ছিন্নমূল ঃ কামদেব - অধ্যায় ৮

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-47551-post-4908948.html#pid4908948

🕰️ Posted on August 10, 2022 by ✍️ kumdev (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1137 words / 5 min read

Parent
অষ্টম অধ্যায় মাহিদিয়া থেকে সব কিছু ছেড়ে এদেশে এসেছে।জীবন যেন পাল ছেড়া তরী ভাসতে ভাসতে চলেছে তীরের সন্ধানে।চৌধুরী পরিবারকে গ্রামের সবাই একডাকে চেনে অত্যন্ত বিত্তশালী চৌধুরীরা।আমার মা সেই পরিবারের মেয়ে।স্কুলে পড়তে পড়তে বিয়ে হয়ে যায়। বাবা গরীব পরিবারের মেধাবী ছাত্র পড়াশুনা শেষে অধ্যাপনা করেন।দাদুর নজরে পড়তে মেয়ের বিয়ে দিয়ে জামাই করে নিলেন।বাবা মারা যাবার পর সেই মা এখন লোকের বাড়ীতে রান্নার কাজ করছে।চোখের কোলে জল জমে।রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বাড়ীর দিকে হাটতে থাকে সুখদা রঞ্জন।  স্কূল শুরু হয়ে গেছে পুরো দমে।ডাক্তার বাবুর মেয়েও এই স্কুলে ভর্তি হয়েছে বিজ্ঞান শাখায়।ভাষার ক্লাসগুলো একসঙ্গে হয়।তখন দেখা হলেও কথা হয়নি কোনদিন। সুখদা একটা ট্যুইশনি ধরেছে মেয়েটি ক্লাস সিক্সে পড়ে,নাম মিলি।মাস গেলে তিরিশটাকা দেয়।মায়ের একটু সাশ্রয় হবে।মাকে যত দেখছে নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধার ভাব তত বাড়ছে।পুরুষরা সেই শৈবালের মত  দীঘিকে একফোটা শিশির দিয়ে সগর্বে বলে লিখে রাখো। গলা চড়িয়ে নিজের কথা বলে।মেয়েরা কাজ করে নীরবে প্রতিদানে কিছুই চায় না।স্কুল শেষে ট্যুইশনি সেরে লাইব্রেরিতে যায়।এই তার নিত্য দিনের রুটিন।রাত জেগে পড়া তার অভ্যেস। ল্যাংচা কার্তিকের দাপট শেষ বাম্ফ্রণ্ট সরকার হওয়ার পর সেই জায়গা নিয়েছে এখন খোকন মণ্ডল।খোকন মন্ডলের মাংসের দোকান বাজারে।বাজার সমিতির সম্পাদক খোকন।শুনেছে একদিন দোকানে বসে কাতান দিয়ে মাংস কাটছিল সেই সময়ে ল্যাংচা কার্তিকের দলের ভোলার সঙ্গে গোলমাল হতে দোকান থেকে লাফিয়ে নেমে কাতান দিয়ে ভোলাকে কুপিয়েছিল।তারপর পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়।সেই থেকে আড়ালে আবডালে লোকে ওকে কাতান খোকন বলে।বেশ কিছুকাল হাজত বাস করার পর বামপন্থীদের চেষ্টায় জামীন পায়।একদিন খোকনদা ধরেছিল পথে।  তুমি মস্টার মশায়ের ছেলে না?  হ্যা।  খুব ভাল লোক ছিলেন।স্কুলের পর কি করো?পার্টি অফিসে আসতে পারো। রাজনীতি সুখর পছন্দ নয়,সে কথা সরাসরি না বলে বলল, স্কুলের পর ট্যুইশনি করতে যাই। খোকন মণ্ডল কি যেন ভাবে তারপর বলল,সময় পেলে যেও।  সব রাজনীতিক দল গুণ্ডা মস্তানকে প্রশ্রয় দেয় এটা সুখর ভালো লাগে না।লাইব্রেরিতে সব ধরণের বই আছে।কৌতূহল বশত একটা বই মজুরী ও পুজি নামে বইটা পড়েছিল।বেশ সুন্দর সুন্দর কথা আছে।পুজির বিরুদ্ধে ওদের লড়াই।কিন্তু ওদের দেখে তা মনে হয় না।বিত্তবান লোকদের ওরা খাতির করে।  এখনো বাড়ি যাওনি?পিছন থেকে সীমা এসে জিজ্ঞেস করল।  অন্যমনস্কভাবে পথ চলছিল সুখ সীমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,তোমার এত দেরী হল? সীমা এখন তার সহপাঠী।সীমা বলল,সেভেন্থ পিরিওডে এয়াডিশন্যাল ক্লাস ছিল।বাড়ি গিয়ে এখন কি করবে?  লাইব্রেরীতে যাবো। সীমা ইতস্তত করে বলল,একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সুখ অনুমান করার চেষ্টা করে কি বলবে আবার।মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে একটু নার্ভাস বোধ করে সুখ মুখে মৃদু হাসি টেনে সীমার দিকে তাকালো।  তোমার এত ভালো রেজাল্ট তুমি আর্টসে কেন ভর্তি হলে? সুখ স্বস্তি বোধ করে বলল,রেজাল্টের সঙ্গে সায়েন্স আর্টসের কি সম্পর্ক? আমার পছন্দ তাই আর্টসে ভর্তি হয়েছি। সীমার ইচ্ছে ছিল সায়েন্স পড়ার নম্বর কম থাকার জন্য সায়েন্সে পড়ার সুযোগ পায়নি।আর্টস পছন্দ তাই আর্টস পড়ে কথাটা শুনে অবাক হয়।সীমা বলল,যারা সায়েন্স নিয়ে পড়ে তারা আর্টসের ছেলে মেয়েদের অবজ্ঞার চোখে দেখে। সুখ হাসল।   তুমি হাসছো?আমার এক বন্ধু পাঞ্চালি আগে এক স্কুলে পড়তাম।কম্বাইন ক্লাসে ওর সঙ্গে কথা বলতে গেলাম এমনভাব করছিল যেন চেনেই না।  তুমি গিরিবালায় পড়তে?  হ্যা পাঞ্চালিকে তুমি চেনো?  সেরকম আলাপ নেই।আমার বাবা ওকে পড়াতো।  তোমার বাবা! তুমি বিআরবির ছেলে?এইবার বুঝেছি এইজন্য তুমি এত ভাল রেজাল্ট করেছো। মেয়েদের এই ছেলেমানুষী ব্যাপারটা সুখর ভাল লাগে বলল,মাঝে মধ্যে কিছু বিষয় বাবাকে জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু বাবা আমাকে পড়াতেন না।  তুমি বিআরবির ছেলে আমি জানতাম না।  তুমি বলছিলে না সায়েন্সের ছেলেরা আর্টসের ছেলেদের হেয়জ্ঞান করে।আমার মনে হয় এটা তোমার একটা কমপ্লেক্স।তোমার মধ্যেই আর্টস সম্পর্কে যে ধারণা সেটাই তুমি অন্যের চোখে দেখতে পাও।  তুমি বেশ সুন্দর কথা বলো।সুখ নিজের বাড়ী দেখিয়ে বলল,আমি এবার আসি?  হ্যা কাল আবার সোমবার হবে।   আজ ডাকে চিঠিটা এসেছে।বৈচিমিতা কার কাছে শুনেছে ওর মৃত্যুর কথা।ওর ভাইজী নাজমার বিয়ে।চিঠিটা হাতে নিয়ে কোথায় হারিয়ে যায় সুমনার মন।নাদিয়া লিখেছে, ধন দৌলত স্বামীর কাছে কিছু না।মেয়েদের কাছে স্বামী হারানো মানে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া।আচলে চোখ মুছলেন সুমনা।কতদিন নাদিয়ার সঙ্গে দেখা হয় না। মনে হচ্ছে মনু এল।নিজেকে বদলাবার চেষ্টা করেন সুমনা।সুখ ঢুকে জিজ্ঞেস করল,কার চিঠি মা?  তোর বৈচিমাসী লিখেছে।তোর বাবার মারা যাবার কথা কার কাছে শুনেছে সেই নিয়ে লিখেছে।যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। ক্লাসে আগে এক আধটা কথা হয়েছে,এভাবে একসঙ্গে চলতে চলতে কথা সীমার আজই প্রথম।সুখকে বেশ ভাল লাগে সীমার।ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় একটা ওভার স্মার্ট ভাব করে।সুখর মধ্যে সেরকম নেই,বেশ সহজ সরল।সুখ বিআরবির ছেলে পাঞ্চালি তো কোনোদিন বলেনি।পাঞ্চালি খুব সেয়ানা এখন সায়েন্সের ছেলেদের সঙ্গে খুব মাখামাখি।গিরিবালায় পাঞ্চালিই ছিল তার বেস্ট ফ্রেণ্ড। ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে শ্রদ্ধার ভাব থাকলেও ভয় বা আতঙ্ক থাকা ঠিক নয়।ভয় থাকলে ছাত্র শিখতে পারে না,আমি মিলির সঙ্গে সহজ ভাবে মিশেছি।পড়ার বাইরের বিষয় নিয়ে কথা বললেও আমি প্রশ্রয় দিয়েছি। পড়াতে পড়াতে কেবলি মনে হচ্ছে আজ মাসের চারদিন হয়ে গেল অথচ টাকা দিল না।আজও যে দেবে কিনা বুঝতে পারছি না।মুখ ফুটে টাকা চাইতে লজ্জা করে।এক তারিখের পর থেকে অপেক্ষা করতে থাকি কবে দেবে কবে দেবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমার বাবা এসেছেন?  দেখে আসবো?  না দরকার নেই।তুমি পড়ো। দেবেন বাবু কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করেন।প্রতি শনিবার বাড়ীতে আসেন আবার সোমবার ভোরে চলে যান। মাস্টার মশায় একটা কথা বলবো? কি কথা? মেধাবী মানে কি? মেধা মানে বুদ্ধি।যার বুদ্ধি আছে তাকে বলে মেধাবী। মিলি ফিক করে হেসে বলল,আপনার খুব বুদ্ধি? কেন?  বাপি বলছিল আপনি খুব মেধাবী। ব্যাপারটা বুঝতে পারি বড়দের আলোচনা শুনেছে কিন্তু অর্থ বুঝতে পারেনি।আমি বললাম,তুমিও মেধাবিনী।নেও পড়ো। পড়ানো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।দেবেনবাবু ঢুকলেন।মিলি বলল,এইতো বাপি এসেছে। মা আজ আর পড়তে হবে না।তুমি বই খাতা নিয়ে ভিতরে যাও।দেবেন বাবু সামনা সামনি বসলেন।মনে হচ্ছে উনি আমাকে কিছু বলতে চান।মিলির পরীক্ষা সামনে কাজেই এখন ছাড়িয়ে দেবেন মনে হয় না। এ মাসে বেতন দিতে একটু দেরী হয়ে গেল।একটা খাম পকেট হতে বের করে এগিয়ে দিলেন।টাকাটা পেয়ে স্বস্তি বোধ করি।হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে পকেটে রাখলাম।  আপনার ছাত্রী কেমন পড়াশুনা করছে?   আমাকে আপনি বলবেন না।আপনি আমার পিতৃ তুল্য।   ওনার সঙ্গে খুব একটা বেশী কথা হয়নি।দু-একটা বলেই বুঝেছি উনি ভিন্ন জাতের।তবে একটা খেদ হয়তো মনে ছিল। আমি সজাগ হলাম বাবার সম্পর্কে কি বলেন শোনার জন্য।  তুমি মিলিকে পড়াচ্ছো তোমার হয়তো অসুবিধে হচ্ছে না।উনি এক সময় কলেজে অধ্যাপনা করতেন একটা স্ট্যাণ্ডারডের ছেলেমেয়েদের উনি পড়াতেন।সেখানে আবার স্কুল স্ট্যাণ্ডার্ডে ফিরে আসা বেশ কষ্টকর। আমি এ ভাবে কখনো ভাবিনি। কিছু মনে কোরো না তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করছি।  না না কাকাবাবু মনে করব কেন?  শুনেছি তুমি আর্টসে ভর্তি হয়েছ।সায়েন্সে ভর্তি না হয়ে আর্টসে কেন?  এই ধরণের কথা সীমাও আজ বলছিল।চুপ করে থাকা সমীচীন নয় বললাম,আমার ইচ্ছে অধ্যাপনা করবো।  স্যায়েন্স নিয়ে পড়লেও অধ্যাপনা করা যায়। বিষয়টা এখনই কাউকে বলার ইচ্ছে ছিল না।দেবেনবাবু মানুষটা খারাপ নয়।একটু ইতস্তত করে বললাম,আমার ইচ্ছে ইংরেজীর অধ্যাপক হবো।  ভেরি গুড।পাস করার পর আমাকে বলবে কলকাতায় ভাল কলেজে ভর্তি করে দেবো।  কলকাতায় গিয়ে পড়ার অনেক খরচ।  আমি যেখানে থাকি মাসে একশো টাকা দিতে হয়।তোমাকে ট্রেন জার্নির ধকল করতে হবে না।তুমি যদি দু-একটা ট্যুইশনি ধরে নিতে পারো মাছের তেলে মাছ ভাজা।দেবেন বাবু প্রাণ খোলা হাসি হাসলেন।আমিও তাল মেলালাম। মাকে একলা রেখে কলকাতায় পড়তে যাওয়া ভাবতে খারাপ লাগছে।  মিলির মা মানে তোমার কাকীমা প্রথম প্রথম একটু গাইগুই করলেও এখন দিব্যি সয়ে গেছে।বরং ভালই আছে কটা দিন একেবারে স্বাধীন স্বামীর দেখভাল করতে হয় না--তোমাকে আর আটকাবো না।তুমি এসো।  দেবেনবাবু ভদ্রলোক বেশ মাই ডিয়ার।এভাবে বসে আগে ওনার সঙ্গে কথা হয়নি।কলকাতায় গিয়ে পড়ার কথার মধ্যে আকর্ষণ  থাকলেও মাকে গ্রামে একা ফেলে পড়তে যাওয়া ভেবে মনটা খুত খুত করে।বাসায় ফিরে মায়ের হাতে টাকার খামটা দিতে সুমনা বললেন,তাড়াতাড়ি ফিরে এলি?লাইব্রেরীতে যাস নি?  কদিন পর পরীক্ষা তাই গেলাম না। এগারো থেকে বারো ক্লাসে ওঠার পরীক্ষা তালেও পরীক্ষা তো পরীক্ষাই। 
Parent