বাংলা গল্প- লালপট্টি - অধ্যায় ৪৫

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-70110-post-6080283.html#pid6080283

🕰️ Posted on November 17, 2025 by ✍️ rajusen25 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2852 words / 13 min read

Parent
খিদিরপুরের গলিটার গা-ঘেঁষা ইঁটের দেওয়ালগুলো যেন দুপুরের রোদে টষটষ করে তেলেভাজা হচ্ছিল। টুকুনের বাইকটা যখন গলি পেরিয়ে সদর রাস্তায় উঠল, ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে আসা এক চেনা চেহারার উপর তার চোখ আটকে গেল। আব্বাস। সেই বুড়ো দারোয়ান, যার শরীরে হাড় আর চামড়া ছাড়া যেন কিছুই নেই। সে হাঁটছিল, কিন্তু তার হাঁটায় কোনো গতি নেই, যেন পা টেনে টেনে চলেছে। তার হাতে দু’টা বড়সড় বাক্স, যেন খুব ভারী বোঝা। আব্বাসের মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেউ তার সমস্ত আশা-ভরসা, সমস্ত স্বপ্ন পায়ের তলায় মাড়িয়ে দিয়েছে। টুকুনের মাথায় ভেসে উঠল তৌফিক মিয়ার ছবি। সেই স্মৃতি—তার মা, আর সেই মহমেডান মেথর। তারপর সে আব্বাসের দিকে তাকাল—এই বুড়ো, নিঃসঙ্গ, 'বিয়ে-পাগল' দারোয়ান। তার মায়ের সেই বিশেষ রুচি, সেই 'খেলা'... হ্যাঁ, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। সম্ভবত তার মা আব্বাসকেও একইভাবে 'পরীক্ষা' করেছেন, তার একাকিত্ব ও গভীর কামনাকে উস্কে দিয়ে একপ্রকার নিষ্ঠুর আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন। টুকুন সঙ্গে সঙ্গে বাইকটা থামিয়ে ডাকল, "আব্বাস চাচা!" আব্বাস যেন লক্কড়-ঝক্কড় হয়ে থমকে দাঁড়াল। তার মুখমণ্ডলে একটা অদ্ভুত ভাব—লজ্জা, অস্বস্তি, আর গভীর এক ক্ষোভ যেন পাক খাচ্ছে। সে টুকুনের দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো আজ আরও গভীর, আরও খাঁজখেদে মনে হল, যেন কোনো কুয়োর তলায় জমে থাকা কালো পানি। "টুকুন সাহেব..." আব্বাসের গলার আওয়াজ যেন মাটিতে পড়ে ভেঙে যাওয়া কাঁচের মতো—খরখরে, ভাঙা ভাঙা। "কি চাচা, আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন নাকি?" টুকুন জিজ্ঞেস করল, ইচ্ছে করেই একদম সাদামাটা সুরে। আব্বাসের মুখের ভাব দেখেই সে টের পাচ্ছিল, কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে, যার দাগ এখনও তার চোখে-মুখে লেগে আছে। আব্বাস মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ সাহেব... বেগম সাহেবার পক্ষ থেকে ফল-মিষ্টি দিতে গিয়েছিলাম।" "আর...? মা ছিলেন তো?" টুকুন নিশ্চিত ছিল যে তিনি ছিলেন। প্রশ্নটা শুধু আলাপ শুরু করার ছল মাত্র। আব্বাসের মুখমণ্ডল বিকৃতি—হ্যাঁ... ছিলেন।" সে যেন আর কিছু বলতে চাইছিল না, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি একেবারে ভিন্ন কথা বলছিল। সেখানে স্পষ্ট ছিল অপমানের জ্বালা, আর তার সাথে মিশে ছিল এক ধরনের নিষিদ্ধ, অব্যক্ত উত্তেজনার আভাস, যেন কেউ তার সবচেয়ে গোপন জায়গাটায় আঙুল দিয়েছে। টুকুন বাইক থেকে নামল। সে আব্বাসের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। গায়ে লাগছিল আব্বাসের গায়ের সেই মিহি ধুলোর গন্ধ, আর পুরনো গামছার ঘাম-মাখা গন্ধ। "কিছু সমস্যা হয়েছে নাকি চাচা? আপনার চেহারা দেখে তো..." আব্বাস তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে বলল, "না না সাহেব, সব ঠিক আছে।" কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের টান আর চোখের অস্থিরতা সম্পূর্ণ বিপরীত ইতিহাস বলছিল। তার গলার শিরাগুলো ফুলে উঠছিল, যেন কথা গিলতে গিলতে কষ্ট হচ্ছে। টুকুন পরিস্থিতি আঁচ করতে পারল। সে আব্বাসের হাতের বাক্স দু’টোর দিকে ইঙ্গিত করল। "ওগুলো কি ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন?" আব্বাস লজ্জায় মুখ নিচু করল, যেন মাটিতে মুখ গুঁজে দিতে চায়। "হ্যাঁ সাহেব... আপা নিলেন না। বললেন...আসলে আপা আমার ওপর রেগে গেছেন.." "কিন্তু সত্যি কথা বলুন তো চাচা," টুকুন এবার সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল, "মা কি আপনাকে কিছু বলেছেন?" আব্বাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "সাহেব... আপনার আম্মু... তিনি একজন বড় মানুষ, শিক্ষিত মহিলা। আমরা গরীব, সাধারণ মানুষ। ওই কথায় কথায় 'শরিয়ত' এর আয়াত নিয়ে বলছিলাম... তখন...।" তার কথার আড়ালে বেজে উঠছিল আত্মসম্মানবোধের গভীর এক আঘাত, যেন কেউ তার ধর্ম, তার বিশ্বাসকে অপমান করেছে। টুকুন আব্বাসের দিকে আরও একবার তাকাল। সেই লজ্জা ও অপমানে ভরা চোখ দুটি তার নিজের বুকেও একটু ব্যথা দিল। সে জানত তার মা একজন দয়ালু, মমতাময়ী মহিলা, কিন্তু রাগ হলে তিনি কতটা তীক্ষ্ণ ও কঠোর হতে পারেন, সেটাও তার জানা। আব্বাস নিশ্চয়ই শরিয়ত নিয়ে কোনও আলোচনায় তাঁর রুচি বা নীতির সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। "চাচা, আপনি চিন্তা করবেন না," টুকুন নরম সুরে বলল, "মা রাগ করলেও তাঁর রাগ বেশিক্ষণ থাকে না।" আব্বাস মাথা নেড়ে বলল, "ইনশাল্লাহ, সাহেব।" কিন্তু তার কণ্ঠস্বর এখনও অনিশ্চয়তায় ভরা, যেন সে নিজের কথাটাই বিশ্বাস করতে পারছে না। টুকুন বাইকে চড়ে বসল। "আপনি এখন যান। আর এই বাক্সগুলো নিয়ে যান। বেগম সাহেবাকে বলবেন আমরা খুব খুশি হয়েছি উপহার পেয়ে।" আব্বাস আবারও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। "জি, সাহেব।" টুকুন বাইক চালু করে দিল, কিন্তু তার মনটা অত্যন্ত ভারী হয়ে রইল। সে আব্বাসের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল, যে ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তার কাঁধে এখনও বোঝা হয়ে চেপে আছে সেই অপমান ও হতাশা। সে ভাবল, তার মা সত্যিই খুব দয়ালু। নিশ্চয়ই আব্বাস এমন কিছু বলে বসেছে যা তাঁর ধর্ম বা নীতিবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। *** বাড়ি ফিরে বসার ঘরের সেই চিরচেনা চায়ের টেবিলে এখন মিসেস সেন আর টুকুন। টেবিলের উপর স্টিলের কেটলি থেকে উঠে আসা ভাপের সূক্ষ্ম রেখাগুলোই যেন একমাত্র নড়াচড়া, যেন নিঃশ্বাস নেওয়া কোনো প্রাণী। দুপুরের রোদ জানালা দিয়ে এসে টেবিলের পলিশ করা কাঠের উপর পড়েছে, ধুলোর কণাগুলো সোনালি সুতোয় নাচছে। কিন্তু সেই নাচে যেন কোনো প্রাণ নেই, কোনো উল্লাস নেই। দুজনের মধ্যেই একটা গভীর, অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা যেন মন্থর হয়ে পড়ে আছে, ঘরের বাতাসটাকে ভারী করে তুলেছে। টুকুন চায়ের কাপের প্রান্তে আঙুল বুলোতে বুলোতে শেষ পর্যন্ত নিজেই নীরবতা ভাঙল। "মা," বলেই সে যেন আটকে গেল, তারপর আবার শুরু করল, "আব্বাসকে দেখলাম খিদিরপুরের গলি দিয়ে খুব বিষন্ন মুখ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেউ ওর সমস্ত আশা-ভরসা, সমস্ত স্বপ্ন হরণ করে নিয়ে গেছে। কি হয়েছে গো মা? তোমার সাথে কি কিছু কথা হয়েছিল?" মিসেস সেন যেন অপেক্ষাই করছিলেন এই প্রশ্নের। তাঁর মুখমণ্ডলে একধরনের জ্বলন্ত ক্ষোভ ফুটে উঠল, যেন আগুনের লেলিহান শিখা। "আর বলিস না বাবা," তিনি বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপছে, "ওই আব্বাসের কথা শুনে আমার তো প্রচন্ড মাথা গরম হয়ে গেছে। কি অদ্ভুত সব যুক্তি দিচ্ছিল জানিস?" তিনি একটু থামলেন, যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য, কিন্তু সেই শ্বাসও যেন রাগে কাঁপছিল। "শোন বাবা, কি বলে জানিস—ওই ষাট বছরের বুড়ো মানুষটা... বলছে সে 'বালেগা' মেয়ে খুঁজছে বিয়ে করার জন্য! মানে সেই আট-নয় বছরের মেয়ে, যে এখনও কলেজের ব্যাগ ঠিকমতো গুছিয়ে নিতে শেখেনি, যে এখনও খেলনা পুতুল নিয়ে খেলে, যে এখনও রূপকথার রাজপুত্রের স্বপ্ন দেখে!" মিসেস সেন চায়ের কাপটা একটু জোরে টেবিলে রাখলেন, চায়ের ফোঁটা ছিটকে এসে পড়ল টেবিলের উপর, যেন তাঁর রাগেরই প্রতীক। "আর যখন জিজ্ঞেস করলাম, এত বড় বয়সে এত ছোট মেয়েকে বিয়ে করার যৌক্তিকতা কি, তখন ও কি বলছে জানিস? বলছে—'ওদের মধ্যে নাকি বালেগা হলেই বিয়ে করা যায়!' মানে মাসিক শুরু হলেই একটা মেয়ে বিয়ের জন্য, শারীরিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত!" তিনি একটু হাপ ছেড়ে বসে পড়লেন, যেন এই কথাগুলো বলতেই তাঁর শক্তি শেষ হয়ে গেছে। "কি বলবো টুকুন... এগুলো শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা না। এটা গভীর একটা সামাজিক ব্যাধি। 'শিক্ষার অভাব আর ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি' ওদের মধ্যে।" টুকুন এবার নরম, সমবেদনাপূর্ণ সুরে বলল, "কিন্তু মা, আব্বাস তো শিক্ষিত মানুষ না। ওর তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই হয়নি। ওকে একা দোষ দিলে..." "তা ঠিক," মিসেস সেন বাধা দিলেন, "কিন্তু সমস্যাটা শুধু আব্বাসের একার না। সমস্যাটা ব্যবস্থার। যখন ধর্মের নামে, সংস্কৃতির নামে এইসব কুপ্রথাকে সমর্থন করা হয়, তখনই তো এই অবস্থা হয়। একটা সমাজ যখন মেয়েদের শুধু প্রজননের যন্ত্র হিসেবে দেখে, যখন একটা মেয়ের শৈশব, তার শিক্ষা, তার স্বপ্ন—কিছুরই মূল্য থাকে না, শুধু তার শারীরিক পরিপক্বতাটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়... তখনই তো এইসব হয়।" টুকুন চিন্তিত হয়ে বলল, "তুমি ঠিক বলছ মা। কিন্তু আব্বাসের মতো মানুষদের বোঝানো কি সম্ভব? ওরা তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিক্ষায় বড় হয়েছে।" "সেটাই তো মর্মান্তিক," মিসেস সেন বললেন, তাঁর কণ্ঠে এখন রাগের বদলে এক গভীর বেদনা, "একটা মানুষ সারাজীবন ভাবে যে সে সঠিক পথেই আছে, কারণ তার চারপাশের সবাই তাকে সেটাই শিখিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা, সংবেদনশীলতা, মানবিকতা—এগুলো তো শুধু কলেজ-কলেজের বিষয় না। এগুলো জীবনবোধের বিষয়।" তিনি টুকুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দ্যুতি, "ভাবতে কি খুব খারাপ লাগে না, একটা নবম বছরের মেয়ে, যে হয়তো এখনও রূপকথার গল্প বিশ্বাস করে, যে এখনও মায়ের কোলেই ঘুমোতে চায়—সেই মেয়েটাকে একটা ষাট বছরের মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত মনে করা?" টুকুন মাথা নেড়ে বলল, "ভয়ঙ্কর লাগে মা। কিন্তু মা, একটা জিনিস—ওদের ধর্মে বলে যে মেয়ের রাজি থাকতে হবে।" মিসেস সেন বিরক্তির সাথে হাত নেড়ে বললেন, "ওই 'রাজি'র কথাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক! একটা আট-নয় বছরের মেয়ে 'রাজি' বুঝবে কি? তার 'সম্মতি'র অর্থ কি? একটা চকলেট, একটা নতুন জামা—এতেই তো একটা শিশুর 'হ্যা' কেনা যায়। এটা সম্মতি না, এটা শোষণ।" চায়ের কাপে শেষ চুমুকটি নিয়ে মিসেস সেন বললেন, "আমি রাগ করেছি বটে, কিন্তু আমার রাগ শুধু আব্বাসের উপর না। আমার রাগ সেই ব্যবস্থার উপর, যে ব্যবস্থা একটা মানুষকে এতটা অন্ধ করে দিতে পারে। আমার রাগ সেই সামাজিক কাঠামোর উপর, যে কাঠামোয় একজন নারী শুধুই একটা বস্তু, তার নিজের কোনো সত্তা নেই।" টুকুন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "তাহলে আমরা কি পারি না কিছু করতে? শুধু রাগ করেই কি থেমে থাকব?" মিসেস সেন গভীরভাবে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন, "একা আমরা খুব কমই করতে পারব। এটা তো গভীরভাবে প্রোথিত একটা সমস্যা। কিন্তু কথা বলতে পারি, সচেতনতা তৈরি করতে পারি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনাকে, আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করতে পারি।" বাইরে থেকে ভেসে আসছিল শিশুদের খেলার আওয়াজ, তাদের উচ্ছ্বল হাসি। মিসেস সেন জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, "শোন টুকুন, ওই শিশুদের কণ্ঠস্বর শুনছিস? প্রতিটি শিশুরই অধিকার আছে উদ্বেগহীন শৈশবের। প্রতিটি মেয়েরই অধিকার আছে স্বপ্ন দেখার, বড় হওয়ার, নিজের মতো করে জীবন গড়ার। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো ধর্ম, কোনো সংস্কৃতি, কোনো প্রথাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।" টুকুন এবার হালকা হাসল, "মা, তোমাকে আজ প্রথম দেখলাম এতো রাগে ফুটতে! এত বছর তোমাকে পড়াতে দেখেছি, কলেজে বিতর্ক করতে দেখেছি, কিন্তু কখনো এমন জ্বলে উঠতে দেখিনি।" মিসেস সেনও মৃদু হাসলেন, তাঁর চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট, "ঠিক ধরেছিস বাবা। ওই রকম কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা দেখে রাগ হবে না তো কী হবে? তবে..." তিনি একটু থেমে, গলাটা একটু নরম করে বললেন, "আব্বাসের ওপর রাগ করা ঠিক হয়নি। ও তো ভিক্টিম। ওকে তো শিক্ষাই দিয়েছে ভুল, ওর তো চারপাশের সমাজ, ওদের ধর্মীয় নেতারা—সবাই মিলেই ওকে শিখিয়েছে যে এটাই সঠিক পথ।" টুকুন এবার গম্ভীর হয়ে বলল, "মা, কিন্তু বাকি ধর্মেও তো ধর্মান্ধ আছে! নানা রকম কুপ্রথা, আছে গোঁড়ামি।" মিসেস সেন ধীরে সুস্থে উত্তর দিলেন, "সব ধর্মেই আছে বাবা, এটা মানতেই হবে। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখবি—বাকি ধর্মের মধ্যে শিক্ষার অভাব ততটা প্রকট নয়। শিক্ষা বাড়লে ধর্মের প্রভাব আপনা আপনিই কমে যায়! যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছেছে, সেখানে ধর্মের অন্ধকার দূর হয়েছে। যেখানে মানুষ যুক্তি দিয়ে ভাবতে শিখেছে, সেখানে অন্ধবিশ্বাসের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।" টুকুন চিন্তিত হয়ে বলল, "মানে তুমি বলতে চাইছো শিক্ষাই একমাত্র পথ?" "না বাবা, শিক্ষাই একমাত্র পথ না," মিসেস সেন বললেন, "কিন্তু সঠিক শিক্ষা, বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা—যা মানুষকে বাস্তবতা বুঝতে শেখায়। ধর্মীয় বইয়ের শিক্ষা আর বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। যেমন ধর 'আসমানী কিতাব' বলে সূর্য পৃথিবীর পরিক্রমা করে, কিন্তু বিজ্ঞান বলে পৃথিবী সূর্যের পরিক্রমা করে। এখানেই তো ফারাক —একদিকে আছে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া, অন্যদিকে আছে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে বোঝা।" তিনি আরও জোর দিয়ে বললেন, "বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী চিন্তা শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। আর যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তখনই সে অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। যখন কেউ জানে যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন সে বুঝতে পারে ধর্মীয় বইয়ের সেই নির্দিষ্ট কথাটা ভুল। তখনই তো সে অন্য বিষয়েও প্রশ্ন তুলতে শেখে—কেন একটা মেয়ের বালেগা হলেই বিয়ে করতে হবে, কেন একজন ষাট বছরের মানুষ একটা ন'বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে চায়?" টুকুন মুগ্ধ দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি যেন আজ একেবারে দার্শনিক হয়ে গেছ মা!" মিসেস সেন হাসলেন, "দার্শনিক হতে হয় না, এটাই তো বেসিক শিক্ষা, একটাও কথা কি ভুল বলেছি, বল।" বাইরে থেকে ভেসে আসছিল স্কু..লের শিশুদের কোলাহল। মিসেস সেন জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ওই দেখ, ওই শিশুরা যখন বিজ্ঞান শিখবে, যখন তারা জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ে বুঝবে পৃথিবী কীভাবে সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তারা কখনোই আব্বাসের মতো চিন্তা করবে না। ওরা বুঝবে যে একটা মেয়ের শৈশব কেড়ে নেওয়া কোনো ধর্মই সমর্থন করতে পারে না।" টুকুন মাথা নেড়ে বলল, "তাহলে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বেশি বেশি করে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো।" "হ্যাঁ বাবা," মিসেস সেন দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আর সেই শিক্ষায় যেন থাকে মানবতা, নৈতিকতা আর সহমর্মিতার পাঠ। কারণ শুধু বইয়ের বিদ্যা না, জীবনের বিদ্যাও তো জরুরি। আজ আব্বাসের মধ্যে যে অমানবিকতা দেখলাম, সেটার মূলে আছে অজ্ঞতা আর কুশিক্ষা। সেটা দূর করার একমাত্র উপায় হলো সঠিক শিক্ষা।" মিসেস সেন উঠে চলে গেলেও টুকুন আর উঠল না। বসার ঘরের সেই সোফাতেই বসে রইল সে, মায়ের ফেলে যাওয়া চায়ের কাপটা সামনে নিয়ে। ঘরে এখন শুধু টিকটিক করার শব্দ আর দেয়ালঘড়ির একঘেয়ে টিকটিক—যেন সময়ও যেন থমকে দাঁড়িয়েছে টুকুনের ভাবনার সাথে তাল মেলাতে। মায়ের কথাগুলো যেন শব্দ হয়ে না থেকে হয়ে গেছে এক জীবন্ত সত্তা, যে টুকুনের মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে—'শিক্ষার অভাব আর ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি ওদের মধ্যে'। টুকুন জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তায় হাঁটছে মানুষ—কেউ কলেজ ড্রেস পরে, কেউ অফিসের পোশাকে, কেউ আবার আব্বাসের মতো লুঙ্গিতেই। সবাই একই শহরে বাস করে, একই বাতাসে শ্বাস নেয়, কিন্তু কী অদ্ভুত—মানুষের চিন্তার জগতে এত তফাত! টুকুনের মনে পড়ল 'ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালাম আর আজম কাসাব'-এর উদাহরণটা। দুজনই একই ধর্মের, কিন্তু একজন হয়ে গেলেন 'মিসাইল ম্যান', দেশের রাষ্ট্রপতি; আর অন্যজন হয়ে গেলেন সন্ত্রাসী। দুজনেই একই ধর্মের, কিন্তু দুজনেই আচরণ, চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ বিপরীত।" তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? টুকুন বুঝতে পারল—মায়ের কথাই ঠিক। পার্থক্যটা বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষায়। একজন পেলেন সঠিক শিক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান; আরেকজন পেলেন ভুল শিক্ষা, ধর্মীয় উগ্রবাদ। শিক্ষাই মানুষকে আলোর পথ দেখায়, আর কুশিক্ষা ঠেলে দেয় অন্ধকারের দিকে। আব্বাসের মুখটা টুকুনের চোখের সামনে ভেসে উঠল—সেই রাগে-ভরা নয়, বরং হতাশায় ভরা মুখ। আব্বাসও কি নিজের একাকিত্ব, নিজের অপরিপূর্ণ কামনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে? নাকি সে ভাবে যে এই পথই একমাত্র সুখের পথ? মায়ের কথা আবারও মনে পড়ল—"ওকে শিক্ষাই দিয়েছে ভুল।" টুকুন এবার বুঝতে পারল কথাটির গভীরতা। আব্বাসকে শেখানো হয়েছে যে একটা শিশু মেয়েকে বিয়ে করাই সমাধান তার একাকিত্বের। তাকে কেউ শেখায়নি যে বয়সের পার্থক্য, মানসিক সঙ্গতি, একটা মেয়ের শৈশব—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সেই কথাটাই আবার মনে হচ্ছে—'শিক্ষার অভাব আর ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি ওদের মধ্যে'। টুকুন এবার কথাটির সম্পূর্ণ অর্থ বুঝতে পারল। এটা শুধু আব্বাসের ব্যক্তিগত সমস্যা না, এটা ব্যবস্থাগত সমস্যা। একটা পুরো সম্প্রদায়ের সমস্যা, যেখানে শিক্ষার অভাব আর ধর্মীয় গোঁড়ামি মিলে তৈরি করেছে এক বিকৃত মানসিকতা। টুকুনের বাড়ির পড়ার টেবিলে বই-খাতার অগোছালো স্তূপ। গত এক সপ্তাহ ধরে পড়াশুনোতে একদমই মন বসছে না তার। মনটা রয়ে গেছে খিদিরপুরের সেই হাভেলিতে, জাঁদরেল মাগি, বেগম শাব্বা হাকিমের ঘামে ভেজা গায়ের ঝাঁঝালো গন্ধ, একধরনের ক্ষমতার গন্ধ, আর আমিশার নরম-কোমল শরীরের স্পর্শে। একই বিছানায় মহমেডান মা-মেয়েকে নিয়ে তার পাগলের মতো চোদাচুদির দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছে। বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেই মনে পড়ে আমিশার সেই চোখ—ভালোবাসা আর কামনায় ভরা, যেন তার জন্য পাগল। আর বেগম সাহেবাকে তো সে পশুর মতো চুদেছে, যেন আদিম যুগের কোনো রাক্ষস জেগে উঠেছিল তার ভেতরে। আমিশাকে চোদার সময় যে সুখ পেত, সেটা ছিল আলাদা—গভীর, শান্ত, যেন ধ্যানের মতো। কিন্তু বেগম সাহেবাকে চুদে যে আনন্দ পেয়েছে, সেটা ছিল হিংস্র, রুক্ষ, যেন শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা পশুটাকে জাগিয়ে তুলেছে। হঠাৎই তার মায়ের কথা মনে পড়ে—"...শিক্ষার অভাব আর ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি ওদের মধ্যে" মায়ের কথায় টুকুনের বুকটা চেপে আসে। আমিনা খালার বাচ্চা হওয়ার সময় হয়ে গেছে। যে কোনদিন খবর আসবে। মনে মনে সে হাসে। আমিনা খালার পেটের বাচ্চাটা তো তারই। আর এতে সবচেয়ে খুশি হবে আমিনা খালা আর ইসমাইল চাচা। ইসমাইল চাচা মুখে কিছু না বললেও নিশ্চয়ই জানে, টুকুন বাবুর বীর্যেই তার বৌ গর্ভবতী হয়েছে। আর সে তো খুশিই—ইসমাইল চাচার বন্ধ্যাত্বের জ্বালা, সমাজের অপমান—সব তো মিটবে এইভাবে। বাবা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে তার। কলেজের ভীষণ ব্যস্ত সময়। ক্লাস শেষ করে টুকুন লাইব্রেরির দিকে হাঁটছে। এমন সময় পকেটে মোবাইল বেজে উঠল—"ইসমাইল চাচা..." নামটা দেখেই টুকুনের বুক ধক করে উঠল। ফোন তুলতেই ওপার থেকে ইসমাইল চাচার আওয়াজ ভেসে এল উৎসবে কাঁপতে কাঁপতে—"বাবু, আমি বাবা হয়েছি, আমার ছেলে হয়েছে বাবু!" টুকুন আনন্দে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কথা বেরুচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর জড়তা কাটিয়ে বলল, "ওয়াও... কংগ্রাচুলেশন্স চাচা! আ...আর আমিনা খালা কেমন আছে?" ইসমাইল চাচার গলায় এখনও উচ্ছ্বাস, "আমিনা ঠিক আছে বাবু! আলহামদুলিল্লাহ, সব ভালো হয়েছে। বাচ্চাটা ভীষণ শক্তিশালী, জোরে জোরে চেঁচাচ্ছে!" টুকুনের চোখে জল চলে এল। কলেজের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে যেন দেখতে পেল—সেই দূরের গ্রাম, আমিনা খালার কুঁড়েঘর, হারিকেনের আলোয় ঝলমলে ঘর, যেখানে তার সন্তান এখন কাঁদছে। ইসমাইল চাচার বাবা হওয়ার আনন্দে তার নিজের বুকটা ভরে গেল অদ্ভুত এক গর্বে। সে-ই তো ইসমাইল চাচাকে এই সুখ দিতে পেরেছে। ইসমাইল চাচা ফোনেই বলে চলল, "বাবু, তোমার আম্মারে খবর দিয়ো! ওনাকে বল, আমাদের ঘরে আল্লাহর রহমত নেমেছে!" টুকুন আবেগ চেপে বলল, "দেব চাচা, নিশ্চয়ই বলব। আর... আমিনা খালাকে বল, খুব শিগগিরই আমি আসছি।" ফোন কাটার পর টুকুন দাঁড়িয়ে রইল কলেজের মাঠে। মনে হচ্ছিল, শহরের এই ময়লা আকাশের ওপারে যেন কোন গ্রাম 'লালপট্টি', তারই এক টুকরো এখন বেঁচে আছে—সেই শিশু, যে তার রক্ত, তারই উত্তরাধিকার বহন করবে। আমিনা খালার কথা মনে পড়ল—তার সেই ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ, মাটির ঘরের গরম উষ্ণতা, আর সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা টুকুনের 'বীর্যের রস'-এর কথা। সবকিছুই যেন এখনও টাটকা। টুকুনের মনে হল, শিক্ষা আর ধর্মের প্রভাবের কথা তার মা যেটা বলেছিল। কিন্তু এই আমিনা খালা, ইসমাইল চাচা, আমিশা, বেগম সাহেবা—মহমেডান হলেও এরা সবাই আলাদা, এদের মধ্যে ধর্মন্ধতা নেই, নেই কুসংস্কার। বিকেলে বাড়ি ফিরে টুকুন দেখল তার মা কলেজ থেকে ফিরেছেন। খবরটা শুনেই মিসেস সেন আনন্দে চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে বললেন - "আহা! কি ভালো খবরটা!" মিসেস সেনের মুখে খুশির ঝিলিক, "ইসমাইল তো এবার নিশ্চয়ই সাত আসমানে বাস করবে! গতবার যখন এসেছিল, কতই না খুশি হয়ে বলছিল—'মেমসাহেব, টুকুন বাবু আমাদের নতুন ঘর করিয়ে দিয়েছেন... ভ্যানরিকশাও কিনে দিয়েছেন... আর... আল্লাহর দোয়ায়, আমার বেগম পোয়াতি হয়েছে!'" মিসেস সেন টুকুনের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "তুই একবার ওদের দেখে আসতে পারিস না? গরিব ইসমাইল আর আমিনা বেগমকে তুই যেভাবে সাহায্য করছিস, সেটা দেখে আমার বুকটা ভরে যায়।" টুকুন একটু হেসে বলল, "মা, সেমিস্টারের এক্সাম তো সামনেই। তবে পরের সপ্তাহে নিশ্চয়ই লালপট্টি একবার উকি দিয়েই আসব!" মিসেস সেন চশমাটা খুলে আবেগী গলায় বললেন, "ওই ইসমাইল ভাইয়ের কথা শুনলে মনটা কেঁদে ওঠে! বলতো—'পনেরো বছর আপা... পনেরো বছর আমিনার পেট শূন্য থাকল। গ্রামের লোকেরা আমারে 'বন্ধ্যা ইসমাইল' ডাকত।'" টুকুন নিচু মুখে মুচকি হাসল, "ওরা খুবই ভাল মানুষ মা। ইসমাইল চাচা তো আমাকে নিজের ছেলের চেয়েও বেশি ভালবাসে।" "তা নাহলে কী!" মিসেস সেন উৎসাহিত হয়ে বললেন, "তুই যখন ওদের নতুন ঘর করিয়ে দিলি, ভ্যানরিকশা কিনে দিলি, ওরা তো জীবনে প্রথমবারের মতো সত্যিকারের সুখ পেল! আর এখন তো সন্তানও হয়েছে... ভগবানের কৃপা বটে!" টুকুন বইগুলো গুছিয়ে বলল, "ঠিক আছে মা, এক্সাম শেষ হলেই চলে যাব। ওদের নতুন বাচ্চাটাকে দেখব।" মিসেস সেন খুশিতে ঠোঁটে হাসি লুকোতে পারছিলেন না, "আহা! ছোট্ট শিশুটাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে! ইসমাইল তো বলেছিল—'...আপনার পায়ের ধুলোয় আমাদের সংসার ধন্য হবে'" টুকুন জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, "তা নিশ্চয়ই যাব মা। ওরা তো আমাদেরই পরিবারের মতো হয়ে গেছে।" মিসেস সেন স্নেহে টুকুনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন, "তুই ভালোই করিস বাবা। গরিব মানুষ, ওদের একটু সাহায্য করতে পারলেই জীবনটা সার্থক মনে হয়।" -চলবে
Parent