একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ১

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74883-post-6283227.html#pid6283227

🕰️ Posted on August 9, 2026 by ✍️ Romzan83 (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2380 words / 11 min read

Parent
প্রথম পর্ব:    ঢাকা শহরের মতিঝিল এর যেকোনো আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের মতোই এই আকাশচুম্বী টাওয়ারটি তার আধুনিকতার জানান দেয়। গ্লাস আর স্টিলের নিখুঁত কারুকাজে তৈরি এই ভবনের সতেরো তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর হেড অফিস। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই কর্পোরেট হাউজের মূল চাবিকাঠি যাঁর হাতে, তিনি হলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান—আলতাফ সিরাজ চৌধুরী। বাইরে তখন বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার গোধূলিলগ্নে। এসি করা বিশাল রুমটার ভেতরটা এক অদ্ভুত শীতলতায় মোড়ানো। ঘরের তাপমাত্রা সবসময় উনি ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করে রাখেন। এই শীতলতা শুধু ঘরের আবহাওয়ার নয়, এর চেয়েও বহুগুণ বেশি শীতল এই রুমের মানুষটির মন। রুমটার ইন্টেরিয়র ডিজাইন দেখলে যেকোনো শিল্পরসিকের চোখ জুড়িয়ে যাবে। ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেতে জুতোর শব্দ পর্যন্ত হয় না। পেছনের সুবিশাল দেওয়ালজোড়া কাঁচের জানলার বাইরে দেখা যাচ্ছে ব্যস্ত ঢাকার অগোছালো আকাশরেখা—অসংখ্য গাড়ি, ব্যস্ত মানুষের ছুটোছুটি, আর দূরে জ্বলে ওঠা নিয়ন আলো। কিন্তু এই দৃশ্য দেখার বা উপভোগ করার মতো কোনো অবকাশ বা মানসিকতা আলতাফ সাহেবের নেই। মাহমুদ আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, কিংবা পার হয়ে গেছে বলা চলে। মাথার চুলগুলোতে এখন রূপালি বরফের আস্তরণ, কিন্তু চেহারার শক্ত ও কর্কশ ভাব বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং বয়সের সাথে সাথে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। চওড়া কপাল, কুঁচকানো ভ্রু, তীক্ষ্ণ ও অনুকম্পাহীন দৃষ্টি—সব মিলিয়ে প্রথম দেখায় যেকোনো মানুষ তার সামনে দাঁড়াতে ভয় পাবে। তার গায়ে সবসময় পরিপাটি করে কাটা স্যুট, টাইয়ের নট নিখুঁত। গত তিন দশক ধরে তার নিয়মে কোনোদিন এতটুকু ব্যত্যয় ঘটেনি। সকাল আটটায় অফিসে ঢোকা, রাত দশটা বা তারও পরে অফিস ত্যাগ করা—এটাই তার জীবন। সাফল্যের সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি তার জীবনের সমস্ত ব্যক্তিগত অর্জনকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। কোনো সঙ্গী নেই, নেই কোনো কোলাহলপূর্ণ সংসার, সন্তানের স্নেহের পরশ বা স্ত্রীর ভালোবাসার উষ্ণতা। তিনি চিরকুমার। একা। এই বিশাল সাম্রাজ্যের তিনি একচ্ছত্র অধিপতি বটে, কিন্তু এই চার দেওয়ালের ভেতরে তিনি এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ। তার জগৎ কেবল ফাইল, ব্যালেন্স শিট, প্রফিট-লস স্টেটমেন্ট আর বিশ্ববাজারের ওঠানামার খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। টেবিলে রাখা মহামূল্যবান মন্টব্লংক পেনটা দিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করছিলেন তিনি। তার মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে আছে। এই মুহূর্তে একটা ছোট ভুলও তিনি সহ্য করেন না। তার অধীনস্থ কোনো এমপ্লয়ি যদি সামান্যতম শৈথিল্য দেখায়, তবে তার কড়া তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়। অফিসের সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়। কেউ তার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও ফিসফিস করে কথা বলে, পা টিপে হাঁটে। .... হঠাৎ করে আলতাফ সাহেবের কলমটা থেমে গেল। ডকুমেন্টের কাগজ থেকে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সরে গেল সামনের বিশাল মেহগনি কাঠের দরজার দিকে। দরজাটা আংশিক বন্ধ, তবে তার ওপরের অংশে স্বচ্ছ কাঁচ লাগানো। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবসময় অত্যন্ত প্রখর। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, রুমের বাইরে করিডোরে কেউ একজন গত পনেরো মিনিট ধরে পায়চারি করছে। ভারী জুতোর মৃদু শব্দ, তারপর থেমে যাওয়া, আবার ফিসফিস করে হাঁটার আওয়াজ। সাধারণ কোনো পিওন বা এক্সিকিউটিভ হলে এতক্ষণ সাহস পেত না। এটা কারোর পদচারণা, যিনি ভেতরে ঢোকার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না। আলতাফ সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। তার কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল। এই সুশৃঙ্খল অফিসে নিয়মভঙ্গ বা বিনা অনুমতিতে কেউ তার রুমের কাছাকাছি আসবে—এটা তিনি বিন্দুমাত্র বরদাস্ত করেন না। তিনি ঘড়ি দেখলেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। অফিসের বাকি সবাই প্রায় কাজ গুটিয়ে বাড়ি চলে গেছে। তাহলে এই সময়ে করিডোরে কে চক্কর কাটছে? তিনি চেয়ার থেকে এক ইঞ্চিও নড়লেন না। শুধু তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো। তিনি অপেক্ষা করলেন দেখতে চান, এই ধৃষ্টতা কার। বাইরে তখন ঘাম মুছছেন আবদুল মালেক। আবদুল মালেকের বয়স চল্লিশের কোঠায়। পরনে মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম, যা গায়ে একটু ঢিলেঢালা। মাথায় টুপিতে সামান্য ময়লা জমেছে। তার কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গালের ওপর। তার হাত দুটো মৃদু কাঁপছে। গত তিন মাস হলো সে এই প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি পেয়েছে। এর আগে তার জীবনটা ছিল বড় বেশি দুর্বিষহ, এক অন্তহীন অন্ধকূপের মতো। মালেকের চাকুরির বয়স সবেমাত্র তিন মাস। তিন মাস আগে যখন সে এই অফিসে প্রথম এসে আলতাফ সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল, সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো তার বুক কেঁপে ওঠে। তখন তার পকেটে একটাও টাকা ছিল না, বাড়িতে ছোট বোন বা অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনার পয়সা ছিল না। পেটে ভাত ছিল না দিনের পর দিন। সেদিন সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। আলতাফ সাহেবের মতো এমন একজন বজ্রকঠিন মানুষের সামনে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। নিজের চরম অভাবের কথা বলতে বলতে একেবারে তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সে। আলতাফ সাহেব সাধারণত আবেগ বা কান্নাকাটিতে গলে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি সেদিনও বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু কী মনে করে যেন সেদিন তার মনের গভীরে অদ্ভুত এক শীতল স্রোত বয়ে গিয়েছিল। তিনি মালেককে তুলে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন এইচআর ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার জন্য। তখনই ১০,০০০ টাকা মাসিক বেতনে তাকে সিকিউরিটি গার্ডের পদে বহাল করা হয়। সেই থেকে মালেক এই চাকরিটাকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত মনে করে। সে আলতাফ সাহেবকে কোনো সাধারণ মানুষ ভাবে না, ভাবে কোনো অদৃশ্য শক্তির দেবতার মতো, যিনি তাকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু আজ মালেকের মনে অন্য একটা তাগিদ কাজ করছে। একটা অদ্ভুত দ্বিধা, এক বুক সংকোচ আর ভয়ের এক মিশ্র অনুভূতি তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে পকেট থেকে বারবার একটা রুমাল বের করে ঘাম মুছছে, আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ..... "ভেতরে কে?" আলতাফ সাহেবের গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বরটা করিডোরের নিস্তব্ধতা চিরে প্রতিধ্বনিত হলো। ইন্টারকমের স্পিকার অন করাই ছিল। এই একটা মাত্র হুকুমেই বাইরে থমকে গেল মালেকের হৃৎস্পন্দন। দরজাটা আস্তে করে ধাক্কা খেল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে, ভয়ে ভয়ে দরজাটা একটু ফাঁক হলো। মালেক ভেতরে প্রবেশ করল। তার দুই হাত কোমরের দুই পাশে শক্ত করে সেঁটে আছে, মাথা নিচু করা। ঘরের ভেতরে পা রেখেই তার পা যেন বরফে পরিণত হলো। বিশাল ওই রুমের জাঁকজমক আর আলতাফ সাহেবের ভীতিপ্রদ উপস্থিতি তাকে আরও ছোট করে দিল। "স্যার... আমি, মালেক," তার গলা দিয়ে শব্দগুলো প্রায় বেরোচ্ছিল না। ঢোক গিলল সে। আলতাফ সাহেব কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তার চোখের চশমাটা সামান্য নামিয়ে দিয়ে মালেকের আপাদমস্তক দেখলেন। তার চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট। "কী ব্যাপার, মালেক? গত কুড়ি মিনিট ধরে বাইরে টিকটিক করে ঘুরছ কেন? অফিসের করিডোর কি তোমার পায়চারি করার জায়গা? নাকি তোমার ডিউটির সময় শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছ?" আলতাফ সাহেবের গলায় বরফের মতো ঠান্ডা কর্কশতা। মালেক ভয়ে কেঁপে উঠল। সে দ্রুত দুই হাত জোড় করে ফেলল। "মাফ করবেন স্যার! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দেবেন। আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না স্যার। আমি শুধু... মানে..." "কথা পেঁচিয়ে লাভ নেই। সোজাসুজি বলো কী চাও। তোমার কাজের সময় আমি ফালতু কথা শোনার মানুষ নই," আলতাফ সাহেব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। মালেক আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। সে তার শুকনো ঠোঁট দুটো চাটল। তারপর অত্যন্ত কাঁপাকাঁপা গলায় যা বলল, তা শোনার জন্য আলতাফ সাহেব প্রস্তুত ছিলেন না। "স্যার, একটা কথা বলার ছিল... আসলে স্যার, আপনি তো জানেন, আমি আজ থেকে তিন মাস আগে এখানে ঢুকেছি। আপনার দয়ায় আমার চাকরিটা হয়েছে। তারপর তো স্যার... এক মাস হলো আমি... আমি বিয়ে করেছি।" শেষ কথাটা বলতে গিয়ে মালেকের মুখটা লজ্জায় ও সংকোচে লাল হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে রইল। আলতাফ সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বিয়ে করেছে? চল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে করাটা হয়তো মালেকের কাছে বড় কোনো ঘটনা, কিন্তু একজন কর্পোরেট চেম্বারের প্রধান নির্বাহীর কাছে এটা চরম এক তুচ্ছ ও অর্থহীন ব্যক্তিগত প্রলাপ। তার মুখের বিরক্তি আরও গাঢ় হলো। "বিয়ে করেছ তো তোমার বউকে নিয়ে সংসার করছ, আমাকে জানাতে এসেছ কেন? এটা কি কোনো ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিস নাকি যে তোমার কাবিননামা আমাকে দেখতে হবে?" আলতাফ সাহেবের গলায় তীক্ষ্ণ ভৎসনা। মালেক তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করল। "না স্যার! না না, তা বলছি না স্যার। আসলে... আমার স্ত্রী... সে গ্রামের সাধারণ মেয়ে। কিন্তু সে আসার পর থেকে যখনই সে শুনেছে যে আপনি মায়া করে আমাকে এই চাকরিটা দিয়েছেন, সে তখন থেকেই আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে স্যার। সারাক্ষণ সে আপনার কথা বলে। বলে যে, ওই লোকটার জন্যই আজ আমাদের দু'বেলা দু'মুঠো ভাত জুটছে, আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছি।" আলতাফ সাহেব নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রইলেন। এসব চাটুকারিতা বা কৃতজ্ঞতার বুলি তার বহু শোনা। তিনি মুখ ফুটে বললেন, "বেশ তো, ভালো কথা। এখন কাজ করো গিয়ে।" কিন্তু মালেক নড়ল না। সে আরও বেশি কুঁকড়ে গিয়ে বলল, "স্যার, আমার স্ত্রী চাচ্ছে... মানে সে  আপনারে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে চায় স্যার। এটাই তার অনেক দিনের একটা বড় ইচ্ছা।" ... কথাটা শোনার পর আলতাফ সাহেবের চোখ দুটো বিস্ময়ে সামান্য কুঁকড়ে গেল। তিনি জীবনে বহু ধরনের প্রস্তাব পেয়েছেন—কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারদের কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব, বিদেশি বড় বড় কোম্পানির পার্টনারশিপের অফার, কিন্তু এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর প্রস্তাব তিনি গত ত্রিশ বছরেও পাননি। তার একটা সিকিউরিটি গার্ডের নববিবাহিতা স্ত্রী তার জন্য রান্না করে আনবে! এ কোন দুনিয়ার কথা বলছে এই লোকটা? "মালেক! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?" আলতাফ সাহেবের গলা এবার বেশ উঁচুতে উঠল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। "তুমি কি ভুলে গেছ এটা কোন জায়গা? এটা কোনো চ্যারিটি হোম নয়, বা তোমার কোনো গ্রাম্য আত্মীয়ের বাড়ি নয় যে যা ইচ্ছা তাই নিয়ে চলে আসবে। আমি কার বাড়িতে কী খাই না খাই, তার কোনো ঠিকঠিকানা আছে? আমি বাইরের মানুষের হাতে রান্না খাই না। আর এগুলো কোন পাগলামি শুরু করেছ?" মালেক ভয়ে এবার একেবারে মেঝেতে বসে পড়ার উপক্রম হলো। সে দুই হাত জোড় করে মিনতি করতে লাগল, "স্যার, রাগ করবেন না স্যার! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি জানি আপনার মতো বড় মানুষ আমাদের মতো গরিবের ঘরের খাবার খাবেন না। কিন্তু স্যার, মেয়েটার খুব শখ। সে সারাদিন রান্না নিয়ে পড়ে থাকে। সে বলছিল, একটা বড় স্যারের জন্য রান্না করতে পারব—এই ভাগ্য কি আমার হবে? সে যদি নিজ হাতে একটু রান্না করে আপনাকে খাওয়াতে পারে, সে মনে খুব শান্তি পাবে স্যার। একটুখানি শুধু... দয়া করুন স্যার।" আলতাফ সাহেবের ভেতরের কাঠিন্যটা আবার শক্ত হয়ে উঠল। তিনি এই সমস্ত আবেগীয় আবর্জনা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পছন্দ করেন। মানুষের সাথে মেলামেশা, তাদের তুচ্ছ সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া—এসব তার অভিধানে নেই। তিনি হাত নেড়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে যাচ্ছিলেন, "অসম্ভব! এসবের কোনো দরকার নেই। যাও কাজে যাও।" কিন্তু ঠিক তখনই মালেক এক অদ্ভুত সত্য প্রকাশ করে ফেলল, যা আলতাফ সাহেবকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। "স্যার, আপনি রাগ করবেন না। আমি আসলে তারিখ ঠিক করতে পারিনি বলেই আজ আপনাকে বলতে এসেছি। ও বলছিল, স্যার যদি তারিখটা বলে দেন, তবে আমি বাজার থেকে ভালো জিনিসপত্র কিনে আনব। ও নিজের হাতে মাছ, মাংস ভালো করে ধুয়ে, মসলা বেটে রান্না করবে। যদি দুই দিন পরে বলেন, তবে আমি সেভাবেই সব জোগাড় করে রাখব।" "দুই দিন পরের কথা বলছ?" আলতাফ সাহেব একটু থমকালেন। তার কড়া মুখের ওপর এক মুহূর্তের জন্য এক ভাবনাহীন ছায়া নেমে এল। তার জীবনটা এতই যান্ত্রিক যে, আগামী দুই দিন পর কী হবে বা তিনি কী করবেন, তার কোনো ব্যক্তিগত রুটিন নেই। সবই মিটিং, প্রেজেন্টেশন আর ফিনান্সিয়াল অডিটের ছকে বাঁধা। তার ভেতরে অদ্ভুত এক ক্লান্তি কাজ করছিল। গত কয়েকদিন ধরে পেপটিক আলসারের কারণে অফিসের ক্যান্টিনের বা বাইরের রেস্টুরেন্টের তেল-মশলাযুক্ত খাবার তার সহ্য হচ্ছিল না। ডাক্তার তাকে বারবার নরম, সেদ্ধ ও ঘরোয়া খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু তার তো রান্না করার কেউ নেই। সারাদিন ফ্ল্যাটে ফিরে হয় ঠান্ডা খাবার, নয়তো হোটেলের পার্সেল খেতে হয়। মালেকের সরল মুখের দিকে তাকিয়ে তার হঠাৎ মনে হলো—একটা গরিব মানুষ, নতুন সংসার পেতেছে, তার বউয়ের আনন্দের একটা ছোট শখ হয়েছে। এতে তার কী এমন ক্ষতি হবে? তাছাড়া, সাধারণ ঘরোয়া রান্নার গন্ধ কেমন হয়, তা তো তিনি ভুলেই গেছেন প্রায়। আলতাফ সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন, "শোনো মালেক। আমি এসব শখ-টখের ধার ধারি না। আজ বলছি বলেই বলছি—খাবারের বা এসব রান্নার কোনো প্রয়োজন নেই।" মালেকের মুখটা একদম শুকিয়ে গেল। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। কিন্তু আলতাফ সাহেবের পরের বাক্যটি মালেকের ম্রিয়মাণ মুখে হঠাৎ আলোর ঝলকানি এনে দিল। "তবে... যদি এতই জেদ ধরে থাকে তোমার ওই বউ, তাহলে পরশু দিন... মানে আগামী বুধবার কি আর কী... আচ্ছা, পরশু দিন দুপুরের লাঞ্চের সময় যাব। এর বেশি যেন কোনো কথা না হয়। যাও, এখন বাইরে যাও।" .  মালেক যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আলতাফ সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন! তার বুকটা গর্বে ও আনন্দে ফুলে উঠল। তার চোখে জল এসে গেল, তবে সেটা কষ্টের নয়, চরম কৃতজ্ঞতার। সে বারবার মাথা নিচু করে সালাম ঠুকতে লাগল। "বহু ধন্যবাদ স্যার! আল্লাহ আপনার ভালো করুন! আপনি অনেক বড় মনের মানুষ স্যার! আমি ও ইতি পরশু ঠিক দুপুরের সময় খাবার নিয়ে রেডি থাকব স্যার। আসসালামু আলাইকুম।" মালেক আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে, বুকভরা একরাশ আনন্দ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল এবং আলতো হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিল। রুমটা আবার আগের মতো নিখুঁত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। এসি-র ঠান্ডা বাতাসটা মৃদু আওয়াজে বইছে। আলতাফ সাহেব আর আগের মতো ডকুমেন্টে মনোযোগ দিতে পারলেন না। তিনি কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারে পেছনে মাথা এলিয়ে দিলেন। চোখ দুটো বন্ধ করলেন কিছুক্ষণের জন্য। তার মনের গহীনে কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি নাড়া দিয়ে গেল। একটা সিকিউরিটি গার্ড, যার পেটে হয়তো সবসময় ঠিকমতো ভাত জোটে না, তার নববিবাহিতা স্ত্রী তার মতো একজন কর্পোরেট টাইকুনের জন্য নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে  চাইছে! কেন? কী পাওয়ার আশায়? কোনো স্বার্থ নেই তো এর পেছনে? কর্পোরেট দুনিয়ায় এত বছর কাটিয়ে তিনি একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছেন—বিনামূল্যে কেউ কাউকে এক কাপ চাও খাওয়ায় না। সবার পেছনেই কোনো না কোনো স্বার্থ থাকে। মালেক কি তবে তার বেতনের প্রমোশন চায়? কিংবা তার মেয়ের বা বোনের কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে চাইছে? কিন্তু লোকটার চোখ দুটো যখন তিনি দেখেছেন, তখন সেখানে কোনো চতুরতার ছাপ পাননি। সেখানে ছিল শুধুই এক ধরনের সহজ সরল আবেগ, কৃতজ্ঞতার বিশুদ্ধ প্রকাশ। আলতাফ সাহেব চোখ খুললেন। তার সামনে বড় কাঁচের জানলার বাইরে তখন রাতের ঢাকা শহরটা অসংখ্য আলোয় ঝলমল করছে। নিচের রাস্তায় ছোট ছোট পিঁপড়ের মতো গাড়িগুলো ছুটছে। তিনি একা। একদম একা। এই বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক তিনি ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে যখন তিনি ফ্ল্যাটে ফেরেন, তখন চার দেওয়াল তাকে গিলে খাওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। কোনো দিন কেউ তার জন্য দরজা খুলে দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। কেউ জিজ্ঞেস করে না—"সারাদিন কেমন কাটল?" তিনি মনে মনে ভাবলেন, আচ্ছা... ওই সিকিউরিটি গার্ডটার বউ... সে দেখতে কেমন হবে? নিশ্চয়ই গ্রামের সহজ-সরল কোনো তরুণী। তার হাতের রান্না কেমন হবে কে জানে? হয়তো একটু ঝাল বেশি দেবে, কিংবা নুন কম হবে। তবুও, সে তো নিজ হাতে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে রান্না করবে। তার মনের একটা কোণ মৃদু শিউরে উঠল। অদ্ভুত এক ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "পুত্রবধূ..." শব্দটা তার মনের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো। হাঁ, তার তো কোনো সন্তান নেই। বিয়েই করেননি তিনি। কিন্তু যদি তার কোনো ছেলে থাকত, যদি তার একটা ভরা সংসার থাকত, তবে হয়তো এই বয়সে এসে তার ঘরেও এমন একজন নববিবাহিতা পুত্রবধূ থাকত। যে হয়তো প্রতিদিন সকালে চা বানিয়ে দিত, দুপুরের খাবার টিফিন বক্সে গুছিয়ে দিত, বাবার মতো যত্ন করে খেয়াল রাখত। আলতাফ সাহেব নিজের এই অবাস্তব চিন্তায় নিজেই মৃদু হাসলেন। কী সব আবলুস-তাবলুস ভাবছেন তিনি! এই বয়সে এসে এসব  আবেগপ্রবণ চিন্তা তার মতো মানুষের সাথে মানায় না। তিনি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি পাথর দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছেন, যার জীবনে অনুকম্পার কোনো স্থান নেই। তবুও... পরশু দিনের কথাটি ভাবতেই তার মনের কোথাও যেন একটুখানি কৌতূহলের বরফ গলতে শুরু করল। তিনি টেবিলে রাখা ফাইলটার পাতা উল্টালেন। কিন্তু মনের ভেতরে মালেকের সেই কথাগুলো আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীর রান্নার কল্পনার চিত্রটা বারবার ভেসে উঠতে লাগল। একটা অদৃশ্য সুতো যেন তাকে এই তুচ্ছ অথচ উষ্ণ ঘটনার সাথে বেঁধে ফেলল। বাইরে ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগোতে লাগল, আর আলতাফ সাহেব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সামনের দেয়ালঘড়িটার দিকে, যেখানে সময় যেন একটু ধীরেই চলল। (চলবে)
Parent