একটি আজাইরা জেল/কয়েদি সংক্রান্ত ক্রাইম গল্প - অধ্যায় ৫
**পর্ব ২ – ভাগ ১: শহরের প্রথম পদক্ষেপ (City Arrival Flashback)**
দুই বছর আগের এক সকাল। গ্রামের সেই ছোট্ট বাস স্ট্যান্ড থেকে নাদিয়া রহমান শহরের বাসে উঠল। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ—মায়ের হাতে বানানো কয়েকটা রুটি, একটা পুরানো সালোয়ার-কামিজের সেট, আর একটা ছোট্ট টিনের বাক্সে তার কলেজের সার্টিফিকেট। তার পরনে সবুজ সালোয়ার-কামিজ, চুল খোলা, কপালে হালকা সিঁদুরের ছোঁয়া। চোখে ভয় আর আশার মিশেল। বাসের জানালা দিয়ে গ্রামের শেষ গাছটা যখন অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন নাদিয়ার চোখে অশ্রু জমল। কিন্তু সে মুছে ফেলল। “আমাকে যেতেই হবে,” সে মনে মনে বলল।
বাসের পাশের সিটে বসে ছিল ফাহিম। তার কলেজের বয়ফ্রেন্ড, এখন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ফাহিমের বয়স ২৬, লম্বা, ফর্সা, চোখে চশমা, চুল ছোট করে কাটা। সে শহরে একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করে, মাসে দশ হাজার টাকা পায়। নাদিয়ার জন্য সে সব ছেড়ে দিয়ে এসেছে—আজ তাকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে সে নিজের কাজে চলে যাবে। ফাহিম নাদিয়ার হাত ধরে বলল, “ভয় পেয়ো না, নাদিয়া। আমি আছি। রাশেদ স্যার তোমার বাবার বন্ধু, তিনি তোমাকে সাহায্য করবেন।”
নাদিয়া মাথা নাড়ল। “জানি। কিন্তু শহরটা… এত বড়। আমি কী করবো যদি ভুল করে ফেলি?”
ফাহিম হাসল, তার হাত চেপে ধরল। “তুমি সাদাসিধা, সেটাই তোমার শক্তি। শুধু সত্যি কথা বলো, কাজটা ভালো করে করো।”
বাস শহরে ঢুকল। উঁচু উঁচু বিল্ডিং, গাড়ির হর্ন, লোকের ভিড়। নাদিয়ার চোখ বড় বড়। সে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল। ফাহিম তাকে বাস থেকে নামাল, তারপর একটা রিকশায় তুলল। “চল, চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ।”
কোম্পানির বিল্ডিংটা বড়, কাচের। দরজায় সিকিউরিটি। ফাহিম নাদিয়াকে নিয়ে ভিতরে ঢুকল। রিসেপশনে একজন মহিলা বলল, “কী ব্যাপার?”
ফাহিম বলল, “নাদিয়া রহমান। রাশেদ স্যারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।”
রিসেপশনিস্ট ফোন করল। কিছুক্ষণ পর একটা লোক এল—রাশেদ চৌধুরী। ৫০ বছরের, লম্বা, স্যুট পরা, চোখে চশমা, মুখে হাসি। কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত ছায়া। সে নাদিয়াকে দেখে বলল, “আরে নাদিয়া! এসো, এসো। তোমার বাবা আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। তুমি এখানে চাকরি পাবে, চিন্তা নেই।”
নাদিয়া মাথা নিচু করে বলল, “ধন্যবাদ স্যার। আপনি অনেক উপকার করেছেন।”
রাশেদ হাসল। “স্যার বলার দরকার নেই। তবে অফিসে সবাই স্যার বলে। চলো, তোমার জয়েনিং দেখাই।”
ফাহিম বলল, “স্যার, আমি তাহলে যাই। নাদিয়া, সন্ধ্যায় ফোন করো।”
নাদিয়া বলল, “ঠিক আছে। তুমি সাবধানে যেয়ো।”
ফাহিম চলে গেল। নাদিয়া একা রয়ে গেল। রাশেদ তাকে HR-এ নিয়ে গেল। ফর্ম ফিলাপ, আইডি কার্ড, তারপর একটা ছোট কিউবিকল। “এখানে তোমার ডেস্ক। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করবে। প্রথমে শিখে নাও।”
নাদিয়া মাথা নাড়ল। “জি স্যার।”
অফিসের পরিবেশ তার কাছে একদম নতুন। এসি-র ঠান্ডা, কম্পিউটারের শব্দ, সবাই ইংরেজিতে কথা বলছে। নাদিয়া তার কিউবিকলে বসল। তার পাশের ডেস্কে একটা মেয়ে বসে আছে—রুবি। রুবির বয়স ২৮, দেখতে কুৎসিত—মুখে দাগ, নাক বাঁকা, দাঁত বের হয়ে আছে, চোখ ছোট। কিন্তু তার চোখে একটা মায়া, হাসলে যেন সারা মুখ আলো হয়ে যায়। সে নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল।
“হাই! নতুন? আমি রুবি।”
নাদিয়া লজ্জা পেয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি নাদিয়া।”
রুবি চেয়ার ঘুরিয়ে কাছে এল। “ভয় পেয়ো না। এখানে সবাই প্রথমে অভ্যস্ত হতে পারে না। তুমি গ্রাম থেকে এসেছো, তাই না? আমিও তো গ্রামের মেয়ে।”
নাদিয়া অবাক হয়ে বলল, “সত্যি? কোথা থেকে?”
রুবি বলল, “ফরিদপুর। তুমি কোথা থেকে?”
“যশোর।”
রুবি হাসল। “আরে, তাহলে তো আমরা কাছাকাছি। চল, তোমাকে সব দেখাই। এই কম্পিউটারে লগইন করো। পাসওয়ার্ড দিয়ে দিচ্ছি।”
রুবি নাদিয়াকে সাহায্য করতে লাগল। তার কথা বলার ধরন মিষ্টি, সে নাদিয়ার হাত ধরে মাউস ঘোরাল, স্ক্রিন দেখাল। নাদিয়া একটু স্বস্তি পেল।
দুপুরের দিকে লাঞ্চ ব্রেক। রুবি বলল, “চল, ক্যান্টিনে যাই।”
ক্যান্টিনে অনেক লোক। নাদিয়া লজ্জা পেয়ে গেল। সবাই তাকে দেখছে। কয়েকজন ছেলে ফিসফিস করে বলল, “গ্রামের মেয়ে এসেছে। দেখ, কী সাদাসিধা!”
রুবি তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী দেখছো? কাজে যাও।”
নাদিয়া বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ রুবি।”
রুবি হাসল। “এখানে সবাই এমন। তুমি শুধু কাজটা ভালো করে করো।”
খাওয়ার সময় রুবি নাদিয়ার পাশে বসল। তারপর হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে দেখাল। একটা কালো গাড়িতে একটা ছেলে উঠছে—রিয়াজ, রাশেদ স্যারের ছেলে। রুবি ইশারায় দেখাল, কিন্তু কিছু বলল না। নাদিয়া বুঝল না। রুবি শুধু হাসল।
বিকেলে অফিস শেষ। নাদিয়া একা বের হল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফোন করল ফাহিমকে। ফাহিম এসে তাকে নিয়ে গেল। “কেমন লাগল?”
নাদিয়া বলল, “ভালো। রুবি নামে একটা মেয়ে অনেক সাহায্য করল।”
ফাহিম হাসল। “দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রাতে নাদিয়া তার ছোট্ট রুমে শুয়ে ভাবল—শহরটা ভয়ের, কিন্তু আশারও। রুবির মায়া, ফাহিমের সাহস, রাশেদ স্যারের উপকার—সব মিলে তার মনে একটা আলো জ্বলল। কিন্তু তার মনে একটা ছোট্ট সন্দেহও জাগল—রুবির ইশারাটা কী ছিল? আর রিয়াজ কে?
এই ছিল তার শহরে প্রথম দিন। একটা নতুন শুরু, যা পরে তার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেবে।