিশেষ করে যখন কাউকে ইচ্ছে করে ছোট করতে চায়, unfairness-টা যখন স্পষ্ট হয়ে যায়।" আমিশা একপা এগিয়ে এসে বলল, "আমি কিন্তু লক্ষ করেছি, তুমি সব সময়ই দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াও। যার যেখানে সামর্থ্য নেই, তুমি সেখানে নিজে থেকেই হাজির হয়ে যাও।" টুকুন হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে বাইকের চাবি বার করতেই বলল, "এতো কিছু বলে করে তুমি তো আমাকে লজ্জায় ফেললে!"—কথাটা শেষ না হতেই রেস্তোরাঁর দরজা থেকে সেই বয়স্ক লোকটি হাফাতে হাফাতে ছুটে এলো, তার হাত দুটি জোড় করে, চোখে-মুখে এক অকৃত্রিম বেদনার ছাপ। "শুকরিয়া, বাবুজী... আপনার অনেক মেহেরবানি..."—তার কণ্ঠস্বর ভাঙা-ভাঙা, গলাটা যেন চেপে আসছে, পুরনো হারমোনিয়ামের মতো কর্কশ। টুকুন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল, লোকটির জোড়হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। "একি বলছেন চাচা, এতো বেশি ধন্যবাদ দেবার কি আছে!" বয়স্ক লোকটির চোখ জলে ভরে এল, জল গড়িয়ে পড়লো রুক্ষ, চিন্তারেখায় ভরা গাল বেয়ে, যেন বর্ষার প্রথম ফোঁটা পড়ছে শুষ্ক মাটিতে। "বাবুজী, আজ শুধু আপনার জন্যই আমার রোজগার বেঁচে গেল। এই বুড়ো বয়সে... বহুত মেহনত... বারতন মেজে, প্লেট ধুয়ে... এইটাই তো আমার একমাত্র ভরসা ছিল।" টুকুনের গলার সুর একবারে নরম হয়ে গেল, "চিন্তা করবেন না চাচা, একদমই না। আপনার কাজ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।" লোকটি কৃতজ্ঞতায় মাথা নেড়ে নেড়ে বলল, "আপকে জেসা লগ আজকাল কাহা মিলতা হে, বাবুজী... সব লোগ আপ যাইস কাহন হোতা হায়..." টুকুন একটু ঝুঁকে জিগ্যেস করল, "আপনার নামটা বলবেন তো চাচা?" লোকটি চোখ মুছে বলল, "নাম আমার শঙ্করলাল যাদব, বাবুজী।" একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলতে লাগল, "বিহার কে ছোটে সে গাঁও সে কাম কে তালাশ মাইন্ কালকাত্তা আয়া থা। কেয়া বোলে বাবুজী... লুগাই কে মরনে কে বাদ, বাচ্চা-বাচ্চি কো পাল-পোস করলাম। ওই লোগ বড় হয়ে, ওহি লোগ ইস বুড়া বাপ কো ঘর সে নিকাল দিয়া!" শঙ্করলালের চোখে আবারও জল জমে উঠল। "গাঁও মে গাই-বচ্ছারেকা কা দুধ বেচকে, খেত মে মজদুরি করকে কিসি তরহ গুজারা চালতা থা। শহর আকে ইহা বারতন মাঞনে কা কাজ মিলা। সব কহত রহা - 'তোহার কালা রং অউর মুখ কে গুটি-দাগ দেখকে, কউন তেরেকো হোটেল মেইন কাম দেগা!' বাতাও তো বাবুজী, ইস মে মেরা ক্যা গলতি? হাম তো গাঁও কা সাধারন আদমি আছি!" টুকুনের গলা একবারে ভারী হয়ে এসেছিল। সে শঙ্করলালের রুক্ষ, শীর্ণ হাতটি নিজের দু'হাতের মধ্যে নিয়ে নিল, যেন কোনো মূল্যবান ধাতুকে সুরক্ষিত করছে। বলল, "চাচা, মানুষের চেহারা দিয়ে তার মন কিংবা যোগ্যতা বোঝা যায় না। আপনি যে পরিশ্রমী, সৎ—সেটাই তো আসল কথা।" আমিশা চোখের কোণ মোছতে মোছতে বলল, "চাচা, আপনার ছেলে-মেয়েরা এখন কী করে? তারা কি কলকাতাতেই থাকে?" শঙ্করলাল মাথা নাড়ল, "না মালকিন, বেটির তো শাদি হয়ে গেছে অন্য জায়গায়। আর বেটা দিল্লি চলে গেছে লুগাই নিয়ে।" চোখ মুছে আবার বলল, "কুছ পাইসা জমিয়ে আবার গাঁয়ে ফিরে যাব, তবতক ইধার কাম করনা পাডেগা।" টুকুন তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে কিছু নোট বার করে শঙ্করলালের হাতে গুঁজে দিল, "চাচা, এইটুকু নিয়ে নিন। কোনো কাজে লাগতে পারে।" আবার জোর দিয়ে বলল, "এবং এখন আপনি রেস্তোরাঁয় ফিরে যান, নাহলে ম্যানেজার কিছু বলবে।" শঙ্করলাল প্রথমে একটু দ্বিধা করল, টাকা নিতে তার হাত কাঁপছিল, যেন ভোরের পাতায় শিশিরবিন্দু। কিন্তু টুকুনের জিদের কাছে শেষ পর্যন্ত নিতে হল। তাঁর চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে, "অনেক... অনেক মেহেরবানি আপনার, বাবুজী..."—তারপর আমিশার দিকে ফিরে হাত জোড় করে বলল, "বহুত বহুত মেহেরবানী মালকিন, ভগবান আপ দোনোকি জোড়ি সালামত রক্ষে।" আমিশার চোখ ছলছল করে উঠল। বিশেষ করে 'জোড়ি' কথাটা, আর তার সঙ্গে যে আশীর্বাদ—সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর টুকুনের জন্য একটা অদ্ভুত, উষ্ণ অনুভূতি জেগে উঠল, যেন প্রথম বর্ষণের পর মাটির গন্ধ। সে শুধু বলল, "চাচা, আপনি ভালো থাকবেন।" শঙ্করলাল আরেকবার কৃতজ্ঞতাভরে নমস্কার করে ধীর পায়ে রেস্তোরাঁর দিকে ফিরে গেল। তার পরনের নোংরা নীল-সাদা লুঙ্গি আর ফেটে-যাওয়া স্যান্ডো গেঞ্জি, আর পিঠের বাঁকা ভঙ্গি—সব মিলিয়ে যেন জীবনের সমস্ত ক্লান্তি আর বোঝা বহন করছিল, পুরনো বটগাছের মতো। টুকুন আর আমিশা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের জীবন তখনও সক্রিয়—হকারের ডাক, গাড়ির হর্ন, রাস্তার কোলাহল—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস। কিন্তু তাদের চারপাশে যেন এক অদৃশ্য গম্ভীরতার পর্দা খসে পড়েছিল। তারা দুজন ধীরে ধীরে বাইকের দিকে হাঁটল। এই ছোট্ট ঘটনাটা তাদের মনে এক অমোচনীয় দাগ কেটে গেল, যেন বৃষ্টিভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ। আমিশা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, "আজকালকার ছেলে-মেয়েরা কী selfish হয়ে গেছে! নিজের বাবা-মাকে, যারা তাকে মানুষ করেছে, তাকে বাড়ি থেকে বার করে দেবে—এটা কী করে সম্ভব!" টুকুন এক গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, "সমাজে সব ধরণের মানুষই থাকে, আমিশা... কিছু করার নেই!" বলে সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। আমিশার দিকে চোখ টিপে বলল, "সিগারেট খেলে তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?" আমিশা হেসে উঠল, "না, না... একদমই না।" টুকুন সিগারেটটা ধরিয়ে এক মজার সুরে বলল, "হুম্ম... অসুবিধা হবার কথাও না! তুমি তো গাঁজাখোর! নিজের মায়ের সাথেও তো গাঁজা ফুকেছ!"—বলে সে জোরেশোরে হাসল। আমিশা একটু লজ্জিত হয়ে হাসল, আর কুনুই দিয়ে টুকুনের পেটে হালকা গুতো দিয়ে বলল, "তুমি কিন্তু দেখতে শান্ত-সুবোধ, কিন্তু.." টুকুন সিগারেট থেকে একটা ধোঁয়ার বল ছেড়ে বলল, "কিন্তু কি?" আমিশা চোখ টিপে বলল, "কিছুই না..."—বলে টুকুনের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে নিজের ঠোঁটে রাখল। তার এই কাজটায় যেন এক অদৃশ্য সাহস, আর টুকুনের সিগারেটে তার ঠোঁট লাগানোটায় এক গোপন মাধুর্য লুকিয়ে ছিল। আমিশা ভাবল, টুকুনের ঠোঁটে লাগা এই সিগারেটটাই সে খুঁজছিল। টুকুনও মনে মনে এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে উঠল, যেন শরতের কুয়াশায় জড়ানো সকাল। টুকুন আমিশার হাত থেকে সেই সিগারেটটা ফেরত নিয়ে একটা লম্বা টান দিল। সিগারেটের আগুনটা যেন একটু উজ্জ্বল হয়ে জ্বলল। ধোঁয়া তার নিশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এল একটা ম্লান ধূসর মেঘের মতো। সে আমিশার দিকে তাকিয়ে হাসল, "দুপুর দুটো বাজে? সময়টাই যেন থমকে আছে এই গরম দুপুরে।" আমিশার চুলের রাশি হালকা বাতাসে উড়ছিল, সোনালি সূক্ষ্ম তন্তুর মতো। সে টুকুনের দিকে এগিয়ে এসে বলল, "আমাকে যদি দিয়ে আসো, তাহলে মমের হাভেলিতে দিয়ে আসতে পারো। আর তুমিও একবার আমার মমের সাথে দেখা করে নাও... যদি তিনি থাকেন হাভেলিতে!" টুকুন একটু থমকেছিল। আমিশার 'মমের হাভেলি' কথাটায় তার মনে পড়ে গেল অমর চক্রবর্তীর বলা কথা। সে সিগারেটটা আর একটা টান দিয়ে বলল, "হ্যাঁ, কেনই বা না? আজকেই দেখা করে নেওয়া যাক।" আমিশার চোখে একটা উজ্জ্বল আভা খেলে গেল, যেন ভোরের তারা। সে টুকুনের বাইকের দিকে এগিয়ে গেল, "তাহলে চলো, ট্র্যাফিক কম আছে এখন।" টুকুন বাইক স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের আওয়াজটা গলির নিস্তব্ধতায় যেন একটা নতুন সুর বয়ে নিয়ে এল। আমিশা পিছনে বসতেই টুকুন বলল, "ঠিক আছে, তবে আজই দেখা করে নেওয়া যাক তোমার মায়ের সাথে। কিন্তু হঠাৎ করে চলে গেলে তিনি রাগ করবেন না তো?" আমিশা হাসল, "মম তো তোমার সাথে দেখা করতে চান, নানু বলেছে আমাকে। আজ দেখেই নিক, আসল টুকুনটা কেমন!"—বলে টুকুনের কোমরটা আরও জোরে জড়িয়ে ধরলো আর সে তার গাল টুকুনের পিঠের উপর হেলান দিয়ে রাখল। খিদিরপুরের পথে বাইকটা ছুটছিল যেন কোনো পুরনো সিনেমার সিকুয়েন্সে। টুকুনের হেলমেটহীন মাথায় বাতাসের ঝাপটা, পিছনে আমিশা, তার দুই হাত দিয়ে টুকুনের কোমর জড়িয়ে ধরা। গলির দুই পাশে শতবর্ষী অশ্বথ গাছের ছায়া পড়েছে রাস্তায়, তৈরি করেছে এক আলো-আঁধারির খেলা। সামনে থেকে আসা এক ট্রাকের হর্নের শব্দ, দূরে লঞ্চের সাইরেন—সব মিলিয়ে কলকাতার এই অংশটা যেন এক জীবন্ত অর্গান বাজাচ্ছিল। আমিশার মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু তার মনটা ভেসে বেড়াচ্ছে উত্তম কুমার-সুপ্রিয়া দেবীর 'হারানো সুর'-এর সেই কালজয়ী গানে— "এই পথ যদি না শেষ হয়..." গানের সুরটা মনে মনে বাজতে বাজতে আমিশা টুকুনের পিঠে গাল রেখে দিল। টুকুনের শরীরের উষ্ণতা আর বাইকের কম্পন যেন মিলে তৈরি করছিল এক অদৃশ্য সুর। সে লক্ষ করল টুকুনের সাদা শার্টের পিঠ কিছুটা ঘামে ভিজে গাঢ় নীল হয়ে উঠেছে, গায়ে লাগলে এক ধরনের নোনতা গন্ধ পাওয়া যায়। টুকুনের মনেও একই গান বেজে চলেছে। সে রাস্তার মোড় নেওয়ার সময় হালকা করে লিন দিল। বাইকের স্পিডোমিটার সত্তর ছুঁই ছুঁই করছে। হঠাৎ একটা কুকুর রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে—টুকুন ব্রেক কষতেই বাইক হালকা কেঁপে উঠল। আমিশা আরও জোরে টুকুনকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, "সাবধান!" গলির বাঁকে বাঁকে পুরনো কংক্রিটের বাড়িগুলোর সামনে फুটপাথ জুড়ে বসেছে মুদির দোকান। এক দোকান থেকে ভেসে আসছে কাঁচা লঙ্কা ভাজার তীব্র গন্ধ। অন্য এক জায়গায় এক বুড়ি বসে আছে পেয়ারা-কুলের ভ্যান নিয়ে, তার ডাকার সুরে যেন এক ধরনের করুণ মাধুর্য—"পেয়ারা-কুল... সস্তায় নেও পেয়ারা-কুল..." টুকুন একটা গলি থেকে আরেক গলিতে ঢুকছে। জুতোর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক যুবক জোরে জোরে অমিত ত্রিবেদীর গাওয়া গান গাইছে—"মৌলা মেরে মৌলা..."—গলাটা একটু ভাঙা, কিন্তু সুরে আছে এক অদ্ভুত জেদ। আমিশা চোখ বন্ধ করে গানটা মনে মনে গুনগুন করতে লাগল। টুকুনের পিঠে তার গালের স্পর্শ যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—এই পথটা যদি সত্যিই না শেষ হয়? যদি এই বাইকের যাত্রা চিরকাল চলতেই থাকে? গলির পর গলি, স্টপের পর স্টপ, শুধু এই দুজনের সঙ্গে? হঠাৎ টুকুনের গলা ভেসে এল, "গানটা মনে পড়ছে না?" আমিশা চমকে উঠল, "কোন গান?" "যে গানটা আমরা দুজনেই ভাবছি," টুকুন হাসল, "মৌলা মেরে মৌলা..." আমিশা অবাক হয়ে বলল, "তুমি কী করে বুঝলে?" "তোমার আঙুলের তালু লাগছিল আমার পেটে," টুকুন বলল, "ঠিক সুরের তাল কাঁটা হচ্ছিল।" আমিশা লজ্জায় আরও জোরে টুকুনকে জড়িয়ে ধরল। সামনে একটা ব্রিজ পার হচ্ছ, নীচে খালের কালো নোংরা জল দিয়ে একটা বজরা যাচ্ছে। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে এক দল কিশোর লুঙ্গি পরে সিগারেট ফুঁকছে, তাদের মধ্যে একজনের হাতে মদের বোতল —সে গাইছে, "মুঝকো পিনা হায় পীনে দো..." আমিশা আর টুকুন একসঙ্গে হাসল। "উউফ এই দুপুরে মদ খাচ্ছে কি করে!!!" টুকুন বলল, "এই এলাকায় এই রকম ছেলে পেলে অনেক আছে!!" আমিশা আর টুকুন অবাক হয়ে তাকালো। আমিশা টুকুনকে আরো জড়িয়ে ধরলো। বাইকটা এবার নানুর বাড়ির দিকে মোড় নিতে যাবে তখন আমিশা বললো "সোজা চলো...মমের হাভেলি ওই দিকে..." - হাত দিয়ে দেখালো। "আহ!" - আমিশার গলা দিয়ে একটি চমকে ওঠা শব্দ বেরিয়ে এল। হঠাৎ ব্রেক কষতেই তার দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল, আর সেই মুহূর্তেই তার বক্ষ টুকুনের পিছনে চেপে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে পিছিয়ে গেল লজ্জায় রক্তিম হয়ে। "ওহ! sorry... accidental..." - সে কথা জড়িয়ে গেল। টুকুনের পিঠ জ্বলতে লাগল সেই সংস্পর্শে। একটি বিদ্যুৎবৎ শিহরণ তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। সে হাসি চেপে বলল, "কি হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?" আমিশা দ্রুত স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে বলল, "হ্যাঁ, সব ঠিক... উঁহু... আমি বলছিলাম, সোজা চলো। মমের হাভেলিটা ওই দিকে..." - এবার সে খুব সতর্কভাবে হাত বাড়িয়ে দিক নির্দেশ করল। খিদিরপুরের গলিগুলো যেন রূপকথারই অংশ। পুরনো ইটের দেয়ালে জমে থাকা শেওলা, জানালা দোলানো রঙিন ফুলের টব, আর রোদে শুকানো কাপড়ের সারি—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস। টুকুনের বাইক সেখানে ছুটছিল যেন কালার প্যালেটে আঁকা কোনো দৃশ্য। আমিশার দুটি হাত টুকুনের কোমরে শক্ত করে জড়িয়ে, যেন সে এই মুহূর্তকে আটকে রাখতে চায় চিরদিনের জন্য। বাইকের স্পিড বাড়তেই আমিশার লম্বা চুল উড়তে লাগল বাতাসে, তৈরি করল এক অদৃশ্য পরীর মতো ছবি। টুকুনের সাদা শার্টের পিঠ তখন পুরোপুরি ঘামে ভেজা, স্যাঁতসেঁতে কাপড়ের গায়ে লাগামি আমিশার স্পর্শ যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল। আমিশার গাল টুকুনের পিঠে লেগে থাকতে থাকতে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছিল দুজনের শরীরজুড়ে। হঠাৎ আমিশার হাতের ইশারায় টুকুন বাইকটা ডান দিকে ঘুরিয়েই থমকে দাঁড়াল। আমিশা বলল, "ওই যে! উঁচু গেট বাড়িটা দেখছ? ওইটাই মমের হাভেলি।" গলির শেষ মোড়ে হঠাৎই দৃষ্টি আটকে গেল টুকুনের। উঁচু লোহার গেটওয়ালা এক প্রাসাদতুল্য বাড়ি। গেটের দুপাশে দুটি পুরনো শেওড়া গাছ, যেন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী ধরে। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করতে করতেই টুকুন লক্ষ্য করল, গেটের ভিতর থেকে একজন দারোয়ান বেরিয়ে আসছে—সাদা-সবুজ ইউনিফর্ম পরা বয়স্ক মানুষটি, মুখে রেশমি দাড়ি, হাতে বেতের লাঠি। "সেলাম, ছোট বিবি সাহেবা!" দারোয়ানটি আমিশাকে অভিবাদন জানালো ভাঁজ করা হাত তুলে, তার কণ্ঠস্বর যেন পুরনো ফোনোগ্রাফের রেকর্ডের মতো কর্কশ কিন্তু শ্রদ্ধামিশ্রিত। আমিশা বাইক থেকে নামতেই বলল, "গেটটা খোলো আব্বাস... মম বাড়িতে আছেন?" দারোয়ান আব্বাস গেটের তালা খুলতে খুলতে বলল, "না ছোট বিবি সাহেবা, বেগম সাহেবা এখনো আসেননি। হয়তো পার্টির কাজে গেছেন। কলকাতা মাইনোরিটি কমিশনের কোনো জরুরি মিটিং হতে পারে।" গেটের কড়্কড়্ শব্দে পাশের আমগাছ থেকে এক ঝাঁক পাতি পাখি উড়ে গেল। টুকুন দেখল, গেট খুলতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এল সাদা মার্বেলের একটি প্রশিষ্ট পথ, যার দুধারে নিখুঁতভাবে সাজানো গাঁদা ও জুঁই ফুলের গাছ। আমিশার মুখে একটু হতাশা ফুটে উঠল। সে টুকুনের দিকে ফিরে বলল, "আরেই! মম তো বাড়িতেই নেই।" টুকুন বাইকটা গেটের ভিতর পার্ক করতে করতে বলল, "কোনো ব্যাপার না। আরেকদিন আসব।" আমিশা হঠাৎ চোখ টিপে বলল, "না না, ভিতরে এসো। মম না থাকলেও তুমি তো আমাদের বাড়িটা দেখে নিতে পারো!" - তারপর একটু মুচকি হেসে "তোমার যদি সময় থাকে!!"। দারোয়ান আব্বাস টুকুনকে সসম্মানে সালাম জানালো। "আসুন সাহেব, আসসালামু আলাইকুম" - বলে সেলাম করলো। ভিতরে প্রবেশ করতেই টুকুনের নজরে পড়লো সামনে চওড়া রাস্তা, দুপাশে ফোয়ারা, আর দূরে একটি বিশাল, সাদা-সবুজ মার্বেল-মোড়া অট্টালিকা। বাগানে ফোয়ারা থেকে ছিটিয়ে পড়া জলের ফোঁটায় রোদ পড়ে তৈরি হচ্ছিল ক্ষণস্থায়ী ইন্দ্রধনু। পুরো জায়গাটা জুড়ে ছিল এক রাজকীয় নিস্তব্ধতা, যেন সময় নিজেই এখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। আমিশা আর টুকুন পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো মার্বেলের সেই প্রশস্ত পথ ধরে। তাদের পায়ের শব্দ গুঞ্জরিত হচ্ছিল খোলা প্রাঙ্গণে। টুকুন তার ডান কাঁধ দিয়ে আমিশার বাহুতে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল, "তোমাদের দারোয়ানের অবস্থা তো খারাপ, এতো দুর্বল আর রোগা-পাতলা দারোয়ানকে তো একটা বাচ্চা ছেলে ধাক্কা দিলে পরে যাবে!!" আমিশা হেসে উঠল, তার হাসি যেন ফোয়ারা থেকে ছিটকে পড়া জলকণার মতো বাতাসে মিশে গেল। "ওহ, আব্বাসের বাটকুল চেহারা দেখে বলছো তো!!" সে বলল মুচকি হেসে, "কিন্তু ওর স্টাইল দেখেছো..." - আমিশা একটু থেমে গেল, যেন আব্বাসের ছবি মনের মধ্যে আঁকছে - "সবসময় ফিট-ফাট থাকে, আর দাঁড়ি একদম তামাটে-লাল রং করে রাখে!!" - বলে আবারও হেসে উঠল, তার হাসিতে ছিল এক বিশেষ স্নেহ। টুকুনও হেসে বলল, "হুমম... আর যা আতর মেখেছে গায়ে!!!" সে নাক উঁচু করে হালকা শুঁকে নিল, "গন্ধটা এখনও নাকে লেগে আছে। মনে হচ্ছে না, যেন পুরনো দিনের কোনো নবাব এসে হাজির হয়েছে!" আমিশা টুকুনের দিকে এগিয়ে এসে বলল, "আব্বাস আমাদের বাড়িতে আছে আমার জন্মেরও আগে থেকে। বেচারা বিয়ে-সাদী হয়নি, বুড়ো বয়সে কোথায় যাবে, তাই মম ওকে কাজ থেকে ছাড়াতে চায় না!!" তার কণ্ঠে হঠাৎ করেই একটা গাম্ভীর্য নেমে এল, "ওর বয়স এখন ষাট পেরিয়েছে, কিন্তু ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করে, দাঁড়ি রাঙায়... যেন এখনও তার যৌবন ফুরোয়নি।" টুকুন মাথা নেড়ে বলল, "বুঝতে পারছি। এরা সেই পুরনো জমানার মানুষ, তবে বেতের লাঠি হাতে বেশ লাগছে কিন্তু।" - বলে একটা টিটকারি হাসি দিলো, ঠোঁটের কোণে খেলা করছে রহস্যময় উঁকি। হঠাৎ আমিশার চোখ চক্চক করে উঠল, "আরে, একটা মজার কথা বলব?" সে টুকুনের হাতটা ধরে বলল, "গত বছর সেজে গুঁজে দাঁড়ি রাঙিয়ে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলো, বিয়ে করবে বলে!!" টুকুন কৌতূলী হয়ে বলল, "তারপর? কী হলো?" সে একটু এগিয়ে এসে আমিশার মুখের দিকে তাকাল, যেন পুরো গল্পটা শোনার জন্য উতলা হয়ে পড়েছে। "মেয়ের বাড়ির লোক হেসে পাগল!" - আমিশা নিজেও হেসে ফেলল, হাসিতে যেন ফুটে উঠল সেই দৃশ্য - "বলে, 'এই বাটকুল বুড়োর কাছে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার থেকে মরে যাওয়া ভালো'" - আরও জোরে হেসে বলল, "এক পা কবরে, আর বুড়ো দাঁড়ি রাঙিয়ে মেয়ে দেখতে এসেছে!!!" টুকুন হো হো করে হেসে উঠল, "ওরে বাবা! আব্বাস তো still young at heart!" সে হাসতে হাসতে পেট ধরে ফেলল, "তারপর? আব্বাস কী করল?" আমিশা হাসি থামিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলল, "বেচারা ফিরে এসে তিন দিন কথা বলেনি কারও সঙ্গে। মম তাকে অনেক বুঝিয়েছিল। বলেছিল, 'আব্বাস, তুমি আমাদের পরিবারের অংশ, এত বছর পর এখন নতুন করে বিয়ে-টিয়ে করার কী দরকার?'" টুকুন মাথা নেড়ে বলল, "তাও আব্বাসের spirit তো কম নয়! ষাট পেরিয়েও শখ কম না!" "হ্যাঁ," আমিশা চোখ টিপে বলল, "আর জানো কি? সেই ঘটনার পর থেকে আব্বাস আরও বেশি করে দাঁড়ি রাঙায়, আরও বেশি আতর মাখে! যেন প্রমাণ করতে চায়, সে এখনও যুবক!" দূর থেকে আব্বাসের কাশির আওয়াজ ভেসে এল। আমিশা আর টুকুন তাড়াতাড়ি হাসি চেপে ফেলল, যেন দুর্দান্ত কোনো রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে। আমিশা ফিসফিস করে বলল, "শশ, ওই দেখো। কেমন স্টাইল করে হাঁটছে!" দুজনে আব্বাসের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো। আব্বাস সত্যিই যেন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য নিয়ে হাঁটছিল - তার লাঠিটি ঠুকঠুক করে মার্বেলের ফ্লোরে, সাদা-সবুজ ইউনিফর্মটি ঝকঝকে, আর সেই তামাটে-লাল রঙ করা দাঁড়িটি যেন আরও বেশি করে চকচক করছিল দুপুরের প্রখর রোদে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল এক অদ্ভুত দম্ভ, যেন সে শুধু দারোয়ান নয়, এই প্রাসাদের মালিক। টুকুন আমিশার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, "ওই যে দেখছি! ঠিক যেন বলিউডের হিরো এন্ট্রি দিচ্ছে!" আমিশা হাসি চেপে বলল, "আর দেখো না, কেমন চওড়া করে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে! যেন বলতে চাইছে - 'দেখো, আমি এখনও জবরদস্ত!'" আব্বাস তাদের দিকে এগিয়ে আসতেই দুজনেই হাসি থামিয়ে মুখ গম্ভীর করে ফেলল। আমিশা টুকুনের হাত ধরে টেনে নিয়ে বললো "চলো, তোমাকে আমার room দেখাই.." - বলে হাভেলির মূল বিল্ডিংয়ের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। টুকুনের পায়ের নিচে মর্মর পাথরের ঠাণ্ডা ছোঁয়া, চারপাশে উঁচু সিলিং, দেয়াল জুড়ে পুরনো তৈলচিত্র। বাতাসে ভাসছে গাঁদা ফুলের মিষ্টি গন্ধ আর পুরনো কাঠের সুবাস। আমিশা তাকে নিয়ে চলেছে লম্বা করিডোর দিয়ে, যার দুপাশে কাচের দরজা ভেদে দেখা যাচ্ছে সাজানো বসার ঘর, লাইব্রেরি, আর ফাঁকা ব্যালরুম। বারান্দার কাছে পৌঁছাতেই পরিচারিকা ইসরাৎ হাসি মুখে বললো "সেলাম, ছোট বিবি সাহেবা"। আমিশা "ইসরাৎ, ও হচ্ছে টুকুন, আমার বন্ধু..." - ইসরাৎ "আসসালামু আলাইকুম" - বলে ঝুকে সেলাম করলো টুকুনকে, তার পরনের কালো বড়খা হালকা দুলে উঠল। আমিশা "আমাদের জন্য ২ টো coca cola নিয়ে আসো না, প্লিজ, আমার ঘরে।" - বলে টুকুনকে নিয়ে যেতে যেতে বললো "আর প্লিজ একদম ঠান্ডা দেখে এনো!" ইসরাৎ হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, "জি হ্যাঁ ছোট বিবি, একদম বরফ-ঠাণ্ডা করে নিয়ে আসছি।" বলে সে তাড়াতাড়ি পায়ের শব্দ চাপা দিয়ে করিডোরের অন্যদিকে চলে গেল। আমিশা টুকুনের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল, "এদিকে আসো।" তারা বাঁকানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। সিঁড়ির রেলিংটা কালো লোহার, তাতে জটিল নকশা আঁকা। টুকুন লক্ষ করল, সিঁড়ির পাশের দেয়ালে আমিশার ছোটবেলার ছবি - কোথাও কলেজ ইউনিফর্মে, কোথাও জন্মদিনের কেক কাটতে, কোথাও ঘোড়ায় চড়তে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে টুকুন এক জায়গায় থমকে দাঁড়াল। একটা ফটোফ্রেমে আমিশার আট-নয় বছর বয়সের ছবি - সাদা ফ্রক পরা, হাতে নতুন গিটার, মুখে উজ্জ্বল হাসি। "ওহ! এটা কবে তোলা?" টুকুন জিজ্ঞেস করল। আমিশা হেসে বলল, "ওইটা আমার প্রথম গিটার পাওয়ার দিন। নানু আমাকে surprise দিয়েছিলেন।" তার কণ্ঠে একটু নস্টালজিয়া। দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে আমিশা একটা বড় কাঠের দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজার ওপর সাদা রঙে ইংরেজিতে লেখা "AMISHA'S DEN - TRESPASSERS WILL BE GUITARED!" টুকুন হাসতে হাসতে বলল, "এটা কে লিখেছে? খুব মজার idea!" "আমিই লিখেছি," আমিশা গর্বিতভাবে, মাথা উঁচু করে বলল, "Come on in" বলে সে দরজার নক-করা brass হাতল ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকল। দরজা খুলতেই একটি আলাদা জগতের, এক অন্য রূপালী জগতের মুখোমুখি হলো টুকুন। ঘরটি ছিল বিশাল, উচ্চ-ছাদযুক্ত, কিন্তু গোছানো নয়—একটা সৃজনশীল, artistic বিশৃঙ্খলায়, এক creative chaos-এ ভরা। বাঁ পাশের পুরো দেয়ালজুড়ে কাঁচের বড় জানালা, যার বাইরে বারান্দা এবং তারও পরে প্রসারিত সবুজ, সাজানো বাগান। ডান দিকে একটি অ্যাসেম্বল করা কাঠের শেলফে রঙ-বেরঙের বই, গিটার পিক, পুরনো অডিও ক্যাসেট, ফটো অ্যালবাম আর ছবি আঁকার সরঞ্জাম অগোছালোভাবে, কিন্তু শৈল্পিকভাবে সাজানো। ঘরের এক কোণে একটি স্টুডিও সেটআপ—মাইক্রোফোন, হেডফোন, স্পিকার। পাশেই বেশ কয়েকটি গিটার ট্যাঙ্গো করছে স্ট্যান্ডে। দেয়ালে পোস্টার—জিমি হেন্ড্রিক্স, বিটলস, এলভিস প্রিসলি, পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গে পাশাপাশি ঝুলছে সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' এবং 'হীরক রাজার দেশে'র পোস্টার। "বাহ!" টুকুন শুধু এই কথাটি বলতে পারল, চোখ গোল করে তাকিয়ে, "এটা তোমার ব্যান্ড রুম নাকি বেডরুম? এতো awesome!" আমিশা হাসতে হাসতে নরম, বড় সোফার ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল, "এটা আমার সেফ হ্যাভেন, আমার আড্ডাখানা। এখানে আমি গান করি, ছবি আঁকি, লেখালেখি করি... আর..." সে চোখ টিপল, এক গোপন ইশারায়, "গাঁজা ফুঁকি।" টুকুন ঘর ঘুরে দেখতে লাগল, যেন কোনো museum-এ ঘুরছে। একটি ডেস্কের ওপর খোলা ছিল একটি স্কেচবুক—তাতে আমিশার আঁকা বিভিন্ন স্কেচ, কার্টুন। একটি স্কেচে আব্বাসকে তার লাঠি নিয়ে খুবই কার্টুনিশ, exaggerated স্টাইলে আঁকা, নিচে ক্যাপশন: "Still got it!" "এটা কি..." টুকুন স্কেচবুকের দিকে ইশারা করল, হাসিমুখে। আমিশা লজ্জায় একটু রাঙা হয়ে, গালে গোলাপি আভা নিয়ে বলল, "ওহ, ওটা কিছুই না। শখের আঁকাআঁকি, time pass।" এমন সময় দরজায় কড়কড় শব্দ, নরম টোকা। ইসরাৎ একটি রূপোর ট্রেতে দুই বোতল বরফ-ঠাণ্ডা কোকাকোলা নিয়ে হাজির। বোতলের গায়ে জমাট বরফের কুঁচি, ঘাম ছুটছে। "ছোট বিবি, কোলা নিয়ে এসেছি। একদম ফ্রিজ থেকে বার করেই এনেছি," ইসরাৎ বলল, ট্রেটি একটি টেবিলে রাখল। আমিশা উঠে বসল, "Thanks ইসরাৎ। মম এলে জানিও কিন্তু।" ইসরাৎ চলে যাওয়ার পর আমিশা একটি বোতল টুকুনের হাতে দিল। "নাও, তোমার প্রিয় ড্রিঙ্ক।" টুকুন বোতলটি খুলে এক লম্বা চুমুক নিল, "আহ! ঠিক যতটা ঠাণ্ডা আমি পছন্দ করি। Perfect." আমিশা প্রায় না বলেই, স্বভাবতই টুকুনের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে চুমুক দিলো, তার ঠোঁট ঠিক সেই জায়গায় লাগল যেখানে এক সেকেন্ড আগে টুকুনের ঠোঁট ছিল। "উম্মম্হ, গরমে কিন্তু দারুন লাগে chilled কোক!" সে বলল একটু চোখ টিপে, যেন এই অপ্রত্যাশিত, অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতাটা খুবই স্বাভাবিক, দৈনন্দিন ঘটনা। টুকুন একটু থমকে গেল, চোখ একটু বড় হয়ে গেল। আমিশার এই সাহসিকতায়, এই স্বতঃস্ফূর্ত আচরণে সে কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না, মুগ্ধ হয়ে গেল। আমিশা আবার বোতলটা টুকুনের দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু এবার টুকুন সেটা নেওয়ার বদলে আমিশার হাতটা ধরে ফেলল, তার উষ্ণ, শক্ত হাত দিয়ে। "তুমি কিন্তু আমার ঠোঁটের জায়গাটাই টার্গেট করলে," টুকুন হাসতে হাসতে, একটু খানিকটা বিস্মিত সুরে বলল। আমিশা একটুও লজ্জা পেল না, বরং আরও মুচকি, আত্মবিশ্বাসী হাসল, "কী করা যাবে, আমি তো ঠাণ্ডা কোকের জন্য কিছুই করতে পারি!" বলে সে আবারও এক চুমুক নিল, কিন্তু এবার নিজের বোতল থেকে। "আহ! এই গরমে এর থেকে ভালো কিছু হয় না! অআহঃ!" টুকুন এবার আমিশার বোতলটা থেকে চুমুক নিল, "দেখি তোমার ঠোঁটে লেগে কোক আরও ঠাণ্ডা লাগে কিনা!" দুজনের মধ্যে এই পানীয় শেয়ার করার মুহূর্তটা, এই পরোক্ষ চুম্বনের মুহূর্তটা যেন আরও ঘনিষ্ঠ, আরও রোমান্টিক হয়ে উঠল। টুকুন মন দিয়ে, একাগ্রভাবে দেখতে লাগল আমিশাকে—তার বড় বড়, টানা টানা চোখ যেন 'সিক্রেট সুপারস্টার'-এর জাইরা ওয়াসিমের মতো, তবে আরও বেশি ফর্সা, আরও বেশি ভাবব্যঞ্জক ও আকর্ষণীয়। আমিশার ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠা হাসির রেখা, কথা বলার সময় হাতের অঙ্গভঙ্গি, চুলের এক গুচ্ছ যখন তার গালে, কপালে লাগছে—সবকিছুই টুকুনের চোখে ধরা পড়ল এক অসাধারণ, প্রায় অতিলৌকিক সৌন্দর্যে। আমিশা টুকুনের এই নীরব, তীব্র পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে একটু লজ্জিত, একটু সংকোচবোধ করে বলল, "কী দেখছো এতক্ষণ? আমার মুখে কিছু লেগেছে নাকি?" টুকুন স্থির, গম্ভীর দৃষ্টিতে এগিয়ে গেলো আমিশার দিকে, যেন চুম্বকের টানে। আমিশাও স্থির হয়ে দাঁড়ালো, নিশ্বাস আটকে এসে, যেন সময় থমকে গেছে, পৃথিবী ঘূর্ণন থেমে দিয়েছে। টুকুন আস্তে আস্তে, প্রায় শ্রদ্ধাভরে তার আঙুল তুলে আমিশার গাল থেকে একটা চুলের গুচ্ছ সরিয়ে পেছনে দিয়ে, তার চুলের রেশমি গঠন অনুভব করে বললো, "You are so beautiful..." আমিশার গালে, গলায় হালকা লালিমা, একটা লজ্জার রং ছড়িয়ে পড়ল। সে আশা করেনি টুকুন এইভাবে, এতটা স্বাভাবিকভাবে, এতটা কাছে আসবে, এতটা হঠাৎ করে। কাল থেকেই, যখন থেকেই টুকুনকে দেখেছে, তখন থেকেই টুকুনের প্রতি তার মনে একটা গভীর, অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসা, একটা আকর্ষণ জন্ম নিয়েছিল। টুকুনের সেই সরল, হৃদয়গ্রাহী প্রসংশায়, সেই কোমল কথায় যেন সেই বাঁধ ভেঙে গেল, সব সংকোচ দূর হয়ে গেল। আমিশা আবেগপ্রবণ, জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে টুকুনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে নিজেকে একটু লম্বা করে তুলে, টুকুনের দুই গালে হাত দিয়ে ধরে, নরম, গরম ঠোঁট দুটি টুকুনের ঠোঁটে রাখল, একটি কোমল, অনিশ্চিত কিন্তু গভীর চুম্বন দিয়ে। ঘরটিতে নেমে এলো এক পরম, গভীর নিস্তব্ধতা। শুধু শোনা যাচ্ছিল দূরের ফোয়ারার জল পড়ার মৃদু শব্দ, পাখির ডাক আর তাদের নিজেদের জোরে কাঁপা হৃদস্পন্দন। আমিশার এই আকস্মিক, সাহসী স্পর্শে টুকুনের সমস্ত শরীরে এক বিদ্যুৎবৎ শিহরণ, এক বৈদ্যুতিক স্রোত ছড়িয়ে পড়ল। সে প্রথমে কিছুক্ষণ নিশ্চল, হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে, প্রায় স্বপ্নাবিষ্টভাবে তার বাহু দিয়ে আমিশার কোমল, নরম কোমরটা জড়িয়ে ধরল, তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। এই চুম্বনটা ছিল মিষ্টি, কোমল, কিন্তু গভীর আবেগে, দীর্ঘ-চাপা-আগুনে-এ ভরা—যেন বছরের অপেক্ষা, মুহূর্তের আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তের মধ্যে মিলিত হয়ে গেল। আমিশার ঠোঁটে ছিল কোকের মিষ্টি স্বাদ আর তার নিজস্ব এক ধরনের মাদকতা, এক বিভ্রম। টুকুন অনুভব করল কীভাবে আমিশার হাত দুটি তার গালে কাঁপছিল—একসঙ্গে সাহস আর লজ্জার, উত্তেজনা আর ভয়ের এক অদ্ভুত, মন্ত্রমুগ্ধকর মিশ্রণ। কিছুক্ষণ পর, যখন তারা একটু আলাদা হল, শ্বাস নেওয়ার জন্য, আমিশার নাক-মুখ দিয়ে গরম হাওয়া বেরোচ্ছিল, তার শ্বাস দ্রুত, অনিয়মিতভাবে চলছিল, বুক ধড়ফড় করছিল অসম্ভব, উতলা বেগে। টুকুন আমিশাকে আরও জোরে, আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে, তাদের ঠোঁট আবারও মিলে গেল—এবার আরও তীব্র, আরও উত্সুক, আরও ক্ষুধার্ত। - চলবে
Parent