দেবশ্রী - এক স্বর্গীয় অনুভূতি - অধ্যায় ৫৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-23080-post-4926912.html#pid4926912

🕰️ Posted on August 24, 2022 by ✍️ Jupiter10 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2574 words / 12 min read

Parent
II ১ II “ভাবতেই অবাক লাগছে তাই না মা? সময় পরিবর্তন না হলে আমার বাবার নাম শ্রী অনুপম মুখার্জি না হয়ে কোনো এক অনির্বাণ চৌধুরী নামক ব্যক্তির সন্তান হতাম আমি।” বিছানার মধ্যে আড়াআড়ি হয়ে শুয়ে মায়ের দিকে চোখ রেখে কথা গুলো বললাম আমি। মা আমার ডান দিকে বিছানার বিপরীতে বসে শুকনো কাপড় গুলো ভাঁজ করে রাখতে গিয়ে একটু আনমনা হয়ে মুখ নামিয়ে বলল, “হুম”।   আমি একটু নড়ে চড়ে তাঁর বাম ঊরুর কাছে মুখ নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলাম, “আর বাবার সঙ্গে তোমার বিয়ের সম্বন্ধটা কি করে হয়েছিলো বলো না মা?” মা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বাম হাত দিয়ে আমার মাথার চুল স্পর্শ করল, “সবই কি আজ শুনে ফেলবি নাকি? বাকী দিন গুলোর জন্য ফেলে রাখবি না কিছু? ” আমি ডান গালে হাত রেখে নাকে কান্নাভাব দেখিয়ে বললাম, “না…।আজ কেই সব শুনে  ফেলবো। তোমার পুরনো দিনের গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে মা। তুমি খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারো। মনে হয় যেন তোমার গল্পের মধ্যেই ডুবে আছি”।     মা সশব্দে হাসল, “নাহ! আজ আর নয় বাবুসোনা…। এমনিতেই বিকেল হয়ে গেছে। তোর বাবারও ফেরার সময় হয়ে এলো…”। মা উঠে যেতে চাইছিল। আমি ডান হাত দিয়ে তাঁর বাম হাত চেপে ধরলাম। মা’র হাতের চুড়ির সঙ্গে আমার হাতের আঙুলের স্পর্শে খনখন শব্দ বেজে উঠল। “উঃ এমন করো না লক্ষ্মী মা আমার। কাজ পরে করবে। এখন শুধু তোমার ছেলেকে তোমার পুরনো দিনের গল্প শুনতে দাও প্লিজ”।   মা আমার হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাত সরিয়ে বলল, “দুষ্টুমি করিস না বাবু! তোর কাজ নেই বলে কি আমার ঘরে কাজ থাকে না। বিকেল হয়ে গেলো, যাই বাগানের গাছে গুলোতে জল দিয়ে আসি। তুইতো মা’র একটাও কাজে লাগিস না…”।   আমি বিছানায় চিবুক রেখে বললাম, “আচ্ছা বাবা। আমি তোমার বাগানে জল দিয়ে দেবো। তুমি শুধু এখন এখানে বসে আমায় গল্প শোনাও না গো”।   মা চুপ করে রইল। আমি তাঁর মুখের দিকে চাইলাম, “ বল না গো! আমি জানতে চাই সেই লোকটা তোমার জীবন থেকে চলে যাবার পর তোমার জীবনে বাবার কীভাবে আবির্ভাব হল?”   আমার ব্যকুলতা দেখে মা আমার দিকে তাকাল, “দাঁড়া কাপড় গুলো আলনায় গুছিয়ে রাখি”। আমি তাঁর হাত ছেড়ে দিলাম। মা বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের দক্ষিণ দেওয়ালের দিকে রাখা কাঠের আলনার ওপর কাপড় গুলো গুছিয়ে রেখে পুনরায় আমার মুখের সামনে এসে বসে পড়ল। এই সুযোগে আমি তাঁর কোলের মধ্যে মাথা রাখলাম। মা’র কোমল জঙ্ঘা কোন অলৌকিক বালিশের থেকে কম। যার মধ্যে আমি গাল স্পর্শ করে পরম তৃপ্তি অনুভব করি।   মা আবার একমনা হয়ে উঠল। বুঝলাম সে হয়তো পুনরায় তাঁর অতীত জীবনের পৃষ্ঠায় চোখ রেখেছে। সে হয়তো ভাবছে কোন পৃষ্ঠা থেকে সে গল্প পড়া শুরু করবে। এমন মুহূর্তে আমিই মা’র চিন্তা ভঙ্গ করলাম। “আহ!! ইয়ে মানে, সব বলবে কিন্তু!” মা একটু বিরক্তি ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকাল, “সব মানে কি বলতে চাইছিস তুই?” আমি গলা ঝাঁড়লাম, “ সব মানে আমি বলতে চাইছিলাম মা, যেমন তুমি তোমার প্রেমিকের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত গুলো যেমন নির্দ্বিধায় বলে ফেললে। ঠিক ওই রকম বাবার সঙ্গেও কাটানো মুহূর্ত গুলোও আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই”।   মা আমার দিকে তাকিয়ে চাপা হাসি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ওহ! ওটা তো তুই বলে ছিলি  যে সেক্স এডুকেশন। যৌন শিক্ষা! তাই তোকে বলে ছিলাম রে। কিন্তু সব বিষয়ে ওই রকম ভাবে খোলামেলা বলা ঠিক হবে না”।   “মা’র মুখে যৌন শিক্ষা!” কথাটা শুনে মন চনমনে করে বললাম, “ওহ আচ্ছা। তার মানে বাবা,মা’র প্রেমের মেলবন্ধন শোনাটা কি যৌন শিক্ষার অঙ্গ নয়?”   মা আবার আমার গালে আলতো করে একখানা চাটি মারল, “ভীষণ অসভ্য হয়ে যাচ্ছিস রে তুই। পাকাপাকা কথা বলছিস”।   আমি হালকা হাসলাম, “এতে পাকা হওয়ার কি আছে মা? ছেলে বড় হচ্ছে তোমার। সে এখন তোমার বন্ধু। তা বন্ধুর সঙ্গে তো বন্ধুর মতোই কথাবার্তা বলবো তাই না?” মা তাঁর অতীতের কথা বলা শুরু করবে,তার আগেই আমি তাঁকে আবার টোকা দিলাম, “আর হ্যাঁ, সহজ ভাষায় বলবে কিন্তু। বই পড়ে পড়ে গল্প শোনাচ্ছ এমন যেন না মনে হয়”। মা আমার অবাক হয়ে তাকাল, “ কেন বলতো? এমন কেন বলছিস তুই?” আমি মাথা চুলকালাম, “ও কিছু না মা। তুমি গল্প বল”। মা আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে একটু নড়েচড়ে বসে গল্প বলা আরম্ভ করলো, “সে ঘটনার প্রায় একবছর পর আমি স্বাভাবিক জীবনে ফির ছিলাম একটু একটু করে। সব মন খারাপ ভুলে নিজের কর্মজীবনে যোগদান করেছিলাম। তোর দিদা বলেছিলেন কাজের মধ্যে থাকলে আর ওইসব দুশ্চিন্তা মাথায় আসবে না। সুতরাং শরীর এবং মন দুটোই ভালো থাকবে। কলেজ সার্ভিস দেওয়ার পর কাছাকাছি একটু গ্রামের দিকে আমার পোস্টিং হয়। হাই কলেজে সহকারী অধ্যাপিকা হিসাবে। দিনকাল ভালোই চলছিলো। কচিকাঁচা ছাত্রছাত্রী দের পড়াশোনা এবং নালিশ অভিযোগ নিয়েই দিন পার করছিলাম”।   মা হাসল। তাতে আমার ক্ষণিকের জন্য ধ্যান ভঙ্গ হলো। আমি মাথা তুলে চোখ মেলে তার মুখের দিকে চাইলাম। সব কিছু স্বাভাবিক দেখে পুনরায় তার বাম ঊরুতে গাল ঠেকালাম। মা বলল, “বিয়ে নিয়ে সেরকম চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু জানি না কেন তোর দাদামশাই, দিদা, আত্মীয়রা এবারে একটু বেশিই লেগে পড়ে ছিলেন। হয়তো তারা ভাবছিলেন মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে আর আগেকার জীবন নিয়ে পড়ে থাকবে না। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ পেলে সব অতীত ভুলে যাবে”। বললাম, “হুম! তারা ঠিকই ভেবেছিলেন মা। অতীত নিয়ে কি আর চলা যায় নাকি!”   মা একখানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “আমার এক দূর সম্পর্কের পিসি। তোর দাদামশাইয়ের সঙ্গে শিক্ষকতা করতেন। তিনিই তোর বাবার বিয়ের সম্বন্ধটা নিয়ে আসেন”। আমি উৎসাহিত হলাম। মা’র মুখে আবার হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল, “হুম! তিনিই বলেছিলেন। ছেলে খুব ভালো। সরকারী এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করা। বর্তমানে একটা প্রাইভেট সংস্থায় চাকরি করে। বয়স তিরিশের কাছাকাছি”।   আমি হাসলাম, “হুম! ভালোতো। ছেলে খুব ভালো। তাই না মা?” মা হেসে বলল, “হ্যাঁ রে। প্রথমে ভেবেছিলাম এঞ্জিনিয়ার ছেলেরা খুব উৎশৃঙ্খল হয়। নেশা ভাং করে। এরোগেন্ট হয়। তার উপর কলকাতা বেজায় দূর। তোর দিদারও শুরুতে আপত্তি হয়”। “তারপর?” “তারপর আবার কি? আমিও রাজী ছিলাম না। তোর দিদাকে নানা বাহানায় আমি এই সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিতে বলেছিলাম”। “তারা কি মেনে নিয়ে ছিল তোমার কথা?” জিজ্ঞেস করলাম। মা বলল, “না রে। তোর দিদা শুধু বলল যে একবার দেখে নে মা। পছন্দ না হলে মানা করে দিবি”। “আচ্ছা”, আমি বিছানার উত্তর দিকে মাথা করে লম্বালম্বি শুয়ে তাকে বললাম, “তুমি বলে যাও মা। আমি অনেক ইনটারাপট করছি!” মা আমার দিকে তাকাল। তারপর বলা শুরু করে দিলো। “তারা মানে তোর ঠাকুমা, ঠাকুরদা আর তোর বাবারা একটা দিন ঠিক করলেন আমাকে দেখতে আসার জন্য। আমি জানতাম এই সম্বন্ধ কোন ভাবেই পাকা করা সম্ভব নয়। কারণ এইতো গত বছরেই আমি যাকে ভালবাসতাম। যার সঙ্গে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিলাম সে আমাকে ছেড়ে জানি না কোন দুনিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল। হঠাৎ করে তাকে  ভুলে গিয়ে অন্য কারও সঙ্গে হাত ধরে এগিয়ে চলবো এটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না।   তারিখটা ঠিক মনে নেই। তবে দিনটা ছিলো শুক্রবার।ফাল্গুন মাস। কলেজ ছুটি ছিল।সকাল সকাল স্নান করে হাল্কা রোদে দাঁড়িয়েছিলাম। চুল শুকাচ্ছিলাম। তখনই সাদা রঙের একখানা অ্যাম্বাসেডর গাড়ি আমাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো। তা দেখে আমি দৌড়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিলাম। ঘরে তো সবার মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো পড়ে গিয়েছিলো। তোর দাদামশাই বাইরে বেরিয়ে গেটের সামনে থেকে তাদের সম্বর্ধনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে আসছিলেন। আমি জানালার পর্দা সরিয়ে সবকিছুই লক্ষ্য করছিলাম। তোর বাবা ঘাড় নামিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। তারপর তোর ঠাকুমা বেরিয়ে এলেন। মানে সে সময় আমার হবু শাশুড়ি”। মা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি ঠোঁটের কোণে হাল্কা হাসি দিলাম। মা বলল, “তোর বাবাকে প্রথমবার দেখার পর ওর সম্বন্ধে আগে যে ধারণা তৈরি হয়েছিলো,তা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিলো। এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া ছেলে একটু উদ্ধত হবে। ছটফটে হবে বলে ধারণা ছিল। তার পুরো বিপরীত মানুষকে দেখছিলাম। লম্বা,রোগা ছেলেটা। গায়ের রং ফর্সা। সরু চোয়াল। নিখুঁত করে কামানো গোঁফ দাড়ি। চোখে চশমা। পরনে সাদা শার্ট। যার কব্জি অবধি গোটান। বাম হাতে ঘড়ি। খাকি রঙের প্যান্ট। পায়ে ম্যাচিং করা চামড়ার জুতো।   অনির্বাণ অনেকখানি আমার মনের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছিল। ওর ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে রেখেছিল আমায়। ও চলে যাবার পরেও মনে হয়েছিলো সে ফিরে আসবে। একই রূপ নিয়ে। অথবা অন্য কোন নাম নিয়ে। কিন্তু  অনুপম মুখার্জিকে দেখে আমার মন কিছুটা হলেও খারাপ হয়ে গে’ছিলো। কারণ সে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির  মানুষ ছিল। যাকে আমি জানালার পর্দা সরিয়ে দেখছি। সে আমার মনের মতো ছিল না”। আমি হাসলাম, “বল কি? বাবাকে তোমার পছন্দ হয়নি?”     মা আমার দিকে বড় চোখ করে তাকাল, “দাঁড়া না। বলতে দে আমায়। তুই খুব ডিস্টার্ব করছিস”। আমি সংযত হলাম, “ওহ! সরি! আমি আর কথা বলবো না মা”। মা পুনরায় সিলিঙ্গের দিকে তাকাল। তারপর আপন মনেই বলতে লাগলো। “সে কারণেই আমি নিজেকে তাদের সামনে সাজগোজ করে উপস্থাপন করার কোন উৎসাহ খুঁজে পায়নি। যা হবার তাই হবে বলে ধরে নিয়েছিলাম। স্নান করার পর হওয়ায় যে চুল এলোমেলো হয়ে পড়েছিলো তা বাঁধার প্রয়োজন মনে করিনি। তারা ঢুকতেই আমি নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই তোর ঠাকুমার গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম।   তিনি বলছিলেন। আমার দুই সন্তান। এক ছেলে। এক মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে কোলকাতার কাছাকাছিই দিয়েছি। কিন্তু ছেলের জন্য তেমন সুপাত্রী সেখানে পাচ্ছিলাম না। এখন যা দিনকাল হয়েছে। সেখানকার মেয়েরা হাতকাটা ব্লাউজ পরে চোখে রোদ চশমা লাগিয়ে ছেলেদের হাতে হাত ধরে ম্যাটিনি শো তে ভিড় করে। সিগারেট খায়। ও সব আমার পছন্দ নয় বাপু। ওদের দেখলেই আমার রাগ এবং দুশ্চিন্তা দুটোই হয়। ছেলে যদি ওই রকম একখানা মেয়েকে ঘরে নিয়ে ঢোকে! আমাদের স্বামী স্ত্রীকে তো ঘর তারা করবে দুই দিন পর।   আমার একমাত্র সাধের বৌমা হবে ঘরের লক্ষ্মীর মতো। যার সুশীল স্বভাবে ঘরে আয় উন্নতি হবে। আপনজন দের নিয়ে মিলেমিশে থাকবে। শ্বশুর শাশুড়ি মা’কে সম্মান করবে। সমাজের চোখেও গৌরব বাড়বে। ওই রকম উড়ু মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিয়ে তার জীবন নষ্ট করতে চাই না বোন। আপনার মেয়ের ছবি দেখেই তাকে পছন্দ করে নিয়ে ছিলাম। মেয়ের মুখের মধ্যে লক্ষ্মীশ্রী ভাব আছে আপনার। বিশেষ করে তার চোখ দুটো। দেখলেই মনে শান্তি জাগে। আমি ছবি দেখেই অনুর বাবাকে বলেছিলাম। এই মেয়ে শুধু নামেই দেবী নয়। এর রূপগুণও দেবীর মতোই হবে।   তারা আমায় সামনা সামনি দেখতে চায়ছিলেন। তোর দিদা ভেতরে এসে আমাকে তাদের সামনে যেতে বলল। আমি তৈরি ছিলাম না দেখে একটু ধমক দিয়েছিলো। “এমন পাগলীর মতো করে আছিস কেন মা? চুলটা তো একটু গুছিয়ে রাখতে পারতিস?” আমি বললাম, “ওদের পছন্দ হবার হলে এমনিতেই পছন্দ হবে মা। আলাদা করে সাজগোজের প্রয়োজন নেই”। তোর দিদা রেগে গিয়েছিলো, “চোখে একটু তো কাজল লাগিয়ে যা। আমার মেয়ের ভারী মিষ্টি চোখ দুটো সরাসরি দেখে যদি তাদের মনে আকর্ষণ জন্মে”।   আমি বলেছিলাম, “কোন দরকার নেই মা”।   বৈঠকখানায় আমি তাদের সামনে গিয়ে হাজির হয়ে ছিলাম। প্রথমে আমি তোর ঠাকুমা কে দেখেছিলাম।  তিনিও তোর বাবার মতোই রুগ্ন। বুঝেছিলাম ছেলে মায়ের ধারা পেয়েছে। তাকে প্রণাম করে তোর ঠাকুরদার  চরণ স্পর্শ করেছিলাম। তোর ঠাকুরদা কে বেশ সাদাসিধে মানুষ মনে হয়ে ছিল। সাদা হাঁফ হাতা শার্ট। এবং  ধূসর রঙের প্যান্ট পরেছিলেন। গায়ের রং একটু চাপা। খুব কালো না। আবার ফসাও বলা যাবে না তাঁকে। তিনি খুবই বিনয়ের সঙ্গে থাক থাক মা। বলে প্রণাম গ্রহণ করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন। কিন্তু তোর ঠাকুমা উল্টে নিজের পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যাতে আমি তাঁকে ভালো করে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে পারি। শেষে তোর বাবার দিকে হাল্কা তাকিয়ে চোখাচুখি হতেই চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম। আমাদের দুজনের মধ্যেই একটা লজ্জাভাব কাজ করছিলো। তবে তোর বাবার কিছুটা বেশিই। আমার হাসি পাচ্ছিলো।একটা ছেলে হয়ে এমন ভাব তার। বহু কষ্টে নিজের হাসি চেপে রেখেছিলাম।     তোর ঠাকুমা বললেন, “মা তো ভারী মিষ্টি দেখতে। ছবিতে যেমন দেখেছিলাম তার থেকেও অনেক মিষ্টি। দেখো কেমন গোল মুখশ্রী তার। ছোট্ট চিবুক। পুরো মা লক্ষ্মীর মতো”।   আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার ভেতরে চলে গিয়েছিলাম। তোর দাদাই তোর বাবাকে অনেক প্রশ্ন করছিলেন। তাতে হয়তো সে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলো কিনা কে জানে। বিকেলবেলা খাওয়া দাওয়ার পর তোর বাবা আর আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়েছিলেন তারা।আলাপ পরিচয়  বাড়ানোর জন্য। আমরা বাগানের মধ্যে পায়চারি করছিলাম। আমি মুখ নামিয়ে হাঁটছিলাম। সেও। কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সে’ই নিজের থেকে শুরু করেছিলেন, “এই জায়গাটা খুব সুন্দর জানো?” আমি মুখ নামিয়ে মাথা নেড়ে , “হ্যাঁ” বলেছিলাম। সে বলেছিল, “আর তুমিও”। “তুমি দেখতে খুবই সুন্দরী। আমার কল্পনার মতো। বিশেষ করে তোমার ঢেউ খেলানো কোঁকড়ানো চুল গুলো। যার ফাঁক দিয়ে তোমার সুন্দর নাক এবং চোখের লাজুক পলক পড়ছে”। আমি মনে মনে হেসে ছিলাম। “আর ওই ঠোঁটের কোণে হাসি। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হলে আমি খুশিই হবো দেবশ্রী”। ব্যাস ওই টুকুই কথা হয়েছিলো সেদিন আমাদের মধ্যে। “তুমি কিছু বলোনি মা?” মা আমার দিকে তাকাল , “না! আমি কিছু বলিনি”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?” মা বলল, “তারপর বাকি কথা বড়দের মধ্যে হয়েছিলো। তোর বাবা, ঠাকুমা, ঠাকুরদার তো ভীষণ পছন্দ হয়েছিলো। আমাকে মা লক্ষ্মী, মা লক্ষ্মী বলে ডাকছিল সর্বদা।   তোর দাদাইও একটু চিন্তিত ছিলেন আমার জন্য। তা তাদের কথার মধ্য দিয়েই বুঝতে পারছিলাম। তোর  দাদামশাই তোষামোদ করার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। সবসময় একটা কঠোর ভাব নিয়ে থাকতেন। কিন্তু সেদিন তোর ঠাকুরদার হাতে হাত রেখে নিজের কপালে ঠেকিয়ে ছিলেন। জানি না কেন? মেয়ের বাবা বলে হয়তো। যতোই হোক তার মেয়েকে অন্য কারও হাতে তুলে দেবেন। যার ভরণপোষণের দায়িত্ব এর পর থেকে কেবলমাত্র তাদেরই হবে”।   মা আবার মনে মনে হাসল। আমি কিছু বললাম না। সেও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আবার বলা শুরু করলো। “ফেরার সময় তারা তোর দিদা আর দাদামশাইকে কলকাতা যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন। দিনের শেষে যা বুঝলাম। তাতে উভয় পক্ষরই উভয় পক্ষকে পছন্দ হয়ে ছিল। মনে দ্বিধা ছিল শুধু আমার।তোর বাবাকে আমার ভালো লাগেনি তা নয়। তাকে অপছন্দ ছিল সেটাও নয়। কিন্তু ওইযে এতো তাড়াতাড়ি  এগিয়ে যাবো ভাবতেই কেমন লাগছিলো। ফলে মনের মধ্যে একটা চাপা অনিচ্ছা কাজ করছিলো।   পরের মাসে তোর দিদা, দাদু কলকাতায় দেখা করতে গেলেন। ফিরে এসে তারা তো ভীষণ খুশি। তোর বাবার বাড়ির লোকজন নাকি খুবই সম্মান, আপ্পায়ন করেছিলেন। বিয়ের সম্বন্ধের জন্য যখন দুই পক্ষের মধ্যে আর কোন বাধা রইল না তখন একদিন হঠাৎ করেই তোর বাবা আমাদের বাড়িতে টেলিফোন করলেন। আমার খোঁজ নিলেন। অনেকক্ষণ ধরে কথা হতো। সে রাখতেই চাইতো না। বলতো ফোনে নাকি আমার গলার স্বর শুনতে আরও মধুর লাগে তার। আর প্রচুর বিল আসতো দেখে তোর দিদা ভীষণ চটে যেতেন। একদিন বলেই দিলেন, “ ওকে বলিস ওর যদি কথা বলার এতোই ইচ্ছা তো এখানে এসে তোর সঙ্গে কথা বলে যেতেই পারে”। সেটা আমি তোর বাবাকে বলায় একদিন হঠাৎ করেই তারা এসে হাজির হয়ে ছিলেন।   মার্চের শেষ সময়  তখন। আমার জীবন ছিল বেরঙিন বসন্তের মতো। তোর বাবার অমায়িক চাহনি দেখে মনের বেদনা কম হয়েছিলো বটে। গুরু জনেরা বলল যে তোরা দুজন মিলে একটু ঘুরে আয় না। আমাদের হবু জামাই কে বোলপুর শহরটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে আয় একটু।   সত্যি কথা বলতে অনির্বাণ চলে যাবার পর আর সেই রাস্তা দিয়ে কোনোদিন যায়নি। যে রাস্তা দিয়ে আমরা একসঙ্গে বেড়িয়ে ছিলাম। আমাদের স্মৃতি, স্বপ্ন জড়িয়ে ছিলো সেই রাস্তা গুলোর মধ্যে। যখন তোর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠল। তখন আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ওই রাস্তা এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু পারিনি। বরং কোনো উপায় ছিলো না। আমি তৈরী হয়ে আমার হবু স্বামী কে সঙ্গে নিয়ে সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম।মন খারাপ হচ্ছিলো ঠিকই। কিন্তু আগে মনে যে একটা আতঙ্কভাব কাজ করতো।নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যেতো। সেটা তখন অনুভব করছিলাম না। ফলে বেশ ভালোই লাগছিলো আমার। তোর বাবা ওই দিকে বারবার আমার হাত ধরার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু আমি না জানার ভান করে হাত সরিয়ে নিচ্ছিলাম।   অনেক দূর হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার পায়ের মধ্যে সাদা ধুলো জমে গিয়েছিলো। সেটা চোখ নামিয়ে তোর বাবা দেখেছিলো। তারপর সামনে একটা বিশাল বট গাছের নিচে অবস্থিত চাপা কলের হাতল চেপে নিজের থেকেই আমাকে বলেছিলো, “পা ধুয়ে নাও দেবশ্রী”। আমি কলের মুখের কাছে শাড়ি সামান্য তুলে জলের মধ্যে পা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। আর তোর বাবা হ্যাঁ করে দেখছিলো। যেন কোনদিন মেয়ে দেখেনি। এরপর আমরা সামনের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে ছিলাম। তোর বাবার বাম পাশে আমি বসেছিলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু সুন্দর বাতাস এবং পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কানে আসছিলো। দুজনেই হয়তো কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। অথচ তোর বাবা টেলিফোনে অনর্গল কথা বলে যেতো। সেই মানুষটা আমাকে সামনে পেয়েও মুখে কুলুপ এঁটে ছিলো দেখে অবাক হচ্ছিলাম। যদিও কিছুক্ষণ পর সে নিজের থেকেই কথা বলেছিল। সেদিন আমি হালকা ঘিয়া রঙের শাড়ি পরে ছিলাম। তার সঙ্গে ম্যাচিং করা সাদা ব্লাউজ  দুই হাতে আমার ঠাকুমার দেওয়া পুরোনো দিনের মোটা সোনার চুড়ি পরেছিলাম খালি। তা দেখে তোর বাবা বলেছিলো, “তোমার সুন্দরী দুই ভরাট হাতে এই সোনালী চুড়ি দুটো বেশ মানিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন এরা তোমার সৌন্দর্যতা বাড়ায়নি বরং তুমিই এদের আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছো”। আমি হেসে বলে ছিলাম, “ছোট বেলায় আমার ঠাকুমা আমায় উপহার দিয়েছিলেন”। তোর বাবা আমার শাড়ির রং নিয়েও বলেছিলো। “এতো হালকা রং কেন পরো দেবশ্রী? মনে হচ্ছে যেন তোমার বয়স হয়ে গিয়েছে অথবা তুমি বিধবা”। সত্যিই আমার খেয়াল হয়েছিলো। ওই দুর্ঘটনার পর আমি সাজতে ভুলে গিয়েছিলাম। তোর বাবা বুঝতে পেরেছিলো হয়তো যে বিধবা কথাটা তার বলা উচিৎ হয়নি। ফলে সে কিছুটা অন্য রকম ভাবেই নিজের ভুল স্বীকার করে ছিলো।
Parent