কুহেলী - এক সতী বিধবার অজানা গন্তব্য (সিরিজ) - অধ্যায় ৬
(6)
ওরা একটা খোলা মাঠের মধ্যে এক বিশাল বট বৃক্ষের পাদদেশে বসে আছে, পাশাপাশি... কুহেলী আর শান্তনু। শান্তনুকে সব কথা কুহেলী খুলে বলেছে। কুহেলীর মন যেন বেশ হালকা বোধ হচ্ছে এতক্ষনে। মনের বোঝা যেন সে নামাতে পেরেছে কিছুটা এই নির্জন পল্লীর সবুজ মাঠের মধ্যিখানে এই ছায়াভরা বট বৃক্ষের পদতলে বসে এক অপরিচিত কিন্তু বিশ্বস্ত এক যুবকের কাছে সব প্রকাশ করে।
কুহেলীর কেন জানি এই যুবকটিকে বেশ ভালো লাগছে। না, ঠিক প্রেম সুলভ ভালো লাগা নয়, একজন বন্ধু কে যেমন মনের কথা খুলে বলা যায়, যেমন খারাপ সময়ে তাকে পাশে পাওয়া যায়, যেমন অন্ধকারের মধ্যে ছোট্ট একটি আলোকরেখা-কে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়, ঠিক তেমন। ছেলেটির অর্থাভাব থাকলেও তার পোশাকে রুচির পরিচয় পাওয়া যায়, সাদা শার্টের বুকের কাছের বোতাম খোলা, নেভি ব্লু জিন্সের সঙ্গে তাকে দেখাচ্ছেও বেশ! শরীরে প্রতেকটা মাংসপেশি যেন হাতে গোনা যাবে। মুখেও এক পবিত্র ভাব ফুটে উঠেছে। মেয়েরা সাধারণত খুব চেনা কেউ না হলে একজন ছেলের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে না, কুহেলীও তাকাচ্ছে না সরাসরি। মাঝেমধ্যে এদিক ওদিক তাকানোর ফাঁকে ফাঁকে শান্তনুকে যেন জরিপ করে চলেছে।
কিন্তু হায় রে অসহায় নারী...তোর এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে একজন গোপনে তোকেই ভোগ করার বাসনা তৈরি করছে এক জানোয়ার সেটা যদি তুই তোর সারল্যতা ভেদ করে দেখতে পেতিস, তাহলে হয়তো পূর্ণিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক ছোট্ট ঘরের ভেতরে এক জানোয়ার বীর্যের সন্তান তোকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হতো না! যেন এই অদৃশ্য বাতাস শান্তনুর মনের কথা কুহেলীর কানে ফিসফিসিয়ে শোনাতে চাইছে, জানাতে চাইছে,
পালিয়ে যা এখান থেকে, পালিয়ে যা কুহেলী... ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে চারপাশে...শিকার এবার পড়ল বলে!!!
কিন্তু না, কুহেলী কিছুই বুঝলো না, কুহেলী এটাও বুঝলো না যখন সে বিশ্বস্ত শান্তনুকে তার অতীতের সব কাহিনী বর্ণনা করে যাচ্ছিল, তখন সেই শান্তনুই মনে মনে তার করে রাখা প্ল্যানে পরিবর্তন করে চলেছিল অবিরাম... ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন পথে এগোতে হয়। যখন কুহেলী তার সব কাহিনী শান্তনুকে বলা শেষ করলো, ততক্ষণে শান্তনুর মস্তিস্কে ছক কষাও শেষ হল!
একটা গাড়ি এসে থামলো তাদের সামনের রাস্তায়। একটা SUV, BMW। কুহেলী সেদিকে তেমন গুরুত্ব দিলনা। শান্তনু তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
এবার বলুন আপনি কোথায় যাবেন। কোথাও তো গিয়ে থাকবেন! রাস্তায় রাস্তায় আপনার মতো একজন সুন্দরী তো ঘুরে বেড়াতে পারে না।
কুহেলী আনমনেই বললো,
জানিনা। তবে...।
বলে তার বাঁ হাতের রূপো দিয়ে গড়া একটা বালা খুলে শান্তনুর হাতে দিয়ে বললো,
আমি এবার আসি। কিন্তু আপনায় এটা নিতে হবে। আপনি আমার এতো সাহায্য করলেন, বন্ধুর মতো পাশে রইলেন, কিন্তু আমার কাছে যে দেবার মতো আর কিছু নেই, এই বালাখানা মায়ের। এটা রাখুন। নয়তো আমার খারাপ লাগবে, আমি যে কারোর কাছ থেকে বিনামূল্যে কিছু নিই না। দয়া করে এটা নিন।
শান্তনু একটু অবাক হয়ে যাওয়ার ভঙ্গি করে একটা টোপ দিলো,
কি বলছেন আপনি? আমি আপনার খাবারের মূল্য নেবো? একজন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে কি দুটো খাবার-ও কিনে দিতে পারবো না? বারে বারে আপনি যে আমায় নিচেই নামাচ্ছেন!
এই কথায় শান্তনু কুহেলীর মনে একটা বিশেষ সম্মানের জায়গা দখল করে নিল অজান্তেই। একইসঙ্গে কুহেলী খুব দুঃখও পায় তাকে এভাবে বলাতে, কিন্তু সে যে তার সরল মনে যা এসেছে তাই বলেছে, এই অপরিচিত কিন্তু ভালো মানুষটিকে তার দুঃখ দিতে একটুও মন চাইল না, তাই সে বলল,
বেশ, তবে আমারও একটা শর্ত আছে, আপনি আমায় সঙ্গ দিয়ে আপনার মানবিকতা প্রকাশ করেছেন, আমিও তেমনি কোনো উপায়ে আপনার জন্য কিছু করে যেতে চাই। বলুন কি করতে হবে?
শান্তনু দেখলো টোপ গিলেছে মাছে। আর ভনিতার কোন প্রয়োজন নেই। এবার সে উঠে দাঁড়িয়ে কুহেলী সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় টোপটা দিলো,
যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তাহলে একটা কথা বলতে পারি?
বলুন।
আপনি কোথায় যাবেন, এই নিয়ে আমার চিন্তা হচ্ছে। যদি আপনি চান তাহলে আমি একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি আপনার জন্য। আপনার উপার্জন-ও হবে, সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাঁচতেও পারবেন।
তারপর শান্তনু তার পরিচয় প্রকাশ করলো এবং এটাও বললো যে পূর্ণিয়ায় একটি গাঁয়ে তার একটা বড় Goat Farm রয়েছে, সেখানে অনেক লোকজন কাজ করে, সেখানে ম্যানেজার হিসেবে যদি কুহেলী জয়েন করে, তাহলে দুপক্ষেরই উপকার।
কুহেলী একটা ঝটকা খেলো সব শুনে। শান্তনুকে সে যা ভেবেছিল তা তো নয়ই, বরং সে অগাধ টাকার মালিক। এবং একইসঙ্গে সেই ম্যানেজারের চাকরির কথা শুনে তার ভেতরে দুটো ভাবের উদয় হলো - এক, তার সত্যিই একটা কাজ দরকার, এই কাজের মাধ্যমে সে স্বাধীনতা পেতে পারে, আর দুই, এই শান্তনু ছেলেটি তার মনের গহনে এক জ্যোতির মতো দেখা দিয়েছে। সত্যিই কি সে এবার একটু সুখ পাবে, এই অতীতের যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবে, একটু শান্তি পাবে।
কুহেলী একটু ইতস্তত করে বলল,
আমি কি পারবো এত বড়ো ফার্মের দায়িত্ব নিতে?
আপনি ছাড়া আমি আর যোগ্য কারোকে দেখিনি!
শান্তনুর এই কথায় কুহেলীর মনে অদ্ভূত একটা অনুভূতি এসে যেন অদৃশ্য হলো, কি এই অনুভূতি! যা-ই হোক, বড্ডো শান্তি তো এতে! সে শান্তনুর দিকে চেয়ে একটু হাসলো, বদলে শান্তনুও একটা হাসি দিলো।
তারা দুজনে সেই SUV তে উঠে বসলো। গাড়ি ছুটে চললো এক অজানা অচেনা অথচ সুখময় গন্তব্যের দিকে!
(চলবে)