মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫১

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6269458.html#pid6269458

🕰️ Posted on July 21, 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2321 words / 11 min read

Parent
৪ সাউথ ব্লক বয়েজ ডর্ম কমপ্লেক্স  সকাল দশটা বেজে চল্লিশ মিনিট। বয়েজ ডর্ম কমপ্লেক্সের সাউথ ব্লক এখন এই মুহূর্তে বেশ শান্ত। সকালের ব্যস্ততা কেটে গেছে; বেশিরভাগ ছেলেই প্রাতরাশ সেরে নিজেদের ক্লাসের দিকে রওনা হয়ে গেছে। ডর্মের লম্বা করিডোরগুলো এখন নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে ডর্মের ক্লিনারদের বালতি আর মপের আওয়াজ ভেসে আসছে। অয়ন নিজের ঘরের দরজাটা লক করে বাইরে বেরিয়ে এল। ওর পরনে একটা ডার্ক চারকোল রঙের হুডি আর কালো ডেনিম। হুডির চেনটা বুক অবধি খোলা। কাঁধে ঝোলানো একটা কালো ব্যাকপ্যাক। তার বাঁ গালে সেই কালশিটের ফিকে, হলদেটে আকার ধারণ করেছে। নিচের ঠোঁটের ফাটা দাগটা শুকিয়ে এসেছে। আজ দীর্ঘ স্বেচ্ছা-নির্বাসনের পর সে প্রথমবার দিনের আলোয়, সবার চোখের সামনে ক্যাম্পাসে পা রাখতে চলেছে।  অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার পদক্ষেপে কোনোরকম আড়ষ্টতা নেই। ডর্মের সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামার সময় সে একবারও মাথা নিচু করল না। এতদিন সে সবাইকে এড়িয়ে চলত, কিন্তু আজ তার হাঁটার মধ্যে একটা ধীর আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। সাউথ বয়েজ ডর্ম কমপ্লেক্সের 'এ' ব্লকের ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই ডিসেম্বরের সকালের রোদটা তার মুখে এসে পড়ল। ততক্ষণে কুয়াশা পুরোপুরি কেটে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে কাঁচের মতো স্বচ্ছ আকাশ। উজ্জ্বল রোদে ঢেকে গিয়েছে ক্যাম্পাস চত্বর। সোনালি রোদে আলোর কোনো কমতি না থাকলেও উত্তাপের লেশমাত্র নেই। শিরশিরে উত্তুরে হাওয়া ক্রমাগত বয়ে চলেছে, যা চামড়ায় স্পর্শ হলে মনে হয় কেউ যেন সুচ ফোটাচ্ছে। অয়নের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একদম রিল্যাক্সড। তার চোখে সেই রক্তবর্ণ ভাবটা কেটে গিয়ে সে জায়গায় এক অদ্ভুত নিস্পৃহ এবং শান্ত ভাব বিরাজ করছে। গত একমাস ধরে সে ভেতরে রাগ চেপে রেখে বাইরে নিস্পৃহ থাকার যে অভিনয় করত সেরকম নয়। তার চোখ-মুখ আজ প্রকৃত অর্থেই শান্ত। ঠিক যেন নিজের ভেতরের সমস্ত লাভা উগরে দেওয়ার পর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এক আগ্নেয়গিরি। অয়ন মেইন গেট থেকে বেরিয়ে এসে মেইন রোড না ধরে ডর্মের পেছন দিকের ইঁট-বিছানো শর্টকাট রাস্তাটা ধরল। এই রাস্তাটা সাউথ ব্লকের তিনটে বিল্ডিং (এ, বি আর সি)-এর পেছন দিক দিয়ে এঁকেবেঁকে সোজা পূব দিকের সায়েন্স ব্লকের দিকে চলে গেছে।  রাস্তাটার বাঁ-দিকেই রয়েছে সেই মাঝারি সাইজের মাঠটা, যেখানে সে আগে আগে ভোরবেলা কুয়াশার মধ্যে ফুটবল নিয়ে অনেক ঘাম ঝরিয়েছে। ঘাসের ডগায় সকালের জমে থাকা শিশির রোদের আলোয় হীরার কুচির মতো চকচক করছে। মাঠের ধার ঘেঁষে লাগানো ইউক্যালিপটাস আর মেহগনি গাছের সারি থেকে মাঝে মাঝেই শুকনো পাতা ইঁটের রাস্তায় ঝরে পড়ছে। চারপাশ একেবারে নিস্তব্ধ; অয়নের জুতোর তলায় সেই শুকনো পাতাগুলো মড়মড় করে ভেঙে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হাঁটতে হাঁটতে অয়ন একবার বাঁ দিকে মাঠটার দিকে তাকাল। ক্যাম্পাসের এই দক্ষিণ দিকটা হলো 'রেসিডেন্সিয়াল জোন'। গাছপালায় ঘেরা, ছায়াসুনিবিড় এই এলাকায় বয়েজ ডর্মের কাছাকাছি রয়েছে গার্লস হোস্টেল কমপ্লেক্স, ফ্যাকাল্টি রেসিডেন্সিয়াল এনক্লেভ আর ডেলিগেটদের জন্য তৈরি গেস্ট হাউস। এর ঠিক পাশেই রয়েছে ইনডোর স্পোর্টস কমপ্লেক্স, জিমনেশিয়াম আর সুইমিং পুল। এই আবাসিক জোনটা গোটা ক্যাম্পাসের সবচেয়ে শান্ত এবং সবুজ এলাকা।  এই সুবিশাল ক্যাম্পাসটা আক্ষরিক অর্থেই একটা আস্ত শহরের মতো। এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং স্থাপত্যের বৈচিত্র্য যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এই সবুজের বুক চিরে সোজা উত্তর দিকে তাকালে চোখে পড়ে ক্যাম্পাসের কেন্দ্রস্থল, 'সেন্ট্রাল জোন'।  সেখানে, ব্রিটিশ আমলের ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারে তৈরি লাল ইটের মেইন বিল্ডিংটা তার বিশাল গম্বুজ আর লম্বা থামগুলো নিয়ে প্রাচীন আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে।  ওই বিল্ডিংয়ের তিনতলার একটি ঘরে বসেন প্রিন্সিপাল সান্যাল। মেইন বিল্ডিং, লাইব্রেরি, বিশাল ইনডোর অডিটোরিয়াম আর ক্যাফেটেরিয়া নিয়ে তৈরি সেন্ট্রাল জোন এই কলেজের ভরকেন্দ্র। আরো পশ্চিম দিকে, একটু দূরে 'আর্টস অ্যান্ড কমার্স ব্লক'-এর চওড়া ইমারতগুলোর চূড়া আবছাভাবে চোখে পড়ে। ওদিকটায় সবসময় একটা গমগমে ভাব লেগে থাকে। আর, আরো পশ্চিমে দৃষ্টিসীমার বাইরে রয়েছে 'নিউ জোন'। ক্যাম্পাসের পূর্ব আর পশ্চিম, এই দুটো দিক দুটো আলাদা জগত। রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোতেই শুরু হলো ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ বোটানিক্যাল গার্ডেনের সীমানা। জায়গাটা ভীষণ শান্ত। এই শীতের সকালে গার্ডেনের ভেতর থেকে একটা সোঁদা, ভিজে মাটি আর নাম-না-জানা বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।  এই বিস্তীর্ণ সবুজ এলাকাটা কালো রঙের, উঁচু, বর্শার ফলার মতো লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে সারি সারি বিরল প্রজাতির গাছপালা, মেহগনি আর সেগুনের লম্বা ছায়া। অয়ন হাঁটতে হাঁটতে রেলিংয়ের ওপর হাত রাখল। কনকনে ঠান্ডা লোহায় জমে থাকা শিশিরের স্পর্শ তার আঙুলে একটা শীতল শিহরণ জাগাল। এখন ওপাশে কেউ নেই, এর আগে সে মাঝে মাঝে এখানে গার্ডেনের গভীর ছায়ায় কয়েকজন স্টুডেন্টকে নোটপ্যাড হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।  এই সুবিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেনটা বায়ো-সায়েন্স বিল্ডিংয়ের প্র্যাকটিক্যাল রিসার্চের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।  এই বোটানিক্যাল গার্ডেনটা শুধু গাছপালার বাগান তা নয়, আরেকটু ভেতরের দিকে চোখ রাখলেই দেখা যায় কাঁচের তৈরি একটা বিশাল গ্রিনহাউস।শীতের রোদ পড়ে গ্রিনহাউসের কাঁচগুলো এখন আয়নার মতো চকচক করছে। এখানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের পরিচর্যা হয়। গ্রিনহাউসের ঠিক পেছনেই রয়েছে জুলজি বিভাগের 'সেরিকালচার ইউনিট' বা রেশম চাষের জায়গা। আরো একটু ভেতরের দিকে রয়েছে বিশাল 'ঔষধি বাগান' বা মেডিসিনাল গার্ডেন। ভেতরে গেলে 'মেডিসিনাল গার্ডেন'-এর কেয়ারি করা ব্লকগুলো দেখা যাবে। সারি সারি অনেক ঔষধি গাছের গায়ে ল্যাটিন ভাষায় বৈজ্ঞানিক নাম লেখা ছোট ছোট বোর্ড ঝোলানো। তার ঠিক পাশেই আছে একটা শান্ত লিলি পন্ড, যেখানে এইসময় শীতের রোদ পড়ে জলপদ্মগুলো চিকচিক করে। এই জায়গাটার নিস্তব্ধতা আর সবুজ স্নিগ্ধতা, কনকনে হাওয়ার সাথে মিশে একটা অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। অয়ন ধীরে, মাপা পদক্ষেপে হাঁটছে। এই মুহূর্তে তার কোনো তাড়া নেই। বোটানিক্যাল গার্ডেনের রেলিং শেষ হতেই রাস্তাটা একটা বাঁক নিল। আর বাঁক ঘুরতেই অয়নের চোখের সামনে খুলে গেল ক্যাম্পাসের সবচেয়ে মায়াবী এবং সুন্দর জায়গাটা, আর্টিফিশিয়াল লেক। জুলজি আর বটানির স্টুডেন্টদের ফিল্ডওয়ার্কের জন্য তৈরি এই লেকটা ক্যাম্পাসের অন্যতম সুন্দর জায়গা। কিন্তু, এই মুহূর্তে সেখানে কোন স্টুডেন্ট নেই। লেকের পাড় ধরে বাঁধানো ওয়াকওয়ে। লাল মোরাম বিছানো রাস্তাটার দু-পাশে সারিবদ্ধ পাম আর ঝাউগাছ। সকাল এগারোটা বেজে গেলেও লেকের ধারের লম্বা ঘাসগুলোর ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশির দেখা যাচ্ছে, যেগুলো রোদের আলোয় হীরার টুকরোর মতো চকচক করছে। লেকের জল আজকে একদম স্থির। ঠিক যেন একটা বিশাল আয়না। আর, সেই আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে ডিসেম্বরের পরিষ্কার নীল আকাশ আর চারপাশের গাছের সারি। কনকনে উত্তুরে হাওয়া যখন লেকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, তখন জলের বুকে খুব সূক্ষ্ম, ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হচ্ছে। চারপাশটা এত নিস্তব্ধ যে, জলের ওপর একটা পাতা পড়ার শব্দও শোনা যাবে। অয়ন কয়েক মুহূর্তের জন্য পাড় ঘেঁষে দাঁড়াল।  তার দৃষ্টি লেকের স্থির শান্ত জলের ওপর নিবদ্ধ। লেকের জলটা অদ্ভুত শান্ত। লেকের স্বচ্ছ গাঢ় নীল জলের ওপর শীতের সকালের রোদ পড়ে চিকচিক করছে।  এই লেকের স্থির, গভীর জলরাশি যেন অয়নের নিজের মনেরই একটা নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। গত এক মাস ধরে তার মনের ভেতরটা একটা উত্তাল সমুদ্রের মতো ফুঁসছিল। বিক্রম মালহোত্রাকে শেষ করে দেওয়ার চিন্তা, মায়ের ওপর তীব্র ক্ষোভ- অভিমান, নিজেকে প্রমাণ করার একটা অন্ধ জেদ, সব মিলিয়ে তার মনের ভেতরে সবসময় একটা তীব্র অস্থিরতা চলছিল। ফাইট ক্লাবে গিয়ে কোনো গার্ড ছাড়া ওইভাবে মারামারি করাটা আসলে সেই অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ ছিল। গত এক মাসের মনের মধ্যে সবসময় যে উত্তাল ঢেউগুলো ওঠা নামা করত, সেগুলো কাল রাতের পরে একদম শান্ত হয়ে গেছে। মনে জমে থাকা সমস্ত অভিমান আজ থিতিয়ে পড়েছে। তার মনে এই মুহূর্তে আর কোনো অস্থিরতা কাজ করছে না।  মিস্টার প্রধানের সাথে ওই একটা কথোপকথন কনফ্রন্টেশন তার ভেতরের সমস্ত অহংকারকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে। সে বুঝেছে, রাগ দেখিয়ে, নিজের জীবন বিপন্ন করে সে শুধু নিজেকেই তিলে তিলে ধ্বংস করছিল। এতে কারোর কিছু এসে যাচ্ছিল না। তার জীবনের গত এক মাসের দিকে তাকিয়ে অয়নের মনে হচ্ছে আবেগকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেওয়াটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আবেগ মানুষকে দুর্বল করে দেয়, চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, মানুষকে প্রেডিক্টেবল করে দেয়। গত একমাস ধরে সে ঠিক এটাই করেছিল। সে ভুল ছিল। রাগের বশে পেশিশক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে ও এখন সবার সামনে ছোট হয়ে গেছে। এখন ওর মনে হচ্ছে, সেদিন ব্যাকস্টেজে বিক্রমকে মেরে আদতে ও হেরে গিয়েছিল।  ওই একটা ঘুঁষি মেরে সে নিজেকে সাসপেন্ড করিয়েছে, সবার চোখে নিজেকে অপরাধী বানিয়েছে আর বিক্রমকে সবার চোখে 'ভিকটিম' আর 'মহান' সাজার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ সকালে অয়ন তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টার সাথে একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছে। বিক্রম মালহোত্রাকে ও কিছুতেই ছাড়বে না। ওকে ঠাণ্ডা মাথায় মারবে। তবে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আগেরবারের মতো সে নিজের জীবন নষ্ট করতে যাবে না।  এবার সে ভেবেচিন্তে পা ফেলবে। অলরেডি ওর মা বিক্রমের পক্ষে আছে।  লেকের ঠান্ডা, ভিজে হাওয়াটা তার ফুসফুসে প্রবেশ করে অয়নের স্নায়ুগুলোকে আরও শিথিল করে দিল। জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই অয়নের মনে পড়ে গেল আজ সকাল আটটায় করা একটা ফোন কলের কথা। সকালে ডর্মের ঘরে বসেই সে কোচ সেনগুপ্তকে ফোন করেছিল। "হ্যালো স্যার, গুড মর্নিং," অয়নের গলাটা ছিল একদম স্বাভাবিক। ওপাশ থেকে কোচ সেনগুপ্তর গলায় একটা স্পষ্ট উৎকণ্ঠা ছিল, "অয়ন। হাউ আর ইউ মাই বয়? কি খবর তোমার ? ব্যথা কমেছে? ডাক্তার কী বললেন?"  কোচের গলায় একরাশ উদ্বেগ ছিল, যেটা অয়নকে ভেতর থেকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। এই পৃথিবীতে এখনো এমন মানুষ আছে, যারা ওর ভালো চায়। "আমি এখন অনেক বেটার, স্যার। ব্যথাটা প্রায় নেই বললেই চলে। আমি কাল থেকেই মাঠে জয়েন করতে চাই।", অয়ন শান্ত গলায় বলেছিল।  কোচ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।" দ্যাটস গ্রেট নিউজ! কিন্তু তাড়াহুড়ো করার কোনো দরকার নেই। তুমি আমাদের টিমের মেইন স্ট্রাইকার। স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপের আগে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। টেক রেস্ট। তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে এসো। আমি চাই তুমি একদম ফিট হয়ে নামুক মাই বয়।" কোচের 'মাই বয়' বলে সম্বোধন অয়নের বুকে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে একা নয়। এমন সময় লেকের জলের ওপর দিয়ে একটা হিমেল হাওয়া বয়ে এসে অয়নের মুখে আছড়ে পড়ল। সে চোখ বন্ধ করে হাওয়াটা অনুভব করল।  এই পৃথিবীতে সবাই তাকে ছেড়ে চলে যায়নি। কোচ সেনগুপ্ত, মিস্টার প্রধান, রৌণক, এরা কোনো না কোনোভাবে তাকে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। মিস্টার প্রধান তাকে যা বলেছেন, সেটাই ঠিক। ইমোশনের বশে নিজেকে ধ্বংস করাটা কোনো আসল পুরুষের কাজ হতে পারে না। আসল যুদ্ধটা মাঠে নেমে, নিজের ফোকাস ঠিক রেখে লড়তে হবে। অয়ন একটা গভীর শ্বাস নিয়ে লেকের পাড় থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকাল। নিজের ইমোশনকে আর সে নিজের দুর্বলতা হতে দেবে না।  আর, বিক্রম ?  সে যদি ভেবে থাকে যে সে অয়নকে শেষ করে দিয়েছে, তবে সে ভুল ভাবছে। আজ থেকে সে আবার ক্যাম্পাসে ফিরবে। ও এমন ব্যবস্থা করবে যাতে দেওয়ালে বিক্রমের পিঠ ঠেকে যায়। স্বেচ্ছানির্বাসনের সময় শেষ।  আজ থেকে তার একটা নতুন রুটিন শুরু হবে।  ও সবার চোখে চোখ রেখে জীবনের ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করবে। ও আর পালিয়ে যাবে না। অয়ন লেক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিছদূর এগিয়ে মোরামের রাস্তাটা শেষ হতেই এতক্ষণের চেনা দৃশ্যপট একদম বদলে গেল। সামনেই চওড়া, পিচ-ঢালা মসৃণ রাস্তা আর সেই রাস্তার ঠিক ওপাশ থেকেই শুরু হয়েছে ক্যাম্পাসের 'সায়েন্স জোন'। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল এগারোটা কুড়ি।  অয়ন রাস্তা পেরিয়ে সায়েন্স জোনে পা রাখল। বোটানিক্যাল গার্ডেনের শান্ত, সবুজ আর হেরিটেজ ব্লকের পুরোনো, সাবেকি পরিবেশের সাথে সায়েন্স জোনের কোন মিল নেই। এটা সম্পূর্ণ অন্য একটা জগৎ। এখানে ইটের লাল রঙের বদলে কংক্রিটের ধূসর রঙ, ইস্পাত আর নীল কাঁচের প্রাধান্য। ক্যাম্পাসের পূর্ব দিকের এই জোনটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে হেরিটেজ ব্লকের সেই ভারিক্কি ভাবটা নেই, বরং একটা সায়েন্স ব্লকের পরিবেশটা বাইরে থেকে দেখে ভীষণ আধুনিক আর মেকানিক্যাল মনে হয়। অয়নের ঠিক বাঁ দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'বায়ো-সায়েন্স কমপ্লেক্স'-এর বৃহৎ লাইফ সায়েন্স বিল্ডিং। এই বিল্ডিংয়ের ভেতরেই জুলজি, বটানি, ফিজিওলজি, বায়োটেক আর মাইক্রোবায়োলজির ক্লাস চলে। বিল্ডিংয়ের জানলাগুলো দিয়ে উঁকি মারলেই ল্যাবের ভেতরের সাদা অ্যাপ্রন পরা ব্যস্ত রিসার্চ স্কলারদের দেখা মেলে। তার ঠিক ডান দিকে রয়েছে 'কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড এআই' বিল্ডিং। বাইরের দিকটা সম্পূর্ণ কালো কাঁচ দিয়ে মোড়া। ভেতরে সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা পরিবেশে কোডিং ল্যাব, ডেটা সেন্টার আর এআই রিসার্চের কাজ চলছে। সেখান থেকে একটা একটানা, খুব নিচু 'হামিং' সাউন্ড ভেসে আসছে; সার্ভার রুম আর এসি ডাক্টগুলোর আওয়াজ।   ভেতরে গেলে স্টুডেন্টদের আড্ডা দিতে দেখার চেয়ে হাতে ফাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত পায়ে হাঁটার দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে। তার ঠিক পাশেই বিশাল ল্যাবরেটরি ভবন, যার কাছাকাছি গেলে কেমিক্যাল আর স্পিরিটের একটা কড়া গন্ধ নাকে ভেসে আসে। কিন্তু, এই সবকটা বিল্ডিংকে ছাপিয়ে, সায়েন্স জোনের একেবারে কেন্দ্রস্থলে একটা দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে অয়নের গন্তব্য, 'সায়েন্স টাওয়ার'। বারো তলা উঁচু একটা অত্যাধুনিক বিল্ডিং, যার বাইরের পুরোটা নীল রঙের রিফ্লেক্টিভ গ্লাস দিয়ে মোড়া। শীতের সকালের রোদ সেই কাঁচে ধাক্কা খেয়ে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য তৈরি করেছে।  এই বিল্ডিংয়ের ভেতরেই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, মেটেরিয়াল সায়েন্স, জিওলজি এবং স্ট্যাটিস্টিক্স ডিপার্টমেন্টের ক্লাস হয়। বিল্ডিংয়ের একেবারে ছাদে একটা গম্বুজের মতো অংশ দেখা যায়, যেখানে একটা শক্তিশালী টেলিস্কোপ বসানো আছে। ফান্ডের অভাবে অবজারভেটরিটা সম্পূর্ণ না হলেও, দূর থেকে ওটা দেখতে বেশ রোমাঞ্চকর লাগে। সায়েন্স জোন চত্বরে এইসময় স্টুডেন্টদের ভিড় বেশ ভালোই। ক্লাস পরিবর্তনের সময় হওয়ায় অনেকেই বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে, কেউ কেউ নোটস মেলাচ্ছে। অয়ন নিজের কাঁধের স্পোর্টস ব্যাগটা একটু গুছিয়ে নিয়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। তার পরনে একটা ডার্ক গ্রে রঙের হুডি আর ব্ল্যাক জিন্স। হুডটা মাথা থেকে নামানো। ফেস্টের সেই অভিশপ্ত রাতের পর, প্রায় এক মাসের দীর্ঘ স্বেচ্ছা-নির্বাসন কাটিয়ে আজ প্রথমবার অয়ন চ্যাটার্জী ক্যাম্পাসের এই জোনে প্রকাশ্যে হাঁটছে। সায়েন্স টাওয়ারের সামনের চওড়া পেভমেন্টে তখন থিকথিকে ভিড়। ক্লাস চেঞ্জ হচ্ছে। কিন্তু অয়ন সেই ভিড়ের মধ্যে পা রাখতেই একটা অদ্ভুত ম্যাজিক হলো। অয়নকে ওই অবস্থায় রাস্তায় পা রাখতে দেখেই চারপাশের কোলাহলটা যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুবলে হঠাৎ করে কয়েক ডেসিবল নিচে নেমে গেল। স্টুডেন্টদের জটলাগুলো হঠাৎ করেই যেন একটা অদৃশ্য ধাক্কায় দু'ভাগ হয়ে যেতে শুরু করল। জটলাগুলোর মধ্যে একটা চাপা ফিসফাস শুরু হলো। যারা একটু আগে হাসাহাসি করছিল, তারা হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেল।  মেয়েদের কয়েকটা গ্রুপ আড়চোখে ওর কালশিটে শার্প মুখটার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কনুই ঠেলাঠেলি করতে লাগল। সিনিয়র দাদারা, যারা ক্যাম্পাসে হিরোগিরি করে বেড়ায়, তারাও অয়নকে দেখে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। একটা নিস্তব্ধ, ভয়ার্ত গুঞ্জন ঢেউয়ের মতো গোটা চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ফেস্টের রাতে ব্যাকস্টেজে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার বিক্রম মালহোত্রাকে পশুর মতো পেটানোর গল্পটা ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইটে পর্যন্ত খোদাই হয়ে গেছে। তার ওপর তার মুখের এই বীভৎস কালশিটে আর ফাটা ঠোঁট প্রমাণ করছে যে এই ছেলেটা আবার কোথাও মারপিট করে এসেছে। "ওই দ্যাখ... অয়ন চ্যাটার্জী..." "মুখের ওই হাল কী করে হলো? নির্ঘাত আবার কোথাও মারপিট করে এসেছে..." "কাউন্সিলের দাদারা ওকে খুঁজছে, আর ও দিব্যি এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে!" ফিসফাস, চাপা গুঞ্জন আর একরাশ আতঙ্কিত দৃষ্টি অয়নের ওপর বর্ষিত হতে লাগল।  কিন্তু অয়নের মধ্যে কোনো অস্বস্তি নেই। এক মাস আগের অয়ন হলে হয়তো এই হাজারটা চোখের দৃষ্টিতে অস্বস্তি বোধ করত, নিজের হুডটা টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করত, বা মাথা নিচু করে হেঁটে যেত। কিন্তু আজকের অয়ন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। সে তার স্বভাবসিদ্ধ স্থির, শান্ত পদক্ষেপে হাঁটতে লাগল। তার হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অস্বস্তি নেই, আবার কোনো শো-অফও নেই।  তার চোখদুটো একদম স্থির, সামনের দিকে নিবদ্ধ। চারপাশে কে তাকে সাইকোপ্যাথ ভাবছে, কে তাকে ভয় পাচ্ছে, এইসব নিয়ে আজ আর তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এতদিন সে রাগ আর অপমানের ঘোরে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার পথে হাঁটছিল।  বিদিশার ক্লাস থেকে তাকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে। ঠিক আছে। সে ওই অপমানটাও নীরবে হজম করেছে। কিন্তু সে আর পালাবে না। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজটা এমন, যেন ও একটা শান্ত অথচ ভয়ংকর শিকারি প্রাণী, যে জঙ্গল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর বাকি ছোটখাটো প্রাণীরা ভয়ে তার রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। সত্যিই তাই হলো।  অয়ন যত এগোতে লাগল, স্টুডেন্টরা নিজেদের অজান্তেই দু-পাশে সরে গিয়ে তার জন্য একটা ফাঁকা রাস্তা তৈরি করে দিতে লাগল। অয়ন কারোর দিকে ফিরেও তাকাল না।
Parent