বাংলা গল্প- লালপট্টি - অধ্যায় ৩৭

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-70110-post-6069079.html#pid6069079

🕰️ Posted on October 30, 2025 by ✍️ rajusen25 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 4163 words / 19 min read

Parent
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই নিজের পরিচিত জগৎ থেকে একেবারে আলাদা এক পরিমণ্ডলে এসে পড়েছে টুকুন। দরজার চৌকাঠ পেরিয়েই যেন সময়ের আরেক স্তরে পা রাখল সে। আমিশার সেই আধুনিক, খসখসে, চকচকে ঘরের সজ্জার বদলে এ যেন এক স্বপ্নিল, সময়ধৃত রাজ্য। ঘরটার সাজসজ্জা দেখেই প্রথমে চমকে গেল টুকুন। দেয়ালের রং হালকা গোলাপি, কিন্তু তাতে পড়েছে বয়সের এক মোহনীয় পাটলিক্রিম। দেয়ালজুড়ে টাঙানো মিনাকারি কাজ করা পিতলের কারুশিল্পগুলো যেন সোনালি যুগের নিঃশ্বাস ধরে রেখেছে। ক্যালিগ্রাফি আঁকা ক্যানভাসে আরবি হরফগুলো নাচছে সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়ে। পুরনো দিনের ইসলামিক নকশাওয়ালা ফ্রেমবন্দি ছবিগুলো থেকে ভেসে আসছে ইতিহাসের গন্ধ। হাতে বোনা পাপোশ আর ইরানি গালিচার নীল-সবুজ জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন সময়ের সঙ্গে বোনা একেকটা কবিতা। ঘরে আলো-আঁধারির এক অপূর্ব খেলা চলছে। জানালার পাশে ভারী মখমলের পর্দা একটু ফাঁক করে দেওয়ায় বিকেলের রোদ এসে পড়েছে ঘরের মাঝখানে, ধুলোর সূক্ষ্ম কণাগুলোকে সোনালি সূতোয় বুনছে। রোদের এই রেখায় ভাসমান ধুলোকণাগুলো যেন লক্ষ তারা। ঘরের এক কোণে রাখা আগরবাতির সূক্ষ্ম ধোঁয়া থেকে ভেসে আসছে চন্দন ও গোলাপের মিশ্র সুবাস, যা ঘরের বাতাসকে করছে মাদকতাপূর্ণ। সোফায় বসে আছেন এক মহিলা। তাঁর উপস্থিতিই যেন এই ঘরের প্রাণ। গম্ভীর কিন্তু শান্ত চেহারা, হাতে কিছু কাগজপত্র। দেখেই বোঝা যায়, তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে ফিরেছেন। তাঁর পরনে নীল-সাদা মার্জিত ফুলের কাজ করা সালোয়ার কামিজ। কাপড়ের ওপর সূক্ষ্ম জরির কাজ বিকেলের আলোয় ঝলমল করছে। কলকাতার ভ্যাপসা গরমে তাঁর ফুল-হাতার বগলের জায়গার কাপড়টা এখনও ভেজা ঘামে। টুকুন একনজরেই বুঝে নিল, ইনিই বেগম শাব্বা হাকিম। আমিশার সঙ্গে মুখমণ্ডলের স্পষ্ট মিল—একই কটা চোখের আকৃতি, একই সূক্ষ্ম নাকের গড়ন। কিন্তু বেগম সাহেবার চেহারায় এক ধরনের পরিপক্ব মাধুর্য, এক প্রকার স্থির-গম্ভীর আভা যা তাঁর বয়স ও অভিজ্ঞতার কথা ফুটিয়ে তুলছে। তাঁর শরীরের গঠনে এক ধরনের পূর্ণতা, এক পরিণত সৌন্দর্য যা আমিশার যৌবনের দুরন্তপনার থেকে একেবারেই ভিন্ন। "মম, এটা টুকুন," আমিশা উজ্জ্বল, গর্বিত কণ্ঠে পরিচয় করিয়ে দিল, যেন সে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটি উপস্থাপন করছে। বেগম শাব্বা হাকিম হাসি মুখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চলনে এক অফুরান মাধুর্য, সালোয়ারের নরম কাপড় তাঁর পায়ের চলার সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে দুলছে, যেন মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে কোনো ফুলের ডাল। তিনি দুই হাত বাড়িয়ে টুকুনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, "আসসালামু আলাইকুম..." তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর তবু মিষ্টি, গরম মধুর মতো যা কানে গেলেই যেন শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। টুকুনও মুখে কিছু না বলে বেগম সাহেবার দিকে এগিয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল বেগম সাহেবার হাত দুটি খুব সুন্দর, লম্বা আঙুলে হালকা মেহেদি রঙের আভা, এক আঙুলে পান্নার একটা রিং যার মধ্যে থেকে ঠিকরে পড়ছে সবুজ আলোর ঝিলিক। তাঁর কোমল ত্বক, মেহেন্দি-রাঙা সোনালি-কালো রেশমি চুলের রাশি টুকুনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। টুকুন নিজের হাত বাড়িয়ে দিল বেগম সাহেবার দিকে, আর সেই মুহূর্তে সে অনুভব করল একজন পরিপক্ব নারীর উপস্থিতি—একইসঙ্গে মমতাময়ী তবু কর্তৃত্বপূর্ণ। বেগম সাহেবা টুকুনকে বুকে জড়িয়ে কোলাকুলি করলেন, যেটা হয়তো টুকুন আশা করেনি। বেগম সাহেবা যখন টুকুনকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন, তখন টুকুনের নাকে এল তাঁর গায়ের এক ঝাঁঝালো গন্ধ—সারাদিনের রোদ, ঘাম আর তাঁর শরীরের মেয়েলি সুবাসের এক অপূর্ব মিশ্রণ। তাঁর বুকের পূর্ণতা টুকুনের শরীরে এক অজানা শিহরণ তুলছিল। খুব ক্ষণস্থায়ী হলেও সেই অভিবাদন টুকুনের কাছে অনেক দীর্ঘ সময়ের মতো মনে হচ্ছিল। আমিশা তাদের কাছে এসে দাঁড়ালো হাসি মুখে। "মম, তুমি কখন ফিরলে?" এই কথায় বেগম সাহেবা কোলাকুলি ছেড়ে দিলেন, কিন্তু টুকুনের হাত ধরে রাখলেন নিজের হাতেই। আমিশার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, "দশ-পনেরো মিনিট হলো রে... রেহানকে দুধ খাওয়ালাম... তারপর ইসরাৎকে বললাম তোদের ডেকে দিতে!" দুধ খাওয়ানোর কথা শুনেই টুকুন অজান্তেই এক পলকে বেগম সাহেবার বুকের দিকে তাকালো—সত্যিই তাঁর বুকের দুধের বোঁটার জায়গা দুটো একটু ভিজে আছে বলে মনে হলো, কাপড়ের উপর স্যাঁতসেঁতে ভাব। বেগম সাহেবা টুকুনের হাত ধরা অবস্থাতেই বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ..."—তারপর টুকুনের থুতনিতে আঙুল দিয়ে ধরে, সেই আঙুলগুলো নিজের ঠোঁটে নিয়ে চুমু খেয়ে বললেন, "কি হ্যান্ডসাম ছেলে গো তুমি!!" তাঁর স্পর্শ ছিল অত্যন্ত কোমল, কিন্তু তাতে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা। আমিশা আগ বাড়িয়ে বলল, "শুধু কি হ্যান্ডসাম!! বুদ্ধিমানও অনেক, আমি সব গল্প শুনেছি নানুর কিডন্যাপারদের কীভাবে ধরাতে পুলিশকে হেল্প করেছে!!" টুকুন মুখে কিছু বলল না, শুধু একটু লজ্জা আর সংকোচ মিশিয়ে হাসল। তার চোখে-মুখে এক ধরনের শিষ্ট সংযোজন ফুটে উঠল, যেন সে এই অতিরিক্ত প্রশংসায় কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে। আমিশা তখন উৎসাহিত কণ্ঠে বলতে লাগল, "মম, তুমি তো জানো না আমরা আজ কোথায় কোথায় ঘুরেছি! প্রথমে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। তারপর প্রিন্সেপ ঘাটে, সেখানে নৌকাগুলো কী সুন্দর দেখাচ্ছিল! তারপর টুকুন দুপুরে যা একটা বিরিয়ানি খাওয়ালো না মম, উউউউম কি বলবো!!! Super Testy!! তোমাকেও একদিন দিয়ে যাবো পার্ক স্ট্রিটের ওই Restaurant এ!!" - তারপর টুকুনের দিকে তাকিয়ে "টুকুন দারুণ গাইড করছে, একেবারে কলকাতার প্রতিটি জায়গার ইতিহাস জানা! খুব enjoy করেছি!!" আমিশার বকবকানির মাঝেই তিনজনে বসলো সোফাতে, বেগম শাব্বা হাকিম ততক্ষণে টেবিলে রাখা রূপার কারুকার্যখচিত চায়ের সেট থেকে চা ঢেলে নিলেন। চায়ের গন্ধে ঘর ভরে গেল এলাচ ও দারুচিনির সুগন্ধে। এক এক কাপ চা টুকুন আর আমিশাকে বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও এক কাপ নিলেন। আমিশার কথা যখন শেষ হলো তখন বেগম সাহেবা, "বহুত বহুত শুকরিয়া বেটা, তুমি আমার মেয়েটাকে সময় দিয়েছো, বেচারী একদম বোর হয়ে পড়েছিল, আমি এই কয়েক দিন বিজি ছিলাম!!" টুকুন চায়ে এক চুমুক দিয়ে হাসি মুখে "না না, আন্টি!! তাতে কি হয়েছে, আমারও সময় ছিলো!!" বেগম সাহেবার কথাগুলো যেন ঘরের আবহাওয়াকে একলহমায় বদলে দিল। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল নরম কিন্তু অটল, "আল্লাহ তালা যা করেন ভালোর জন্যই করেন, আমিশা পরশু, Sunday ফিরে যাবে হোস্টেলে!" তাঁর দুই হাত ঈশরের উদ্দেশে তুলে বললেন, "ইনশাল্লা, ভালোই হয়েছে তুমি একটু ঘুরিয়ে দিয়েছো! কাল আমাকে আব্বু বলেছে, তোমার কথা!" এই কথাগুলো ঘরের মধ্যে যেন এক ধরনের স্তব্ধতা নিয়ে এল। জানালার ফাঁক দিয়ে পড়া সোনালি রোদটাও যেন ম্লান হয়ে এল। হোস্টেলে ফেরার কথা শুনে টুকুন আর আমিশার মুখে একই সঙ্গে নেমে এল এক অদৃশ্য ছায়া। আজ সারাদিনের সমস্ত মুহূর্তগুলো—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা মার্বেলের ইতিহাস, প্রিন্সেপ ঘাটে হুগলি নদীর বুকে নৌকাগুলোর দোল খাওয়া, বিরিয়ানির সেই মশলালো স্বাদ, আর একটু আগেই এই ফ্ল্যাটেই তাদের যে উত্তপ্ত, ঘামভেজা মিলন হয়েছিল—সবকিছুই যেন হঠাৎ করেই শেষ হওয়ার পথে। তাদের সামনে এখন মাত্র একটা দিন—কালকের দিন। আমিশা আবেগতাড়িত হয়ে উঠল। সে সোফার হাতলে বসা মাত্রই যেন তার সমস্ত শরীরী ভরটা নেমে এল। সে তার মা বেগম শাব্বা হাকিমের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "মম, I will miss you..." কিন্তু তার চোখ দুটি ছিল টুকুনের দিকে স্থির। কথাটা মুখে ছিল মায়ের জন্য, কিন্তু সেই দৃষ্টি, সেই আবেগের তরঙ্গ যেন সরাসরি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল টুকুনের দিকে। তার কণ্ঠস্বর ছিল এক ধরনের কাঁপুনি-মাখা, চোখের কোণ জুড়ে জমা হচ্ছিল অশ্রুর এক সূক্ষ্ম আভা। টুকুন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল। সে আমিশার সেই দৃষ্টি বুঝতে পারল, যে দৃষ্টিতে ছিল একইসঙ্গে ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা আর বিচ্ছেদের বেদনা। সে নিজেও অনুভব করল একটা ভারী কিছু বুকে চেপে বসেছে। ঘরের বাতাসে ভাসমান আগরবাতির সুগন্ধি এখন আরও ভারী মনে হচ্ছিল, যেন সেটাও তাদের দুঃখের গন্ধ শুষে নিয়েছে। ইরানি গালিচার নকশাগুলো এখন আর সময়ের গল্প বলছিল না, বরং মনে হচ্ছিল সেগুলো হলো তাদের স্বল্পস্থায়ী সুখের জটিল, কিন্তু ক্ষণভঙ্গুর নকশা। বেগম সাহেবা তার মেয়ের এই আকস্মিক আবেগপূর্ণ আচরণে কিছুটা বিস্মিত হলেন। তিনি আমিশার পিঠে আদরের সঙ্গে হাত বুলিয়ে দিলেন, কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লক্ষ্য করল টুকুন আর আমিশার মধ্যে বিনিময় হওয়া সেই নীরব, কিন্তু তীব্র বার্তা। তাঁর মুখে এক ধরনের সূক্ষ্ম, বোঝা-না-যাওয়া হাসি ফুটে উঠল। তিনি হয়তো বুঝতে পারছিলেন, এই শুধু একটি বিদায়ের গল্প নয়, এটি একটি শুরুও বটে। বেগম সাহেবার কণ্ঠে মিশেছিল এক অপার মমতা আর দুষ্টুমির অদ্ভুত সমন্বয়। তিনি আমিশার গালে নিজের গাল ঘষে দিলেন, নরম ত্বকের স্পর্শে ভরিয়ে দিলেন মায়ের স্নেহ। "I miss you too sweetheart..." - তাঁর কথায় ছিল এক ধরনের কোমল করুণা, যেন মেয়ের প্রতিটি না-বলা আকুতি তিনি বুঝে নিচ্ছেন। তারপর তিনি হেসে বললেন, "Next vacation এ যখন আসবি তখন আমি পাক্কা সময় দেবো....Promise" - এই কথা বলার সময় তাঁর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেন ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল ছবি তিনি দেখতে পাচ্ছেন। মুখে একটু দুষ্টুমি-মেশানো হাসি নিয়ে তিনি বলেই ফেললেন, "টুকুনকেও ডেকে নেবো তখন...কেমন?" - আমিশার দিকে চোখ টিপতে টিপতে তিনি যোগ করলেন, "ইনশাল্লাহ..আমরা তিন জন খুব মজা করবো, ঘুরবো, ফিরবো!!!" এই কথাগুলো বলার সময় বেগম সাহেবার পুরো চেহারা যেন আলো হয়ে উঠল। তাঁর চোখের কোণে গজিয়ে উঠা রেখাগুলোতে খেলা করছে এক ধরনের উচ্ছ্বাস। সালোয়ারের নরম কাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পুরো শরীরটাই যেন এক অপেক্ষার সংগীতে দুলছে। আগরবাতির সূক্ষ্ম ধোঁয়া যেন নতুন এক স্বপ্নের আকার নিতে শুরু করল ঘরের বাতাসে। আমিশার মুখে ফুটে উঠল এক ধরনের লজ্জা-মেশানো উল্লাস। সে টুকুনের দিকে তাকিয়েই রইল, কিন্তু কথা বলতে পারল না। তার চোখেই যেন লেখা ছিল সবকিছু - পরবর্তী ছুটির জন্য অপেক্ষা, তিনজন一ঘুরে বেড়ানোর সম্ভাবনা, আর সেই অদেখা ভবিষ্যতের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য মুহূর্তের প্রতিশ্রুতি। টুকুন নিজেও কিছু বলতে পারল না। সে শুধু হাসল, এক ধরনের সংকোচ আর আনন্দের মিশ্রণ নিয়ে। বেগম সাহেবার সেই দুষ্টুমি-ভরা চোখের ইশারা সে ধরতে পেরেছিল। এই সাধারণ কথোপকথনের মধ্য দিয়েই যেন তৈরি হয়ে গেল এক নতুন বন্ধনের ইঙ্গিত, ভবিষ্যতের জন্য রচিত হতে থাকল এক অপূর্ব ত্রয়ীর গল্প। বেগম সাহেবার দৃষ্টি টুকুনের উপরে স্থির হয়ে থাকলো, তাঁর চোখ দুটিতে জমাট বাঁধা কৃতজ্ঞতা আর মমতার এক অপার্থিব আলো। "Thank you so much বেটা for everything you did for us.." তাঁর কণ্ঠস্বর ভরা ছিল এক গভীর আবেগে, যেন শব্দগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে সরাসরি টুকুনের হৃদয়ে গিয়ে পড়ছিল। কৃতজ্ঞতা তাঁর চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, যখন তিনি বললেন, "আল্লাহ তালার মেহেরবানীতে আর তোমার জন্য আমার আব্বু ছাড়া পেয়েছিলো কিডনাপারদের কাছ থেকে!!" তাঁর গলা একটু ভারী হয়ে এসেছিল, কথা বলার সময় তাঁর লম্বা আঙুলগুলো অনায়াসে একটা প্রার্থনার ভঙ্গি করে ফেলেছিল। পান্নার রিংটি আলোয় ঝলমল করে উঠল, মনে হল যেন সেই কৃতজ্ঞতারই একটা উজ্জ্বল প্রতীক। টুকুন একটু সংকোচ বোধ করল। সে নিচু হয়ে, "প্লিজ আন্টি, এতো কিছু বলবেন না!!" তারপর একটু অপ্রস্তুত হয়ে, কিন্তু স্পষ্টভাবে ব্যাপারটা খুলে বলল, "আসলে আমাদের কলেজের চুরির কেস solve করার সময় আমিশার নানুর মানে আপনার বাবার ফিরদৌস হাকিম সাহেবের কেস automatic solve হয়ে গেছে!!" টুকুনের এই সরল স্বীকারোক্তিতে বেগম সাহেবার মুখে ফুটে উঠল এক কোমল, বোঝাপড়ার হাসি। তিনি টুকুনের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁর সালোয়ারের নরম কাপড় মেঝেতে সশব্দ হয়নি, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি পুরো ঘর জুড়ে মায়াবী হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। "তবুও বেটা," তিনি বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর এখন মিষ্টি এলাচের চায়ের মতো উষ্ণ ও সান্ত্বনাদায়ক, "তুমি যে পথ দেখিয়েছ, সেই পথ ধরেই তো আল্লাহ মদদ দিয়েছেন। তুমি আমাদের কত বড় উপকার করে দিয়েছ, সেটা আমরা কখনো ভুলবো না।" ঘরের বাতাসে আগরবাতির সূক্ষ্ম ধোঁয়া যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল, মিশে গেল চা-এর সুগন্ধ আর মানুষের সম্পর্কের এই নবগঠিত বন্ধনের অদৃশ্য সূত্রে। ইরানি গালিচার জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন এবার বুনে চলেছে ভবিষ্যতের এক আশাবাদী গল্প। বেগম সাহেবা হঠাৎই যেন কিছু মনে পড়ার মতো করে চোখ উজ্জ্বল করে তুললেন। তাঁর মুখমণ্ডলে খেলল এক ধরনের আগ্রহ ও আতিথেয়তার মিশ্র অভিব্যক্তি। "ওহঃ আমিশা, বেটা..টুকুনের জন্য কিছু ফল আর মিষ্টি এনেছিলাম.." বলেই তিনি দূরের টেবিলের দিকে ইশারা করলেন, যেখানে সাজানো ছিল বেশ বড়সড় দুইটি রঙিন পেটরা। সেই পেটরা দুটো দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এগুলো সাধারণ কোনো উপহার নয়। একটিতে তাজা ফলের রাজকীয় সমারোহ - লাল-সবুজ আপেল, সোনালি কমলা, রুবি রঙের ডালিম আর স্ট্রবেরির মণিমুক্তাখচিত অ্যারে। অন্যটিতে বাংলার বিখ্যাত মিষ্টির সংগ্রহ - রসগোল্লার সাদা গোলাপি পাশ, মিহিদানার সোনালি বল, কালোজামের রহস্যময় কালো আর স্যান্ডেশের নানান রূপ। পেটরা দুটোর গায়ে লাগানো ছিল সূক্ষ্ম নকশি কাগজ, যেন উৎসবেরই আরেক নাম। আমিশা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল বক্সগুলোর দিকে। সে পেটরা দুটো হাতে করে ওজন করতে গিয়ে মুখে একটু চিন্তার ভাব নিয়ে এল। "কিন্তু মম," সে বলল একটু শঙ্কিত স্বরে, "টুকুন কি করে নেবে, ও বাইকে নিতে পারবে না!!" তার কণ্ঠস্বরেই যেন ভেসে উঠল সেই বড়সড় পেটরা দুটোর অসুবিধা। সে যেন মনে চোখেই দেখতে পেল টুকুনকে তার বাইক নিয়ে সংকটে পড়তে - এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্যহাতে এই বিশাল উপহারের ভার। ঘরের নরম আলোয় পেটরা দুটো আরও বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। বেগম সাহেবার চোখে একটু হাসি খেলে গেল, তিনি যেন এই সমস্যাটা আগেই অনুমান করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টি টুকুনের দিকে ঘুরল, যেন বলতে চাইলেন - 'দেখো, আমি কতটা ভেবেছি তোমার জন্য!' আমিশা আর টুকুনের মধ্যে চলে গেল এক অর্থপূর্ণ দৃষ্টিবিনিময়, যেখানে মিশে ছিল উপহারের আনন্দ এবং তা বহন করার practical সমস্যা। টুকুনের মুখে লাজুক, বিনয়ী হাসি। সে মাথা নীচু করে বলল, "না না আন্টি, এতো কিছু দেবেন না প্লিজ..." তার কণ্ঠস্বর এতই নরম যে যেন পাতার ফিসফিসানি। সে আরও যোগ করে, "বাবা তো mostly হসপিটালে ব্যাস্ত থাকে আর মা কলেজ নিয়ে!! এতো কিছু দেবেন না প্লিজ, নষ্ট হবে!!" টুকুনের এই বিনয় দেখে আমিশা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এল। তার চলনে এক ধরনের জেদি ভঙ্গি, "না না, সে বললে কি হয়, মম তোমাদের বাড়ির জন্য এনেছে!!" তার কণ্ঠে স্পষ্ট প্রতিবাদী সুর। বেগম সাহেবার চোখে-মুখে ফুটে উঠল গর্বের আভা। তিনি যেন মেয়েকে শাবাশি দিতে দিতে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ....ঠিক বলেছিস আমিশা।" তাঁর কথায় মিশেছিল স্নেহ আর অনুমোদনের মধুর সমন্বয়। আমিশা হঠাৎই উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল, যেন সমস্যার সেরা সমাধান খুঁজে পেয়েছে। "মম!! এক কাজ করলে হয় না!!" সে বলল উৎসাহিত কণ্ঠে, "কাল বরং তুমি আব্বাসকে দিয়ে এই ফল মিষ্টিগুলো টুকুনের বাড়ি পৌঁছে দিয়ো!!" বেগম সাহেবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই প্রস্তাবে। তিনি উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "ও তাই তো.. আমি কালই আব্বাসকে দিয়ে পাঠিয়ে দেব!! একদম ঠিক বলেছিস!!" তাঁর মুখে খেলল এক তৃপ্তির হাসি, যেন শুধু উপহার দেওয়া নয়, সেটি সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পেরে তিনি বিশেষ আনন্দ পেলেন। ঘরের আবহাওয়া যেন আবারও বদলে গেল। সমস্যার সমাধান হয়ে গেলেও টুকুনের মনে এখন উঁকি দিচ্ছে এক অন্যরকম চিন্তা। সে আমিশার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে, কিন্তু এখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে দারোয়ান আব্বাসের ছবি। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে আব্বাসের সেই বাটকুল চেহারা - তামাটে-লাল রঙের দাঁড়ি, যেগুলো সমান করে কাটা না। মনে পড়ছে সেই উগ্র, সস্তা আতরের গন্ধ, যে গন্ধ দশ হাত দূর থেকেই মানুষকে সতর্ক করে দেয়। ষাট বছরের সেই বিয়ে-পাগল লোকটার জীর্ণ রূপ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে টুকুনের মনে। আর তারই পাশাপাশি ভেসে উঠছে টুকুনের মায়ের ছবি - সেই দশাসই রূপ, পরিপক্ব সৌন্দর্য, যে সৌন্দর্য বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও পরিশীলিত হয়েছে। টুকুনের গা কেমন শিরশির করে উঠলো এই চিন্তায়। 'কাল তো শনিবার, মা বাড়িতেই থাকবে!!' - এই ভাবনাটা তার মনে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠার জন্ম দিল। সে নিঃশব্দে একটা গভীর শ্বাস নিল। আমিশা আর বেগম সাহেবা যে আনন্দে মশগুল, টুকুনের মন সেখান থেকে একটু দূরে সরে গেছে। তার কপালে একটু ঘাম দেখা দিয়েছে। সে ভাবতে লাগল, আব্বাস যদি সত্যিই তার মায়ের সেই পরিণত সৌন্দর্য দেখে, তাহলে কী হতে পারে! তার মনে পড়ে গেল আব্বাসের সেই চিরকালী লুঙ্গির কথা, যে লুঙ্গি প্রায়ই তার শরীরের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। টুকুনের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সে নিজের কণ্ঠস্বরেই একটু কর্কশতা টের পেয়ে নিজেকে সামলে নিল। "আন্টি..আমি এখন উঠি!!" বলতে গিয়েও তার গলা একটু কেঁপে গেল। বেগম সাহেবা তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানালেন, "না না...আরেকটু বসো!!" তাঁর কণ্ঠে ছিল এক জোরালো কিন্তু স্নেহময় অনুরোধ। আমিশা উৎসাহে এগিয়ে এসে বললো, "হুমম..এখনই চলে যাবে!!" - তার কথার মধ্যে যেন এক ধরনের আকস্মিক বিচ্ছেদের বেদনা ছড়িয়ে পড়ল। সে টুকুনের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিল, যেন তাকে ধরে রাখতে চাইছে। বেগম সাহেবা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে একটু নরম সুরে বললেন, "একটু বসে যাও, তোমার সাথে তো গল্প করা হলো না!!" তাঁর চোখে ছিল এক কৌতূহল ও আগ্রহের দ্যুতি। টুকুন অনিচ্ছায় কিন্তু সম্মতিতে আবার সোফায় বসে পড়ল। তার মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে পালানোই শ্রেয়, কিন্তু বেগম সাহেবার সেই স্নেহশীল দৃষ্টি এবং আমিশার আবেগঘন অনুরোধের সামনে সে হার মানতে বাধ্য হল। বেগম সাহেবা আরাম করে সোফায় পা গুটিয়ে বসে বললেন, "তোমার বাবা, মায়ের কথা কিছু বোলো!!" তাঁর কণ্ঠে ছিল এক আন্তরিক আগ্রহ। তিনি সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়লেন, যেন টুকুনের পরিবারের গল্প শোনাটা তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সালোয়ারের নরম কাপড় সোফার উপর একটু যেন শব্দ করল। আমিশাও কৌতূহলী দৃষ্টিতে টুকুনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সে নিজেও টুকুনের পরিবার সম্পর্কে আরও জানতে চায়। বেগম সাহেবার কথাগুলো যেন ঘরের বাতাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। তিনি আমিশার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বেটা জানিস..টুকুন ডঃ সুনির্মল সেনের ছেলে.." তাঁর কণ্ঠে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ। "আরে আম্মুর হার্ট অপারেশন হয়েছিল যে....হাঁ ওই ডঃ সুনির্মল সেন!!" বলতে বলতে বেগম সাহেবার চোখে-মুখে ফুটে উঠল এক গভীর কৃতজ্ঞতার ভাব, "বিশাল নাম করা ডাক্তার!!" তারপর তিনি টুকুনের দিকে ফিরে তাকিয়েই যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন। "দেখলে মনে হবে যেন সিনেমার কোনো Hero..." - তাঁর কণ্ঠ এখন একেবারে আপ্লুত, "টুকুনের মত Handsome।" এই কথাগুলো বলার সময় বেগম সাহেবার পুরো চেহারা যেন আলো হয়ে উঠল। তাঁর চোখের কোণে খেলতে থাকা রেখাগুলোতে লেগে ছিল এক ধরনের উচ্ছ্বাস। তিনি যেন শুধু টুকুনকে দেখছেন না, দেখছেন সেই নামকরা সার্জনকেও, যিনি একদিন তাঁর মায়ের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আমিশা একটু লজ্জা পেয়ে গেল। সে মাথা একটু নিচু করে ফেলল। তার গালে লাগল এক হালকা লাল আভা। সে চোখ তোলতেই দেখল টুকুনের দিকে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি সরে নিল। এই লজ্জায় সে আরও সুন্দর দেখাতে লাগল। টুকুন নিজেও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। সে নিজের হাত দুটি নিজের মধ্যেই গুটিয়ে নিল, যেন এই অতিরিক্ত মনোযোগ থেকে নিজেকে একটু আড়াল করতে চাইছে। তারপর গর্বে বলল, "হুমম..বাবা সবসময় বিজি থাকে হসপিটাল নিয়ে!! সময় খুব কম পায়!!" "আলহামদুলিল্লাহ...আর আমিশা," - বেগম সাহেবা আমিশার দিকে তাকিয়ে কথাটা শুরু করলেন, তাঁর কণ্ঠে এক বিশেষ উৎসাহ। "মিসেস মুনমুন সেনের কথা কি বলবো.." - আমিশার মুখে প্রশ্নের ছাপ দেখে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, "টুকুনের মম!!" তারপর তিনি যেন এক স্বপ্নিল আবেশে ডুবে গেলেন, "সুবহানাল্লাহ..এতো সুন্দরী এতো হাসিন মহিলা আমি জীবনে দেখিনি..কি লম্বা..!!" তাঁর চোখে-মুখে বিস্ময়ের এক অকৃত্রিম ভাব ফুটে উঠল। তিনি টুকুনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "মাশাল্লাহ...ছয় ফুট হবেন না?" টুকুন গর্বে সোজা হয়ে বসল, "হুমম ওই পাঁচ ফুট দশ এগারো ইঞ্চি.." তার কণ্ঠে শোনা গেল এক বিশেষ মাধুর্য, মায়ের কথা বলতে গিয়ে যেন সে নিজেই আরেকটু উঁচু হয়ে গেল। বেগম সাহেবার বিস্ময়ের যেন শেষ ছিল না। তিনি মাথা নাড়তে নাড়তে বলেই চললেন, "একদিন দেখা হয়েছিল, ওনার কলেজে...কোনো একটা রাজনৈতিক ইস্যুতে গিয়েছিলাম..." তাঁর ডান হাতের তালু বুকে রাখলেন, যেন সেই স্মৃতি সরাসরি তাঁর হৃদয় স্পর্শ করছে, "আমিতো একদম jealous ওনার রূপের...মনে হবে জান্নাতের হুর..." এই কথাগুলো বলার সময় বেগম সাহেবার চোখে এক স্বপ্নিল দ্যুতি খেলে গেল। তিনি যেন আবারও দেখতে পাচ্ছিলেন মুনমুন সেনকে - তাঁর রাজকীয় ভঙ্গিমা, ঈগলের মতো উচ্চতা, আর সেই তেজোদ্দীপ্ত অথচ কোমল চেহারা, যে চেহারা দেখলে যে কেউই মুগ্ধ হতেন। আমিশা এই কথায় মনে মনে গর্ব বোধ করতে লাগল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই লজ্জায়ও ডুবে গেল। সে নিচু মুখে বসে থাকল, কিন্তু তার মনটা তখন এক উত্তাল সমুদ্র। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, 'এতো হ্যান্ডসাম বাবা আর এতো সুন্দরী মায়ের ছেলে টুকুন, যে রাজপুত্রের মতো দেখতে, তার সাথেই তো একটু আগেই চরম শারীরিক সুখ ভোগ করেছি আমি।' এই ভাবনা আমিশার গালে আরও গভীর লাল আভা এনে দিল। সে নিজের হাতের তালু ঘামতে লাগল, মনে পড়ে গেল টুকুনের স্পর্শ, তার শক্তিশালী অথচ কোমল স্পর্শের অনুভূতি। সে টুকুনের দিকে চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি নামিয়ে নিল, যেন তার এই গোপন ভাবনা কেউ টের পেয়ে যাবে। ঘরের বাতাসে এখন তিনজনেরই মিশ্র অনুভূতি ভাসছে - বেগম সাহেবার বিস্ময়, আমিশার লজ্জামিশ্রিত গর্ব, আর টুকুনের নিঃশব্দ সম্মান। আগরবাতির সূক্ষ্ম ধোঁয়া যেন এই সব অনুভূতিগুলোকে আরও তীব্র করে তুলছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে আজানের মধুর সুর। সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসা সেই আযানের ধ্বনি যেন পুরো ঘরটাকে এক পবিত্র আবহে ভরিয়ে দিল। বেগম সাহেবা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখমণ্ডলে নেমে এলো এক গভীর ভক্তির ছায়া, চোখে-মুখে ফুটে উঠল একান্ত নিবেদনের ভাব। "আমাকে মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে," বললেন তিনি দুজনের উদ্দেশ্যে, তাঁর কণ্ঠস্বর এখন অত্যন্ত নরম কিন্তু দৃঢ়। তারপর আমিশার দিকে ফিরে বললেন, "বেটা, টুকুনকে রেহানের সাথে দেখা করিয়ে দাও, আমি নামাজ পরে নি ততক্ষণে..." তাঁর কথায় ছিল এক বিশেষ স্নেহ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নামাজের জন্য দ্রুত যাওয়ার তাড়াও। বেগম সাহেবা সালোয়ারের নরম কাপড়টি সোজা করে নিলেন। তাঁর চলনে এখন এক ভিন্নরকম গাম্ভীর্য, যেন তিনি এক জগৎ থেকে আরেক জগতে পাড়ি দিচ্ছেন। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর পায়ের পাতার শব্দও যেন মিলিয়ে গেল আজানের সুরের সঙ্গে। আযানের সুর এখনও ভেসে আসছে দূর থেকে, যেন তা সময় ও স্থান পেরিয়ে এসে এই ঘরকেও স্পর্শ করছে। আমিশা ও টুকুন নিঃশব্দে বসে রইল, সেই আধ্যাত্মিক মুহূর্তটাকে ভাঙতে না চেয়ে। দুইজনেই পাশের ঘরে ঢুকতেই একটা আলাদা জগতের মুখোমুখি হলো। ঘরটার বাতাসে ভাসছিল শিশুর গায়ের ট্যালকম পাউডারের মিহি, মিষ্টি গন্ধ, মিশে আছে ল্যাকটিক অ্যাসিডের হালকা গন্ধ—যেন নবজাতকের নরম নিঃশ্বাসেরই স্পর্শ। নরম হলুদ আলোর নীচে ছোট্ট বিছানায় গুমটি মেরে ঘুমাচ্ছিল রেহান, আমিশার দেড় বছরের ভাই। তার নরম নিঃশ্বাসের শব্দ—হালকা সাঁ সাঁ—ঘরটাকে যেন একটা মায়াবী চাদরে মুড়ে দিয়েছে। "চলো, তোমাকে আমার ভাইয়ের সঙ্গে Intro দিই!" আমিশার কণ্ঠে এক তীব্র আবেগ। সে টুকুনের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিল। বেগম সাহেবার অনুপস্থিতিতে আমিশার আচরণে এল এক গোপন সাহস। সে টুকুনের হাতটা একদম নিজের বগলের নিচে, তার স্তনের পাশের কোমলতায় চেপে ধরল, যাতে টুকুনের বাহুর পিঠ তার বুকের কাছাকাছি থাকা নরম উষ্ণতাকে সরাসরি অনুভব করতে পারে। এই স্পর্শে আমিশার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। একটু আগেই এই ফ্ল্যাটেরই অন্য ঘরে তাদের মধ্যে যে উত্তপ্ত, ঘামভেজা মিলন হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও তাজা, রোমাঞ্চকর। আমিশার হৃদস্পন্দন এখনও দ্রুত। সে টুকুনের দিকে তাকাল এক ধরনের লজ্জা আর সাহসীকতার মিশ্রণে, তার চোখের ভাষা যেন বলছিল—'দেখো, আমরা কতটা কাছাকাছি এসে গেছি। শুধু দেহই নয়, মনও।' টুকুনের সমস্ত শরীরে যেন এক বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল। আমিশার বগলের সেই কোমল, উষ্ণ, রেশমি স্পর্শ তার হাতের ত্বককে জ্বালিয়ে দিল। সে আমিশার চোখের গভীরে, সেই কালো তারার মত চোখের গহীনে তাকাতেই বুঝতে পারল, এই মুহূর্তটা শুধু একটা শারীরিক স্পর্শ নয়, বরং তাদের গোপন ভালোবাসারই এক নিঃশব্দ, রোমাঞ্চকর স্বীকৃতি। তারপর ঘটল সেই অবিশ্বাস্য, চিত্রময় মুহূর্ত। টুকুন আমিশার গাল দুটো তার দুই হাতের তালু দিয়ে সযত্নে ধরে ফেলল, যেন সে ধরে রাখছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, নাজুক রত্ন। আমিশার গালের কোমল, উষ্ণ ত্বক তার আঙুলের ডগায় এক জীবন্ত স্পন্দনের অনুভূতি জাগাল। আর তারপর...মন্থর গতিতে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে, সে এগিয়ে গেল আমিশার দিকে, আর তাদের ঠোঁট দুটি মিলে গেল এক গভীর, তৃষ্ণার্ত, দীর্ঘস্থায়ী চুম্বনে। ওই চুম্বন শুধু শারীরিক সংস্পর্শই ছিল না, সেটা ছিল এক আবেগের বিস্ফোরণ, এক স্মৃতির ধারাবাহিকতা। একটু আগে পর্যন্তও তারা যে গোপন, উন্মত্ত মিলনে মিলিত হয়েছিল, যেখানে শরীরের গন্ধ, ঘামের লবণাক্ততা, আর ক্লান্তির মাধুর্য মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল—তারই যেন ধারাবাহিকতা বয়ে আনল এই চুম্বন। আমিশার ঠোঁটের নরম, সামান্য আর্দ্র, মধুর মত মিষ্টি অনুভূতি টুকুনের জন্য এখন স্বর্গস্পর্শের মতো। সে আমিশাকে আরও কাছে, আরও গভীরভাবে টেনে নিল, তাদের দেহের মধ্যে কোনো ফাঁকা জায়গা না রেখে, পেটের সাথে পেট, বুকের সাথে বুক চেপে ধরে। দূর থেকে ভেসে আসা আজানের শেষ সুরের করুণ সুর, আর পাশের ঘরে রেহানের নরম, শিশুসুলভ নিঃশ্বাস—সবকিছুই মিলে গেল এই রোমাঞ্চকর, গোপন মুহূর্তের সঙ্গে, এক অদ্ভুত কামনা ও কোমলতার সংমিশ্রণ তৈরি করল। আজানের শেষ সুরটি বাতাসে মিলিয়ে যেতেই যেন তাদের চুম্বনের মোহভঙ্গ হলো। আমিশা হঠাৎই এক দুষ্টু, চোখ-টিপটিপে হাসি হেসে, তার হাতটা নামিয়ে টুকুনের প্যান্টের উপর দিয়ে তার ফুলে ওঠা লিঙ্গটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে ধরে ফেলল। "তোমার বাঁড়াটা আমার ভেতরে ভরে রেখে যেও!!" বলেই সে হিহি করে হাসতে লাগল, তার কণ্ঠে মিশে ছিল অদ্ভুত এক সকরুণতা, একইসাথে লাজুক ও নির্লজ্জ। তারপর একটু ন্যাকামো ভঙ্গিতে বলল, "কি বড় উউউফ, এখনো ফুলে রয়েছে!!" তারপর সে টুকুনের নাক টিপে দিল, গালে টোল ফেলে দিল হাসির ছলে। "কি!! আরেকবার চুদবে নাকি!!" আমিশার চোখে জ্বলছিল চ্যালেঞ্জ আর কামনার মিশেল, এক তীব্র আগুন যা কিছুক্ষণ আগের মিলনেই নিভেনি। টুকুন আমিশার টোল পড়া, উষ্ণ গালে এক নরম চুমু দিয়ে সতর্ক করে দিল, "ছি!! কি করছো, তোমার মা চলে এলে!!" তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের আতঙ্ক মিশ্রিত উৎকণ্ঠা, কিন্তু চোখে ছিল সেই একই দুষ্টুমি। সে আমিশার বুকের দুধ দুটো তার পাতলা সাদা টি-শার্টের ওপর দিয়ে দুই হাতে মুঠো করে ধরে, সেই নরম, ভরাট উষ্ণতা হাতের তালুতে অনুভব করতে করতে বলল, "চলো, এখন তোমার ভাইকে দেখে আসি..আমার শিশু খুব ভালো লাগে!!" টুকুনের এই স্পর্শে, তার হাতের জোরালো কিন্তু স্নেহময় মুঠোয় আমিশার সমস্ত শরীরে এক শিহরণ বয়ে গেল। তার টি-শার্টের নরম সুতির কাপড়ের ওপর দিয়ে টুকুনের হাতের উষ্ণতা, তার আঙুলের চাপ তাকে আরও উত্তেজিত করে তুলল, মনে করিয়ে দিল তাদের সদ্যসমাপ্ত উন্মাদনার কথা। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে, একটা গভীর শ্বাস নিয়ে হাসিমুখে বলল, "তুমি তো দেখছি বাচ্চা পাগলই হয়ে গেছ!" দুজনে পাশের ঘরে ঢুকতেই দেখল রেহান গভীর ঘুমে অচেতন। তার ছোট্ট মুখখানি এক পরম শান্তিতে প্রসন্ন, গোলাপি ঠোঁট সামান্য খোলা, নরম হাত দুটি মাথার পাশে ছড়ানো—যেন কোনো পরীর দেশের বাসিন্দা। টুকুন নিঃশব্দে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা, এক গভীর মমতার আভা খেলে গেল। সে আমিশার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "কি সুন্দর দেখতে...ঠিক তোমার মতো।" তার গলার স্পর্শে আমিশার কানে এক শিহরণ বয়ে গেল। আমিশা টুকুনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তার মনটা তখনও টুকুনের স্পর্শে, তার উপস্থিতিতে জড়াজড়ি করে আছে। সে টুকুনের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল, যেন নিঃশব্দেই বলতে চাইল—'এটাই আমাদের গোপন বিশ্ব, আমাদের নিজস্ব রাজ্য, যেখানে শুধু আমি আর তুমি আছি, আর আমাদের এই মুহূর্তের আকাঙ্ক্ষা।' ঠিক তখনই রেহান মোর-মুড়ি দিয়ে উঠল, তার ঘুম ভেঙে গেছে। আমিশা সঙ্গে সঙ্গে রেহানকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল, তার নরম গালে চুমু দিতে দিতে। তারপর রেহানকে টুকুনের দিকে মুখ করে বলল, "দেখোতো এটা কে....রেহান!!" টুকুনের দিকে মুচকি হেসে, চোখের ইশারায় যোগ করল, "এটা তোমার বেহনই...জিজা!!" টুকুন হাসল, একটা হালকা, স্নেহময় হাসি। সে দুই হাত বাড়িয়ে দিল রেহানকে কোলে নিতে। রেহান খিলখিল করে হেসে টুকুনের কোলে চলে গেল, তার ছোট্ট, মাংসল হাত দিয়ে টুকুনের টিশার্টের রবার-প্রিন্টের ডিসাইনটা আঁকড়ে ধরে ফেলল। "আব..ব্বা..বা, আব..ব্বা..বা, আবব্বা..বা" বলে সে অস্পষ্ট, মিষ্টি আওয়াজ করতে লাগল, তার বড় বড় চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে নতুন, অচেনা একজন মানুষের মুখ দেখে। আমিশা হেসে উঠল, তার হাসি ভরে গেল ঘরটা। সে রেহানের ফোলা ফোলা, গোলাপি গাল টিপে দিল, "আব্বা না, রেহান..জিজা বোলো!!" তার কণ্ঠে ছিল স্নেহের পরিহাস, এক বোনের গর্ব। সে টুকুনের দিকে তাকাল, যেন দেখতে চাইল টুকুন কীভাবে শিশুর সাথে মিশছে, কীভাবে তার কোমলতা প্রকাশ পাচ্ছে। টুকুন রেহানকে দোলা দিতে দিতে, তার নরম শরীরটা নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে বলল, "উউউউ কি মিষ্টি, কত ছোট্ট, টেডি বেয়ার!" তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত কোমলতা খেলে গেল। শিশুর কাছাকাছি থাকায়, তার নির্দোষ উপস্থিতিতে তার নিজের মনও যেন হালকা, নির্মল হয়ে উঠল। রেহানের নরম শরীরের স্পর্শ, তার গায়ে লেগে থাকা ট্যালকম পাউডারের মিহি গন্ধ, আর গলা থেকে বের হওয়া খিলখিলানি—সব মিলিয়ে টুকুনের হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর মমতায় ভরে গেল। সে রেহানকে আরও শক্ত করে, কিন্তু সযত্নে জড়িয়ে ধরে বলল, "তুই যেন জীবনের প্রথম ফুল, রেহান!" আমিশা পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে একদম মুগ্ধ, স্তব্ধ হয়ে রইল। টুকুনের চোখে, তার মুখের ভঙ্গিতে যে কোমলতা, যে আন্তরিক মমতা দেখছিল, তাতে তার নিজের বুকও যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম হল, এক অজানা আবেগে তার গলা আটকে আসতে চাইল। সে ভাবল, এই যুবকটি, যে কিছুক্ষণ আগেই তার সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ, প্রাণবন্ত, উন্মত্ত মিলনে মিলিত হয়েছিল, যে তার লিঙ্গ দিয়ে এমন পাগল করা যৌনমিলন ঘটিয়েছিল যে তার যোনিপথ এখনও স্পন্দিত হচ্ছে, স্মৃতিতে রোমাঞ্চিত হচ্ছে—সেই একই মানুষ এখন একটি শিশুর সঙ্গে এমন অকৃত্রিম, মমতাময়, নিষ্কলুষ হয়ে উঠল। এই দ্বৈতসত্ত্বা—একদিকে প্রখর কামনার যোদ্ধা, অন্যদিকে কোমলতার আধার—টুকুনের ব্যক্তিত্বকে আমিশার চোখে আরও রহস্যময়, আরও আকর্ষণীয় করে তুলছিল। - চলবে
Parent