মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6283144.html#pid6283144

🕰️ Posted on August 9, 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2537 words / 12 min read

Parent
অধ্যায় 26 বিনীত অনুরোধ, এটা plot and character driven story, এখানে গল্পের প্রয়োজনে সেক্স আর সেন্সুয়ালিটি দুটোই আসবে। "সেক্স চাই, সেক্স চাই" বলে অকারণে আমার মাথা খারাপ করবেন না। ২৬ নং অধ্যায়টি তিলোত্তমা 'কলকাতা'কে উৎসর্গ করা হল। সকাল সাড়ে এগারোটা। ক্রোবার দিয়ে দরজার পুরনো পাইন কাঠের লকটা চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলতেই গন্ধের চোটে ইন্সপেক্টর শিন্ডে পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখে চাপা দিলেন। ঘরের ভেতরের এসি বন্ধ, মুম্বইয়ের ভ্যাপসা গরমে তিন দিন ধরে বন্ধ থাকা একটা ঘরের ভেতরে বাতাস থমকে আছে। শোবার ঘরের সেন্ট্রাল লাইটটা জ্বলছিল না, কিন্তু জানলার পর্দা সামান্য সরে থাকায় দিনের আলোয় ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা অস্পষ্ট হলেও স্পষ্ট। বিছানার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটি মধ্যবয়সী পুরুষের দেহ। শরীরটা সম্পূর্ণ নগ্ন। পেটটা গ্যাসে ফুলে উঠে একটা ঢিবির মতো দেখাচ্ছে। বুক আর পেটের চামড়ার নিচে রক্তনালীগুলো মরে গিয়ে কালচে-সবুজ মার্বেল পাথরের নকশার মতো ফুটে উঠেছে। গলার চামড়া আলগা হয়ে এসেছে। আধখোলা চোখের মণিদুটো ঘোলাটে। সিলিংয়ের স্থবির পাখাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শিন্ডে ঘরে পা না রেখে চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়েই চোখ দুটো দিয়ে টেবিল আর মেঝেটা স্ক্যান করলেন। খাটের পাশের সাইড টেবিলে দুটো স্কচের গ্লাস। একটা খালি, অন্যটায় এখনও অল্প জলীয় অংশ জমে আছে। তার পাশেই পড়ে আছে দামী হুইস্কির বোতলের শেষ সিকিভাগ এবং খাটের নিচে মেঝেতে দুমড়ানো একটা ব্যবহৃত কন্ডোমের মোড়ক।  চাদরটার এক পাশ মেঝেতে ঝুলে আছে, ঘরের কোথাও কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। ড্রয়ার আর আলমারিগুলো পরিপাটি করে বন্ধ। লাশের মুখটা সামান্য হাঁ করা, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া ফেনার দাগ। গলার কাছটা গ্যাসে ফুলে বিকৃত হয়ে গেছে, তবে বাইরে থেকে সেখানে কোনো কাটা বা রক্তপাতের দাগ নেই। শিন্ডে রুমালটা মুখে চেপে ধরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলকে বললেন, "বুড়ো বয়সের ভীমরতি! মদের সাথে পিল গিলে লাইফ এনজয় করতে গিয়েছিল। হার্ট অ্যাটাক হতেই সাথে যে মালটা ছিল, সে ভয়ে জামাকাপড় পরা অবস্থায় সটান চম্পট দিয়েছে। পঞ্চনামায় কেস অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ হবে। তবে আগে সরকারি হাসপাতালের গাড়ি ডাকো, যা গন্ধ ! বডি ফুলতে শুরু করেছে, এই গন্ধের চোটে পুরো ফ্লোর খালি না হয়ে যায়।" ১ কলকাতা বললে চোখের সামনে সাধারণ মানুষের মনের যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তাতে আলিপুর সাধারণত থাকে না। কলকাতা মানেই ভিড়ে-ঠাসা যানজটে হাঁসফাঁস করতে থাকা এক শহর। ফুটপাথ জুড়ে হকারদের চিৎকার, পথচারীর ব্যস্ততা আর তারই মাঝে ফুটপাথে জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকা অনাহারী দারিদ্র্য। অথচ এই চেনা কলকাতার পাশেই এক অচেনা কলকাতা আছে, আলিপুর আর বালিগঞ্জ। শহরের বনেদী বড়লোকদের নিজস্ব ঠিকানা। তার মধ্যে আলিপুরকে তো অনায়াসেই সমগ্র পূর্বভারতের সবচেয়ে অভিজাত পাড়া বলা যায়। বেকার রোড, বেলভেডিয়ার রোড, অলটার রোড কিংবা বর্ধমান রোড, এসব নামগুলোয় এখনও ব্রিটিশ আমলের আভিজাত্যের গন্ধ মেলে। যখন কলকাতা অবিভক্ত ভারতের রাজধানী ছিল, তখন থেকেই মধ্য কলকাতা, বালিগঞ্জ আর আলিপুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সুবিশাল সব বাংলো। সময়ের সাথে সাথে মধ্য কলকাতার সেই সব ঐতিহ্যবাহী বাংলো ভেঙে তার জায়গায় মাথা তুলেছে চকচকে শপিং মল, বহুতল আবাসন আর বহুজাতিক সংস্থার অফিস বিল্ডিং। বালিগঞ্জের কোল থেকেও মুছে গিয়েছে বহু বাংলোর স্মৃতি। কিন্তু আলিপুর আজও আলাদা। তার চিরাচরিত আভিজাত্যের প্রাচীরে আজও আধুনিকতা আঁচড় কাটতে পারেনি। তিন-মানুষ-সমান উঁচু ভারী লোহার গেট, উঁচু প্রাচীরের আড়াল, দেবদারু গাছের ছায়ামাখা নির্জনতা, সিসিটিভি আর সশস্ত্র প্রাইভেট সিকিউরিটির কড়া পাহারায় থাকা বাংলোগুলোতে নজর দেবার সাহস আজ অবধি কোন প্রমোটার দেখায়নি।  দেখাবেই বা কী করে?  রাজ্যের শীর্ষ শিল্পপতি, ঝানু আমলা, হাইকোর্টের বিচারপতি আর ডাকসাইটে আইনজীবীদের আস্তানা এই আলিপুরেই। ক্ষমতা আর আভিজাত্যের বিচারে আলিপুরের এই বংশানুক্রমিক ‘ওল্ড মানি’-র সাথে যদি টেক্কা দেওয়ার মতো কোনো এলাকা থেকে থাকে, তবে তা কিছুটা হেস্টিংসের বাংলোগুলো।  কিন্তু সে তো সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত সীমানা। সাধারণের অলক্ষ্যেই তাদের বসবাস। বৈদিক ভিলেজের কাছে লাউহাটিতে আর জোকাতেও রজনীশ মালহোত্রার বিলাসবহুল ফার্মহাউস রয়েছে। কিন্তু আভিজাত্য আর ক্ষমতার প্রচ্ছন্ন দাপটে সেগুলো আলিপুরের ধারেকাছেও আসতে পারে না। আলিপুর হলো কলকাতার আসল 'পাওয়ার সেন্টার'।  বিড়লা, গোয়েঙ্কা, জালান, খৈতান, বাঙ্গুর কিংবা রুংটাদের মতো শহরের ভাগ্যনিয়ন্তাদের বসবাস এখানে। এদের একেকটা এস্টেট দু-চার একর জমি জুড়ে জাঁকিয়ে বসে আছে। যেন শহরের বুকের ভেতর গড়ে ওঠা অন্য এক শহর। সেই আলিপুরে, আলিপুর পার্ক রোডে, উঁচু ও সুদৃঢ় সীমানা প্রাচীরের ওপারে বিঘা বিঘা জমি জুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল সব বাংলো। চারপাশ ঘন, সুউচ্চ, প্রাচীন মেহগনি, অশ্বত্থ আর দেবদারু গাছে ঘেরা বাইরের দুনিয়ার ধুলো-বালি এদেরকে সযত্নে আড়াল করে রাখে। এখানেই 'মালহোত্রা ম্যানশন'। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটা রাজপ্রাসাদ। সুবিশাল কালো লোহার অটোমেটিক রিভলভিং গেট পার হলে চোখে পড়ে নিখুঁতভাবে ট্রিম করা সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ লন। মাঝখানে ইতালিয়ান মার্বেলে বাঁধানো ফোয়ারা, যা থেকে অজস্র সূক্ষ্ম জলধারা শূন্যে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের বেলায় সেই জলকণাগুলোতে আলো ঠিকরে পড়ে চারপাশে হীরের কুচির মতো দ্যুতি ছড়ায়। লন পেরিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলেই প্রাসাদের মূল প্রবেশদ্বার। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের আদলে তৈরি সুবিশাল ভবনের সদর দরজাটি ভারী সেগুন কাঠের তৈরি, গায়ে জটিল নকশার পিতলের কাজ।  প্রবেশদ্বার টপকালেই চোখে পড়ে এক রাজকীয় পরিমণ্ডল। সিলিং থেকে ঝুলছে বেলজিয়াম কাঁচের সুবিশাল ঝাড়বাতি। পালিশ করা ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেয় তার আলো পড়ে প্রতিফলিত হয়ে গোটা ঘরে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করছে। দেওয়ালে টাঙানো তৈলচিত্র আর ঘরের কোণে রাখা দুষ্প্রাপ্য অ্যান্টিক ভাস্কর্যগুলো আভিজাত্যের প্রমাণ দিচ্ছে।  এন্ট্রান্স হল পার হয়ে বাঁ-দিকের লম্বা, গালিচা-মোড়া চওড়া করিডর ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে এক জোড়া সুউচ্চ, ডাবল-লিফ মেহগনি কাঠের কারুকার্য করা দরজা। সেই অলঙ্কৃত দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখলেই মালহোত্রা ম্যানশনের সুবিশাল ডাইনিং হল। এটা বাংলোর নিচতলার সাউথ উইং। প্রাইভেট ডাইনিং হলটি এই মুহূর্তে রোজকার দিনের মতো ঠান্ডা থমথমে মেজাজে ডুবে আছে। ঘরটির উচ্চতা সাধারণ যে কোনো আধুনিক বাড়ির দ্বিগুণ। এখানেও, সিলিং থেকে ঝুলছে বিশাল এক ক্রিস্টালের অ্যান্টিক ঝাড়বাতি, ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে বার্মিজ টিক কাঠের প্যানেলিং। দেওয়াল থেকে ঝুলছে তৈলচিত্র। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশ ফুট লম্বা মেহগনি কাঠের তৈরি ডাইনিং টেবিল। টেবিলটি এতই নিখুঁতভাবে পলিশ করা যে, সেখানে সিলিংয়ের আলোর প্রতিফলন যেন আয়নার মতো ভেসে উঠছে।  টেবিলের ওপর পাতা রয়েছে হস্তশিল্পের কাজ করা সিল্কের রানার। তার ওপর সাজানো কাট-গ্লাসের জগ, বোন চায়নার থালা-বাসন, আর রুপোলি ক্যাটলারি সেট। টেবিলের প্রধান আসনে টানটান হয়ে বসে আছেন মালহোত্রা গ্রুপের একচ্ছত্র অধিপতি, রজনীশ মালহোত্রা। তার পরনে একদম নিখুঁত ইস্ত্রি করা সিল্কের ডার্ক নেভি-ব্লু হাউজ গাউন, ভেতরে হালকা নীল রঙের ফর্মাল শার্ট। কলারের বোতাম খোলা থাকলেও তার মেরুদণ্ড কাঠপেন্সিলের মতো সোজা। মাথার চুলগুলো ব্যাক-ব্রাশ করা, দু-পাশের কনপটির কাছে কালচে চুলে রুপোলি ছোপ লেগেছে, ব্যস এটুকুই। তার চওড়া শারীরিক গঠনে বয়সের আর কোন ছাপ পড়েনি। বরং বলা ভালো, সময় যেন এই লোকটার কাছে এসে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়েছে।  নাকের ওপর পাতলা গোল্ডেন ফ্রেমের একটা বাইফোকাল চশমা। ঠোঁটের গঠন সরু আর খসখসে। রজনীশের মুখের হাড়গুলো অত্যন্ত শার্প। চওড়া চোয়াল সবসময় শক্ত থাকে, এই দুটো মিলে তার চেহারায় এক ধরনের নিষ্ঠুর গম্ভীরতার ছাপ ফেলেছে।  তার হাতের আঙুলগুলোতে ঘন লোমের আস্তরণ, ডান হাতের তর্জনীতে একটা বিশাল আকারের রক্তমুখী নীলার আংটি। লাউঞ্জের আলোয় ঠিকরে উঠছে। রজনীশ মালহোত্রা এই শহরের অন্যতম ক্ষমতাবান ও পরাক্রান্ত শিল্পপতি। রিয়েল এস্টেট, টেক্সটাইল এবং হসপিটালিটি সেক্টরে মিলিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য তিনি পরিচালনা করেন সম্পূর্ণ নিজের ইশারায়। কিন্তু, তার পরিচিতি কেবল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে শেষ হয় না। সেই প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। এই বিশাল বাড়িতে প্রতিটা ধূলিকণা পর্যন্ত তার অনুশাসন মেনে নড়াচড়া করে। কোন আবেগ, কোনরকম কোমলতা, দুর্বলতার স্থান তার ডিকশনারিতে নেই। করুণা শব্দটাকে তিনি দুর্বল মানুষের বিলাসিতা বলে মনে করেন। আপাতত, ওনার পুরো মনোযোগ নিবন্ধ হয়ে আছে হাতে ধরা ইংরেজি দৈনিক 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর ফ্রন্ট পেজে। সংবাদপত্রের প্রতিটি খবর উনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েন। ব্যবসায়ের রাজনীতি আর রাজনীতির ব্যবসা, এই দুটোই ওনার জীবনের মূল মন্ত্র।  চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে ওনার তীক্ষ্ণ, কালো চোখের তারা দুটো খবরের প্রতিটি লাইনের ওপর দিয়ে স্ক্যানারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথম পাতার একদম নিচের অংশে একটি খবর বিশেষ ব্লকে ছাপা হয়েছে। গাঢ় অক্ষরে শিরোনাম: "TRAGIC CAR ACCIDENT AT BYPASS: STATE INFRASTRUCTURE BOARD MEMBER'S WIFE PASSES AWAY, SISIR ROY CRITICAL" খবরের সারসংক্ষেপ হলো - গতকাল সন্ধ্যায়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে সায়েন্স সিটির কাছাকাছি এক মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য শিপিং করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শিশির কুমার রায়ের মার্সিডিজ গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ল্যাম্পপোস্টে সজোরে ধাক্কা মারে। গাড়িতে থাকা ওনার স্ত্রী অমৃতা রায় (৩৫) ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন। শিশির রায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাইপাসের এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। রজনীশ খুব ধীরে, ঠান্ডা মাথায় শেষ পর্যন্ত খবরটা পড়লেন। তার মুখে বিষাদ, সহানুভূতি বা বিস্ময়, কোনরকম ইমোশনের চিহ্ন ফুটে উঠল না। শিশির কুমার রায় বা ওনার স্ত্রী, কারো সাথেই রজনীশ মালহোত্রার কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না। শহরের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা রজনীশের কাছে আরও দশটা চেনা চেহারার মতো শিশির রায়ও কেবলই এক পরিচিত নাম।  ওনার মুখটা পাথরের মতো ভাবলেশহীন রইল। ঠিক এই সময়ে ডাইনিং হলে প্রবেশ করে রজনীশের ডানদিকের চেয়ারটি সামান্য টেনে অত্যন্ত নিঃশব্দে ওনার পাশে এসে বসলেন ওনার বিধবা বোন, বীণা কাপুর। তার পরনে, হালকা ক্রিম রঙের হাতে বোনা চিকনকারির সুতি-সিল্কের সালওয়ার স্যুট, কাঁধে আলতো করে ফেলা ম্যাচিং করা সূক্ষ্ম দোপাট্টা। চুলে নিখুঁত পরিপাটি খোঁপা। গলায় একটা মোটা সোনার চেন।  বীণা দেবী হলেন এই মালহোত্রা প্রাসাদের অন্দরমহলের মূল কাণ্ডারী। ওনার নিজের স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি ভাইয়ের সংসারে স্থায়ী আস্তানা গেড়েছেন। রজনীশকে তিনি ভয়ও পান, আবার ভালোও বাসেন; একইসাথে ওনার ক্ষমতার ছায়ায় থেকে এই বাড়িতে নিজের দাপট বজায় রাখেন। বীণা দেবী চেয়ার টেনে বসার পরও রজনীশের দৃষ্টি খবরের কাগজ থেকে সরলো না। তিনি টেবিলে বসেই সার্ভেন্ট বেলটা আলতো করে বাজালেন। যতক্ষণ না রজনীশ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই টেবিলে আর কারও কোনো কিছু মুখে তোলার নিয়ম নেই। সার্ভেন্ট বেলের মিহি আওয়াজটা ডাইনিং হলের সুউচ্চ সিলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই করিডর দিয়ে একজন প্রৌঢ় লোক নিঃশব্দ পায়ে ঘরে প্রবেশ করল।  মালহোত্রা পরিবারের পুরানো ভৃত্য রামদীন। গত তিরিশ বছর ধরে সে এই পরিবারে দাসত্ব করে আসছে। ষাটোর্ধ্ব রামদীন বয়সে রজনীশের চেয়ে বেশ কিছুটা বড়। রামদীনের পরনে ধবধবে সাদা কাজের পোশাক। হাতে রুপোলি ট্রে-তে সাজানো কাঁচের গ্লাসে টাটকা ফলের রস, মাখন মাখানো টোস্ট আর রজনীশের জন্য কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম ব্ল্যাক কফি। রামদীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্লেট আর কাঁচের গ্লাসগুলো টেবিলে সাজিয়ে রেখে, একইভাবে নিঃশব্দে টেবিল থেকে একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।  বীণা দেবী আড়চোখে একবার ভাইয়ের দিকে তাকালেন।  "সংবাদপত্রে বিশেষ কোন খবর বেরিয়েছে নাকি, ভাই ?"  তিনি খুব সাবধানে অত্যন্ত মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, যাতে রজনীশের মনোযোগে কোন ব্যাঘাত না ঘটে। রজনীশ হাতের কাগজটা সামান্য নামিয়ে চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে বোনের দিকে তাকালেন। তার চোখে কোনো রকম চাঞ্চল্য নেই।  তিনি অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন,  "বিশেষ কিছু নয়। রাজ্য শিপিং করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শিশির রায়ের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বাইপাসে। মিঃ রায় আইসিইউ-তে, ওনার স্ত্রী স্পট ডেড।" বীণা কপূর সামান্য চমকে উঠে বুকের ওপর দোপাট্টাটা টেনে নিলেন।  "ইশ! বড্ড মর্মান্তিক ঘটনা। উনি কিছুদিন আগেই আমাদের ক্লাবের চ্যারিটি ফাংশনে এসেছিলেন না? ভদ্রমহিলার বয়সও তো বেশি হয়নি..." রজনীশ খবরের কাগজটা এক ছাঁচে ভাঁজ করে টেবিলের একপাশে রেখে নিজের ব্রেকফাস্ট টেনে নিলেন। কিন্তু, দিদির কথার কোন উত্তর দিলেন না।  তার কাছে অহেতুক সমবেদনা জানানো কিংবা শোক প্রকাশ করা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যে বিষয়ে তার নিজস্ব লাভ-ক্ষতির অঙ্ক জড়িয়ে নেই, সেখানে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথাও নেই। ঠিক এই সময়েই ডাইনিং হলের বাইরের করিডরে একজোড়া ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল। ভেতরে প্রবেশ করল বরুণ কপূর, রজনীশ মালহোত্রার ভাইপো, বীণার একমাত্র ছেলে। বরুণের পরনে একটি নিখুঁত কাট এর চারকোল-গ্রে থ্রি-পিস ফর্মাল স্যুট, ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট আর একটি ডার্ক মেরুন টাই। চুলগুলো জেল দিয়ে পারফেক্ট সাইড-পার্টিং করে আঁচড়ানো। হাতে একটা দামি লেদার ফাইল আর লেটেস্ট মডেলের আইপ্যাড। সে মালহোত্রা গ্রুপের ডিরেক্টর অফ অপারেশনস। বরুণের চেহারাটি সুঠাম, ঠোঁটের কোণে সবসময় মার্জিত হাসি ঝুলে থাকে, যা দেখলে মনে হবে সে বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বিনয়ী মানুষ। কিন্তু, মনে মনে বরুণ ভালোমতোই জানে সে মালহোত্রা রক্তের ডিরেক্ট ওয়ারিশ নয়। এই মালহোত্রা পরিবারে সে কেবলই একজন 'ভাগ্নে', আসল উত্তরাধিকারী বিক্রম। "গুড মর্নিং, মামাজি। গুড মর্নিং, মাম্মি" বরুণ বিনীতভাবে বলল। রজনীশ এতক্ষণ হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। তিনি বাইফোকালের ওপর দিয়ে বরুণের দিকে তাকালেন।  কোনো ভূমিকা না করে এক শব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,  "কাজ কতদূর?" "কমপ্লিট, মামাজি" বরুণের গলায় হঠাৎই এক ধরণের পেশাদারি তৎপরতা চলে এল।  "বাইপাসের জমির ক্লিয়ারেন্স আমরা আগামী সোমবারের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছি। কেএমডিএ-র নতুন জয়েন্ট কমিশনার কাল রাতে ফাইল সই করে দিয়েছেন। এখন শুধু এনওসিটা বাকি।" কথাটা শেষ হতেই ডাইনিং হলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। রজনীশ চশমার ওপর দিয়ে একবার রামদীনকে দেখে নিয়ে শান্তভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।  এবার টেবিলের বাকিরা খাওয়া শুরু করতে পারে। কিন্তু, চায়ের কাপটা টেবিলে নামাতেই তার গলায় ফুটে উঠল বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ, "রামদীন, বিক্রম কোথায় ?এখনও নিচে নামেনি কেন ?" রজনীশের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। রামদীনের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। সে তোতলে উঠল, "ম-ছোট সাহেব... মানে বিক্রম বাবা... উনি... উনি তো এখনও নিজের কামরায়..." রজনীশ এবার চশমার ওপর দিয়ে সরাসরি রামদীনের দিকে তাকালেন। ডাইনিং হলের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। "কামরায় মানে?"  রজনীশের গলাটা খাদে নামানো, কিন্তু তাতে এমন এক গম্ভীর ভারী ভাব ছিল যা ঘরের বাতাসকে ভারী করে দিল।  "কটা বাজে এখন? এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি?" রামদীন এক পা পিছিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে হাত জোড় করল। ওর বুক ধড়ফড় করছে।   "মা-মালিক... ছোট সাহেব কাল রাতে... মানে আজ ভোরে... শেষ রাতে বাড়ি ফিরেছেন। খুব... খুব ক্লান্ত ছিলেন, তাই..." "শেষ রাতে?" রজনীশের মুখের ফর্সা চামড়া মুহূর্তের মধ্যে রাগে লাল হয়ে উঠল। ওনার চওড়া চোয়ালের পেশিগুলো দপ দপ করে কেঁপে উঠল।  "একটা একুশ বছরের ধাড়ি বাছুর, কোম্পানির কোন দায়িত্ব নেয় না, সারারাত পার্টি করে মদ গিলে ভোরে বাড়ি ফেরে! আর এগারোটা-বারোটা অবধি শুয়ে শুয়ে শুয়োরের মতো ঘুমায়!" রজনীশের গলার আওয়াজে ডাইনিং হলের কাঁচের ঝাড়বাতিটা যেন হালকা কেঁপে উঠল। বরুণ জুসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এমন নির্লিপ্তভাবে তাতে চুমুক দিল, যেন সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তবে রজনীশের এই বিরক্তি মনে মনে তাকে বেশ খানিকটা তৃপ্তিই দিল। ঠোঁটের কোণে সেই সূক্ষ্ম হাসির আভাসটা অবশ্য সে ধরা পড়তে দিল না। বীণা দেবী মোলায়েম গলায় বাধা দিয়ে বললেন,  "আহা রজনীশ, তুমি সকাল সকাল অকারণে কেন নিজেকে উত্তেজিত করছ বল তো? ও তো বাইরে কোনরকম বাজে ঝামেলায় জড়াচ্ছে না। বাচ্চা ছেলে, এটাই তো আনন্দ করার বয়স। এ বয়সে পুরুষমানুষের ওসব একটু-আধটু থাকেই। বয়স বাড়লে, মাথায় দায়িত্ব পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে।" রজনীশ ওনার দিদির দিকে তাকালেন না। কিন্তু ওনার চেহারায় চরম বিতৃষ্ণা ফুটে উঠল। এই নিয়ে অনেকবার তাদের মধ্যে কথা হয়েছে, রজনীশ কখনো জিততে পারেননি। তিনি ভালো করেই জানেন কেন ওনার দিদি বিক্রমকে এই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রাকে অন্ধের মতো প্রশ্রয় দেয়। তিনি আবার কাজের কথায় ফিরে এলেন। "ভোটের ফান্ডের আপডেট কী ?" রজনীশের গলায় শীতলভাবটা আবার ফিরে এসেছে। বরুন সোজা হয়ে বসল।  "মামাজি, ওদের স্টেট ট্রেজারার পরশুদিন আবার মেসেজ পাঠিয়েছে। রাজারহাটের এনওসি-র বিনিময়ে ওরা ডাবল ডিজিট চাইছে। একেবারে ফিফটি পার্সেন্ট আপফ্রন্ট আর বাকিটা ফাইল ক্লিয়ার হওয়ার পর।" সে একটু থামল, তারপর নিচু গলায় যোগ করল,  "অপনেন্ট পার্টিও অন-টেবিল বসার মেসেজ দিয়েছে। ওরা বাজেটের থার্টি পার্সেন্ট ডিমান্ড করছে। তবে দিল্লির ইনপুট, তাতে এবার হাওয়া ঘোরার চান্স সেভেন্টি পার্সেন্ট।" রজনীশ শান্তভাবে আবার চশমাটা পরে নিলেন। খুব ধীর, কিন্তু মেধাচ্ছন্ন গলায় বললেন, "অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য ডাবল ডিজিটের ক্যাশ ছুড়ে দেওয়া বোকামি। ট্রেজারারকে বলো পাঁচ পার্সেন্ট টোকেন অ্যামাউন্ট রিলিজ হবে, তাও আমাদের সার্ভিস প্রোভাইডারদের অ্যাকাউন্ট দিয়ে। নিউ টাউনের প্রজেক্টের এনওসি সই হয়ে আমার টেবিলে না আসা পর্যন্ত এক পয়সার এনভেলপও লকার থেকে বের হবে না।" "আর অপনেন্ট পার্টিকে বলো...এখন কেবল চায়ের খরচ দেওয়া হবে। বাকিটা রেজাল্টের পর। আমরা পলিটিশিয়ানদের কিনে নিই বরুণ, ওদের কথায় উঠি-বসি না।  আমাদের ইনভেস্টমেন্ট যেন সবসময় রিটার্ন দেয়।" "আন্ডারস্টুড, মামাজি। একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। আমি আজ দুপুরে লিগ্যাল টিমকে সেইভাবেই নির্দেশ দিচ্ছি,"  বরুন মাথা নিচু করে বলল। এমন সময় রামদীন আবার ডাইনিং টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল।  "মালিক... একটা খবর ছিল"  সে ভীরু স্বরে বলল। রজনীশ বিরক্ত চোখে তাকালেন।  "কিসের খবর?" "অনন্যা দিদিমণি...আগামী কদিনের মধ্যেই কলকাতায় আসছেন।" কথাটা রামদীনের মুখ থেকে বেরোনো মাত্র ডাইনিং হলের বাতাস যেন এক লহমায় জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেল। রজনীশের হাত টেবিলের ওপর শক্ত মুঠি পাকিয়ে উঠল। ওনার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে উঠল, ওনার চওড়া কপাল কুঁচকে উঠল। চিন্তায় নয়, রাগে। বীণার মুখটাও মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে উঠল। তিনি কটু চোখে রামদীনের দিকে তাকালেন। বরুণ অবশ্য নিজের মুখের ভাব সামলে নিল। কিন্তু ওর চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠল।  রজনীশ মালহোত্রা প্রায় এক মিনিট কোন কথা বললেন না। নিস্তব্ধ ডাইনিং রুমে শুধু দেয়ালঘড়ির টিক-টিক শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। তারপর তিনি ধীরভাবে বরফ ঠান্ডা গলায় রামদীনকে নির্দেশ দিলেন, "বলবি, এ বাড়িতে কোন ঘর খালি নেই। ও যেন কোন হোটেলে গিয়ে ওঠে।" কথাটা বলে রজনীশ এক মুহূর্তও আর টেবিলে বসলেন না। তিনি টেবিল ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে হনহন করে হেঁটে ডাইনিং হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
Parent