ছায়ার আড়ালে আগুন -Crime Thriller [Part-3: অন্ধকারের অধিশ্বর] - অধ্যায় ৪৬
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৩: অন্ধকারের অধীশ্বর)
ছেচল্লিশতম পরিচ্ছেদ: রানির প্রচার
বিকেল তিনটে। টালিগঞ্জের একটা ঘিঞ্জি এলাকা। রাস্তার দুই পাশে দোকানপাট, রিকশা, ভ্যানগাড়ি। মাঝখানে একটা ছোট মাঠের মতো জায়গায় লাল-সাদা কাপড়ের ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। তার নিচে একটা কাঠের চেয়ার আর মাইকের স্ট্যান্ড। চারপাশে হাতে ঢোল চিহ্ন আঁকা পোস্টার লাগানো। “গণ একতা পার্টি — রানি সামন্ত” লেখা।
রানি সামন্ত দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে সাদা-লাল ছাপা শাড়ি, চুল খোঁপায় বাঁধা। মুখে হালকা পাউডার আর লিপস্টিক। চোখে কাজল। বয়স ছাব্বিশ হবে, কিন্তু চেহারায় এখনো একটা লাজুক ভাব। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিন্দুবালা দেবী — কালো বেনারসি শাড়ি, গলায় সোনার হার, হাতে চারটে করে সোনার বালা। তার মোটা শরীর আর গভীর গলার আওয়াজেই চারপাশটা ভরে যাচ্ছিল।
অংশুমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। চোখে সানগ্লাস। হাতে মোবাইল। সে চুপচাপ দেখছিল। তার পাশে দুজন যুবক — রুবিনা গ্যাংয়ের লোক। তারা জানে যে অংশুমান আসলে কার জন্য কাজ করছে। তারা শুধু অংশুমানের নির্দেশের অপেক্ষায়।”
“ভাই-বোনেরা!”
রানির গলা মাইকে উঠল। একটু কাঁপা কাঁপা, কিন্তু চেষ্টা করে জোরে বলছে।
“আমি আপনাদের মেয়ে। আপনাদের বোন। আমার বাবা-মা নেই। আমি এই এলাকায় বড় হয়েছি। আপনারা জানেন, আমি কীভাবে বড় হয়েছি। বিন্দুমাসীর কাছে। আজ যদি আপনারা আমাকে ভোট দেন, তাহলে আমি আপনাদের কথা বলব। আপনাদের ছেলেমেয়েদের জন্য কাজ করব।”
কয়েকজন হাততালি দিল। বেশিরভাগই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। রানি একটু থেমে আবার বলল,
“আমি জানি, অনেকে বলবে — এত ছোট মেয়ে কী করবে? কিন্তু আমি বলছি, আমি লড়ব। আপনাদের জন্য লড়ব।”
বিন্দুবালা পাশ থেকে মাথা নেড়ে বললেন, “বল রে, বল। জোরে বল।”
অংশুমান একজন লোককে ইশারা করল। সে সাথে সাথে দুজন যুবক এগিয়ে এসে রানির চেয়ারের পাশে দাঁড়াল। তারা হাতে ছোট ছোট ঢোল নিয়ে বাজাতে শুরু করল — ঢোল ঢোল ঢোল। সাথে সাথে আরও কয়েকজন যুবক “রানি সামন্ত জিন্দাবাদ!” স্লোগান দিতে লাগল।
ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে লাগল।
অংশুমান পাশে এসে রানির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, “আরেকটু জোরে বলো। চোখে চোখ রেখে কথা বলো। ভয় পেও না। আমি আছি।”
রানি তার দিকে তাকাল। তার চোখে একটা নির্ভরতা ছিল। সে মাথা নেড়ে আবার মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আমি জানি, অনেকে টাকা দিয়ে ভোট কিনতে চায়। কিন্তু আমি টাকা দিয়ে ভোট চাই না। আমি আপনাদের বিশ্বাস চাই। আপনারা যদি আমাকে একবার সুযোগ দেন, আমি দেখাব — একটা মেয়েও কী করতে পারে।”
বিন্দুবালা হাততালি দিয়ে উঠলেন। তার পাশে দাঁড়ানো ব্রজদাসীও হাসিমুখে হাততালি দিলেন।
অংশুমান একটু দূরে সরে গিয়ে মোবাইলে কথা বলতে লাগল।
“হ্যাঁ, ভিড় বাড়ছে। আরও দশটা লোক পাঠাও। স্লোগান দিতে হবে। …না, রানি ঠিক আছে। ভয় পাচ্ছে একটু, কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছে।”
ফোন রেখে সে আবার রানির দিকে তাকাল।
রানি এখন একটু বেশি জোরে কথা বলছে। তার গলায় এখনো কাঁপুনি আছে, কিন্তু চোখে একটা নতুন আগুন জ্বলছে।
“আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি — এই এলাকায় একটা কলেজের জন্য লড়ব। মেয়েদের জন্য নিরাপদ রাস্তা চাইব। আর যারা এলাকায় অশান্তি করে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলব।”
বিন্দুবালা মুচকি হেসে অংশুমানকে বললেন, “দেখছিস? আমার মেয়ে কথা বলতে শিখে গেছে।”
অংশুমান মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ মাসী। ভালোই বলছে।”
কিন্তু তার চোখে অন্য কথা ছিল।
সে জানত — রানি যতই ভালো বলুক, আসল খেলা অন্য জায়গায় চলছে।
রুবিনার গ্যাংয়ের লোকেরা আজ থেকে এই এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। তারা রানির নামে স্লোগান দিচ্ছে, কিন্তু আসলে তারা অন্য কারও জন্য কাজ করছে।
অংশুমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
রানি এখনো মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার গলা আরেকটু জোরে উঠেছে।
“আমি আপনাদের সাথে আছি। আপনারা আমার সাথে থাকবেন?”
“থাকব!” — কয়েকজন চিৎকার করে উঠল।
ঢোলের শব্দ আবার বাজতে লাগল।
ঢোল ঢোল ঢোল…
অংশুমান একটু হেসে ফেলল। তারপর আবার মোবাইল তুলে আরেকটা নম্বরে কল করল।
“হ্যাঁ… রানি ঠিক আছে। কিন্তু ভোটের দিন যা বলেছি, সেটা মনে রেখো। কোনো ভুল হবে না।”
সে ফোন রেখে আবার রানির দিকে তাকাল।
রানি এখন হাসছে। তার মুখে একটা নতুন উজ্জ্বলতা।
অংশুমান ভাবল — এই মেয়েটা জানে না, তার পেছনে আসলে কী চলছে।
কিন্তু সে চুপ করে রইল।
কারণ সে জানত — এখনো সময় আসেনি সব কথা বলার।