ছোটগল্প সমগ্র - অতৃপ্ত ( সমাপ্ত ) - অধ্যায় ৩২
অন্ধকার সিরিজ
অতৃপ্ত ১
( গল্পে তন্ত্র মন্ত্রের বর্ননা রয়েছে , কোনোরকম কুসংস্কারকে প্রশয় দেওয়া হয়নি , গল্প পড়ার অনুভূতি নিয়েই গল্পটা পড়ার অনুরোধ রইলো )
বানান ভুলের জন্য আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।
বুড়ো মাঝিটাকে তাড়া লাগানো বৃথা জেনেই নিশীথ বহুক্ষণ আগে চুপ করেছিল৷ মাঝির বকাটাই রোগ—এমন কি ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল ঐটেই বুড়োর পেশা৷ ওর বউ কতদিন মরেছে, জামাই কেন মেয়েকে নেয় না—ছোট জামাইটা জুয়াড়ি, ছেলেটা নেশা করতে পেলে আর কিছু চায় না—খুব ছেলেবয়সে একবার ও কলকাতা গিয়েছিল কিন্তু অত হট্টগোলে মাথা ঠিক থাকে না বলে পালিয়ে আসতে পথ পায় নি—আবার একবার যাবে মা কালীকে দর্শন করতে, ইত্যাদি তথ্য পরিবেশন করবার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র দম নেবার প্রয়োজনে যখন থামে তখনি শুধু দাঁড় বাইবার কথা মনে পড়ে ওর৷ সুতরাং শহরে যাবার বাস যে পাবে না তা নিশীথ আগেই বুঝেছিল, কিন্তু এমন অবস্থায় যে পড়বে তা কল্পনা করে নি৷ বাস তো নেই-ই, আশেপাশে কোথাও মানববসতির চিহ্নও যেন চোখে পড়ে না৷
নৌকা এসে যেখানটায় ভেড়ে সেখানে বাঁশের মাচা মতো একটা আছে, জাহাজঘাটা হলে অনায়াসে জেটি বলা যেত৷ সেই মাচাতে নেমে অসহায় ভাবে নিশীথ একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখল৷ নিচে কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে৷
ওপারে হরিদেবপুর গ্রাম, বেশ সম্পন্ন গ্রাম তা সে জানে, বহু লোকের বাস, অনেক পাকা বাড়ি ইকলেজ ডাকঘর আছে কিন্তু এখান থেকে তার কিছুই দেখা যায় না৷ ঘাট থেকে উঠে যে রাস্তাটা গ্রামের দিকে গিয়েছে তার সাদা বালির আভাস নিবিড় বনের অন্ধকারে মিশে গেছে ।
ওপারেই যদি এই হয় তো, এপারের অবস্থা সহজেই অনুমেয়৷ এপারে যেদিন সে এসেছিল সেদিন দিনের বেলাও কোনো গ্রাম ওর চোখে পড়ে নি৷ বাসটা এসে একেবারে এই ঘাটের ধারে দাঁড়ায়, যাত্রীরা সবাই হরিদেবপুর চলে যায়৷ সেদিন অন্তত এমন কেউ ছিল না যে এপারে কোথাও যাবে৷ আসার সময়ও দুদিকে আম গাছের ঘন বন কাটিয়ে এসেছিল—বেশ মনে আছে৷ হয়তো ছিল কোথাও ঘরবাড়ি, কিন্তু তা ওর চোখে পড়ে নি ৷
পারাপারের জন্য একটা খেয়া নৌকো আছে, চওড়া ভেলার মতো প্রকাণ্ড বস্তু—কিন্তু শেষ বাস চলে যাবার পর আর ওপার থেকে কেউ আসবার সম্ভাবনা নেই জেনে সে ইজারাদারও বহুক্ষণ বাড়ি চলে গেছে নৌকোটা ওপারে বেঁধে রেখে৷
‘বাবু ভাড়াটা?’—তাড়া লাগায় মাঝি৷
ঘোর কাটে কিন্তু যেন আরো ব্যাকুল হয়ে ওঠে অনিমেষ৷
‘ভাড়াটা কিরে! এই অন্ধকার রাত্রিতে আমি এখানে কোথায় থাকব? তুই তো এক ঘণ্টার রাস্তা সাত ঘণ্টায় এনে আমাকে এই বিপদে ফেললি৷ এখন নিদেন ওপারে পৌঁছে দে৷ দেখি কোথাও একটু আশ্রয় পাই কিনা, এপারে এই জঙ্গলে শেষে কি বাঘের পেটে প্রাণ দেব! চল, ওপারে নিয়ে চল—’
‘উটি লারলম আজ্ঞা!’
‘সে কি! কেন রে? কী হয়েছে?’
তার উত্তরে মাঝি যা বলল তার অর্থ হচ্ছে এই যে, ওপারে অন্য নৌকো গেলে খেয়ার ইজারাদার বড্ড বকাবকি করে, পুলিশে ধরিয়ে দেয়৷
নিশীথ তাকে অনেক করে বোঝাল৷ ওপারে তাকে ধরবার জন্য ইজারাদার যদি বসে থাকত তো সে তাকেই ডাকত শুধু ইজারাদার কেন, জনমানবের চিহ্ন থাকলেও সে মাঝিকে এ অনুরোধ করত না৷ কোনোমতে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যাক—তাতে যদি কেউ তাকে ধরে তো নিশীথ তার দায়ী—ইত্যাদি সব কথার উত্তরে তার সেই একই উত্তর, ‘উটি লারলম আজ্ঞা!’
নিশীথ তখন রাগ করে বলল, ‘তবে তুইও থাক, আমি তোর নৌকোতেই রাত কাটাই৷’
‘আজ্ঞা, উটিও লারলম!’ দাঁড়ের একটা ধাক্কা দিয়ে নৌকোটা খানিক দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল৷
‘টাকাটি ছুঁড়ে দ্যান কেনে—বাড়ি চলে যাই৷’
‘তবে টাকাও পাবি না যা!’ রাগ করে বলে নিশীথ , কিন্তু যখন দেখে বুড়োটা সত্যি-সত্যিই একটা নিশ্বাস ফেলে ঘর-মুখো হচ্ছে তখন সে একখানা এক টাকার নোট দলা পাকিয়ে ছুঁড়েই দেয়৷
‘যা বেটা যা৷ পথে ডুবে মরিস তো ঠিক হয়৷’ মনে মনে বলে নিশীথ ৷
স্যুটকেসটা মাচার উপর পেতে সেখানেই জেঁকে বসল নিশীথ ৷ বাঘ ভাল্লুক যদি সত্যিই আসে তো জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে—এখানেই খানিকটা তবু নিরাপদ৷
খরখর ঝটপট শব্দ করে কী একটা পাখি উড়ে বসল মাথার ওপরে৷ ভয় পেয়ে চমকে উঠল নিশীথ ৷ কাছেই কোথায় শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কী একটা সরীসৃপ চলে গেল বোধ হয়৷ সামান্য, শব্দ, তবু বেশ স্পষ্ট৷ জলের মধ্যে হঠাৎ একটা মাছ ডিগবাজী খায়৷ ঐটুকু আওয়াজ—কিন্তু নিশীথ মনে হল যেন বন্দুকের শব্দ উঠল কোথায়৷
হাতঘড়িটা দেখল—মাত্র রাত ন-টা৷ কলকাতায় সবে সন্ধ্যা৷ কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে নিশুতি রাত৷ এখনো দীর্ঘসময় তাকে এখানে অপেক্ষা করতে হবে৷ কখন ভোর হবে, তারপর কখন ইজারাদারের ঘুম ভাঙবে তবে সে একটু লোকালয়ের মুখ দেখতে পাবে৷ বাস একটা আসে এখানে সকাল আটটা নাগাদ— অর্থাৎ প্রায় বারো ঘণ্টা এখনো—
আচ্ছা, হাঁটলে কেমন হয়? বাসের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে কি আর গ্রাম একটা পাওয়া যায় না কাছাকাছির মধ্যে?
কিন্তু সেখানে যদি তাকে আশ্রয় দিতে কেউ না চায়? ডাকাত বলে মনে করে? তাছাড়া দু’দিকে যা ঘন ঘন বন, যদি বাঘ আসে? বাঁকুড়া জেলায় এসব অঞ্চলে প্রায়ই বাঘ বেরোয়৷
দরকার নেই৷ দশ-এগারো ঘণ্টা সময়—একরকম করে কেটেই যাবে৷
‘ও বাবু , শুনছেন? বাস মিস করেছেন বুঝি? কোথাও আশ্রয় পান নি?’
অস্ফুট একটা শব্দ করে চমকে ওঠে নিশীথ , বরং আঁতকে ওঠে বলাই ঠিক৷ কখন নিঃশব্দে কে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে—কৈ একটুও তো টের পায় নি! সামান্য কুটো নড়ার শব্দের দিকেও তো সে কান পেতে ছিল!
কয়েক মুহূর্ত যেন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকে, ঘাড় ফেরাতেও সাহস হয় না৷ কথাগুলো যে বলেছে সে একেবারে ওর পিছনে এসেই দাঁড়িয়েছে৷ অত্যন্ত দ্রুত, যেন একটা কথা শেষ হবার আগেই আর একটা শুরু হয়েছে—এইভাবে পর পর তিনটি প্রশ্ন করে আগন্তুকটিও চুপ করে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে৷
অবশেষে প্রায় মরীয়া হয়েই নিশীথ ফিরে তাকায়৷
হালকা কালো গোছের একটি মানুষ, মানুষ না বলে মহিলা বলা ভালো । খুব বেঁটে নয়—তাই বলে ঢ্যাঙাও বলা চলে না৷ উসকো-খুসকো এক মাথা চুল কোমর ছাড়িয়ে গেছে ও ৷ বয়স চল্লিশের উপরেই হবে বোধহয় ৷ একখানা খাটো আধময়লা কাপড় পরনে ৷ মোটা ভুরুর আড়ালে চক্ষুর তীক্ষ্মদৃষ্টি নিঃশব্দে শুধুমাত্র চাউনির দ্বারাই যেন নিশীথের সমস্ত ইতিহাস আয়ত্ত করবার চেষ্টা করছে৷…
‘বলছিলুম যে, আপনি বোধহয় কোথাও আশ্রয় পাচ্ছেন না—না? তাহলে বরং চলুন না-হয় আমার কুটিরেই—কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে দেবেন৷’
এ মহিলাটাকে দেখেই যেন পাগল বলে মনে হয়—শেষ পর্যন্ত এর আশ্রয়ে গিয়ে কি আরো বিপদে পড়বে!
‘কী বলেন? যাবেন নাকি?’
নিশীথের চোখ পড়ে মহিলার বুকের উপর , উরিব্বাশ , এত বড় , যেনো মাঝারি মাপের দুখানি ফুটবল বুকে ঝোলানো আছে , কথা বলার সাথে সাথে দুলে উঠেছে । ময়লা শাড়ি পেঁচিয়ে বুকের ম্যানাজোড়া ঢাকা । এতবড় স্তন আগে দেখেছে কোথাও বলে মনে করতে পারেনা নিশিথ ।
‘আ-আপনি এখানে—মানে—’ আমতা আমতা করে নিশীথ ৷
‘আমার এখানেই একটা ঘর আছে, এই যে!’ -মহিলা আঙুল দিয়ে দেখায়৷
সত্যিই তো, এই তো, বলতে গেলে তার সামনেই পাড়ের ওপর একখানা খড়ের ঘর—ও অঞ্চলে যেমন হয় তেমনি৷ আশ্চর্য, এতক্ষণ তার চোখে কি হয়েছিল?
মহিলা বোধ হয় তার মনের ভাব বুঝেই হেসে বললে, ‘ঘরে আলো ছিল না কিনা, তাই অন্ধকারে টের পান নি৷ আমিও বাড়ি ছিলুম না, নদীর ধার দিয়ে দিয়ে একটু বেড়াতে গিয়েছিলুম৷ অন্ধকারে একা একা বেড়াতে আমার বেশ লাগে৷’
‘এখানে বাঘের ভয় নেই?’
‘আছে বৈকি৷ তবে আমার অত ভয় নেই৷…মরবার ভয় করি না৷ করে লাভই বা কি , মরতে তো একদিন হবেই৷’
না, মহিলাটাকে ঠিক পাগল বলে তো মনে হয় না!
‘চলুন বাবু, ঘরে বসেই কথাবার্তা হবে’খন৷’ মহিলা তাড়া লাগায়৷
আর সাত পাঁচ না ভেবে ‘চলুন’ বলে স্যুটকেসটা তুলে নেয় নিশীথ ৷
একখানা নয়—পাশাপাশি দুখানা ছোট ঘর, সামনে এক ফালি দাওয়া৷ ভেতরদিকে আরো কি আছে তা ওর নজরে পড়ল না৷ দাওয়া বেশ ঝকঝকে করে নিকানো, পরিচ্ছন্ন৷ মহিলাটি আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ‘দাঁড়ান আলো জ্বালি’ বলে ওকে দাওয়াতেই দাঁড় করিয়ে রেখে দোর খুলে ভেতরে ঢুকল৷ তালাচাবির বালাই নেই, দোর শুধু ভেজানোই ছিল, ঠেলা দিতেই নিঃশব্দে খুলে গেল৷ ভেতরে ঢুকে আশ্চর্যরকম ক্ষিপ্রতার সঙ্গে একটা আলো জ্বেলে বলল, ‘আসুন—ভেতরে আসুন বাবু৷’
ঘরে আসবাবপত্র বেশি ছিল না৷ একটি তক্তপোশের ওপর একটা মাদুর বিছানো,—শয্যা বলতে এই৷ একটা বালিশ পর্যন্ত নেই৷ একপাশে একটি দড়ি টাঙানো, তাতে খান-দুই কাপড়, তার মধ্যে একটা লাল মেঝেতে জলের মেটে কলসী, একটা কাঁসার ঘটি এবং পিতলের পিলসুজে একটা মাটির প্রদীপ৷ এ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই৷
‘বসুন, বসুন৷ ঐ চৌকিটের ওপরই বসুন৷’
তারপর খানিকটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নিজের দুইহাত ঘষে , দুধ নাচিয়ে এক রকমের বিচিত্র হাসি হেসে বললে, ‘ভালো বিছানা আমার নেই৷ ঐ স্যুটকেসটা মাথায় দিয়েই শুতে হবে৷…আর খাবারও তো কিছু দিতে পারব না৷ ঘরে আমার কিছুই নেই৷…আপনি মদ খান?’
যেন একটা আকস্মিক উগ্রতা দেখা দেয় মহিলার প্রশ্ন করবার ভঙ্গিতে৷
চমকে ওঠে নিশিথ , ‘না-না৷ রক্ষে করুন৷ কিচ্ছু ব্যস্ত হবেন না আমার জন্যে৷ আশ্রয় পেয়েছি এই ঢের৷’
‘ঐ আশ্রয়টুকুই যা৷ বাঘ-ভাল্লুকের হাত থেকে তো বাঁচলেন অন্তত৷—তা আশ্রয় ভালোই৷ ঘরখানা মন্দ নয়, কী বলেন?’
বলতে বলতে হেসে ওঠে সে৷ সাদা ঝকঝকে দাঁত কালো দাড়ির ফাঁকে চকচক করে৷
নিশীথের যেন ভালো লাগে না ওর ভাবভঙ্গি৷ আবারও সেই সন্দেহটা মনে জাগে—পাগলীর পাল্লায় এসে পড়ল নাকি?
‘আপনি এখানে কি করেন?’
‘আপাতত কিছুই না৷ আচ্ছা বসুন, আমি আসি৷ মুখহাত ধোবেন নাকি?’
ধুতে পারলে ভালোই হত, কিন্তু নিশীথের তখন নড়তে ইচ্ছে করছে না৷ সে বললে, ‘না—দরকার নেই৷’
মহিলা বেরিয়ে গেল৷ নিশীথ স্তব্ধ হয়ে বসেই রইল৷ ভালো বোধ হচ্ছে না ওর৷ কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে৷ কী করে মহিলা এখানে, এমন একাই বা থাকে কেন? ঘরে কোনোরকম কিছু খাবার নেই তো ও নিজে খায় কি? মাথায় সিন্দুর নেই আবার বিধবার বেশেও নেই । চোরডাকাত নয় তো? লোকজনকে ভুলিয়ে এনে শেষে—
ঈশ্বর বাঁচিয়েছেন—ব্যাগে ওর খানকতক পুরোনো কাপড়জামা ছাড়া আর কিছুই নেই৷ পকেটেও মাত্র টাকা-ছয়েক আছে৷ কিন্তু একটু পরেই সমস্ত দেহ হিম হয়ে ওর মনে পড়ে…এই সব উদ্দেশ্যে যারা নিয়ে আসে ভুলিয়ে, টাকা না পেলে আরো হিংস্র হয়ে ওঠে৷ তা-ছাড়া মেরে ফেলে তো দেখবে কী আছে না আছে৷ ওদের দেশে একবার খুব ডাকাতের উপদ্রব হয়েছিল, তারা একটা লোককে খুন করার পর পেয়েছিল মাত্র একটি আধলা!
কখন মহিলা আবার নিঃশব্দে ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, নিশীথ টেরও পায় নি৷ যদিও খোলা দরজার দিকে চেয়েই বসেছিল সে৷ আশ্চর্য!
মহিলা বলল, ‘এখনই শুয়ে পড়বেন নাকি? যদি ঘুম পেয়ে থাকে তো অন্য কথা৷ নইলে একটু বসি৷ কতদিন লোকের সঙ্গে কথা কইতে পাই নি! বলেন তো দুটো কথা কয়ে বাঁচি৷…এখানে তেমন লোকজন তো নেই, আসেও না কেউ—’
নিশীথ আবারও পূর্ব প্রশ্নের জের টানল, ‘তা এমন জায়গায় আপনি থাকেনই বা কেন?’
সেই হাসি মহিলার মুখে, তেমনি নিঃশব্দ হাসি, দাড়ির ফাঁকে শুভ্র দন্তের সেই বিজলী প্রকাশ , শাড়ির একপাশে বগলের পাশে একটা স্তন উকি দিচ্ছে , প্যান্টের নিচে অস্বস্তি অনুভব করে নিশীথ !
‘ভয় নেই—আমি চোর-ডাকাতও নই, পাগলীও নই৷ ঘরে কিছু নেই মানে আমার কিছুর দরকার নেই৷ থাকারও দরকার হয় না আমার৷ কেন জানেন?’
তারপর যেন কতকটা অসংলগ্ন ভাবেই বলে ওঠে, ‘আমি সাধীকা৷ তান্ত্রিক সন্ন্যাসিনী ৷’
‘সন্ন্যাসিনী ?’ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মহিলাটির দিকে চায় নিশীথ ৷ বয়স চল্লিশ হলেও শরীরের বাঁধুনি এখনো কোলকাতার অনেক যুবতীকে হার মানায় , গ্রাম্য মহিলা , মজবুত মোটাসোটা শরীর হলেও পেটে চর্বি এখনো জমেনি , রুপ খুব একটা না থাকলেও চেহারায় চটক আছে ।
মহিলা বলে, ‘না—সন্ন্যাসিনী মানে ঠিক অভিষিক্ত সন্ন্যাসিনী নই—তবে সাধিকা বলা চলে ৷’
উবু হয়ে ঘরের মেঝেতেই বসল মহিলা, শাড়ির আঁচলের থেকে বাম স্তনের অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে ।কিছুক্ষণ মৌনভাবে থেকে বললে, ‘তাহলে আপনাকে বলেই ফেলি সেটা৷ মেঝের একপাশে একটা মাটির ভাঁড় এতক্ষণ চোখে পড়েনি নিশীথের , সেটা যে মদ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না , মহিলাটি সেটা থেকে কিছুটা সুরা মুখে চালান করে বলল - কাউকে কখনো বলি নি, বলবার সুযোগও পাই নি বিশেষ৷ ছোটো থেকেই নানা লোকের যাদু টোনা অদ্ভুত সব ক্ষমতার কথা পড়ে ঐদিকে মনটা ঝোঁকে৷ মনে হত আমিও ঐসব সাধনা করে সিদ্ধ হব, তারপর প্রাণভরে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য ভোগ করব—আর আমাকে পায় কে! হায় রে, তখন কি আর জানতুম যে ভোগের উদ্দেশ্যে সাধনা করতে এলে সিদ্ধি তো দূরের কথা, সমস্তই খোয়াতে হয় একে একে!’
এই পর্যন্ত বলে মহিলাটি চুপ করল৷ এতক্ষণে নিশীথও অনেকটা সহজ হয়েছে৷ মহিলার ভাবভঙ্গি আর কথাবার্তায় সত্য কথা বলছে বলে মনে হয়৷ দুশ্চিন্তা অনেকখানি কমে গেল ওর৷
‘বাড়ি আমার এ অঞলে নয়৷ বাড়ি সেই পাঁচমুড়ার কাছে৷ এখানে কেন এলুম? বলছি দাঁড়ান৷…বলেছি আপনাকে, ছেলেবেলা থেকেই ঐদিকে ঝোঁক গিয়েছিল৷ বাবা ছিলো কলেজ মাস্টার , কিন্তু আমার আর ইকলেজের পড়া হল না, তার বদলে যত সব ঐ ধরনের বই পড়তে লাগলুম৷ পড়তে পড়তে বিশ্বাসটা খুব পাকা হয়ে গেল৷ শেষমেষ উনিশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম ।কিন্তু গুরু কৈ? দু-একটা কাপালিক তান্ত্রিক যা হাতের কাছে পেলুম দেখলুম সব বাজে—কেউ কিছু জানে না , কিছুদিন আমাকে ভোগ করে ছেড়ে দিলো ৷
"ভোগ" আচমকাই নিশীথের মুখ থেকে জিজ্ঞাসু ভাবে বেরিয়ে আসে প্রশ্নটা !
এতক্ষণে মহিলাটারো সুরাপানে নেশা হতে শুরু করেছে , চোখগুলো হালকা লাল হয়েছে ।
সে নিশীথের প্রশ্ন শুনে হালকা হেঁসে গ্রাম্য ভাষায় বললো - ভোগ গো বাবু ভোগ , ভোগ জানেন না ?
ভন্ডগুলা আমাকে শিখাবার নাম করে পাসে শুয়াই লিয়ে আমার ফুটা চুদে দিতক । কেউ তো আবার নিজের হিয়া বড় ধোনটা চুষা করাতক , বলে নিজের ডানহাত টা কুনুই পর্যন্ত দেখায় মহিলাটি ।
নিশীথের গলা শুকিয়ে আসে , মাথা ভন ভন করে মহিলার কথা শুনে ।
নিশীথের অবস্থা দেখে মুচকি হেঁসে আবার শুরু করে - ধোনেই দেখাতক শুধু অথচ পথ দেখাবেক এমন লোক না পালে এগাবো কি করে?…মনটা বড়ই চঞ্চল হয়ে যাচ্ছিল ৷
‘যত দিন যাতে লাগল মনটা ততই খারাপ হয়ে যাচ্চিল ।এমনি করে যখন যখন হতাশ হয়ে যাচ্ছি তখন একদিন—বাড়ি ফেরার পথেই বলতে গেলে—বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ একজনকে পায়ে গেলুম৷ শ্মশানে এক কাপালিক থাকেন শুনলুম, উলঙ্গ থাকেন শ্মশানে শুয়ে, কেউ খেতে দিলে খান নইলে এমনি থাকেন৷ লতাপাতা এমন কি মানুষের গু খাতেও ওর আপত্তি নাই বোধ হয় ৷’
‘খোঁজ করে করে গেলুম৷ প্রথম তো দেখাই পালম নাই ৷ শেষে তিন দিন ধন্না দিয়ে পড়ে থাকতে দর্শন পেলুম ৷ বিপুল শরীর , কোমরের নিচ থেকে একহাত নুনু ঝুলছে, দেখলেই ফুটা থাইকে জল কাটে , পাগলের মতো ভাবভঙ্গি—কিন্তু পাগল লয় ৷ একদিন আমার চোখের সামনেই—দু’দিক থেকে দু’দল তাঁকে দর্শন করতে আসছে দেখে, আমার চোখের সামনে শিয়ালের রূপ ধরে বনের মধ্যে পালালো , কেউ আর খুঁজেই পালো নাই ৷ বুঝলম যে এতদিন ধরে যাকে খুঁজছিলুম, এতদিন পরে তাকে পায়েছি ৷’
নিশীথের মনেও ততক্ষণে গল্প জমে উঠেছে৷ মহিলাটি থামতেই সে বললে, ‘তারপর?’
লোক তো পেলুম—তাকে ধরবো কি করে? কিছুতেই ধরা দেয় নাই ৷ কিছু বলতে গেলে শ্মশানের পোড়া কাঠ তুলে তেড়ে আসে৷ একদিন খুব কান্নাকাটি করতেই সব শুনলো মন দিয়ে, কিন্তু তারপর যা বকুনিটা দিলে—বললে, ভালো চাস তো এসব মতলব ছাড়! সাধনা করবি তুই, ঐ ভোগ-দেহ নিয়ে? তোর কাজ নয়—বুঝলি, মরবি একেবারে৷ তা ছাড়া ভোগ করবার জন্যে এসব কাজ যে করতে আসে তার একূল ওকূল দুকূল যায়৷ ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে যা—বিয়ে-থা কর৷ নিজে-নিজেই ভগবানকে ডাক, নয়তো কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নিস৷ অনেক কাকুতি-মিনতি করলুম, বাবার আর দয়া হল না৷ আমি কিন্তু হাল ছাড়লুম না৷ আমার তখন জেদ চেপে গেছে কি না৷…ঐখানই পড়ে রইলুম, বলতে গেলে না খাইয়ে দাইয়ে—আর লুকায়ে ওঁর দিকে নজর রাখলুম৷ যদি আসল কাজের কিছু হদিস পাই—বুঝলেন না বাবু ? এতদিন কি আর বৃথাই এর ওর নিচে কাপড় তুলে শুইয়েছি ! আসল মানুষ না পাই, ওদের ভেতরের কথা কিছু কিছু জানেছি বৈকি৷ তারপর হল কি , আরো দুজন ভৈরবী ওখানে এল বাবার সঙ্গে দেখা করতে৷ গোপনেই এলো কিন্তু আমি তো ঐখানেই পড়ে ছিলম , আমাকে এড়াবেক কি করে?…পরপর কদিন উয়াদের চক্র বসল৷ তাও দেখলুম৷—মনে হল যে, আর কি, সব শিখে গেছি…ওখান থেকে রওনা হয়ে নির্জন শ্মশান, লোকালয় কাছে এই রকম খুঁজতে খুঁজতে এসে পড়লুম৷ পথে বিষ্ণুপুরে একজনের কাছে দীক্ষাও নিয়ে নিলুম৷
‘ও বাবু, এলুম তো এখানে, কিন্তু সাধনা আর হলোনাই ৷ প্রথম দিন থেকে বিঘ্ন ঘটছে৷ জিনিস জুটে তো দিন পাই নাই, দিন পাই তো জিনিস নাই—শেষে অনেক ফন্দি করে অনেক লোককে নিজের ফুটার লোভে ফাঁসায়ে যদিবা সব যোগাড় করলুম, মঙ্গলবার অমাবস্যার রাতে যখনি আসন করে বসেছি—কী বিঘ্ন! ধ্যানে মন দিবো কি, কিছুতে মনই স্থির করতে পারিছি নাই…এখন ইটা বাসের রাস্তা হয়েযাতে শ্মশান ইখান থেকে সরে গেছে, আগে এইখানটাতেই শ্মশান ছিল, এখন এইযে ঘর দেখছেন, এই যেখানে আমি বসে আছি, এইখানেই সেদিন আসন করে বসেছিলম —’
নিজের অজ্ঞাতেই নিশীথ যেন একটু সরে বসে৷ তারপর বলে, ‘আচ্ছা বিঘ্ন কি রকমের? ভয় পেলেন? শুনেছি তো এ রকম সাধনায় বসলে প্রথম প্রথম নানা রকমের ভয় দেখায়—কিন্তু সেটা শুধুই পরীক্ষা করার জন্যে৷ আপনিও তো সে রকম শুনেছিলেন নিশ্চয়, তবে ভয় পেলেন কেন?
মহিলাটি আবার হাঁসলো ৷ কাউকে ছেলেমানুষি করতে দেখলে বিজ্ঞ মানুষেরা যেমন হাসে কতকটা তেমনি হাসি৷ বললে, ‘জানে তো সবাই কিন্তু শোনা এক কথা আর সামনাসামনি থাকা আর এক৷ !…শুনবেন কেমন?…মড়ার বুকের ওপর বসেছি আসন করে, মড়ার খুলিতে করে মদ খাচ্ছি—মনে ভয়ডর কিছুই নাই, এই বিশ্বাস আছে , প্রথম শুরু হল ফিসফিস কথার শব্দ, খিলখিল হাসি, চাপা হাসিই৷ আস্তেআস্তে সেইটাই বাড়তে লাগল৷ মনে হল একগন্ডা , দু গন্ডা, একশগন্ডা —হাজার হাজার৷ আপনার চারপাশে যদি গন্ডা গন্ডা ফিসফিস শব্দ হতে থাকে তো তেমন হবেক ? আর উয়ায সাথে চাপা এক ধরনের খিলখিল হাসি ৷ তবু আমি স্থির হয়ে আসনেই বসেআছি —নড়ি নাই ৷ তার পর বাবু—স্পষ্ট দেখতে লাগলুম শ্মশানের মাটি ফুঁড়ে ফুঁড়ে যেন মড়াগুলো উঠছে৷ কতকাল থেকে মরেছে সব—কত হাজার হাজার বছর ধরে৷ এক এক জনের বীভৎস চেহারা, রোগে যন্ত্রণায় বিকৃত মুখ৷ কেউ খুন হয়েছে, কেউ বা ঠ্যাঙাড়ের হাতে প্রাণ দিয়েছে, কেউ বা গলায়-দড়ির মড়া৷ ঠিক ওই অবস্থায় উঠেছে—তেমনি কন্ধকাটা কিংবা হাড়গোড় ভাঙা অবস্থায়৷ সকলেরই মুখে রাগ, চোখের দৃষ্টিতে আগুন৷ উয়ারা সবাই আমার দিকে আঙুল তুলে শাসাতে লাগল, তুই এখানে কেন? শ্মশান অপবিত্র করতে এসেছিস? চলে যা, দূর হয়ে যা! জানিস না, এখানে আমরা পাহারা দিচ্ছি? মনে পাপ নিয়ে তুই এসেছিস শ্মশান জাগাতে! চলে যা! তার মধ্যে একজনের তো শুধু কঙ্কাল, বোধ হয় তাকে পুঁতে রাখেছিল কোথাও মারে —তারপর উটা তুলে পোড়াতে হয়েছে৷…তবু এও জানতম, একবার ভয় পালেই গেল—চিরকালের মতো৷ প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম, যাব নাই, যাব নাই ৷ উঠব নাই আমি৷ ব্যস—আর যাবি কুথা কোথা, সেই কঙ্কালটা আরো এগাই আসে উয়ার সেই আঙুল কটা দিয়ে আমার গলাটা চিপে ধরলো ৷ ওঃ, সে কী চাপ, যেন মোটা লুহার সাঁড়াশী! কত চেষ্টা করলম ছাড়া পাবার , ! দম বন্ধ হয়ে গেল, বুকে সে এক অসহ্য যন্ত্রণা—মনে হচ্ছিল যেন শরীরের প্রতিটি শিরা ফেটে যাচ্ছে৷…আকুলিবিকুলি করতে লাগলুম এক ফোঁটা হাওয়ার জন্যে—সে হাওয়া চারিদিকেই রয়েছে তবু এক বিন্দু বুকের মধ্যে নিতে পারলুম না৷ বরং আরো চেপে বসতে লাগল সেই সাঁড়াশীর মতো আঙুলগুলো—৷…’
তারপর?’ রুদ্ধনিঃশ্বাসে প্রশ্ন করে নিশীথ ।