বাংলা গল্প- লালপট্টি - অধ্যায় ৩৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-70110-post-6069174.html#pid6069174

🕰️ Posted on October 31, 2025 by ✍️ rajusen25 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 1865 words / 8 min read

Parent
রাত তখন সাড়ে আটটা। আমিশার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে টুকুনের বাইকটা যেন হালকা মনের মতোই ছুটে চলেছে খিদিরপুরের গলি ধরে। কিন্তু চারপাশের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, কলকাতা শহরটা যেন আজ এক নতুন রূপে সেজেছে। রাস্তার দু’ধারে দোকান-পাট থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল হলুদ আর সাদা আলোর রেখা—যেন কিছু এলইডি বাতি আর পুরনো টিউবলাইটের লড়াই। মুদির দোকানে ভিড় করেছে পাড়ার গৃহিণীরা, চায়ের দোকানে জমে আছে রিকশাওয়ালা-ট্যাক্সিওয়ালাদের আড্ডা, আর হালাল মাংসের দোকানের সামনে ঝুলছে লাল রঙের গোস্তের টুকরো। চোখে পড়ার মতো ছিল লুঙ্গি-পরা, সাদা টুপি-পরা মানুষের ভিড়—খিদিরপুরের এই অংশটা যেন মহমেডান অধ্যুষিত এলাকারই আখড়া। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল পচা চামড়ার তীব্র গন্ধ, কারণ এখানে চামড়ার কারখানার কোনো অভাব নেই। কোথাও কোথাও ফুটপাত জুড়ে জুয়ার আসর বসেছে—একদল মানুষ টাকার ওপর টাকা জমা রাখছে, উত্তেজনায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। পাশেই স্ট্রিট ল্যাম্পের নরম আলোয় একদল বুড়ো বসে আছে তাসের ম্যাচে, তাদের মুখের গম্ভীরতা দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছে! আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বখাটে ছেলে, তাদের চোখ যেন শিকারের সন্ধানে ঘুরছে। পথচারী মেয়েদের দিকে তারা ইচ্ছেকৃত টোকা দিচ্ছে, কখনও অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়ে মারছে, কখনও হুইসেল দিচ্ছে। একজন মহিলা তড়িঘড়ি করে পা চালিয়ে সেখান থেকে সরে যাচ্ছেন, তার চোখে স্পষ্ট অসহায়তার ছাপ। টুকুনের বাইকটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল এই সব দৃশ্যের ভিতর দিয়ে। সে লক্ষ্য করছিল, কীভাবে একই শহরে কত রকমের জীবন একসাথে বয়ে চলেছে—কেউ ধর্মের ধ্যানে মগ্ন, কেউ জুয়ার নেশায় বুঁদ, আবার কেউ রাস্তার হয়রানির শিকার। কলকাতার এই চেহারাটা একদমই বদলায়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু রং চড়েছে, কিন্তু চরিত্রটা আগের মতোই রয়ে গেছে। যখন টুকুন খিদিরপুরের গলিঘুঁজি পেরিয়ে রেস কোর্স ময়দানের রাস্তায় পৌঁছাল, তখন সে যেন এক অন্য কলকাতার মুখোমুখি হল। একদমই পাল্টে গেল শহরের চিত্র। খিদিরপুরের গায়ে-লাগা বস্তির জটিলতা, দোকানপাটের জমজমাট ভিড়, পচা চামড়ার গন্ধ—সবকিছুই যেন পিছনে পড়ে রইল। পরিবর্তে সামনে খুলে গেল প্রশস্ত রাস্তা, দুই ধারে সারি সারি উঁচু গাছ, আর সবুজ ময়দানের বিশালতা। বাতাসে এখন ভেসে বেড়াচ্ছিল ঘাসের টাটকা গন্ধ, মধ্যে মধ্যে বাগানের ফুলের সৌরভ। রেস কোর্স ময়দানের অফুরন্ত সবুজ যেন চোখ জুড়িয়ে দিল। দূরদূরান্ত পর্যন্ত শুধুই ঘাসের গালিচা, মাথার ওপর খোলা আকাশে জ্বলজ্বল করছে কয়েকটা তারা। রাস্তার বাতিগুলো নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যা খিদিরপুরের টিউবওয়েলের তীক্ষ্ণ সাদা আলো থেকে একদমই ভিন্ন। এখানে মানুষের ভিড় নেই বললেই চলে। কেউ কেউ জগিং করছে, কয়েকজন দম্পতি হাত ধরে হাঁটছে, কেউ আবার বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়েছে। সবকিছুই যেন শান্ত, পরিপাটি, সাজানো-গোছানো। টুকুনের বাইকটাও যেন গতি কমিয়ে নিল, এই সুশৃঙ্খল পরিবেশটা উপভোগ করতে করতে। রবীন্দ্র সদনের রাস্তায় প্রবেশ করতেই টুকুনের চোখে পড়ল শহরের এক নতুন চেহারা। রেস কোর্সের নিস্তব্ধতা থেকে হঠাৎই যেন প্রবেশ করল এক প্রাণচঞ্চল জগতে। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় শপিং মল তাদের নিওন আলোয় উদ্ভাসিত, নামী-দামী ব্র্যান্ডের দোকানগুলো এখনও খোলা, ভেতরে বাইরে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। বই-পুস্তকের দোকানগুলোতেও জমে উঠেছে পাঠকদের সমাগম, কেউ বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে, কেউ দাঁড়িয়েই গল্পের বই পড়ায় মগ্ন। অফিস থেকে ফেরার লোকজনের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কারো হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ, কারো কাঁধে অফিসের ফাইল, সবার মুখে কাজের ক্লান্তি আর বাড়ি ফেরার তাড়না। অটো রিকশা, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার—সবাই যেন একসাথে মিলে তৈরি করেছে এক যানজটের সিম্ফনি। ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে টুকুন লক্ষ করল, কীভাবে এই শহর একইসাথে এতগুলো ভিন্ন জীবনকে ধারণ করে আছে। একপাশে রেস কোর্সের শান্তি, অন্যপাশে রবীন্দ্র সদনের এই প্রাণচাঞ্চল্য—দুটোই যেন কলকাতার নিজস্ব পরিচয়। বাতাসে এখন ভেসে বেড়াচ্ছিল রাস্তার পাশের ফুড স্টল থেকে উঠে আসা ঝাল-মুড়ি আর চায়ের সুগন্ধ, মধ্যে মধ্যে বইয়ের দোকান থেকে ভেসে আসা নতুন বইয়ের সেই স্বর্গীয় গন্ধ। শহরের এই অংশটা যেন কখনও থামে না, সন্ধ্যা হলেই নতুন করে জেগে ওঠে। টুকুন মনে মনে ভাবল, 'একটা চায়ের দোকানে ব্রেক নেওয়া যাক, চা-সিগারেটে খেলে মন্দ হয় না।' সে রাস্তার পাশেই একটা ছোট্ট চায়ের দোকান দেখতে পেল, যেখানে কাঠের বেঞ্চে বসেছে কয়েকজন অফিসফেরতা মানুষ। টুকুন বাইক পাশে রাখল এবং দোকানের লোকটাকে বলল, "দাদা, একটা চা দেবেন?" দোকানদার তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, "দুধ না লিকার?" "দুধ চা দিন," টুকুন বলল, তারপর জিন্সের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। চায়ের গরম ভাপ আর সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে আমিশার মুখটা ভেসে উঠল টুকুনের মনে। সে আরেকটা লম্বা টান নিল সিগারেটে, ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে আজকের পুরো দিনটার কথা ভাবতে লাগল। সকালবেলা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা মার্বেল, প্রিন্সেপ ঘাটে হুগলি নদীর বুকে দোল খাওয়া নৌকা, আর তারপর... বেগম সাহেবার হাভেলিতে, আমিশার ঘরে তাদের সেই গোপন মিলন। তার মনে পড়ল আমিশার শরীরের উষ্ণতা, তার নরম ঠোঁটের স্বাদ, ঘামে ভেজা চুলের গন্ধ, আর সেই শারীরিক অন্তরঙ্গতার সমস্ত খুঁটিনাটি। আমিশার সেই সুন্দর মুখখানি, কত আপন লাগছে আমিশাকে... বিশেষ করে বিদায় বেলায় আমিশার আবেগপ্রবণ মুখ, চোখের কোণে জমা জল, আর না বলা কথাগুলো—সবই যেন টুকুনের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে। "আল্লাহকে নাম পে কুছ দে দে বাবা!!"—এই করুণ আওয়াজে টুকুনের ধ্যান ভাঙল। সে নিচে তাকাতেই দেখল একজন দুই পা পোলিও আক্রান্ত ভিখারী, যার শরীর অর্ধেক ভাঙা চেয়ারের উপর ভর দিয়ে ঠাঁই নিয়েছে, হাত বাড়িয়ে আছে ভিক্ষার জন্য। ভিখারীটির চোখের গভীরে যেন ক্ষুধার একটা আগুন জ্বলছিল, আর সেইসাথে লেগে ছিল জীবন-মরণ সংগ্রামের এক করুণ ছাপ। তার জিন্সের প্যান্টের হাঁটুর কাছে কাপড় এতটাই টান পড়ে ছিল যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ওই পায়ে সত্যিই কোনো ভান নেই। এই দৃশ্য দেখে টুকুনের মনটা একটু নরম হয়ে গেল। সে তার জিন্সের পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা বের করে ভিখারীটির হাতে গুঁজে দিল। ভিখারীটি পয়সাগুলো তার কালো, ময়লা, আঙুলগুলো দিয়ে আঁকড়ে ধরে "বহুত বহুত মেহেরবানী বাবু" – বলে দুই হাত জোড় করে কৃতজ্ঞতা জানাল। তারপর সে দুই হাতের তালু মাটিতে রেখে, নিজের অর্ধ-পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরটাকে টেনে টেনে, এক পা লেংচাতে লেংচাতে পরের দোকানের দিকে এগোতে লাগল, আবারও ভিক্ষার সুরে গলা ছেড়ে দিল। এদিকে চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়ানো এক মধ্যবয়স্ক গ্রাহক, যার পরনে ছিল অফিসের ফর্মাল প্যান্ট-শার্ট আর হাতে একটা ডায়েরি, সে হঠাৎই এগিয়ে এসে বলল, "আরে স্যার! ওই হারামখোরকে পয়সা দিলেন কেন? ওই ল্যাংড়া সাজার নাটক করে, সারাদিন এভাবে কুকুরের মতো ভিক্ষে করে, আর সেই পয়সা দিয়ে সন্ধ্যাবেলা গুটখার দোকানে ঢুকে পড়ে!" বলে সে মুখ বেঁকিয়ে একধরনের বিরক্তি আর বিতৃষ্ণার ভাব দেখাল, তার চোখেমুখে ফুটে উঠল যেন নিত্যদিনের দেখা "চিটিংবাজ" শ্রেণীর লোকগুলোকে। টুকুন মুখে কিছু না বলে শুধু মৃদু হাসল, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। সে মনে মনে ভাবল, 'বাহ! কত রকমের ফাঁকিবাজিই না চলে এই শহরে! হাড়ভাঙা খাটুনি না করে, অক্ষমতার নাটক করে ভিক্ষা করে পেট চালায়!' কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে ভেসে উঠল বেগম শাব্বা হাকিমের সেই রাজপ্রাসাদ-সদৃশ হাভেলির ছবি—ঝলমলে মার্বেলের মেঝে, দামী পারস্য কার্পেট, আর এই রাস্তার ধুলোমাখা ভিখারী—জীবনের এই চরম বৈপরীত্য যেন এক থাপ্পড়ের মতো লাগল তার মনে। সে আবারও একটা লম্বা টান দিল সিগারেটে, ভাবতে লাগল, 'অথচ ওই হাভেলীর দারোয়ান আব্বাস, বাটকুল, রোগা-পটকা শরীর নিয়ে, বুড়ো বয়সেও সাদা-সবুজ ইউনিফর্ম পরে সম্মানের সাথে কাজ করে খাচ্ছে।' ভাবতে ভাবতে টুকুনের ঠোঁটের কোণে হঠাৎই একটা হাসি ফুটে উঠল—"হে হে হে..."—আব্বাসের সেই হাস্যকর চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। পালক ঝরা ক্যাংটা মোরগের লেজের মতো তার রঙিন দাঁড়ি, লুঙ্গির ওপর ঢিলে হয়ে পড়ে থাকা সাদা-সবুজ ইউনিফর্ম, সস্তা আতরের তীব্র গন্ধ আর আমিশার বলা কথাটা মনে পড়তেই—"বিয়ে পাগল আব্বাস!"—তার মনটা হালকা হয়ে উঠল। হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল—"ওহো... কাল তো বেগম সাহেবা আব্বাসকে দিয়েই ফল-মিষ্টির পেটরা পাঠাবে আমাদের বাড়িতে!" মনে মনে ভাবতে লাগল, "আরে! কিন্তু আমি তো কাল সকালেই আবার আমিশার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব!! মা একা থাকবে বাড়িতে... আর ওই আব্বাস যদি!!!" এই ভাবনা মাথায় আসতেই টুকুনের সমস্ত শরীরে এক ঝলকানি বয়ে গেল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে জানত তার মায়ের সেই অসামান্য রূপ—লম্বা, পরিণত সৌন্দর্য, ঈগলের মতো উচ্চতা। আর আব্বাসের সেই বিয়েবাজারি চেহারা, বাটকুল রোগা শরীর, আর মায়ের গরিব-দুঃখী, কুৎসিত, বুড়ো মজুরদের প্রতি অসম্ভব মমতা—এই সংমিশ্রণটা ভেবেই টুকুনের বুকটা ধক করে উঠল। সে কল্পনা করল আব্বাস তার মায়ের সামনে হাজির হওয়ার দৃশ্য—কলেজের অধ্যাপিকা মায়ের চশমার পিছনে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, আব্বাসের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি—এক অদ্ভুত আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে এল। তারপর হঠাৎই মনে পড়ে গেল—"তৌফিক মিয়াকে যখন দেখেছিলাম মায়ের সাথে....উউফ" — আরেকটা সিগারেটে ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে ভাবতে লাগল, "এই আব্বাস তো আরও বুড়ো, ষাট বছর বয়সেও বিয়ে হয়নি...আর মা উফফ, সদাসই চেহেরার উঁচা লম্বা সুন্দরী কলেজের ইংরেজির অধ্যাপিকা আর আব্বাস কুৎসিত কালো বাটকুল মহমেডান দারোয়ান!!" সিগারেটের ধোঁয়া ধূসর মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকল। টুকুনের মনে পড়ে গেল সেই তৌফিক মিয়ার কথা—লালপট্টির নোংরা গলিতে থাকা সেই বাটকুল রোগগ্রস্ত মহমেডান মেথর, যে টুকুনের মায়ের করা একটু উপকারের জন্য তাকে আল্লাহর ফেরেশতা ভাবত। মায়ের সামনে সে এমনভাবে নতজানু হত, যেন কোনো দেবীর পূজা করছে। টুকুনের মানসপটে যেন সিনেমার পর্দায় ভেসে উঠল দুইটি বিপরীতমুখী ছবি। একদিকে তার মা, মিসেস মুনমুন সেন—প্রায় ছয় ফুট লম্বা সেই পরিণত সৌন্দর্য, যার প্রতিটি ভঙ্গিমায় ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকার মার্জিত ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। সাদা শাড়ির নরম ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই অভিজাততা, চশমার পিছনে থাকা বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, কথাবার্তায় যে সংযোজন—সব মিলিয়ে তিনি যেন এক জীবন্ত মূর্তি। আর তারই পাশে মানসচক্ষে ভেসে ওঠে আব্বাসের সেই জীর্ণ, অর্ধ-পাগলাটে, বাটকুল চেহারা—মুখজুড়ে খোদাই করা দাগ, কুঁচকে যাওয়া কালো চামড়া যেন পুরনো চামড়ার থলের মতো, চোখে এক অকারণ, অস্বস্তিকর উজ্জ্বলতা, শরীর থেকে ভেসে আসা সস্তা আতরের তীব্র গন্ধ যেন দূর থেকেই সতর্ক করে দেয়। এই চরম বৈপরীত্য ভেবেই টুকুনের গা শিউরে উঠল। সে কল্পনায় দেখতে পেল আব্বাসের সেই ক্ষুধার্ত, প্রায় পশুত্বপূর্ণ চোখ কীভাবে তার মায়ের দিকে তাকাবে—যেন একটা ক্ষুধার্ত শেয়াল এক রাজহাঁসের দিকে লালসাভরে তাকিয়ে আছে। আর মায়ের সেই অফুরন্ত দয়া, যে দয়া কোনোদিন শ্রেণী বা বর্ণ দেখেনি, যে দয়া তৌফিক মিয়াকেও ফেরেশতা ভাবতে শিখিয়েছিল—সেই দয়াই কী আব্বাসের মতো একজন বুড়ো মহমেডান দারোয়ান পাবে?, এই চিন্তায় তার মন অস্থির হয়ে উঠল। সে জানত, ক্ষুধার্ত চোখ কখনোই শান্ত হয় না, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সিগারেটের শেষ টানটা টেনে নিয়ে, ছাই ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে টুকুন ভাবল, 'আর যদি মা সত্যি সত্যিই আব্বাসের রঙিন দাঁড়ি ধরে টেনে নেয় কাছে, তাহলে...!" টুকুনের কল্পনায় ভেসে উঠল এক অসম যুদ্ধের ছবি—একদিকে তার মায়ের সুঠাম, পরিণত দেহ যার ওজন নিঃসন্দেহে পঁচাশি কেজি ছাড়িয়েছে, অন্যদিকে আব্বাসের কঙ্কালসার, বাটকুল শরীর যা পঞ্চাশ কিলোর বেশি হবে বলে মনে হয় না। সে ভেবে অবাক হলো, এই নাজুক, বৃদ্ধ মানুষটির মধ্যে কীভাবে এতটা সাহস বা লালসা জাগবে! তার মনে পড়ল আজ সন্ধ্যায় হেলমেট নিতে গিয়ে আব্বাসের হাতের সেই অস্বস্তিকর কাঁপুনি—যে হাত একটি হেলমেটের ওজনই সামলাতে পারছিল না, সে কীভাবে তার মায়ের পূর্ণতা সামলাবে! ঠিক তখনই টুকুনের কল্পনা ব্যাঘাত ঘটলো তিনটি পথচারী অর্ধনগ্ন বালক-বালিকার করুণ ডাকে—"বাবু, কিছু পয়সা দাও আল্লাহর নামে, কিছু খাই নাই...!!" পাঁচ-ছয় বছর বয়সী একটি কৃশকায় বাচ্চা মেয়ে তার কোলে দুই বছরের একটি শিশু ধরে রেখেছে, আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেক তিন-চার বছর বয়সী ছেলে—তাদের চোখে ক্ষুধার জ্বালা, শরীরে ময়লার স্তর। টুকুন পকেট থেকে পয়সা বার করতে যাবে এমন সময় চায়ের দোকানদার ধুরধুর করে চিৎকার করে উঠলো—"এই, ভাগ তোরা এখান থেকে, কোনো কাস্টমার আসতে পারেনা এই ভিখারী গুলোর জন্য!!" দোকানদারের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর উঁচু গলার আওয়াজ শুনে বাচ্চাগুলো ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো, যেন ছত্রভঙ্গ পাখির দল। তখন দোকানদার চিৎকার করে গলার শিরা ফুলিয়ে বলতে লাগলো—"ওই দেখুন দাদা!"—দূরে একটা ফুটপাতের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে—"ওদের বাবা-মা মাদুর পেতে বসে আছে!! আর বাচ্চাগুলোকে দিয়ে ভিক্ষে করাচ্ছে!! হারামখোরগুলো প্রত্যেক বছর একটা করে পয়দা করবে আর রাস্তায় ছেড়ে দেবে!!" দোকানদারের ঠোঁটের কোণে সাদা ফেনা জমেছে, তার চোখদুটো যেন রাগে টকটক করে জ্বলছে। দিনের পর দিন দোকান চালানোর ক্লান্তি, আর তার ওপর এই পথ-ভিখারীদের অবাধে বেড়ে ওঠা—সবকিছুরই যেন একটা ফেনিল অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তার মুখমণ্ডলে। টুকুন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে লক্ষ করল, ঠিকই তো, ওই রাস্তার ওপারে ফুটপাত জুড়ে বাবা-মা স্বচ্ছন্দে বসে গল্প করছে, আর তাদের নিষ্পাপ শিশুরা ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। 'কি যুক্তি আছে এদের?' টুকুন ভাবল, 'নিজেদের থাকার ঠাঁই নেই, অথচ একটা পর একটা সন্তান জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। আর এই নিষ্পাপ শিশুরা না পাচ্ছে ভালো শিক্ষা, না পাচ্ছে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ভিক্ষাবৃত্তি করে কতদিন চলবে এদের? বড় হলে এরাও তো ওদের বাবা-মায়ের মতোই ভিক্ষাবৃত্তি করবে, নাহয় চোর-ডাকাত হয়ে যাবে।' এই পথচারী শিশুদের করুণ চেহারা দেখে টুকুনের মনটা ভারী হয়ে এল। কিন্তু কীই-বা করতে পারে সে? এটাই তো সমাজের চিত্র—একদিকে আমিশাদের রাজপ্রাসাদ, অন্যদিকে এই ভিখারির দল। টুকুন আর কিছু না ভেবে চায়ের পয়সা মিটিয়ে দিল। তারপর বাইক স্টার্ট করে রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাস্তার আলোয় তার বাইকের হেডলাইট একটা দীর্ঘ ছায়ার সৃষ্টি করল, যেন কলকাতার রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া অগণিত জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। - চলবে
Parent