মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ১৪
দশম অধ্যায়
করিডোরে অয়নকে ওইভাবে স্তম্ভিত অবস্থায় ফেলে আসার পর বিদিশার বুকের ভেতরটা একবারের জন্য হলেও কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু তিনি নিজের পাঁজরের সেই কাঁপুনিকে কোন প্রশ্রয় দেননি। অয়নকে করিডোরে ওইভাবে ফেলে আসাটা কি খুব কঠিন ছিল? হয়তো। কিন্তু ওই মুহূর্তটিতে বিদিশার কাছে এতদিন ধরে নিজের গড়ে তোলা বর্মটা রক্ষা করা বেশি জরুরি ছিল।
অরুণের অবহেলা আর অয়নের অকারণে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাকে শিখিয়েছে, কারুর উপর নির্ভর করলে এই পৃথিবীতে কেবল নিজেকেই ঠকতে হয়। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় বিদিশার স্টিলেটোর প্রতিটি ‘খট খট’ শব্দ সবার সামনে তার আত্মবিশ্বাসকে জানান দিচ্ছিল।
তিনি বুঝতে পারছিলেন, এখানে টিকে থাকতে হলে তার নরম হওয়া চলবে না, তাকে শক্ত, অনমনীয় হতে হবে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর আরেকটু শক্ত করে টেনে নিয়ে তিনি সোজা স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
স্টাফরুমের কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক ঝলক এসির ঠান্ডা হাওয়া আর কফির কড়া গন্ধ তাকে স্বাগত জানাল। ঘরটা বেশ বড়, একটা দিকে কয়েকটা কিউবিকল করা আর মাঝখানে একটা বড় ডিম্বাকার টেবিল। বড় টেবিলটায় কয়েকজন প্রফেসর নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছিলেন। কেউ কেউ কিউবিকলে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলেন। বিদিশা ঢুকতেই গুঞ্জনটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
বিদিশা লক্ষ্য করলেন টেবিলের কোণের দিকে বসা সত্তরোর্ধ্ব ইতিহাসের প্রফেসর থেকে শুরু করে মাঝবয়সী ফিজিক্সের টিচার, সবার চোখ তার ওপর স্থির। সেই চাহনিতে কোনো কদর্যতা হয়তো নেই, কিন্তু একটা তীব্র কৌতূহল আছে। চার বছর আগের বিদিশা হয়তো এই দৃষ্টিতে অস্বস্তি বোধ করতেন, শাড়ির আঁচল আরও একটু টেনে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসতেন। কিন্তু আজকের বিদিশা গাঙ্গুলি আলাদা।
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান,” বিদিশা অত্যন্ত মার্জিতভাবে সম্ভাষণ জানালেন।
“ওহ, গুড মর্নিং মিস গাঙ্গুলি! আপনিই তো নতুন ম্যাথস ফ্যাকাল্টি?” বিদিশা ঘুরে তাকাতে হাসিমুখে বছর ত্রিশের এক যুবককে এগিয়ে আসতে দেখলেন।
"ওয়েলকাম টু দ্য ফ্যাকাল্টি লাউঞ্জ। আমি রাহুল বোস, ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট। সান্যাল স্যার আপনার কথা বলেছিলেন”, যুবকটি একটা উষ্ণ হাসি দিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন।
বিদিশা হাত মেলালেন। রাহুলের চোখের মণি যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “নাইস টু মিট ইউ, মিস্টার বোস।”
রাহুলের পরনে একটা নেভি ব্লু শার্ট, হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। চোখে রিমলেস চশমা আর গালে হালকা ট্রিম করা দাড়ি।
“রাহুল বললেই চলবে। এখানে আমরা সবাই খুব ফ্রেন্ডলি,” রাহুল একটু ঝুঁকে এসে বলল, তার কণ্ঠে এক ধরণের প্রশ্রয়। “আপনার প্রথম ক্লাস কেমন হলো? আমাদের স্টুডেন্টরা কিন্তু বেশ... মানে, একটু বেশিই এনার্জেটিক।”
বিদিশা টেবিলের উপর ব্যাগটা রাখতে রাখতে স্মিত হাসলেন।
“ক্লাস খুব ভালো হয়েছে। স্টুডেন্টরা যথেষ্ট মনোযোগী। আমি যথেষ্ট উপভোগ করেছি।”
রাহুল কফির মেশিনটার দিকে ইশারা করল, "কফি করে দেব? ফার্স্ট ডে-র নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য আমাদের এখানকার ব্ল্যাক কফি জাস্ট ম্যাজিকের মতো কাজ করে।"
বিদিশা সামান্য হেসে মাথা নাড়লেন, "শিওর। থ্যাঙ্ক ইউ।"
রাহুল কফি বানাতে বানাতেই আড়চোখে বিদিশার দিকে তাকালো। ততক্ষণে বিদিশা একটা চেয়ারে টেনে বসেছে।
সেটা বিদিশার চোখ এড়াল না। বিদিশার মেরুন শাড়ির স্লিভলেস ব্লাউজের নিচ দিয়ে উন্মুক্ত ফর্সা, মসৃণ হাত, তার তীক্ষ্ণ কলারবোন আর ওই বিষাদঘন চোখের গভীরতা রাহুলকে যে চুম্বকের মতো টানছে, সেটা তার শারীরিক ভাষাতেই স্পষ্ট।
কফির মগটা বিদিশার সামনে নামিয়ে রাখার সময় রাহুলের আঙুল অত্যন্ত সাবধানে, যেন ভুল করেই, বিদিশার আঙুলের ডগা সামান্য ছুঁয়ে গেল। বিদিশা হাতটা সরিয়ে নিলেন না, বরং তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক অচেনা, প্রায় ভুলে যাওয়া শিহরণ বয়ে গেল। এই অনুভূতিটা তার কাছে মৃত ছিল। যান্ত্রিক, শীতল স্পর্শহীন জীবন কাটিয়ে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া বিদিশা এত বছর পর আজ এই স্টাফরুমে একজন অল্পবয়সী, আকর্ষণীয় পুরুষের চোখে নিজের জন্য মুগ্ধতা দেখতে পেলেন। সকাল থেকে দৃশ্যটা তিনি অনেকবার দেখেছেন, তবুও এখনকার ঘটনাটা তার মনে এক অচেনা তৃপ্তি এনে দিল।
অনেকদিন পর তার মনে হলো তিনি শুধু কারোর মা বা কারোর অবহেলিত স্ত্রী নন। তিনি একজন কাঙ্ক্ষিত নারী। তিনি নিজের অজান্তেই উল্টোদিকের দেওয়ালের আয়নায় একবার নিজের প্রতিবিম্ব দেখলেন।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করলেন, স্টাফরুমের অন্য পুরুষ কলিগরা রাহুলের এই ‘এগিয়ে যাওয়াটা’ হওয়াটাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখছেন না।
বনগানি তার শরীরটা ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল, আর এখানে শিক্ষিত পুরুষরা তার সাহচর্য পাওয়ার জন্য এক ধরণের অলিখিত প্রতিযোগিতায় নামছে। বিদিশার মনে হলো, এটা একধরনের জয়।
কিছুক্ষণ পরে স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে নিজের দ্বিতীয় ক্লাসে যখন বিদিশা ঢুকলেন, তখন তিনি আবার সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। অঙ্কের জটিল সমীকরণগুলো যখন তিনি বোর্ডে চক দিয়ে একটানা সমাধান করে যাচ্ছিলেন, তার শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল।
তার গোটা ক্লাস জুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। ছাত্র-ছাত্রীরা তার পড়ানোয় মগ্ন ছিল। বিদিশা নিজের বৌদ্ধিক সত্তাকে এত বছর পর যেন আবার নতুন করে ফিরে পেলেন। এতদিন পরেও তার ধার একটুও ভোঁতা হয়নি। অবশ্য গত ক'বছর ফাঁকা সময়টায় তিনি অঙ্কের চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন।
বিদিশা যখন নিজের নতুন অস্তিত্ব উপভোগ করছেন, তখন অয়ন কলেজের ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় পাথরের মতো বসে ছিল। তার সামনে রাখা কফির কাপটা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে ওপরে একটা সর জমেছে, স্যান্ডউইচটা প্লেটেই পড়ে আছে। তখন দুপুরবেলা, কলেজের বিশাল ক্যাফেটেরিয়ায় থিকথিকে ভিড় আর তুমুল কোলাহল। কফির কাপের টুংটাং, সিগারেটের ধোঁয়া আর তারুণ্যের বাধভাঙা হাসিতে জায়গাটা সরগরম। কিন্তু, অয়নের মনে সেটা আঁচল কাটছিল না, তা অন্য কোথাও পড়ে ছিল।
বিদিশা চলে যাবার পর কলেজের করিডরের ওই জায়গাটায় অয়ন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। "মিস্টার চ্যাটার্জী..." শব্দদুটো তখন তার কানের পর্দায় তখনো হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছে। তার নিজের মা তাকে এই নামে ডাকল!
তার কানে এখনো বিদিশার সেই শীতল ‘মিস্টার চ্যাটার্জী’ ডাকটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মায়ের ঠোঁট থেকে নিজের নামের সাথে ওই পদবীটা শোনা যেন তপ্ত তেলের মতো তার কানে বিঁধছে। তার মা, যে মা তাকে খাইয়ে দিত, যার আঁচল ধরে সে বড় হয়েছে, সে আজ তাকে এক জন অপরিচিত ছাত্রের মতো উপেক্ষা করে চলে গেল!
অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, হাতের মুঠো দুটো এতটাই শক্ত যে নখগুলো হাতের তালুতে গেঁথে গিয়ে লাল দাগ করে দিয়েছে। অপমানে, রাগে আর এক তীব্র, অধিকারহীনতার যন্ত্রণায় অয়নের চোখদুটো জ্বলতে লাগল। সে দ্রুত পায়ে ওই জায়গা থেকে সরে গেল, যেন বেশিক্ষণ দাঁড়ালে তার মাথার ভেতরের শিরাগুলো ফেটে যাবে।
“কিরে অয়ন? কোন দুনিয়ায় আছিস?” রনি তার কাঁধে একটা জোর ধাক্কা দিল।
অয়ন ধড়মড় করে উঠল। তার চোখের কোণটা সামান্য লাল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কিছু না। মাথাটা একটু ধরেছে।”
“আরে মাথা তো সবারই ধরেছে রে ভাই! ম্যাথস ক্লাসের পর থেকে কারোর তো আর হুঁশ নেই,” কবীর এসে পাশের চেয়ারে বসল। তার চোখেমুখে উত্তেজনা।
“শুনেছিস? বিক্রম মালহোত্রা তো অলরেডি বাজি ধরেছে!”
অয়নের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“বিক্রম মালহোত্রা? সে কে?”
“আরে বিক্রম! আমাদের কলেজের হিরো। সেকেন্ড ইয়ারের স্পোর্টস কোটা, পলিটিক্স, আবার পড়াশোনাতেও ভালো। কলেজের সব কটা সুন্দরী মেয়ে ওর পকেটে থাকে,” রনি নিচু স্বরে বলল।
“ও বলছিল, এই ম্যাথস প্রফেসরের দেমাগ আমি এক মাসের মধ্যে ভাঙব। দেখবি আমার বাইকের পেছনে ও বসে ডিনার ডেটে যাচ্ছে।"
অয়নের হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এল। ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলটার ওপর তার নখগুলো ডেবে যাচ্ছিল।
“ডিনার ডেট? টিচারের সাথে? ওর সাহস তো কম নয়!”
কবীর হাসল। “আরে ভাই, এই কলেজে টিচার-স্টুডেন্ট ডেটিং কোনো ব্যাপারই না। আর বিক্রম যা দেখতে, যেকোনো মেয়েই ওর উপর ফিদা হয়ে যাবে। তা ছাড়া মিস গাঙ্গুলি তো এখনো সিঙ্গেল বলেই মনে হলো। আঙুলে কোনো আংটি নেই, সিঁথিতে সিঁদুর নেই... ওহ গড, অয়ন! তুই কি ওনার হাতটা দেখেছিস? কী মসৃণ!”
অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো লাফাতে লাগল। তার হাতের মুঠি এতটাই শক্ত হয়ে গেল যে মনে হলো টেবিলের কোণটা সে ভেঙে ফেলবে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতালির সেই রাত। বনগানিও তো ঠিক এইভাবেই তার মায়ের শরীরটাকে গিলে খেতে চেয়েছিল। আজ এই কলেজের একটা সাধারণ, বখে যাওয়া ছেলে সবার সামনে বসে তার দেবীতুল্য মাকে নিয়ে এই ধরনের নোংরা, কামার্ত মন্তব্য করছে!
অয়নের ইচ্ছে করছিল টেবিলটা উল্টে দিয়ে কবীরের কলারটা চেপে ধরে ওর ওই হাসিমুখটা ঘুষি মেরে থেঁতলে দিতে। কিন্তু সে পারল না। তার হাত-পা যেন কোনো এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। সে যদি এখন মারামারি করে, তাহলে কালই গোটা কলেজে রটে যাবে যে ফার্স্ট ইয়ারের অয়ন চ্যাটার্জী নতুন ফ্যাকাল্টির জন্য পাগল। আর যদি সে সত্যি কথাটা বলে দেয় যে মিস গাঙ্গুলি তার মা, তাহলে বিদিশার নতুন তৈরি করা এই আত্মপরিচয়, এই স্বাধীনতা এক মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে যাবে।
অয়ন একটা ঢোঁক গিলল, তার ভেতরে যে অনুভূতিটা এখন খেলা করছে সেটার নাম ও জানে না। তার চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।
ও বুঝতে পারল বেশিক্ষণ এখানে বসে থাকলে ও কোন বাড়াবাড়ি করে ফেলতে পারে। সে ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, কপালে একটা শিরা দপ দপ করছে।
“আমি আসছি,” বলে সে প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কোনো কথা না বলে লম্বা পায়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছন থেকে বন্ধুদের হাসি, চিৎকার, গল্প-গুজব তার কানে পৌঁছাল না। তার এখন কোন গন্তব্য নেই। সে জানে না সে কী করতে যাচ্ছে।
বনগানি-নিধনের রাতে কী এই বন্য সত্তাটাই জেগে উঠেছিল ?
তিন ঘন্টা পরে,
বিকেলের দিকে কলেজের ভিড় অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। বিদিশা নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু লেকচার নোটস গোছাচ্ছিলেন। তার নিজস্ব কেবিন।
দরজায় একটা ছোট নেমপ্লেট— ‘মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, লেকচারার’।
দরজায় একটা হালকা টোকা পড়ল।
"কাম ইন," স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন বিদিশা।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল অয়ন। তার মুখটা থমথমে, চোখের নিচে কালশিটে পড়ার মতো একটা ক্লান্তি। সে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিদিশার টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারটায় গিয়ে বসল।
বিদিশা তখন নিজের ডেস্কে বসে কিছু নোটস দেখছিলেন। দরজা বন্ধের শব্দে তিনি মাথা তুললেন। অয়নকে এইভাবে ভেতরে ঢুকতে দেখে এবং দরজা লক করতে দেখে তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য হলেও কেঁপে উঠল। ইতালির সেই রাতের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে ভেসে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি জানতেন, এখনই যদি তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন, তবে তার এই চার বছরের লড়াই বৃথা যাবে।
বিদিশা ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন। তিনি জানতেন এই আলোচনাটা আজ না হোক কাল করতেই হতো। তিনি একটু সোজা হয়ে বসলেন। তার মুখের সেই বরফের মতো শীতল ভাবটা এখন কিছুটা প্রশমিত, কিন্তু পেশাদারিত্বের দেয়ালটা তখনো অটুট।
“মিস্টার চ্যাটার্জী, দরজা লক করার মানে কী? এটা কি কোনো স্টুডেন্টের আচরণ?” বিদিশার গলা শান্ত কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।
অয়ন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সে বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখে এক ধরণের অবদমিত যন্ত্রণা। তার বুকের ভেতর অনেকগুলো প্রশ্ন, অনেক অভিমান দলা পাকিয়ে আছে।
"কিছু বলবে অয়ন?" বিদিশার গলাটা শান্ত।
“মিস্টার চ্যাটার্জী? সত্যি মা? তুমি আমাকে এই নামে ডাকলে?” অয়নের গলা অভিমানে বুজে এল।
"তুমি...তুমি এখানে কেন মা? আর এই পরিচয় লুকনোর নাটকটাই বা কেন?" অয়নের গলাটা কেঁপে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
“আর এখানে...‘মিস গাঙ্গুলি’? তুমি কি সব ভুলে গেলে? বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক নেই বলে তুমি এখানে এসে নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করবে? আর এই কলেজের ছেলেরা... ওরা তোমার সম্পর্কে কী সব কথা বলছে তুমি জানো? আজ ক্লাসে তোমার দিকে ছেলেরা যেভাবে তাকাচ্ছিল... ক্যাফেটেরিয়াতে তোমাকে নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছিল... তুমি জানো আমি কতটা সাফোকেটেড ফিল করছিলাম?"
বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েটটা হাত দিয়ে সামান্য ঘোরাতে ঘোরাতে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বললেন, “অয়ন, চিৎকার করো না। বসো।”
অয়ন বসল না, সে দাঁড়িয়েই রইল। তার বড় বড় শ্বাস পড়ছে।
বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন এবং জানলার দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের দেবদারু গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "অয়ন, তুমি চার মাস হলো এই কলেজে এসেছ। তুমি বাড়ি যাও না।তুমি কি জানো আমি ওই চার দেওয়ালের মধ্যে কতটা দমবন্ধ অনুভব করছিলাম?"
অয়ন চুপ করে রইল।
"অরুণ আমার থেকে দূরে সরে গেছে। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলো। ওই বিশাল বাড়িতে আমি একা। আমার কি একটা নিজস্ব পরিচয়ের, একটা জীবন কাটানোর কোন অধিকার নেই?" বিদিশার গলায় এবার একটা সূক্ষ্ম, চাপা কষ্ট ফুটে উঠল।
"অধিকার আছে। কিন্তু নিজের পরিচয় মুছে ফেলে কেন? তুমি বলতে পারতে তুমি বিদিশা চ্যাটার্জী। আমার মা।"
"তাহলে কী হতো জানো?" বিদিশা অয়নের চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।
"প্রথম দিনেই আমি এই কলেজের সমস্ত স্টুডেন্ট আর ফ্যাকাল্টিদের চোখে একজন উনিশ বছরের ছেলের 'মা' হয়ে যেতাম। আমার ইন্টেলেক্ট, আমার যোগ্যতা—সবকিছু ওই 'মা' শব্দটার নিচে চাপা পড়ে যেত। সবাই ভাবত, একটা বয়স্কা মহিলা টাইমপাস করতে পড়াতে এসেছে। আমি সেটা চাই না, অয়ন। আমি চাই এরা আমাকে মিস গাঙ্গুলি হিসেবে চিনুক, আমার কাজ দিয়ে আমাকে সম্মান করুক। আর তাছাড়া...ইতালির সেই ঘটনার পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে একজন পঙ্গু নারী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতাম না। তোমার বাবা...আমাকে শ্রদ্ধা করতে ভুলে গেছেন। তার কাছে আমি এখন একটা অপ্রীতিকর স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নই।”
তিনি ঘুরে অয়নের দিকে তাকালেন।
“আমি এখানে চাকরি নিয়েছি কারণ আমি বাঁচতে চাই। আমি বিদিশা চ্যাটার্জী হয়ে নয়, বিদিশা গাঙ্গুলি হয়ে নিজের পরিচয় ফিরে পেতে চাই। আর এখানে আমার পরিচয় ফাঁস হলে আমার প্রফেশনাল ইমেজ নষ্ট হবে। তুমি কি চাও তোমার মা আবার সেই ঘরের কোণায় বসে কাঁদুক?”
বিদিশা একটু থামলেন। তার চোখদুটো যেন অয়নের মনের গভীরের অন্ধকারগুলো পড়ার চেষ্টা করল।
"তাছাড়া, তুমি নিজেই কি চাইতে যে ক্লাসের সবাই জানুক যে আমি তোমার মা? তুমি তো নিজেই আমার থেকে দূরে পালাচ্ছো। আমাদের এই সম্পর্কটা লুকোনো থাকলে তোমারও তো স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করবে না, তাই না?"
অয়ন মাথা নিচু করে নিল। মায়ের এই অকাট্য যুক্তির সামনে তার কোনো উত্তর ছিল না। সে বুঝতে পারল, বিদিশা যা করেছেন, নিজের বাঁচার তাগিদেই করেছেন। সত্যিই তো সে বাড়ি থেকে একরকম পালিয়ে এসেছে, বাবা-মা দুজনকেই এড়িয়ে চলছে। মাকে সে বলতেও পারবে না কেন সে পালিয়ে এসেছে।
ধনীর দুলালি বিদিশার অগাধ পৈতৃক সম্পত্তি। তার সারাজীবনে একটা আঙুল না নাড়ালেও চলবে। অরুণ চ্যাটার্জীর রোজগারের উপর তিনি নির্ভর করেন না, তার চাকরির কোন দরকার নেই। তিনি আজ ঘর থেকে বেরিয়ে চাকরি নিয়েছেন শুধুমাত্র বাঁচার জন্য। এই মাকে সে সারাজীবন অন্তর্মুখী দেখে এসেছে।
মায়ের এই যুক্তির সামনে সে অসহায়। কিন্তু রনি, কবীর, বিক্রমদের কথা ভেবে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু বিদিশা তো জানেন না তাদের লোলুপ দৃষ্টির কথা! তাকে তো এসবের মুখোমুখি হতে হয় না। তিনি জানেন না যে তার নিজের ছেলের মনের ভেতরে আজ আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি ফুঁসছে !
“কিন্তু মা... কলেজের পরিবেশ খুব খারাপ। সবাই তোমাকে নিয়ে... নোংরা কথা বলছে”, অয়ন ফিসফিস করে বলল। শুরুতে ওর গলার যে জোরটা ছিল, সেটা হারিয়ে গেছে।
বিদিশা অয়নের কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি অয়নের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেলেন। দূরত্ব বজায় রাখাটা জরুরি।
“অয়ন, কে কী বলছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমি কে। তুমি এই চার মাস বাড়ি ফেরোনি কেন, আমি জানি। তুমি বড় হয়েছ, তোমার নিজস্ব জগৎ হয়েছে। আমাকেও আমার জগৎটা তৈরি করতে দাও। আমাদের এই কলেজে পরিচয় স্রেফ টিচার আর স্টুডেন্টের। এর বাইরে আর কিছু নয়। তুমি কি আমাকে এইটুকু সহযোগিতা করবে না?”
অয়ন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। বিদিশার এই শান্ত অথচ দৃঢ় আবেদন তার মনের ভেতরে চলা ঝড়ের গতি কমিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, তার মা কী চাইছেন। মায়ের জন্য সে এটুকু করতেই পারবে না ? মায়ের জন্য অয়ন সব করতে পারে।
“ঠিক আছে,” অয়ন খুব নিচু স্বরে বলল। "আমি বুঝতে পেরেছি," আমি তোমার পরিচয় কাউকে বলব না। কলেজে আমরা একে অপরের কেউ নই।..." অয়ন মুখ তুলল, তার চোখে এখন এক অদ্ভুত জেদ।
"কিন্তু, মা... কেউ যদি তোমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তোমার দিকে আঙুল তোলে আমি চুপ করে থাকব না। সেটা তুমি মিস গাঙ্গুলি হও, আর যাই হও।”
বিদিশা হালকা হাসলেন।
“আমি জানি তুমি আমার রক্ষাকর্তা। কিন্তু, আমার নিজের রক্ষা আমি করতে জানি, মিস্টার চ্যাটার্জী। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইওর কনসার্ন। এবার আপনি আসতে পারেন।" তারপর গলা নামিয়ে বললেন, "এবার যাও, নেক্সট ক্লাসের দেরি হচ্ছে।"
অয়ন উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, আপাতত তাদের এই চুক্তির হিসেবেই চলতে হবে।
অয়ন দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তার মন এখন একটু শান্ত ঠিকই, কিন্তু বিদিশার ওই মোহময়ী রূপ আর কলেজের ‘ওপেন ডেটিং’ পলিসি তার মাথার ভেতর এক বিপজ্জনক চিন্তার বীজ বুনে দিয়ে গেল। তার উপর কবীরের কথাগুলো ওর মনে ঘুরপাক খেতে লাগল।