মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী - অধ্যায় ৩
৩।
এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব, এই দহন আর এই নিষিদ্ধ হাতছানি—এ নিয়েই এতদিন ছিল মুমতাহিনা চৌধুরী টয়ার বেঁচে থাকা। একটা মুখোশ পরে বেঁচে থাকা।
কিন্তু আজ আর এই হাতছানি সহ্য করা যাচ্ছে না। আজ সেই হাতছানি আর চোখের দেখা বা মনের কল্পনায় সীমাবদ্ধ নেই, আজ সেটা সরাসরি চামড়ায় এসে বিঁধেছে। সন্ধ্যার সেই ঘটনা—ইশতির ওই খসখসে হাতের তালু যখন ভুলবশত তার কোমরের নরম চামড়ায় ঘষা খেয়েছিল—সেটা টয়ার জন্য কোনো সাধারণ স্পর্শ ছিল না। সেটা ছিল একটা দেশলাইয়ের কাঠি, যা মুহূর্তের মধ্যে টয়ার শরীরের বারুদের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
লিফটে ওঠার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত, টয়া অনুভব করছে সেই জায়গাটা এখনো জ্বলছে। যেন ওখানে কোনো অদৃশ্য সিলমোহর পড়ে গেছে। শাওনের হাজারো আদর, দামী পারফিউমের সুবাস, আর মার্জিত স্পর্শ যা চার বছরে করতে পারেনি, ইশতির ওই এক সেকেন্ডের রুক্ষ, অপরিচ্ছন্ন আর ‘ভুল’ স্পর্শ সেটা করে দেখিয়েছে। টয়ার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ এখন চিৎকার করে বলছে—‘আমি ভদ্রতা চাই না, আমি চাই ওই বুনো দখল।’
টয়া আর পারছে না। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। চুলায় যাক সমাজ। গোল্লায় যাক তার ‘লাক্স সুপারস্টার’ ইমেজ। জাহান্নামে যাক তার সাজানো সংসারের মিথ্যা পবিত্রতা। সে ভেবে নিয়েছে, আজ সে সব ভুলে নিজের কামনার কথা শুনবে। আজ সে ইতিহাস করবে। সেই ইতিহাস কোনো বইয়ের পাতায় লেখা হবে না, সেই ইতিহাস রচিত হবে তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে, এক আদিম তৃপ্তির কালিতে।
আজ রাতে সেই দহনের শেষ হবে। টয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার বিবেক, তার শিক্ষা, তার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড—এই ভারী ভারী শব্দগুলো এখন দরজার বাইরে পাহারায় থাকুক। ভেতরে আজ শুধুই প্রবৃত্তি রাজত্ব করবে।
টয়া অনুভব করছে, তার ভেতরে বাস করা সেই আদিম মানবীটি আজ শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। সে চাইছে এমন কাউকে, যে তাকে মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া হিসেবে পুজো করবে না। সে চাইছে এমন একটা শরীর, যার ঘামে নোনা স্বাদ আছে, যার হাতে শ্রমিকের কঠোরতা আছে। যে শরীর তাকে আদর করবে না, বরং ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। ইশতির ওই রোদে পোড়া তামাটে চামড়া, গায়ের উৎকট গন্ধ আর কর্কশ হাত—এগুলোই এখন টয়ার কাছে অমৃত।
সে জানে, এই পথটা একমুখী। একবার পা বাড়ালে আর ফিরে আসা যাবে না। কিন্তু তৃষ্ণার্ত মানুষ কি আর পথের বিচার করে? টয়া তার রেশমি গাউনের ওপর হাত বুলিয়ে অনুভব করল নিজের বুকের ধড়ফড়ানি। এই কম্পন ভয়ের নয়, এই কম্পন এক নিষিদ্ধ খেলার চরম উত্তেজনার। সে প্রস্তুত। আজ সে হারবে, এবং সেই হেরে যাওয়ার মাঝেই খুঁজে নেবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।
টয়া ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সামনে সাজানো অনেকগুলো দামী পারফিউমের বোতল। চ্যানেল, গুচি, আরমানি। কিন্তু টয়ার হাত চলে গেল গাঢ় নীল রঙের একটা বোতলের দিকে। ‘মিডনাইট পয়জন’। ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের এই সুগন্ধিটা মারাত্মক। এর গন্ধে একটা মাদকতা আছে, একটা অন্ধকার জাদু আছে। আজকের রাতের জন্য এই বিষটাই উপযুক্ত।
সে বোতলটা হাতে নিল। কাঁচের বোতলটা ঠান্ডা, কিন্তু টয়ার হাতের তালু ঘামে ভেজা। সে খুব যত্ন করে পারফিউমটা স্প্রে করল। প্রথমে গলার দুই পাশে, যেখানে ধমনী দপদপ করছে। তারপর কানের লতিতে, এবং সবশেষে বুকের গভীর ভাঁজে। ঘরের বাতাসে একটা কড়া, মিষ্টি অথচ ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। এই গন্ধটা ভদ্রস্থ ড্রয়িংরুমের নয়, এই গন্ধটা কোনো নিষিদ্ধ অন্দরমহলের।
এরপর সে চুলের কাঁটাটা আলগা করে দিল। হাত দিয়ে সামান্য ঝাঁকুনি দিতেই পিঠের ওপর একরাশি কালো রেশমি চুল এলিয়ে পড়ল। আয়নায় নিজেকে দেখে টয়ার মনে হলো, সে কোনো আধুনিক রমণী নয়, সে যেন প্রাচীন কোনো বনদেবী—যে তার শিকারকে ভুলিয়ে আনার জন্য ফাঁদ পাতছে।
ধীর পায়ে ইন্টারকমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যন্ত্রটা সাদা প্লাস্টিকের, নির্জীব। কিন্তু টয়ার কাছে ওটা এখন জীবন্ত বোমার সুইচ। তার হাত কাঁপছে। খুব সামান্য কাঁপুনি, কিন্তু স্পষ্ট। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শব্দ হচ্ছে—ধক ধক, ধক ধক। এই শব্দটা কি ইশতি শুনতে পাবে?
টয়া নিজেকে প্রশ্ন করল—আমি কি ভুল করছি? উত্তর এল—অবশ্যই ভুল করছি। এটা পাপ। এটা বিশ্বাসঘাতকতা। শাওনের মতো একটা দেবতার সঙ্গে প্রতারণা। কিন্তু পরক্ষণেই অন্য একটা সত্তা ফিসফিস করে বলল—পাপের যদি এত আকর্ষণ না থাকত, তবে মানুষ কেন আদিমকাল থেকে পাপের পেছনে ছুটত? স্বর্গের নিষিদ্ধ ফলটা তো মানুষই আগে খেয়েছিল, তাই না?
টয়া আর ভাবল না। সে বোতাম টিপল। রিং হচ্ছে। একবার... দুইবার... ওপাশ থেকে রিসিভার তোলার খট করে একটা শব্দ হলো। তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। এরপর একটা খসখসে, ঘুমজড়ানো গলার আওয়াজ ভেসে এল, “জি ম্যাডাম?” ইশতির গলা।
টয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই গলার স্বরেই সে মাতাল হয়ে যায়। সে কল্পনা করে নিল—ইশতি হয়তো তার ছোট ঘরটাতে শুয়ে ছিল। হয়তো তার পরনে শুধু একটা লুঙ্গি। খালি গা। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে সে ধড়মড় করে উঠে বসেছে। টয়া গলাটা পরিষ্কার করে নিল। এক মুহূর্ত সময় নিল নিজেকে প্রস্তুত করতে। সে তো অভিনেত্রী, অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার না পেলেও দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছে। আজ তার জীবনের সেরা অভিনয়টা করতে হবে। গলার স্বরে ফুটিয়ে তুলতে হবে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য আর মালকিন-সুলভ কর্তৃত্ব।
সে বলল, “ইশতি, তুমি কি জেগে আছো?”
ওপাশ থেকে বিনীত উত্তর এল, “জি ম্যাডাম, জেগে আছি। কিছু লাগবে?”
টয়া বলল, “একটু উপরে আসতে পারবে? আমার বেডরুমের এসিটা মনে হয় কাজ করছে না। রিমোটে টেম্পারেচার কমিয়ে রেখেছি, তাও ঘর একদম ঠান্ডা হচ্ছে না। গরমে থাকা যাচ্ছে না। তুমি একটু কুইক এসে দেখো তো কী সমস্যা।”
মিথ্যেটা খুব সহজেই টয়ার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। অথচ সত্যিটা হলো, ঘরটা তেইশ ডিগ্রিতে বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। গরমটা ঘরে নয়, গরমটা টয়ার শরীরে। তার রক্তে আগুন জ্বলছে, তাই বাইরের কৃত্রিম ঠান্ডায় তার তৃষ্ণা মিটছে না।
ইশতি বলল, “জি ম্যাডাম, আমি আসছি।”
লাইনটা কেটে গেল। টয়া রিসিভারটা নামিয়ে রাখল। তার কাজ শেষ। এবার অপেক্ষা। সে ঘুরে আয়নায় নিজেকে শেষবারের মতো দেখল। কিছুক্ষণ আগে যে দ্বিধাগ্রস্ত, ভীতু মেয়েটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে এখন আর নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক শিকারী। তার চোখে এখন আর শাওনের প্রতি ভালোবাসার মায়া নেই, আছে এক আদিম ক্ষিদে। বাঘিনী যেমন শিকার ধরার আগে শান্ত হয়ে যায়, টয়াও এখন শান্ত।
সে জানে, ইশতি আসবে। ইশতি তার হুকুমের গোলাম। বেচারা ড্রাইভার ভাবছে সে এসি ঠিক করতে আসছে। সে জানে না, বারো তলার এই আলিশান বেডরুমে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নেই। গোলযোগটা টয়ার মনে। ইশতি আসছে, কিন্তু সে জানে না—সে এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে আসছে, যে আগুনে টয়া নিজে জ্বলছে এবং তাকেও জ্বালাবে।
কলিংবেল বাজার শব্দ হলো। খুব মৃদু, টিং-টং শব্দ। কিন্তু এই নিঝুম রাতে টয়ার কানে সেটা বাজল বজ্রপাতের মতো। সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এখন এক ধরণের নেশাগ্রস্ত ছন্দ। সিল্কের গাউনটা তার শরীরের ওপর দিয়ে সাপের মতো পিছলে যাচ্ছে।
টয়া দরজা খুলল। ইশতি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা ট্রাউজার, আর গায়ে হাতকাটা স্যান্ডো গেঞ্জি। চুলগুলো উশকোখুশকো, চোখে ঘুমের রেশ। “ভেতরে এসো, ইশতি।” টয়া দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। তার গলার স্বর খাদে নামানো, যেন বাতাসের ফিসফিসানি।
ইশতি ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকল। সে জুতো খোলার জন্য নিচু হতে যাচ্ছিল, কিন্তু টয়া তাকে থামিয়ে দিল। “জুতো খুলতে হবে না। সোজা চলে এসো।”
টয়া আগে আগে হাঁটছে। ইশতি তার পেছনে। করিডর দিয়ে হেঁটে তারা মাস্টার বেডরুমের দিকে যাচ্ছে। টয়া জানে ইশতি তার পেছনে আছে। সে ইচ্ছে করেই তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা আলগা দোলা নিয়ে এল। মডেলিংয়ের র্যাম্পে হাঁটা আর বেডরুমে হাঁটার মধ্যে পার্থক্য আছে। র্যাম্পে থাকে আত্মবিশ্বাস, আর এখন তার হাঁটায় আছে আমন্ত্রণ। তার নিতম্বের দুলুনি সিল্কের মিহি কাপড়ের আড়ালে ঢেউ তুলছে। করিডরের মৃদু আলোয় টয়ার ছায়াটা ইশতির পায়ের কাছে পড়ছে।
ইশতি মাথা নিচু করে হাঁটছিল। কিন্তু মানুষের চোখ অবাধ্য। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামনে তাকাল। ম্যাডামের হাঁটার এই ভঙ্গিটা কেমন যেন অচেনা। কেমন যেন টলমলে, অথচ ছন্দময়। ইশতির মনে হলো, ম্যাডাম কি তাকে কিছু দেখাতে চাইছে? পরক্ষণেই সে নিজেকে ধমক দিল। ছিঃ! ম্যাডাম অসুস্থ। হয়তো জ্বরের ঘোরে এমন করছেন। অথবা... ইশতির মনে হলো, বড়লোকদের অনেক ব্যাপার থাকে। ম্যাডাম কি আজ ড্রিংক করেছেন? মাতাল হলে মানুষ হয়তো এভাবে হাঁটে। সে চোখ নামিয়ে নিল ফ্লোরের দিকে। কিন্তু তার নাকের ছিদ্রে এসে পৌঁছাল এক কড়া সুগন্ধি। এই গন্ধটা তাকে মাতাল করে দিচ্ছে।
বেডরুমে ঢুকেই ইশতি থমকে গেল। ঘরটা বেশ ঠান্ডা। এসি চলছে পুরোদমে। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, নীলচে আলোয় ঘরটাকে পানির নিচে তলিয়ে থাকা কোনো এক জগতের মতো মনে হচ্ছে। কোথাও কোনো গরমের লেশমাত্র নেই।
ইশতি অবাক হয়ে এসিটার দিকে তাকাল। ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে তাপমাত্রা তেইশ ডিগ্রি। ফ্যান স্পিড হাই। সে বিভ্রান্ত গলায় বলল, “ম্যাডাম, রুম তো ঠান্ডা। এসি তো ঠিকই চলতেছে। বাতাসও তো ঠান্ডা।”
টয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ধীর পায়ে ইশতির দিকে এগিয়ে এল। ইশতি পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা পেল না, কারণ পেছনে বিছানা। টয়া অদ্ভুত এক হাসল। “রুম ঠান্ডা? কিন্তু ইশতি, আমার যে ভীষণ গরম লাগছে। মনে হচ্ছে আমার চামড়ার নিচে আগুন জ্বলছে।”
ইশতি আরও বিভ্রান্ত হলো। “ম্যাডাম, আপনার মনে হয় জ্বর আসছে। থার্মোমিটার থাকলে মেপে দেখা দরকার।”
“থার্মোমিটার লাগবে না। তুমি আছ না?” কথাটা বলেই টয়া আচমকা ইশতির ডান হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। ইশতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই টয়া সেই কর্কশ, তামাটে হাতটা নিজের কপালে চেপে ধরল।
ইশতি চমকে উঠল। যেন তার হাতটা কোনো জ্বলন্ত কয়লায় স্পর্শ করেছে। টয়ার কপাল সত্যিই গরম। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, নাকি শরীরের ভেতরের কোনো তাপে—সেটা বোঝা দায়। কিন্তু উত্তাপের চেয়েও ইশতিকে যা বেশি চমকে দিল, তা হলো ম্যাডামের এই স্পর্শ। তার মতো এক নগণ্য ড্রাইভারের হাত আজ দেশের সবচেয়ে বড় তারকার কপালে!
“দেখো তো ইশতি, আমার জ্বর কি না? শরীরটা কেন এত গরম?” টয়া ইশতির চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। তার চোখে এখন আর কোনো পর্দা নেই। সেখানে কেবল আদিম আহ্বান।
ইশতি হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। “ম্যাডাম... আপনার শরীর তো গরম। আমি... আমি ডাক্তার ডাকি?”
“ডাক্তার লাগবে না।”ইশতির অবাক হওয়ার পালা শেষ হয়নি। সে হাতটা নামিয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু টয়া ছাড়ল না। সে ইশতির হাতটা কপাল থেকে নামিয়ে আনল নিজের মুখের কাছে। ইশতির হাতের তালু এখন টয়ার ঠোঁট স্পর্শ করে আছে।
ইশতি পাথরের মূর্তির মতো জমে গেল। ম্যাডাম এটা কী করছেন? ভুল করছেন? জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন? নাকি তাকে পরীক্ষা করছেন? ইশতির হাতের কড়া পড়া চামড়ায় টয়ার নরম, ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ। ইশতির শরীরের রক্তপ্রবাহ যেন উল্টো দিকে চলতে শুরু করল।
“এখনো গরম লাগছে না?” টয়া বিড়বিড় করে বলল। তারপর সে ইশতির হাতটা আরেকটু নিচে নামিয়ে আনল। গলার ভাঁজ পেরিয়ে, রেশমি গাউনের ওপর দিয়ে সোজা নিজের বুকের বাঁ পাশে। ঠিক যেখানে হৃৎপিণ্ডটা পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছে।
টয়া ইশতির হাতটা নিজের স্তনের ওপর চেপে ধরল। মাঝখানে শুধু সিল্কের পাতলা আবরণ। ইশতি তার হাতের নিচে অনুভব করল টয়ার নরম মাংসের উষ্ণতা এবং হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি।
“এখানে দেখো ইশতি,” টয়া ইশতির দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ এখন অর্ধেক বোজানো। “দেখো তো, এখানটায় কত গরম?”
ইশতির মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। সে ড্রাইভার, সে কর্মচারী—এসব পরিচয় এখন নীলচে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তার হাতের নিচে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। টয়ার শরীরের এই আমন্ত্রণ, এই উষ্ণতা, আর ‘মিডনাইট পয়জন’-এর তীব্র ঘ্রাণ ইশতির ভেতরের পশুটাকে শিকল ছিঁড়ে জাগিয়ে তুলল।
ইশতির মস্তিষ্কের ভেতরে তখন সাইরেন বাজছে। বিপদ সংকেত। তার হাতটা এখনো টয়ার বুকের ওপর, কিন্তু তার মন চলে গেছে অন্য সমীকরণে। এটা নিশ্চয়ই কোনো ফাঁদ। বড়লোকদের অদ্ভুত সব খেয়াল থাকে। আজকাল তো ইউটিউব আর ফেসবুকে ‘প্র্যাংক’ ভিডিওর খুব চল হয়েছে। ঘরের কোণে কোথাও কি গোপন ক্যামেরা বসানো আছে? এক্ষুনি কি ম্যাডাম হা হা করে হেসে উঠে বলবেন, ‘ইশতি, তোমাকে মুরগি বানালাম!’ আর সেই ভিডিও কাল সকালে ভাইরাল হয়ে যাবে?
অথবা এটা কোনো পরীক্ষা? আজ সন্ধ্যায় যখন গাড়ি থেকে নামার সময় ভুলবশত ইশতির হাত ম্যাডামের শরীরে লেগেছিল, ম্যাডাম কি সেটা মনে রেখেছেন? তিনি কি দেখতে চাইছেন ইশতি আসলে কেমন? সে কি সুযোগসন্ধানী কোনো লম্পট, নাকি বিশ্বাসী কর্মচারী? যদি ইশতি এখন এই ফাঁদে পা দেয়, যদি সে সামান্যতম আগ্রহ দেখায়, তাহলেই সর্বনাশ। কাল সকালেই চাকরি নট। হয়তো পুলিশেও দিতে পারে। চুরির দায়ে কিংবা শ্লীলতাহানির দায়ে জেলে পচতে হবে।
নাকি ম্যাডাম মাতাল? বড়লোকের বউ, স্বামী বাসায় নেই, হয়তো দামী কোনো মদ খেয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। মাতাল মানুষের কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না। সকালে নেশা কাটলে হয়তো ম্যাডাম নিজেই লজ্জিত হবেন, অথবা ইশতিকে উল্টো দোষারোপ করবেন।
ইশতির যুক্তি-বুদ্ধি তাকে চিৎকার করে বলছে—‘পালা ইশতি! হাত সরিয়ে নে। মাফ চেয়ে দৌড় দে।’
কিন্তু এসব ভাবনার বাইরে শরীর এক অদ্ভুত জিনিস। শরীর কোনো যুক্তি মানে না, শরীর শুধু উদ্দীপনা চেনে। ইশতির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া। চৌত্রিশ বছরের এক পূর্ণাঙ্গ, লাস্যময়ী নারী। তার বস। তার চেয়ে বয়সে সাত-আট বছরের বড়। এই বয়সের ব্যবধান আর ক্ষমতার দূরত্বটাই যেন আগুনটাকে আরও উসকে দিচ্ছে।