মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬৪
৭
রেড রোডে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো পনের মিনিট লেগে গেল। আজকে গোটা শহর যেন ভেঙে পড়েছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে লম্বা লাইন। প্রতি পাঁচ মিটার অন্তর কোন না কোন পরিবার ময়দানে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছে।
রেড রোডের সিগন্যালে যখন গাড়ি দাঁড়াল, অরুণ জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। আকাশে একঝাঁক পায়রা উড়ছে, আর ময়দানের হালকা ধোঁয়াটে রোদে কেল্লা ফোর্ট উইলিয়ামের উঁচু প্রাচীরটা বেশ আবছা দেখাচ্ছে।
আজ সকালে তিনি ভেবেছিলেন, মিটিংটা সেরে নিয়ে চারটে নাগাদ সিঙ্গাপুরে একটা মেইল পাঠিয়ে লেক ক্লাবে গিয়ে শান্তিতে একটা ড্রিঙ্ক নেবেন। অথচ এখন একজন অজানা লোকের সঙ্গে দেখা করার জন্য ফেয়ারলিতে দৌড়তে হচ্ছে।
মেয়ো রোডের দিকে না ঢুকে শিবু দক্ষ হাতে গাড়িটাকে রেড রোডের চওড়া সরণি ধরে সোজা কিংসওয়ের দিকে কাটাল, এখান থেকে এক টানে স্ট্র্যান্ড রোডে ঢুকে পড়া যায়। স্ট্র্যান্ড রোডে ঢুকলেই ফেয়ারলি প্লেস ঘাট আর বেশি দূরে নয়।
ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের মোড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা একটা পনের বেজে গেল। স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর লরি আর হলুদ ট্যাক্সির ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ শব্দ নিত্যদিনের সঙ্গী হলেও, গঙ্গার দিকটা আজ বেশ নির্জন। ছুটির দিনে লঞ্চ চলাচল কম। হুগলি নদীর ওপর রোদ চিকচিক করছে। গঙ্গার হাওয়ায় মাটির সোঁদা গন্ধ। পাড়ে জেটির লোহায় জং ধরা চেনের ওপর গঙ্গার ঢেউ এসে নিয়মিত ছন্দে ধাক্কা মারছে।
ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের পাশেই পোর্টের কাস্টমস ও মেরিন ট্রাফিক কন্ট্রোলের কিছু পুরনো চুনকামে ঢাকা ইটকাঠের দালান। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের যে লঞ্চগুলো পর্যটকদের জন্য চালানো হয় সেগুলো একটু দূরে বাঁধা।
অরুণ গাড়ি থেকে নেমে পোর্টের নোটিস বোর্ড দেওয়া লোহার ফটকটা পার হলেন। দুজন সিআইএসএফ জওয়ান ভারী বুট পরে দাঁড়িয়ে ছিল। অরুণের হাতের বিশেষ পোর্ট পাসের দিকে তাকিয়ে তারা বিনাবাক্যে রাস্তা ছেড়ে দিল।
জেটির কাঠের তক্তা পার হয়ে তিনি উঠে এলেন 'ময়ূরাক্ষী' ভেসেলের ওপর। এটি পোর্টের পুরনো, ঐতিহ্যবাহী স্টিমার-টাইপ রিভার ক্যাটামারান। সাধারণত বিদেশি প্রতিনিধি বা মন্ত্রী পর্যায়ের ভিজিটরদের নদী পরিদর্শনের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
ভেসেলের ডেকে পা দিতেই একজন নেভি ব্লু ইউনিফর্ম পরা পোর্ট অ্যাটেনডেন্ট এগিয়ে এল।
"অরুণ চ্যাটার্জী ? আসুন স্যার। বড় সাহেব লোয়ার লাউঞ্জে অপেক্ষা করছেন।"
অরুণ কাঠের সিড়ি দিয়ে মেহগনি কাঠে বাঁধানো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত লোয়ার লাউঞ্জে নেমে গেলেন।
‘ময়ূরাক্ষী’-র এসি ঢাকা লোয়ার লাউঞ্জে নামার ধাতব সিঁড়িটা বেশ খাড়াই।
জেটির ওপর গঙ্গার ঢেউ আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আস্ত ক্যাটামারানটা হালকা দুলছিল। কাঠের পলিশ আর নোনতা হাওয়ার মিশ্র গন্ধের ভেতরে একটা ভিআইপি মেজাজ থমথম করছে।
লোয়ার লাউঞ্জে পা রাখতেই অরুণের চামড়ার জুতোর শব্দটা মিহি কার্পেট শুষে নিল। ভেতরে ঢুকতেই অরুণের নাকে এল তাজা এসপ্রেসো কফি আর পাইপের নামী তামাকের গন্ধ।
ডেকোরেশন ব্রিটিশ আমলের মতো। ভারী, চামড়ার সোফা, কাচের ট্রফি কেস আর দেওয়ালে ঝুলছে, পুরনো প্যালকাটা পোর্টের জলরঙের ছবি।
সোফায় বসে ছিলেন অমিতাভ সেনগুপ্ত। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট আর ছাইরঙা ব্লেজার। তবে ঘরের একদম কোণে, ভারী রিভলভিং চেয়ারে গা এলিয়ে যিনি বসে আছেন যে মানুষটি বসে আছেন, তাকে দেখে চেনা লাগলেও তার পরিচয় অরুণের কিছুতেই মনে পড়ল না।
অমিতাভ সেনগুপ্ত অরুণকে ঢুকতে দেখে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, তারপর মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
"আসুন অরুণবাবু। জ্যাম কাটিয়ে পৌঁছাতে পারলেন শেষ পর্যন্ত?"
"আজকে আলিপুর রোড পার হওয়া মানে মহাভারতের যুদ্ধ জয় করা।"
উত্তর দিয়ে অরুণ নিজের ওভারকোটের বোতামটা আলগা করলেন। তার নজর কিন্তু অমিতাভ সেনগুপ্তের পাশের লোকটার ওপর।
মানুষটি বেশ লম্বা চওড়া চেহারার। মাথায় কাঁচা-পাকা পেছনের দিকে ব্যাকব্রাশ করা চুল। চোখে সোনালি ও মোটা ফ্রেমের চশমা। তবে
চোখ দুটো বড্ড বেশি ধারালো। যেন একদম গভীরে নেমে যাচাই করে নিতে অভ্যস্ত। পরনে ধবধবে সাদা খাদি কুর্তা, আর তার ওপর চাপানো গাঢ় নীল রঙের খাদ্দারের জ্যাকেট।
ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে একটা দামি ডমিনিকান সিগার। লাউঞ্জের টেবিলে দুটো অর্ধেক খাওয়া ব্ল্যাক কফির কাপ, আর তার পাশেই রাখা একটা গাঢ় বাদামী চামড়ার পোর্টফোলিও ব্যাগ।
অমিতাভ সেনগুপ্ত হাত বাড়িয়ে লোকটির দিকে ইঙ্গিত করলেন,
"অরুণবাবু, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি অরবিন্দ জোশী। দিল্লিতে মিনিস্ট্রি অফ শিপিং অ্যান্ড ওয়াটারওয়েজ-এর অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি। সেই সঙ্গে পোর্টস সিকিউরিটি রিভিউ কমিটির হেড।"
অরবিন্দ জোশী সিগারটা অ্যাসট্রেতে আলতো করে ঠুকলেন। এক ফোটা ধূসর ছাই ঝরে পড়ল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন না, কিন্তু অত্যন্ত সংযত ভঙ্গিতে ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন।
"অরুণ চ্যাটার্জী। ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোনের হেড।"
জোশী সাহেবের গলাটা বেশ ভারী, একটু খাঁজকাটা।
"আপনার নাম আমি মুম্বইয়ে বোর্ডের ফাইলগুলোতে বেশ কয়েকবার দেখেছি।"
"নমস্কার জোশীজী।"
অরুণ হাত মেলালেন। তার মনে একটা মৃদু অস্বস্তি গজিয়ে উঠল। দিল্লির লোক, অথচ ভিআইপি গেস্ট হাউসে না এসে, এই ডিসেম্বরের দুপুরে পোর্টের একটা লঞ্চে বসে আছেন?
অমিতাভ সেনগুপ্ত পাশে রাখা টি-পয় থেকে কফির পটটা তুলে অরুণের দিকে তাকালেন,
"কফি নেবেন অরুণবাবু?"
"না অমিতাভবাবু, থ্যাংকস। আমি সোজাসুজি কাজের কথায় আসতে চাই। আপনি আমাকে যেভাবে এখানে ডাকলেন... ব্যাপারটা কী? আজ ইভনিং-এর মধ্যে আমার মুম্বইয়ে ইস্টার্ন জোনের প্রিলিমিনারি ডক-অডিট রিপোর্ট পাঠানোর কথা।"
অরবিন্দ জোশী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একটা সূক্ষ্ম অবজ্ঞার ভাব ছিল। সেটা অরুণের চোখ এড়াল না। তবে উনি খোঁচাটা হজম করে নিলেন।
অরবিন্দ জোশী সিগারে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা পোর্টের লাউঞ্জের এসি বাতাসের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ভেসে গেল।
"মুম্বই..."
জোশী সাহেব স্বগতোক্তির মতো বললেন,
"আপনাদের বার্থিং টাইম আর ডেমারেজের হিসাব। খুব ভালো। কিন্তু মিঃ চ্যাটার্জী, আজ আপনাকে রিপোর্টটা কয়েক ঘণ্টা হোল্ডে রাখতে হবে।"
অরুণ ভুরু কুঁচকে অমিতাভ সেনগুপ্তের দিকে তাকালেন। তিনি কফির কাপে একটা চামচ নাড়ছেন, কিন্তু কোন শব্দ হচ্ছে না। পুরো পরিবেশটাতে একটা ভারী রহস্যের গন্ধ।
জোশী সাহেব সামনে রাখা কাঠের ডেক্সটপ ফাইলটার ফিতে আলগা করলেন। তারপর সোজা অরুণের চোখে চোখ রাখলেন।
"আপনার কি ধারণা মিস্টার চ্যাটার্জী, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হুট করে আমাকে বিনা নোটিশে কলকাতায় পাঠাল কেন? স্রেফ রুটিন ইন্সপেকশনের জন্য?"
অরুণ একটু থামলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে শান্তভাবে বললেন,
"আমার কাজ অপারেশনাল ডোমেইনে। সিকিউরিটি আর পলিটিক্যাল প্রবলেম দেখা তো আমাদের কাজ নয়।"
"পুলিশ আর পোর্ট অথরিটি দেখে, ক্রাইম আর কার্গো এন্ট্রি।"
জোশী চশমাটা খুলে পকেট থেকে একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে সেটা মুছতে মুছতে বললেন।
"আর সেন্ট্রাল এজেন্সি যেটা দেখে, সেটা হলো মানি ট্রেইল আর ডেটা ট্রেইল।"
জোশী সাহেব একটু থামলেন। ক্যাটামারানের তলায় গঙ্গার জল আছড়ে পড়ার একটা ভারী ‘ছপ’ শব্দ হলো।
"এক মাস আগে,"
জোশী বলতে শুরু করলেন, তাঁর প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট, কাটা কাটা,
"NTRO থেকে একটা কনফিডেনশিয়াল অ্যালার্ট আসে। তারা ফ্ল্যাগ করে, মুম্বই বন্দরের কেন্দ্রীয় 'কার্গো ট্র্যাকিং' এবং 'মেরিন ট্রাফিক ডেটা' কাস্টমসের এনক্রিপ্টেড সার্ভার থেকে বাইপাস হয়ে একটা বেআইনি ফরেন সার্ভারে রিয়েল-টাইমে লিক হচ্ছে।"
অরুণের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন বরফজল নেমে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন।
"হ্যাক করা হয়েছে?"
"নো" জোশী হাত নাড়লেন।
"হ্যাকিং হলে আমাদের সিস্টেম ধরে ফেলত। ব্যাকডোর এন্ট্রি। একদম ইনসাইডার জব। একটা প্যারালাল সার্ভার মিররিং করা হয়েছে। অর্থাৎ মুম্বই ডকে কোনো জাহাজ কখন ঢুকছে, তার কন্টেনারে কী মাল আছে, তার বিওএল-এর বিবরণ কী, কারগো কার কাছে ডেলিভারি হবে, এমনকী কাস্টমস স্নাইফারের রেন্ডম ইনস্পেকশন লিস্টে কোন গাড়িটা পড়েছে। সবকিছু লাইভ চলে যাচ্ছে ওই থার্ড-পার্টি সার্ভারে।"
জোশী আবার থামলেন। অরুণের মুখের ভাব পর্যবেক্ষণ করলেন কিছুক্ষণ।
"আর গত সপ্তাহে,"
জোশী গলাটা আরও এক ধাপ নামিয়ে আনলেন,
"আমাদের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি কো-অর্ডিনেটর কনফার্ম করেছে, মুম্বইয়ের ওই একই প্যাটার্ন এখন বিশাখাপত্তনম পোর্টেও শুরু হয়েছে। দ্য সেম মিরর সার্ভার ইজ অ্যাক্টিভ হেয়ার ইজ দেয়ার টু।"
কথাটা অরুণের কান দিয়ে ঢুকে সোজা মাথার ভেতরে একটা বিস্ফোরণ ঘটাল।
বিশাখাপত্তনম! মিরর সার্ভার! কার্গো ডেটা লিক!
অরুণের চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে অনন্যার মুখটা ভেসে উঠল।
অরুণের বুকটা ধক করে উঠল। তার হাতের তালু ঘেমে উঠছে। অনন্যা মুম্বইয়ে বসে তাকে যে তথ্যগুলো দিয়েছিল, অরুণ ভেবেছিলেন সেগুলো অনন্যা হয়তো কোনোভাবে রাজীব মাথুরের থেকে পেয়েছে বা সিংহানিয়াদের হয়ে কর্পোরেট স্পাইগিরি করছে। কিন্তু ব্যাপারটা এখন আর স্রেফ একটা কোম্পানির চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই! এরা একটা বিশাল চক্রের অংশ যারা ন্যাশনাল ডেটা নেটওয়ার্কের ওপর ডিরেক্ট অ্যাটাক করছে !
অরুণ নিজের মনের এই মারাত্মক আলোড়নটা বাইরে প্রকাশ না করার প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু, তার মুখের ভাবের সূক্ষ্ম পরিবর্তন অরবিন্দ জোশীর মতো অভিজ্ঞ আমলাদের চোখ এড়ানোর কথা নয়।
জোশী সিগারের ছাই ঝেড়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন, "দেখছি খবরটা শুনে আপনি বেশ শকড হলেন, মিঃ চ্যাটার্জী।"
অরুণ দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। গলার খসখসে ভাবটা দূর করতে একবার কেশে নিয়ে বললেন,
"শকড হওয়াটাই স্বাভাবিক, জোশীজী। সেন্ট্রাল কাস্টমস আর পোর্ট অথরিটির সার্ভারের ডেটা যদি লিক হতে শুরু করে, তবে তো ভারতের পুরো লজিস্টিকস আর মেরিটাইম সিকিউরিটি কোলাপ্স করবে! ভ্যানগার্ডের মতো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে ভারতের পোর্টে। এই ডেটা যদি ফরেন কম্পিটিটরদের হাতে যায়..."
"কম্পিটিটর?"
অরবিন্দ জোশী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একটা মারাত্মক শ্লেষ ছিল।
"আপনার কি মনে হয় এই ডেটা স্রেফ কিছু বিজনেস রাইভালদের হাতে যাচ্ছে? মিঃ চ্যাটার্জী বিষয়টা এত সরলভাবে নেবেন না।"
এবার অমিতাভ সেনগুপ্ত মুখ খুললেন।
অরুণের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,
"অরুণবাবু, জোশীজী যা বলেছেন তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
গত পনেরো দিনে আরব সাগরের আন্তর্জাতিক সীমানায় তিনটে কন্টেনার ভেসেল তাদের নির্ধারিত কোর্স থেকে সামান্য সরে যায়। স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য। কাস্টমস বা কোস্ট গার্ডের কাছে কোনো স্যাটেলাইট অ্যালার্ট পৌঁছায়নি, কারণ সিস্টেমে দেখানো হয়েছিল জাহাজগুলো একদম ঠিক ট্র্যাকে স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। আসল ট্র্যাকিং ডেটা যখন ম্যানুয়ালি মেলানো হলো, দেখা গেল বিশাখাপত্তনমের দিকে আসা একটা প্যানামেক্স ভেসেলের পজিশন রিয়েল-টাইমে প্রায় ত্রিশ নটিক্যাল মাইল দূরে ফেক করা হয়েছিল।"
অরুণ স্থির হয়ে শুনলেন। এর ভয়াবহতা বুঝতে তাঁর এক সেকেন্ডও বেশি সময় লাগল না। পোর্টের ডেটাবেস লিক হওয়া মানে শুধু বিষয়টা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জলপথে নজরদারির রাডারকে অন্ধ করে দেওয়া। এর পরিণাম ভয়াবহ। জলপথ দিয়ে কোনরকম অ্যাটাক হলে কোস্টগার্ড সেটা লাস্ট মোমেন্টের আগে বুঝতেই পারবে না।
জোশীজী ফাইলটা বন্ধ করে সেটি ফিতে শক্ত করে বাঁধলেন।
"এবার বলুন মিস্টার চ্যাটার্জী, আপনার ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোনের লজিস্টিক সার্ভার কি সম্পূর্ণ নিরাপদ? "
অরুণ সোজা অরবিন্দ জোশীর চোখের দিকে তাকালেন।
"আমাদের ইস্টার্ন জোনের সার্ভারে এখনও পর্যন্ত কোনো ইন্টারনাল ব্রিচ ধরা পড়েনি।"
অরুণ নিজের গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রেখে বললেন।
"তবে মুম্বই হেড অফিসের কার্গো-লজিস্টিক ডেটাবেস সম্পূর্ণ আলাদা এআই-প্রোটেক্টড ফায়ারওয়ালের অধীনে চলে। আজ বিকেলে যে প্রিলিমিনারি ডক-অডিট রিপোর্ট পাঠানোর কথা ছিল, তাতে আমরা ইস্টার্ন জোনের ডেমারেজ আর বার্থিং ডিলে নিয়েই রিপোর্ট করছিলাম। কিন্তু আপনারা যা বলছেন..."
অরুণের মাথার ভেতরে এখন হাজারটা চিন্তা এক সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করছে।
রাজীব মাথুর!
তিনি এতদিন ভেবেছিলেন রাজীব স্রেফ প্রফেশনাল জেলাসি থেকে অনন্যা বকলমে সিংহানিয়াদের কাছে ভ্যানগার্ডের ইনফো লিক করছে।
কিন্তু, এখন পুরো বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছে!
রাজীব তাহলে একটা বিশাল চক্রের অ্যাসেট হিসাবে কাজ করছে ! তাহলে কী মুম্বইতে ইতিমধ্যেই ভ্যানগার্ডের ডাটা লিক হয়েছে ?
কলকাতাতেও কী অলরেডি পোর্ট সার্ভার আর ভ্যানগার্ডের প্রাইভেট ইন্টারনাল নেটওয়ার্কের মধ্যে এরকম লিঙ্ক তৈরি হয়ে গেছে ?
কিন্তু, রাজীব এত সাহস পায় কীভাবে ? তার মাথার উপর কী অফিসের আরো বড় কারোর হাত আছে ?
অরুণ টেবিলের ওপর রাখা কফির ঠান্ডা কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আর চিন্তা করতে পারছেন না। তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
কিন্তু...কিন্তু প্রমান কোথায়?
অরুণ মনে মনে চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর কাছে রাজীবের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। অনন্যা তাঁকে যা যা বলেছিল, তার একটা শব্দও তো লিখিত নয়! সব মৌখিক!
আজ যদি অরুণ এখানে জোশীকে বা দিল্লিতে সেন্ট্রাল এজেন্সির সামনে গিয়ে বলেন,
"আমার মনে হয় রাজীব মাথুর এর পিছনে আছে।"
জোশী প্রথম প্রশ্নটাই করবেন,
'আপনি জানলেন কীভাবে?'
অরুণ কী উত্তর দেবেন? বলবেন যে এক অনন্যা মালহোত্রা তাকে এই খবর দিয়েছে? যে নিজের ফ্যামিলি বিজনেস ছেড়ে অন্য সংস্থায় কাজ করে, অন্য কোম্পানির ভেতরের খবর রাখে!
নাকি বলবেন যে 'J' নামের এক অচেনা আইডি থেকে তাঁকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল মেসেজ পাঠানো হচ্ছে?
তা বললেই অমৃতা হত্যার প্রসঙ্গ উঠে আসবে। পুলিশ আর এজেন্সিগুলো জানতে চাইবে, অরুণের সাথে অমৃতার সম্পর্ক কী ছিল?
না! অরুণ এখানে মুখ খুলতে পারবেন না। অবস্থা এমন যে, মুখ খুললেই অরুণ নিজে ফাঁদে জড়িয়ে যাবেন!
অরবিন্দ জোশী সিগারের শেষ অংশটা অ্যাসট্রেতে ভালো করে পিষে নিভিয়ে দিলেন। তারপর সোজা হয়ে বসে অরুণের দিকে তাকালেন।
"চ্যাটার্জী সাহেব? আপনি খুব বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু মনে পড়ছে নাকি ?"
অরুণ জোর করে মুখে একটা শান্ত, পেশাদারভাব ফুটিয়ে তুললেন।
"না জোশীজী। আমি ভাবছিলাম, আপনারা যা বলছেন, তাতে তো আমাদের মতো কোম্পানিগুলোর সার্ভারও সেফ নয়। কিন্তু আপনারা কি শিওর যে কলকাতা পোর্টেও এভাবে ডেটা লিক হচ্ছে? "
জোশী হালকা হাসলেন।
"প্রুফ যদি একশো শতাংশ থাকত চ্যাটার্জী সাহেব, তবে এতক্ষণে পোর্টের কয়েকজন অফিসার সিবিআই-এর কাস্টডিতে থাকতেন। আমরা প্রসেসে আছি।"
অরুণ একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে জিজ্ঞেস করলেন,
"তা হলে আপনারা আমাকে এখানে কেন ডেকেছেন? ভ্যানগার্ড তো স্রেফ একটা ক্লায়েন্ট।"
অমিতাভ সেনগুপ্ত এবার অরুণের মুখোমুখি বসলেন।
"অরুণবাবু, আপনাকে ডাকার দুটো কারণ। প্রথমত, ভ্যানগার্ড ইস্টার্ন জোনের অন্যতম বড় শিপিং প্লেয়ার। আপনাদের জাহাজের গতিবিধি খবর যদি এসব লোকদের হাতে চলে যায়, তবে পোর্টের রেপুটেশন নষ্ট হবে। শুধু ভ্যানগার্ড নয়। আমরা পোলারিস, চোগলে, গ্রেট ইস্টার্ন, এমএসসি, সিএমএ, মায়েরস্ক গ্রুপ সবার সাথেই কন্ট্যাক্ট করব।
দ্বিতীয়ত... আমরা জানতে চাইছি, আপনার ওপর বা ভ্যানগার্ডের ওপর কি সম্প্রতি কোনো রাজনৈতিক চাপ এসেছে? কোন লোকাল পলিটিক্যাল লিডারের লোক বা কোনো 'থার্ড-পার্টি মিডলম্যান' কি আপনার কাছে 'ইলেকশন ডোনেশন' বা প্রটেকশন মানির জন্য অ্যাপ্রোচ করেছে?"
অরুণ এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন। রাজীবের নাম তিনি নিতে পারবেন না, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিটা তাঁকেই সামলাতে হবে।
"এখনও অবধি সরাসরি কেউ কোন টাকা দাবি করেনি অমিতাভবাবু।"
অরুণ কৌশলগতভাবে বললেন।
"তবে হ্যাঁ, গত দু-তিন মাস ধরে আমি একটা অস্বাভাবিক প্যাটার্ন খেয়াল করছি। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ছোটখাটো টেকনিক্যাল ইস্যু দেখিয়ে আমাদের কিছু কন্টেনার আটকে রাখা হচ্ছিল। আমরা সেটাকে টেকনিক্যাল প্রবলেম ছাড়া আর কিছু মনে করিনি।"
জোশী তাঁর ব্যাগ থেকে একটা পাতলা প্লাস্টিকের ফোল্ডার বের করলেন। ভেতরে গোটা তিনেক ফটো। তিনি ফটো তিনটে টেবিলের ওপর দিয়ে অরুণের দিকে ঠেলে দিলেন।
"এদের চেনেন?"
অরুণ ফটোগুলোর দিকে তাকালেন।
প্রথম ছবিটা কাস্টমসের এক প্রবীণ অফিসারের। দ্বিতীয় ছবিটা শিশির কুমার রায়ের। আর তৃতীয় ছবিটা দেখে অরুণের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অমৃতা !
"শিশির রায়!" অরুণের মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হলো।
"হ্যাঁ, শিশিরবাবু।"
অমিতাভ সেনগুপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"ওনার অ্যাক্সিডেন্টার কথা আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে অরুণবাবু।"
অরুণ ঘাড় নাড়লেন।
অরুণ বিলক্ষণ জানেন শিশিরের দুর্ঘটনার কথা, তার চেয়ে ভাল আর কে জানবে। তবু তিনি ফটোটার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,
"আপনারা কি মনে করছেন শিশিরবাবুর ওই অ্যাক্সিডেন্টটা স্রেফ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না? ইট ওয়াজ আ মার্ডার?"
"সেন্ট্রাল এজেন্সির কাজ অনুমান করা নয়, মিঃ চ্যাটার্জী। তথ্য প্রমাণ ছাড়া আমরা কাউকে অভিযুক্ত করি না। শিশির রায়ের মৃত্যু নিয়ে পুলিশের রিপোর্টে লেখা আছে, 'ড্রাইভিং আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ অ্যালকোহল অ্যান্ড র্যাশ ড্রাইভিং'। আমরা এখনো অবধি ওটা নিয়ে কাউকেই সন্দেহ করছি না। কারণ ওটাকে মার্ডার সাব্যস্ত করার মতো কোন ফরেন্সিক বা ডিজিটাল এভিডেন্স আমাদের হাতে আসেনি।"
অরবিন্দ জোশীর গলার স্বর অত্যন্ত নিরপেক্ষ শোনালো।
জোশী সামান্য থেমে অরুণের চোখের দিকে তাকালেন,
"তবে...কয়েক সপ্তাহ আগে, দিল্লিতে শিপিং মিনিস্ট্রিতে একটা বেনামী চিঠি এসেছিল। তাতে লেখা ছিল, কলকাতা পোর্টের কিছু বড় কর্তা মিলে পোর্টের জমি বেআইনিভাবে বিক্রি করে দিচ্ছেন।"
অরুণের মনে হলো লাউঞ্জের ভেতর বাতাস যেন ভারী হয়ে এসেছে। শিশির রায়!
তবে কী তিনি এই চক্রের কথা জেনে ফেলেছিলেন? নাকি তিনি নিজেই এই চক্রের অংশ ছিলেন এবং পরে সরে আসতে চেয়েছিলেন বলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো? আর অমৃতা?
অনেক বছর পর অরুণের নিজেকে অসম্ভব একা মনে হতে লাগল। তিনি নিজেকে এক গভীর কুয়োর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।
একদিকে জোশী এবং সেন্ট্রাল এজেন্সি আর অন্যদিকে সিংহানিয়া ও রাজীব মাথুর, আর তারও পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা 'J' এবং অনন্যা মালহোত্রা।
অরবিন্দ জোশী ফটো তিনটে আবার ফোল্ডারে পুরে নিলেন। তারপর চেয়ারে ব্যাক হেলান দিয়ে অরুণের দিকে তাকালেন।
"চ্যাটার্জী সাহেব, আমাদের আজ আপনাকে এখানে ডাকার মূল উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়। আমরা আপনাকে অ্যালার্ট করতে চেয়েছিলাম।"
"তা হলে ভ্যানগার্ডের কী করা উচিত?" অরুণ প্রশ্ন করলেন।
"আপনি আপনার ইনভেস্টমেন্ট আর কন্টেনার ট্রাফিক বাঁচান।"
জোশী ঠান্ডা গলায় বললেন।
"আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনার নিজের অফিসের ভেতরের লোকগুলোর ওপর নজর রাখুন। ডাটা যদি লিক হয়ে থাকে, তবে বাইরে থেকে কেউ এসে করেনি।"
অরুণের মাথার ভেতরে আবার রাজীব মাথুরের মুখটা ফুটে উঠল।
কিন্তু অরুণ চুপ করে রইলেন। তিনি এখনো কোনো কার্ড টেবিলে ফেলবেন না।
অমিতাভ সেনগুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন।
"অরুণবাবু, ময়ূরাক্ষী আর কিছুক্ষণ পর ফেয়ারলি প্লেস ছাড়বে। আমরা দক্ষিণেশ্বরের দিকে যাব। আপনার গাড়ি তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তাই না ?"
"হ্যাঁ।"
অরুণ উঠে দাঁড়ালেন।
"ধন্যবাদ সেনগুপ্তবাবু, ধন্যবাদ জোশীজী, ইনফরমেশনগুলোর জন্য।"
অরবিন্দ জোশী হাত মেলালেন না, স্রেফ মাথা নাড়লেন।
"সতর্ক থাকবেন। গঙ্গার জল দেখতে শান্ত লাগে, কিন্তু তলার টানটা খুব বিপজ্জনক আর মিঃ চ্যাটার্জী, এই ইনফরমেশনগুলো যেন লাউঞ্জের বাইরে না যায়।"
অরুণ কোন কথা না বলে, ঘাড় নেড়ে লাউঞ্জের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলেন।
ডেকে পা দিতেই ডিসেম্বরের কনকনে সোঁদা হাওয়ায় অরুণের মুখটা ঠান্ডা হয়ে গেল। গঙ্গার ওপর রোদ এখন অনেকটাই ঢলে পড়েছে। সাড়ে তিনটা বাজে। দূরে হাওড়া ব্রিজের ধোঁয়াটে কাঠামোটা আবছা দেখাচ্ছে।
জেটির কাঠের তক্তা পার হয়ে অরুণ যখন নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন তাঁর মাথার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নীরব।
তিনি এখন নিশ্চিত, এসব একই মাফিয়া নেটওয়ার্কের প্ল্যানিং আর কাজের নমুনা।
অনন্যা তাঁকে মুম্বইয়ে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে যা বলেছিল, তা এখন পরিহাসের মতো লাগছে।
আর রাজীব মাথুর... রাজীবকে যেভাবে হোক ফাঁদে ফেলতে হবে। পুলিশ বা সেন্ট্রাল এজেন্সির ওপর ভরসা করে লাভ নেই। কারণ জোশী সাহেব নিজেই বলেছেন।
'প্রমাণ ছাড়া আমরা কাউকে অভিযুক্ত করি না'।
প্রমাণ অরুণকেই জোগাড় করতে হবে।
কিন্তু, কীভাবে ?
অরুণ গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন। শিবু স্টার্ট দিল।
"কোথায় যাবেন স্যার? অফিস না বাড়ি ?" শিবু জিজ্ঞেস করল।
অরুণ জানালার কাচটা নামিয়ে দিলেন। বাইরের পোড়া ডিজেল আর গঙ্গার সোঁদা হাওয়ার গন্ধটা তাঁর ফুসফুসে ঢুকে পড়ল।
"না শিবু।"
অরুণ খুব নিচু গলায় বললেন, তাঁর গলার স্বর পাথরের মতো শক্ত।
"অফিসে নয়। ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে চল।"