মায়ের বান্ধবী - অধ্যায় ১১
১২।
তনিমা আন্টি সারারাত আমার সঙ্গেই থাকলেন। শারীরিক মিলনের পর সাধারণত যা হয়—এক ধরণের ক্লান্তি, অবসাদ, কিংবা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়া—আমাদের ক্ষেত্রে তার কিছুই হলো না। বরং ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করে, আমাদের সম্পর্কের আকাশটাও ঠিক তেমনই পরিষ্কার হয়ে গেল। আমাদের প্রথম সেই উদ্দাম মিলনের পর আমরা আর দ্বিতীয়বার মিলিত হইনি। শরীরের ক্ষুধা মিটে যাওয়ার পর মনের ক্ষুধাটা জেগে উঠেছিল।
মায়ের বান্ধবী এবং বয়সে বড় হওয়ার কারণে আমার মধ্যে যে প্রাথমিক লজ্জা, বিস্ময়, শঙ্কা আর অস্বস্তি ছিল, তা ওই এক রাতেই কর্পূরের মতো উবে গেল। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম। এসি চলছে, ঘর অন্ধকার, আর লেপের নিচে দুটো নগ্ন শরীর একে অপরের উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে। বাকি সময়টা আমরা শুধু কথা বললাম। ফিসফিস করে বলা সেই সব কথা, যা দিনের আলোয় বলা যায় না। যাকে ভদ্রসমাজে 'নোংরা কথা' বা 'পিলো টক' বলা হয়। কিন্তু আমার কাছে তখন ওগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক কবিতা মনে হচ্ছিল।
আন্টি আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তন্ময়, তুই কি আমাকে জাজ করছিস? মনে হচ্ছে আমি খুব খারাপ?" আমি তার বুকে মাথা রেখে বলেছিলাম, "খারাপ-ভালোর সংজ্ঞা কে ঠিক করে আন্টি? আপনি সুখী?"
"ভীষণ।"
"আমিও। তাহলে আর কোনো কথা নেই।"
তিনি হেসে আমার কানে কামড় দিয়েছিলেন। "তোর ওই লাজুক ভাবটা কিন্তু বিছানায় একদম ছিল না। তুই তো রীতিমতো বুনো জানোয়ার হয়ে গিয়েছিলি।" আমি বলেছিলাম, "আপনিই তো উস্কে দিলেন।" এভাবেই রাত গড়িয়ে ভোরের দিকে গেল। মসজিদে যখন ফজরের আজান শুরু হলো—"আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম"—তখন তনিমা আন্টি নড়েচড়ে উঠলেন। "তন্ময়, ছাড়। এবার যেতে হবে। আলো ফুটে গেলে বিপদ।" তিনি খুব সতর্কভাবে বিছানা থেকে নামলেন। অন্ধকারে হাতড়ে নিজের নাইটিটা খুঁজে নিয়ে গায়ে জড়ালেন। আমি শুয়ে শুয়ে দেখলাম, আমার কামনার দেবী আবার সাধারণ মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছেন। যাওয়ার আগে তিনি আমার কপালে একটা চুমু খেলেন। "ঘুমিয়ে পড়। বেলা করে উঠবি। আর হ্যাঁ, চার্জারটা থ্যাঙ্কস।" তিনি আমার চার্জারটা টেবিল থেকে তুলে নিলেন। ওটা যেন তার এই ঘরে আসার ভিসা।
দরজাটা তিনি খোলা রেখেছিলেন কি না আমার মনে নেই, তবে এখন খুব সাবধানে, বিড়ালের পায়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম, টেরই পেলাম না।
আমার ঘুম ভাঙল পরদিন দুপুর এগারোটার দিকে। শনিবার, ছুটির দিন। তাই বাসার নিয়মে একটু শিথিলতা আছে। কেউ আমাকে ডাকেনি। ঘুম ভাঙার পর বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। বালিশে, চাদরে তনিমা আন্টির গায়ের গন্ধ লেগে আছে। সেই গন্ধ শুঁকে আমার মনে হলো গত রাতের ঘটনা কোনো স্বপ্ন ছিল না, এটা ছিল এক জ্বলন্ত বাস্তব।
ফ্রেশ হয়ে যখন ডাইনিং স্পেসে গেলাম, তখন দেখি সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। বাবা সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন, মা রান্নাঘরে দুপুরের মেনু নিয়ে বুয়ার সাথে ঝগড়া করছেন, আর মৃন্ময় টিভিতে ক্রিকেট হাইলাইটস দেখছে। তনিমা আন্টি বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে আছেন। হাতে কফির মগ। রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছেন তিনি। আমাকে দেখে তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকালেন। "কিরে? নবাবজাদার ঘুম ভাঙল? গুড মর্নিং।" আমিও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। "গুড মর্নিং আন্টি।" তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি একটা বার্তা পেলাম। সেই দৃষ্টিতে লেখা আছে—"সব ঠিক আছে। কেউ কিছু জানে না।"
আমরা দুজন এমন ভাব করলাম যেন সব স্বাভাবিক। যেন কাল রাতে কোনো ঝড় এই ফ্ল্যাটের ওপর দিয়ে বয়ে যায়নি। এই অভিনয়টা আমরা দুজনেই খুব দক্ষভাবে করছি। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মুখোশ পরে থাকতে হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে আমাদের দুজনের ভেতরেই এক তীব্র হাহাকার কাজ করছিল। আমরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি, কথা বলছি, হাসছি—কিন্তু আমাদের মন পড়ে আছে সেই বন্ধ দরজার ওপাশে। আমরা দুজনেই একাকীত্বের অপেক্ষায় আছি, কখন আবার সব কোলাহল থামবে, কখন আবার আমরা মিলিত হব।
সকালটা কেটে গেল এক ধরণের অলস মন্থরতায়। যেহেতু আজ শনিবার, তাই সবাই বাসায়। বাবা-মা কেউ বাইরে যাচ্ছেন না। মৃন্ময়েরও কোচিং নেই। এই ভরা মজলিসে আমাদের গোপন ইশারা বিনিময় করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আমি সোফায় বসে ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছি, কিন্তু আমার চোখ আন্টির দিকে। তিনি শাড়ির আঁচলটা ঠিক করছেন, আর আমি কল্পনা করছি ওই শাড়ির নিচে গত রাতে আমি কী দেখেছি। তিনি হয়তো পানি খাওয়ার জন্য গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছেন, আর আমার মনে পড়ছে ওই ঠোঁটের স্পর্শ।
দুপুরের খাওয়ার পর বাবা একটা প্রস্তাব দিলেন। "আজ তো আবহাওয়াটা বেশ ভালো। বিকেলে চলো কোথাও বের হই। বাসায় বসে থেকে বোর হচ্ছি।" মৃন্ময় সাথে সাথে সায় দিল। "হ্যাঁ বাবা! চলো মোড়ের মাথায় ওই নতুন রেস্তোরাঁটায় যাই। 'স্কাই ভিউ টেরাস'। ওখানকার নাকি ভিউ খুব সুন্দর।"
মা বললেন, "তনিমা, তোর কি আপত্তি আছে?" তনিমা আন্টি হাসলেন। "আমার আবার আপত্তি কিসের? চলো। বিকেলে একটু হাঁটাহাঁটিও হবে।"
বিকেলে আমরা সবাই তৈরি হয়ে নিচে নামলাম। তনিমা আন্টি আজ একটা ছাই রঙের জর্জেট শাড়ি পড়েছেন। সাথে স্লিভলেস ব্লাউজ। চুলগুলো হাতখোঁপা করা। তাকে অসম্ভব সুন্দর আর অভিজাত লাগছে। রাস্তায় বের হতেই পথচারীদের দৃষ্টি তার দিকে আটকে যাচ্ছে। আমার বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। এই যে এত মানুষ তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাচ্ছে, তারা কেউ জানে না এই নারীর আসল রূপ। তারা কেউ জানে না এই শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরির কথা। একমাত্র আমি জানি। আমি—তন্ময়—এই রহস্যের একমাত্র চাবিকাঠিধারী।
আমরা হেঁটে রেস্তোরাঁর দিকে গেলাম। বাবা আর মা সামনে হাঁটছেন, গল্প করতে করতে। মৃন্ময় তাদের সাথে। আমি আর আন্টি একটু পেছনে। রাস্তার ভিড়ের সুযোগ নিয়ে আন্টি আমার গা ঘেঁষে হাঁটলেন। তার হাতটা আলতো করে আমার হাত স্পর্শ করল। ফিসফিস করে বললেন, "কাল রাতে নখের দাগটা দেখেছিস?" আমি চমকে তাকালাম। "কোথায়?"
"পিঠে। আয়নায় দেখলাম। তুই আমাকে একদম জখম করে দিয়েছিস রে।"
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, "সরি আন্টি। বুঝতে পারিনি।"
"সরি বলছিস কেন? আমি তো কমপ্লেইন করছি না। দাগটা দেখে ভালো লাগল। মনে হলো তুই আমার সাথে আছিস।"
রেস্তোরাঁটা দশতলার ছাদে। খোলা আকাশ। বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে টেবিলে। হালকা বাতাস দিচ্ছে। পরিবেশটা খুব মনোরম। আমরা গোল হয়ে বসলাম।
আড্ডা শুরু হলো। বাবা তার ব্যাংকের গল্প করছেন, মা সংসারের গল্প। মৃন্ময় তার কলেজের বন্ধুদের হাসির ঘটনা শোনাচ্ছে। তনিমা আন্টিও যোগ দিচ্ছেন, হাসছেন, কথা বলছেন। সবাই খুব খুশি। খাওয়া-দাওয়া হলো—মোগলাই পরোটা, কাবাব আর চা। কিন্তু আমার মন কিছুতেই এই আড্ডায় নেই। আমি শারীরিকভাবে এখানে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে আমি আছি তনিমা আন্টির শরীরে। তিনি যখন হাসছেন, তার বুকের কাপড়টা একটু নড়ে উঠছে। আমি আড়চোখে সেটা দেখছি। তিনি যখন চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, আমি তার গলার দিকে তাকিয়ে আছি। আমার মস্তিষ্কে শুধু একটাই চিন্তা—কখন রাত হবে? কখন আবার আমরা চার্জারের অজুহাতে এক হব?
তনিমা আন্টি মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তার চোখের ভাষায় আমি বুঝতে পারছি তিনিও একই কথা ভাবছেন। সবার সামনে এই যে দূরত্ব, এটা আমাদের আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের টান সবসময়ই বেশি থাকে।
সন্ধ্যা নেমে এল। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। আমরা বাসায় ফিরলাম।রাতে ডিনারের টেবিলে বসার পর তনিমা আন্টি একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। মনে হলো তিনি কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবছেন। বাবা আর মা খাচ্ছেন আর টিভির খবরের সমালোচনা করছেন। হঠাৎ তনিমা আন্টি গলা ঝাড়লেন। "জামিল ভাই, রাশেদা... একটা জরুরি কথা ছিল।"
বাবা খাওয়া থামিয়ে তাকালেন। "বলো তনিমা। সিরিয়াস কিছু?" তনিমা আন্টি পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ, একটু সিরিয়াসই। আসলে আমার তো ফেরার সময় হয়ে এল। আর বেশি দিন নেই। কিন্তু আসল কাজটাই এখনো করা হয়নি।" মা বললেন, "কোন কাজ?"
"গ্রামের বাড়ির কাজটা। তোরা তো জানিস, আব্বা মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন গ্রামের ভিটা আর জমিজমা যেন বিক্রি না করি। ওগুলো যেন স্থানীয় কলেজ আর এতিমখানায় দান করে দিই।"
বাবা মাথা নাড়লেন। "হ্যাঁ, চাচার ওসিয়তের কথা শুনেছি। তুমি তো সেটাই করতে চেয়েছিলে।"
আন্টি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মুখে এখন এক গভীর বিষাদের ছায়া। এই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় এবং কর্তব্যপরায়ণ মেয়ে।
"চেয়েছিলাম তো বটেই। কিন্তু দেশে আসার পর খোঁজখবর নিয়ে যা জানলাম, তাতে মনটা ভেঙে গেল। গ্রামের পলিটিক্স এখন খুব নোংরা হয়ে গেছে জামিল ভাই।"
"কেন? কী হয়েছে?"
"আমার চাচাতো ভাইয়েরা—রফিক আর শফিক—ওরাই তো এখন জমিটা দেখাশোনা করে। ওরা আমাকে জানাল, আমি যদি জমিটা সরাসরি কলেজের নামে দান করেও দিই, তবুও সেটা রক্ষা করা যাবে না। লোকাল কিছু প্রভাবশালী নেতা ওৎ পেতে আছে। দান করার পরদিনই তারা ভুয়া দলিল বানিয়ে কলেজ দখল করে নেবে। তখন না থাকবে জমি, না থাকবে কলেজ। আব্বার শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ হবে না।"
সবাই চুপ করে তার কথা শুনছে। যুক্তিটা অকাট্য। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটা খুবই বাস্তব সমস্যা। আন্টি বলে চললেন, "তাই আমি অনেক ভেবেচিন্তে একটা ডিসিশন নিয়েছি। আমি জমিটা দান করব না। আমি ওটা বিক্রি করে দেব।" মা অবাক হয়ে বললেন, "বিক্রি করে দিবি? কিন্তু চাচা তো..."
আন্টি থামিয়ে দিয়ে বললেন, "শোন আগে। বিক্রি করে আমি টাকাটা নিজের পকেটে ভরব না। আমি ওই টাকাটাই দান করে দেব। কোনো ট্রাস্টে দেব, অথবা ঢাকায় কোনো ভালো এতিমখানায় ফিক্সড ডিপোজিট করে দেব। তাহলে অন্তত শিওর হওয়া যাবে যে টাকাটা সৎ কাজে লাগছে। জমি বেদখল হওয়ার টেনশন থাকবে না।"
বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, "ব্রিলিয়ান্ট ডিসিশন তনিমা! তুমি একদম ঠিক ভেবেছ। ইমোশন দিয়ে কাজ হয় না, প্র্যাকটিক্যাল হতে হয়। জমি দান করলে ভেজাল বাড়বে। তার চেয়ে ক্যাশ টাকা ডোনেট করা অনেক সেফ।"
আমি চুপচাপ ভাত নাড়াচাড়া করছি আর আন্টির কথা শুনছি। তিনি কত সুন্দর করে সবকিছু গুছিয়ে বলছেন! তার এই 'মহানুভবতা'র আড়ালে যে অন্য কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে, সেটা কেউ সন্দেহও করছে না।
আন্টি বললেন, "রফিক ভাইদের সাথে আমার কথা হয়েছে। ওরা জানিয়েছে জমি কেনার মতো ভালো পার্টি পাওয়া গেছে। তারা নগদ টাকা দিতে রাজি। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা খুব তাড়াতাড়ি রেজিস্ট্রি করতে চায়। দেরি করলে যদি মত বদলে ফেলে! তাই আমাকে খুব দ্রুত একবার গ্রামে যেতে হবে। নওগাঁ।"
"নওগাঁ?" মা চিন্তিত মুখে বললেন। "অনেক দূরের পথ তো।"
"হোক দূর। যেতে তো হবেই। আব্বার ওসিয়ত বলে কথা। আর এটা আমার দাদার সম্পত্তি, বংশানুক্রমিকভাবে বাবার হয়ে আমার কাছে এসেছে। এটার ওপর আমার একটা মায়া আছে। শেষবার গিয়ে নিজের হাতে সাইন করে দিয়ে আসতে চাই।"
আমরা সবাই তনিমা আন্টির এই ত্যাগের প্রশংসা করলাম। আহারে! পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে সব টাকা দান করে দিচ্ছেন! কয়জন পারে এমন? মা বললেন, "তোর মনটা অনেক বড় রে তনিমা। আল্লাহ তোকে ভালো করবেন।" বাবা বললেন, "কবে যাওয়ার প্ল্যান করছ?"
আন্টি বললেন, "হাতে তো সময় নেই। ভাবছি দু-একদিনের মধ্যেই রওনা দেব। রফিক ভাই তাগাদা দিচ্ছেন।"
এই পর্যন্ত বলে আন্টি আমার দিকে এক পলক তাকালেন। সেই দৃষ্টি খুব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমার বুকের ভেতর সেটা তীরের মতো বিঁধল। আমি বুঝতে পারলাম, এই গ্রাম যাত্রা শুধু জমি বিক্রির জন্য নয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো ব্লু-প্রিন্ট আছে। এই শহরে, এই ফ্ল্যাটে আমাদের গোপনীয়তার অভাব হচ্ছে। আমরা মন খুলে মিশতে পারছি না। কিন্তু গ্রামে? দূরে কোথাও? সেখানে হয়তো আমরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পারব।
আন্টি আবার বললেন, "তবে একা যেতে ভয় করছে। সাথে কেউ থাকলে ভালো হতো। কিন্তু তোদের তো অফিস, ছুটি পাবি না।" এই কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন, যেন তিনি খুব অসহায় বোধ করছেন। অথচ আমি জানি, তিনি আসলে একটা সুযোগ তৈরি করছেন। একটা রাস্তা বের করছেন যাতে আমি তার সঙ্গী হতে পারি।
রাতে খাওয়ার পর ডাইনিং টেবিলে বসে আমরা যখন আন্টির এই 'স্যাক্রিফাইস' নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি এক বিশাল নাটকের দর্শক এবং অভিনেতা—দুটোই। সবাই দেখছে তনিমা আন্টির দয়া আর মহানুভবতা, আর আমি দেখছি এক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি। নওগাঁ। উত্তরবঙ্গ। দীর্ঘ যাত্রা।
এই যাত্রাপথ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা ভাবতেই আমার শরীর শিউরে উঠল। আন্টি জমি বিক্রি করে টাকা দান করবেন ঠিকই, কিন্তু সেই ফাঁকে তিনি আমার কাছ থেকে কী আদায় করে নেবেন, সেটা একমাত্র তিনিই জানেন।