ছোট ছোট গল্পঃ [নষ্টামি নয় অল্প] "সোহিনীর সংসার" সমাপ্ত - অধ্যায় ৮
অম্লানদার কাছে ফটোগ্রাফি শেখা সোহিনীর রোজকার জীবনে মুক্তির স্বাদ নিয়ে এলো। অম্লান একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার, এবং ও সোহিনীকে খুব ভালো ভাবে শেখাচ্ছে। সোহিনী আগে শুধু মোবাইলে অটো মোডে ছবি তুলতো, আর মোবাইলে নানা ফিল্টার ব্যবহার করতো। অম্লান সোহিনীরকে ফটোগ্রাফির বিভিন্ন দিক শেখাচ্ছে, এবং তাকে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ছবি তোলার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।
সারাদিন শ্বশুর বাড়ির ঘরকন্নার কাজ আর খরচের হিসাব সোহিনীকে চাপের মধ্যে রাখত। কিন্তু সোহিনী এখন প্রতিদিন ফটোগ্রাফির জন্য সময় বের করার চেষ্টা করে। ফটোগ্রাফি তাকে তার চাপ এবং উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করছে।
অম্লান ওকে বলেছে বাড়ির আসবাবপত্র, ঠাকুর ঘর, ছাদের দৃশ্য এসবের ছবি তুলতে। কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ভালো লাগবে সেটা বুঝে ভালো করে ফ্রেম করতে। অম্লানের মতে চেনা জিনিসকে ভালো করে উপস্থাপন করতে পারা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন মোবাইলের ক্যামেরায় খুব ভালো ছবি ওঠে, ফলে কিসের ছবি কিভাবে তুলবো সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন সোহিনী বাড়ির ঠাকুর ঘরের কয়েকটি ছবি তুলল যা ওর নিজের খুব ভালো লেগেছিল।
সোহিনী ছবিগুলো অম্লানদার সাথে শেয়ার করল, এবং অম্লানও ওর ছবির খুব প্রশংসা করল।
অম্লানদা বললো ছবিগুলো বাবাকে দেখাতে। শ্বশুরও প্রশংসা করে বললেন যে সোহিনী নতুন ছবি তোলা শিখতে শুরু করে এতো ভালো পেরেছে সেটা অবিশ্বাস্য।
সোহিনী এই প্রশংসা পেয়ে খুব খুশি হল। শ্বশুর বললেন এবার মানুষের ছবি তোলা শুরু করতে। ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। সোহিনীর খুব ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল শ্বশুর বাড়িতে ওর গ্রহণযোগ্যতা একটু হলেও বাড়লো।
শ্বশুরের সাথে কথা বলতে বলতেই অম্লানদার ফোন। ফোন করে বলল এক্ষুনি মেল চেক কর, ভালো খবর আছে। একটা ওয়েবসাইট ডিজাইনের জন্য ওরা বিড করেছিল, টেমপ্লেট জমা দিয়েছিল। অবশেষে ওদের দিকে থেকে হ্যাঁ হয়েছে, সঙ্গে অগ্রীম টাকা। সোহিনীর বিশ্বাস হচ্ছে না এতো টাকার কাজ ওরা পেয়েছে। আনন্দে ওর নাচতে ইচ্ছে করছিল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল যে ও পারে। ওয়েবসাইটের কাজ যদিও ও জানে না, কিন্তু মেল করে আবেদন করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, এই সবই তো ও করেছে।
অম্লান বাড়ি ফিরে সোজা সোহিনীর ঘরে চলে গেল। সোহিনী রেডি হয়েই ছিল। আজকে সোহিনী খুবই খুশি, আর ওকে দেখতেও খুব সুন্দর লাগছে। অম্লান গিয়ে সোহিনী দুকাধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, "কিরে খুশি তো?"
সোহিনী: হ্যাঁ, আমি খুব খুশি। অনেকদিনের পরিশ্রম আজকে সফল হল।
অম্লান: এটা তো শুধু শুরু। তুই আরও অনেক ভালো করবি।
সোহিনী বলল, "ধন্যবাদ! তুমি না থাকলে হয়তো এই দিনটা আসত না। তুমিই আমাকে ফটোগ্রাফি শিখিয়েছ। আর রোজ আমাকে দিয়ে বিডিং করিয়েছ, আমি তো হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।"
অম্লান বলল, "আমি তো শুধু তোর প্রতিভাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছি। ঠিকমতো চেষ্টা করলে সাফল্য আসবেই।"
সোহিনী বলল, "তোমার ছাড়া আমি কিছুই পারতাম না।"
অম্লান বলল, "আমি তোর জন্য সবসময় থাকব।"
এই বলে অম্লান সোহিনীর কপালে একটা চুমু খেল।
সোহিনী কিছু বলার আগেই অম্লানের ঠোঁট সোহিনীর ঠোঁটে এসে পড়লো। এই চুমু আগ্রাসী পুরুষের চুমু নয়, বরং ভীতু প্রেমিকের প্রথম চুমু।
"ধ্যাৎ, খালি উল্টোপাল্টা । আমি তোমার ভাইয়ের বউ" সোহিনী অম্লানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল।
"জানি তো, তাই তো তোকে আরও বেশি ভালো লাগে।" অম্লান বলল।
"আমার ভালো লাগে না। তোমার ভাইয়ের স্ত্রী হয়ে আমি তোমার সাথে প্রেম করতে পারি না।" সোহিনী বলল।
"কিন্তু কেন? আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।" অম্লান বলল।
"কিসব বলছো তুমি, এটা ঠিক না।" সোহিনী বলল।
"কেন ঠিক না? আমরা দুজনেই মানুষ। ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম।" অম্লান বলল।
"হ্যাঁ, আমরা মানুষ। কিন্তু আমরা একই পরিবারের সদস্য।" সোহিনী বলল।
"তাতে কি হয়েছে? " অম্লান বলল।
"তুমি আমর দাদার মতো, আর আমি আমার বরকে ভালোবাসি।" সোহিনী বলল।
"দাদার মতো আমি কোনদিন ছিলাম না, আর বিয়ে হয়েছে বলে কি প্রেম করা যায় না?" অম্লান বলল।
"না, যায় না।" সোহিনী বলল।
"কে বলেছে?" অম্লান বলল।
"সমাজ বলেছে।" সোহিনী বলল।
"সমাজের কথা কে শোনে? আমরা তো আমাদের নিজের জীবন বাঁচাবো।" অম্লান বলল।
"না, আমি পারব না।" সোহিনী বলল।
"কেন পারবে না?" অম্লান বলল।
"আমি আমার বরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবোনা। আমার লজ্জা লাগবে।" সোহিনী বলল।
"লজ্জা কিসের? আমরা তো দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক।" অম্লান বলল।
"তাতে কি হয়েছে? আমি তোমার ভাইয়ের বউ।" সোহিনী বলল।
"আচ্ছা, তাহলে আমি ভাইয়ের সাথে কথা বলব।" অম্লান বলল।
"না, প্লিজ না।" সোহিনী বলল।
"কেন না? আমি তো তাকে বলে দেব যে আমি তোমাকে ভালোবাসি।" অম্লান বলল।
"না, তুমি এভাবে করতে পারো না।" সোহিনী বলল।
"কেন পারব না? আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। আমরা একসাথে কত ভালো সময় কাটিয়েছি , এখন আমি পিছোতে পারবোনা" অম্লান বলল।
"আমি তোমার কৃতজ্ঞ, তুমি আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছ। কিন্তু আমরা এইভাবে এগোতে পারব না।" সোহিনী বলল।
"কেন পারবে না? আমরা দুজনেই দুজনকে চাই।" অম্লান বলল।
"না, সেটা হয় না। আমি তোমার ভাইয়ের বউ।" সোহিনী বলল।
"কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি।" অম্লান বলল।
"কিন্তু আমি তোমার সাথে প্রেম করতে পারব না। তুমি চলে যাও অম্লানদা, কেউ এসব কথা শুনলে কেলেংকারী হবে। তোমার আমার জন্য কোনো সমস্যা হোক সেটা আমি চাইনা।" সোহিনী বলল।
আম্লান বললো, "একবারের জন্য কি আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরবো?"
"একদম না, একবারের জন্যও না।"
অম্লান সোহিনীর কাছ থেকে দূরে সরে গেল। মুখ নিচু করে সে তার ঘরে চলে গেল।
সোহিনী নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং কাঁদতে লাগল। ওর মনে হলো ওর অনেক কিছুই হারিয়ে গেল। সোহিনী বুঝতে পারছে না যে সে অম্লানকে ভালোবাসে কিনা। কিন্তু সে তার ভাইয়ের বউ। সে এই সম্পর্ককে এগোতে দিতে পারে না।
সোহিনী আশা করে যে সে অম্লানকে ভুলে যেতে পারবে। কিন্তু সে জানে যে এটা সহজ হবে না। আজকের ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এর থেকে তো ফটোগ্রাফি না শিখতে শুরু করলে ভালো হতো।
সোহিনী নিজেকে জিজ্ঞাসা করলো, সে কি জানতো না যে অম্লানদার ওর প্রতি আগ্রহ আছে। অম্লানদা ভাগ্গিস কোনো অসভ্যতা করেনি। ঠোঁট যে কেন এখনো জ্বালা জ্বালা কে জানে। লোকটা এমনিতে খুব খারাপ না। কেন যে এতো কান্না পাচ্ছে সেটা সোহিনী নিজেও জানে না।