ছিন্নমূল ঃ কামদেব - অধ্যায় ৩৬

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-47551-post-5013172.html#pid5013172

🕰️ Posted on November 3, 2022 by ✍️ kumdev (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1124 words / 5 min read

Parent
ষষ্ঠত্রিংশৎ অধ্যায়।    গভীর রাত সারা গোপালনগর ঘুমে অচেতন।কয়েকটা ধেড়ে ইদুর গোফ নাড়তে নাড়তে বগানে ঘোরাঘুরি করছে।সাদা সাদা ছেড়া  মেঘ আকাশে ভাসতে ভাসতে চলেছে নিরুদ্দেশে।মাঝে মাঝে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে চাঁদ। রাত চরা পাখিরা বেরিয়ে পড়েছে শিকারের সন্ধানে।গাছের পাতায় জমাট বেধে আছে গাঢ় অন্ধকার।সুখদার চোখে ঘুম নেই। এলোমেলো নানা চিন্তা ভীড় করে আসছে মনে।ডিসচার্জের ব্যাপারে মামা ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলবে বলেছিল তাকে কিছু জানায় নি।কলকাতা থেকে মনু ফিরে এসেছে মা কি জানে?সকালে উঠে লোকের বাড়ি রান্না করতে চলে যায়।ফিরে এসে নিজেদের রান্না,এই বয়সে এত ধকল সহ্য হয়।পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করে।বাবার সময় ডাক্তার মিত্র অনেক করেছিলেন।এখন বয়স হয়ে গেছে বাইরে কল এয়াটেণ্ড করেন না।ড মিত্রর মেয়েকে বাবা পড়াতো।এমনিতে বাবা প্রাইভেট ট্যুইশন করে না। প্রায় প্রতি সপ্তাহে গ্রামে এসেছে পাঞ্চালীর সঙ্গে দেখা হয় নি।কোথায় উধাও হল কে জানে। সিধুরা হয়তো জানতে পারে।তার উপর কেন রাগ কে জানে। স্বপ্ন তো মানুষ সবাই দেখে।সব স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়।সত্যকে অস্বীকার করতে যাওয়া এক বিড়ম্বনা।কবি বলেছেন,ভাল মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লও সহজে। বাবা একদিন সাজানো ঘর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল এপারে।তার জন্য কোনো হা-হুতাশ করতে দেখেনি। এলো মেলো ভাবতে ভাবতে সুখ একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।মাকে আর কিছুতেই কাজ করতে দেবে না।অনেক হয়েছে পড়াশুনা। সুবিমামাকে বলে একটা কাজ জুটিয়ে নেবে তাতে দুটি প্রাণির চলে যাবে অনায়াসে।মামা তো বলেইছিল কাজের কথা।অনেক করছে সুবিমামা।মামীটা যেন কি রকম।ভেবেছিল হাসপাতালে দেখতে আসবে,আসেনি।ভাবতে ভাবতে শেষরাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল সুখদা রঞ্জন।  ভোরের আলো ফুটতে শুরু হয় পাখির কলরব।বাইরে কাদের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসল সুখ।দরজা খুলে বাইরে এসে দেখল বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে।ছেলেটি খোকনদার দলের মনে হল। কমরেড খোকন দা আপনাকে ডাকছে। ছেলেটির চোখ মুখ দেখে বুকের মধ্যে ছ্যৎ করে উঠল।সুখ বলল,মা নেই? ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না।সুখ ঘরে ঢুকে দ্রুত পোশাক বদলে বাইরে এসে দেখল সুবিমামাও এসেছে।তাকে দেখে মনুরে দিদি নেই বলে হাউ হাউ করে কাদতে শুরু করল।বাইক নিয়ে দাঁড়ানো ছেলেটি বিব্রত বোধ করে।সুখ বলল,আঃ মামা কি হচ্ছে?কাদলে কি যে গেছে ফিরে আসবে। দাদা তো আগেই গেছে দিদিও চলে গেল রে-এ-এ--। সুখ বাইকের পিছনে চাপতে ছেলেটি বাইকে স্টার্ট করল।সুখ জিজ্ঞেস করে,কখন মারা গেছে? এই রাত তিনটের কাছাকাছি হবে। সুখ মনে মনে হিসেব করল যখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল তখনই মা চলে গেছে।দুটো কথা বলার সুযোগ পেল না এই আফশোস চিরকাল থেকে যাবে।পৃথিবীটা বড় শূণ্য মনে হয়।কলকাতায় ছিল জানতো গোপাল্পুরে ফিরলেই মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।এখন সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুজলেও কোথাও পাওয়া যাবে না মাকে। হাসপাতালে পৌছে দেখল সিধু সহ স্কুলের কয়েকজন বন্ধু এসেছে।এক্টু দূরে দাঁড়িয়ে খোকন মণ্ডল।একটা খাটিয়া ফুল দিয়ে সাজানো।সিধু এসে বলল,মাইরি মাসীমা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ভাবতে পারিনি। সুখর কথা বলতে ভালো লাগছে না।শূণ্য খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,মা কোথায়? বেডেই আছে,আটটার আগে বডি ছাড়বে না। সুবীর রায় হাসপাতালে পৌছে ভাগ্নেকে দেখে অবাক হয়।কে বলবে ওর মা মারা গেছে।কাছে গিয়ে ভাগ্নের কাধে হাত রাখতে সুখ বলল,আচ্ছা মামা মায়ের ঠিক কি হয়েছিল? বলব সব বলব। কয়েকজন স্ট্রেচারে করে সুমনাদেবীর মৃতদেহ নামিয়ে নিয়ে এল।খোকন মণ্ডল এগিয়ে এসে বলল,সাবধানে সাবধানে। মৃতদেহ খাটিয়ার উপর শুইয়ে দিতে একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল।কাধের দুপাশে ফুলের তোড়া দিয়ে সাজানো হল।সুগন্ধি ধুপ জ্বেলে দিল।ছিটিয়ে দিল অগরুর গন্ধ।নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে সুখ রঞ্জন।দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সামনে শায়িত তার মায়ের মৃতদেহ।কোনোদিন চোখ মেলে তাকাবে না।এত লোকজন এক সময় সবাই চলে যাবে নিজ নিজ কাজে।সুখদা তখন একা একেবারে একা।তার আর কেউ থাকল না।   দলবল শ্মশানে গেলেও খোকনদা নিজে যায় নি।স্কুলের কিছু বন্ধুও ছিল।দাহ কার্য সেরে ধুতি কাছা গলায় বাড়ী ফিরল। মামা পরে আসবে বলে পাইকপাড়া চলে গেল।মায়ের ঘরে ঢুকে দেওয়ালে হাত বোলাতে থাকে সুখ।সারা বাড়ীতে এখন সে একা।দেওয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে খাটের দিকে নজর পড়তে নিজেকে সামলাতে পারে না,বালিশের উপর আছড়ে পড়ে হাউ-হাউ করে কাদতে থাকে।আটকে থাকা জোয়ারের জল যেন বাধ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে।বাড়ী ফিরে তার জন্য অপেক্ষারত উদবিগ্ন মুখটা আর দেখতে পাবে না।যে মুখটা শত প্রতিকূলতায় তাকে বল ভরসা যোগাতো।এক সময় হুশ হয় বাইরে কে যেন ডাকছে।সুখ উঠে চোখ মুছে বাইরে এসে দেখল গিরিদি। সারাদিন তো কিছু খাওনি।এগুলো রাখো,ফল খেলি দোষ নেই। একটা ঠোঙা এগিয়ে দিল।সুখ দেখল দুটো কমলা আর কিছু আঙুর।সুখ বলল তুমি আবার এসব আনতে গেলে কেন? যা সামিথ্য তাই এনিছি।ভাল মানুষরে ভগবান বেশীদিন রাখে না।আমি আসি অন্ধকার হয়ে আসতিছে। একটা বাটিতে আঙুরগুলো ধুয়ে সুখ ঘরে এসে বসল।বেশ ক্ষিধে পেয়েছিল।একটা একটা করে আঙুর মুখে দিয়ে ভাবতে থাকে।গিরিবালা লেখাপড়া জানে না মায়ের কাছে মাঝে মাঝে আসত।এমনি আর কোনো সম্পর্ক নেই।সে সারাদিন কিছু খায়নি গিরিবালার কি দায় ছিল।কোন সময়ে কতটুকু করা উচিত যে বোঝে তাকে কি অশিক্ষিত বলা যায়?এইজন্যই মেয়েদের প্রতি সুখর সম্ভ্রমবোধ।গভীর অন্ধকারে এইসব ঘটনা যেন জোনাকির আলো।সকালে কাকু এসে কয়েক কিলো চাল আর সবজি দিয়ে গেলেন।দাড়ালেন না সম্ভবত অফিসে যাবেন।বেলা হল সুখ স্নান করে বারান্দায় ইট পেতে কাঠকুটো জ্বেলে মালসায় দু-মুঠো চাল চাপিয়ে দিল।মালসাগুলো মামা পাঠিয়েছে।কাঠের ধোয়ায় সম্ভবত সুখর চোখে জল এসে যায়। একটা শালপাতায় অল্প ভাত দিয়ে সামনে বাগানে রেখে অপেক্ষা করে কখন কাক এসে খায়।এইভাবে পার হয় একেকটা দিন।মাঝে মাঝে বিকেলে তাপস সিধু পল্লবরা আসে।পাড়ার খবরা খবর পুরানো দিনের কথায় সময় কাটে।গল্প করতে করতে পল্লব উঠে দাঁড়িয়ে বলল,যাই রে পরীক্ষা এসে গেল। সীমা বলছিল সুখর ভাগ্যটাই খারাপ পরীক্ষার আগেই যত ঝামেলা।তাপস বলল। তুই বুদ্ধি করে বইগুলো আনলে ভাল করতিস। সুখ পরিক্ষা দেবেনা সেসব কথা ওদের বলে না। ন'দিনের মাথায় শ্রাদ্ধশান্তি মিটে গেল।কাকু এসেছিল বরেনদা খোকন মণ্ডল তার দলবল অনেকেই এসেছিল।গোটা তিনেক জামা পেয়েছে।মামাই সব কিছুর ব্যবস্থা করলেও মামী আসেনি।সুখ সুযোগ খুজছে কখন মামাকে কথাটা বলা যায়।নিমন্ত্রতরা একে একে চলে যায়।সুখ নিজের ঘরে বসে আছে।সুবীরবাবু ঢুকে বলল,মনু এবার তুই খেয়ে নে। মামা তুমি বলেছিলে আমাকে একটা কাজের কথা--। মানে?আগে কলকাতায় গিয়ে পরীক্ষাটা দে তারপর ওসব ভাবা যাবে। এমনিতে অনেক দিন নষ্ট হল--। আমি আর পড়ব না। পড়বি না মানে?গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট করবি না? কি হবে?এইতো সিধু গ্রাজুয়েট হয়নি--। সিধুর সঙ্গে তোর তুলনা! ভুলে যাবি না তুই বিআরবির ছেলে। বিআরবির ছেলে ত কি হয়েছে?আচ্ছা মামা তুমি আমাকে কলকাতা পাঠানোর জন্য এত মরীয়া কেন বলতো? কি বললি?ঠিক আছে তোর যা মন চায় কর।গলার স্বর বদলে সুবীরবাবু বলতে থাকে,জামাইবাবু মারা যাবার পর আমি চাকরির কথা বলেছিলাম।দিদি রাজি হল না মনু পড়বে।আজ দিদি নেই সব দেখছে আমি তার ছেলের জন্য কি করছি--।মনুর পড়ার জন্য কি প্রাণপাতটাই না করেছে--। মায়ের কথা উঠতে সুখর জিদের বাধন ঢিলে হয়ে যায়।আমতা আমতা করে বলল,কলকাতায় গিয়ে পড়া অনেক ঝামেলা? কিসের ঝামেলা? দু-মাসের বেতন বাকী পরীক্ষা ফি মেসের ভাড়া--। এই নে টাকা।সুবীরবাবু পকেট হতে একগোছা টাকা এগিয়ে দিল। সুখ গুনে দেখল নশো টাকা। কিরে এতে হবে না? এত লাগবে না। তোর কাছে রেখে দে।মেসের ঠিকানা লিখে দে দরকার হলে আরও পাঠাবো। আবার তাকে কলকাতা যেতে হবে।এতদিন ধরে মনে মনে সাজানো পরিকল্পনা ভেঙ্গে চুর চুর হয়ে যায়।মা নেই কিসের জন্য সপ্তাহে সপ্তাহে গোপাল নগর আসা।কাকুকে কথা বলা দরকার।  পরেরদিন সকালবেলা অনেক দ্বিধা দন্দ্ব নিয়ে দেবেন বিশ্বাসের বাড়ী গেল।কাকু দেখে এগিয়ে এসে বললেন,সব ভালয় ভালয় মিটেছে? কাকু আজ আমি কলকাতায় যাচ্ছি। হ্যা অনেকদিন হয়ে গেল। না মানে বলছিলাম কি মিলি--। ব্যাস ব্যাস।কাকু হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন,দেখো রঞ্জন খুটো উপড়ে গেছে। কিসের বাধনে তুমি গোপাল নগরে আসবে?মিলি মাধ্যমিক দেবে আর আমি তো বাড়ীতেই থাকি। কাকু কিছু মনে করলেন নাতো? দেবেন বিশ্বাস হেসে বললেন,আমাকে কি এত স্বার্থপর মনে হয়? সুখ জিভ কেটে নীচু হয়ে দেবেনবাবুর পায়ের ধূলো নিল।দেবেনবাবু জড়িয়ে ধরে বললেন,এতদিন খুটো ছিল ভয় ছিল না।খুটো আলগা হলেই বিচ্যুতির ভয় থাকে।সাবধানে থেকো। 
Parent