মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী - অধ্যায় ৭
৭।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুটো কি তিনটা। বাইরের কড়া রোদ জানালার ভারী পর্দার আড়ালে ম্লান হয়ে এসেছে। গুলশানের এই আলিশান ফ্ল্যাটটিতে সময় যেন থমকে আছে। বাইরের জগতের ব্যস্ততা, কোলাহল, নিয়ম-কানুন—সবকিছু এই চার দেয়ালের বাইরে। ভেতরে শুধু এক অলস, মন্থর সময়।
টয়া আর ইশতির পেটে তখন রাক্ষুসে ক্ষুধা। গত রাতের প্রবল শারীরিক ধকল আর সকালের দীর্ঘ আদরের পর শরীর এখন জ্বালানি চাইছে। টয়া মোবাইল হাতে নিয়ে ফুডপান্ডা অ্যাপটা ওপেন করল। ইশতি পাশে বসে আছে, গায়ে শাওনের একটা পুরনো টি-শার্ট। টি-শার্টটা ইশতির গায়ে একটু টাইট হচ্ছে, তার পেশিবহুল হাত আর চওড়া ছাতি কাপড়ের নিচ দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। টয়া আড়চোখে একবার তাকাল। এই দৃশ্যটা তার ভালো লাগছে। তার বরের পোশাকে তার প্রেমিক। এক অদ্ভুত নিষিদ্ধ আনন্দ।
“কী খাবি রে? বিরিয়ানি? নাকি চাইনিজ?” টয়া জিজ্ঞেস করল। ইশতি একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “যা অর্ডার করবেন তাই। তবে কাচ্চি হলে ভালোই লাগত।” টয়া হাসল। “তুই আর আমি সেম। পেটে ক্ষিদে থাকলে কাচ্চির ওপরে কিছু নাই।”
সুলতান’স ডাইন থেকে দুই প্যাকেট বাসমতি কাচ্চি আর বোরহানি অর্ডার করা হলো। ডেলিভারি ম্যান যখন বেল বাজাল, ইশতিই গিয়ে খাবারটা নিয়ে এল। তবে সে দরজাটা পুরো খুলল না, শুধু হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিল। সে জানে, এই ফ্ল্যাটে তার উপস্থিতি এখন আর ড্রাইভারের মতো নয়, মালিকের মতো।
খাবার টেবিলে বসা হলো না। টয়া বলল, “টেবিলে না, ফ্লোরে বসে খাব। কার্পেটের ওপর। তুই আর আমি।” ড্রয়িংরুমের মাঝখানে কার্পেটের ওপর খবরের কাগজ বিছিয়ে তারা খেতে বসল। টয়া নিজের হাতে প্যাকেট খুলল। গরম বিরিয়ানির সুবাসে ঘরটা ভরে গেল। ইশতি প্রথমে একটু সংকুচিত ছিল, কিন্তু টয়া যখন নিজের প্লেট থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে ইশতির মুখে তুলে দিল, তখন সব সংকোচ কেটে গেল।
খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল ইশতি। টয়া টিস্যু দিয়ে ইশতির ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা ঝোল মুছে দিল। তারপর উঠে গিয়ে নিয়ে এল সিগারেটের প্যাকেট আর অ্যাশট্রে।
দুজনে সোফায় গা এলিয়ে বসল। এসি চলছে মৃদু লয়ে। ঘরে নীলচে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। টয়া এক পা তুলে দিয়েছে সোফার ওপর, আরেক পা নিচে ইশতির উরুর সাথে লাগিয়ে রেখেছে। ইশতি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। তার চোখেমুখে এক ধরণের ঘোর। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, গতকাল বিকেল পর্যন্ত সে ছিল এই বাড়ির ড্রাইভার, আর আজ সে এই বাড়ির রানীর পাশে বসে সিগারেট ফুঁকছে। ইশতি টয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি?” টয়া বলল, “কর।”
“মিডিয়ার সব লোকই কি আপনার মতো? মানে, সবারই কি এমন অদ্ভুত সব শখ আছে?” টয়া হাসল। ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “শখ বলিস না, বল ডিজায়ার। কামনা। মানুষের মন তো আর সরল রেখা না রে ইশতি, জিলাপির প্যাঁচ। বাইরে থেকে যাকে দেখবি খুব ফিটফাট, ভদ্র, তার মনের ভেতরে হয়তো এমন সব অন্ধকার ঘর আছে যা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। তবে সবার ডিজায়ার আমার মতো না। একেকজনের একেক রকম।”
ইশতি কৌতূহলী হয়ে নড়েচড়ে বসল। “যেমন? আপনার মতো আর কার কার এমন রোগ আছে?” টয়া ইশতির চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “এটা রোগ না রে, এটা রুচি। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু জিনিস আছে যা আসলেই অসুস্থতা। আমাদের এই শোবিজে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা তোরা খবরের কাগজে দেখিস না। পর্দার সামনে আমরা সবাই ফেরেশতা, কিন্তু পর্দার পেছনে আমরা সবাই রক্তমাংসের মানুষ। আর মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলো যখন টাকা আর ক্ষমতার সাথে মেশে, তখন সেটা অদ্ভুত রূপ নেয়।”
টয়া একটু থামল। অ্যাশট্রেতে ছাই ঝেড়ে বলল, “সবচেয়ে জরুরি জিনিস কী জানিস? কন্সেন্ট। সম্মতি। আমার যেমন হায়ারার্কোফিলিয়া আছে, আমি নিচু ক্লাসের পুরুষ পছন্দ করি, নোংরামি পছন্দ করি—এটা আমার ব্যক্তিগত চয়েস। তুই রাজি ছিলি, তাই আমাদের এই সম্পর্কটা সুন্দর। এখানে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। কিন্তু মিডিয়াতে এমন অনেকে আছে যাদের শখগুলো আসলে ক্রাইম।” ইশতি অবাক হয়ে বলল, “ক্রাইম মানে?”
“উদাহরণ দেই,” টয়া গলা নিচু করল, যেন কোনো গোপন রহস্য ফাঁস করছে। “নায়িকা মৌসুমিকে চিনিস তোঁ? ওই যে, নব্বই দশকের বিখ্যাত নায়িকা। তারপর ছাগল ওমর সানীকে বিয়ে করছে।” ইশতি মাথা নাড়ল। “হ, চিনি তো। এখনো তো সিনেমায় বড় বোনের পার্ট করে। দেখতে খুব সুন্দর, বয়স বোঝা যায় না।” টয়া বাঁকা হাসল। “বয়স পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ হবে। কিন্তু তার জিভ এখনো ললল করে পনেরো-ষোল বছরের কিশোর ছেলে দেখলে। ডাক্তারি ভাষায় এটাকে বলে পিডোফিলিয়া বা এফিবোফিলিয়া। মৌসুমি ম্যাডামেড় রোগটা হলো, সে কচি ছেলে ছাড়া চলতে পারে না।”
“বলেন কী!” ইশতির চোখ কপালে উঠল।
“হুম। নতুন নতুন যেসব ছেলে মিডিয়াতে কাজ করতে আসে, যাদের বয়স কম, দেখতে সুন্দর—তাদেরকে সে টার্গেট করে। অভিনয়ের সুযোগ করে দেওয়ার নাম করে নিজের ফ্ল্যাটে ডাকে। তারপর...” টয়া থামল, ইশতির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। “তারপর যা হওয়ার তাই হয়। ছেলেগুলো ভয়ে কিংবা ক্যারিয়ারের লোভে কিছু বলতে পারে না। মৌসুমি ম্যাম তাদেরকে ভোগ করে, তারপর ছুড়ে ফেলে দেয়। এটা অন্যায়। কারণ এখানে ওই ছেলেগুলোর সম্মতি থাকে না, থাকে বাধ্যবাধকতা। আমার ডিজায়ার নোংরা হতে পারে, কিন্তু আমি কারো ক্ষতি করি না। মৌসুমি ম্যাম যেটা করে সেটা শোষণ।”
ইশতি শিউরে উঠল। “ছিঃ! অথচ টিভিতে দেখলে মনে হয় কত ভালো মানুষ।” টয়া বলল, “সবাই কি আর মৌসুমি ম্যামের মতো? অন্যরকমও আছে। আমার দুই জুনিয়র—দীঘি আর পূজা চেরি। দুজনেই এখন টপ হিরোইন। তুই তো দেখিস, দীঘির পেছনে হাজার হাজার ছেলে পাগল। পূজার একটা হাসির জন্য প্রডিউসাররা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানিস?”
“কী?”
“ওদের পুরুষ লাগে না। ওরা লেসবিয়ান। সমকামী।” ইশতি এবার আকাশ থেকে পড়ল। “মানে? মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষরে কেমনে...” টয়া শব্দ করে হেসে উঠল। “গ্রামের ভূত তো তুই, তাই বুঝবি না। ভালোবাসা শুধু নারী-পুরুষের মধ্যে হয় না রে। দীঘি আর পূজা একে অপরের পার্টনার। ওরা যখন কোনো পার্টিতে যায়, দেখবি খুব সেজেগুজে যাচ্ছে। ছেলেরা ভাবছে ওরা হয়তো পটাতে এসেছে। কিন্তু আসলে ওরা সাজে একে অপরের জন্য। রাতের বেলা ওরা যখন দরজা বন্ধ করে, তখন ওদের আর কোনো পুরুষের দরকার হয় না। ওরা একে অপরের শরীর চেনে, মন চেনে। সমাজ এটাকে খারাপ বলে, পাপ বলে। কিন্তু আমি বলি—ওরা তো কারো ক্ষতি করছে না। ওদের দুজনের সম্মতি আছে, ওরা সুখে আছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? শাওন বা অন্য পুরুষরা যখন ওদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়, ওরা মনে মনে হাসে। ভাবে—তোদের এই পৌরুষ আমাদের কাছে মূল্যহীন।”
ইশতি মাথা চুলকালো। “দুনিয়াতে কত কী যে আছে! আমরা ড্রাইভার মানুষ, স্টিয়ারিং আর চাকা ছাড়া কিছুই চিনি না।” টয়া আবার সিরিয়াস হলো। সিগারেটের ধোঁয়াটা এবার অনেকক্ষণ আটকে রেখে ছাড়ল। “তবে কিছু মানুষ আছে যারা ভয়ঙ্কর। যেমন নায়িকা পরিমনি। দেখতে একদম ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না এমন।”
“হ, ওর সিনেমা তো আমি খুব দেখি। খুব মায়া মায়া চেহারা।”
“ওই মায়ার আড়ালে একটা রাক্ষস আছে রে ইশতি। পরিমনি স্যাডিস্ট। ও মানুষকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়।”
“কষ্ট দিয়ে আনন্দ?”
“হ্যাঁ। ওর বয়ফ্রেন্ডরা বেশিদিন টেকে না। কেন জানিস? ও বিছানায় খুব ভায়োলেন্ট। ও কামড় দিয়ে মাংস ছিঁড়ে ফেলে, জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাকা দেয়। মারধর করে। ওর পার্টনার যতক্ষণ না ব্যথায় চিৎকার করে, ততক্ষণ ওর তৃপ্তি আসে না। রক্ত না দেখলে ওর অরগাজম হয় না। এটাকে বলে স্যাডিজম।”
ইশতি ভয়ে ভয়ে নিজের গায়ে হাত বুলালো। “ম্যাডাম, আপনি আবার ওরকম না তো?”
টয়া খিলখিল করে হেসে ইশতির বুকে মাথা রাখল। “ধুর বোকা! আমি তো উল্টো। আমি ম্যাসোকিস্ট টাইপের। আমি চাই তুই আমাকে শাসন করবি, তুই আমাকে ভোগ করবি। আমি ব্যথা পেতে ভালোবাসি, দিতে না। পরিমনি যেটা করে সেটা যদি তার পার্টনার এনজয় করে, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু শুনেছি ও জোর করে। সেটা অন্যায়।”
ইশতি টয়ার পিঠে হাত রেখে বলল, “শুনলে তো মাথা ঘুরে যায়। আপনারা এত সুন্দর সুন্দর মানুষ, দামী দামী গাড়িতে চড়েন, এসি রুমে থাকেন... অথচ আপনাদের মনের ভেতর এত প্যাঁচ!”
টয়া ইশতির দিকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখ এখন কিছুটা ঘোলাটে। “প্যাঁচ না থাকলে জীবনটা বোরিং হয়ে যেত রে ইশতি। শাওন দেখ, কত ভালো মানুষ। কোনো প্যাঁচ নেই, কোনো অন্ধকার নেই। তাই তো ওর সাথে থেকে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। মানুষ আসলে বিচিত্র প্রাণী। তার শরীরের ক্ষুধা একরকম, মনের ক্ষুধা আরেকরকম। এই যে আমি তোর কাছে আসি, কেন আসি? তোর টাকার জন্য? না। তোর রূপের জন্য? তাও না। আমি আসি তোর ওই বুনো গন্ধটার জন্য। তোর ওই ঘামের স্বাদের জন্য। তোর এই কর্কশ হাতের থাপ্পড়ের জন্য।”
টয়া ইশতির হাতটা নিয়ে নিজের গালে রাখল। “তুই আমাকে যত নোংরা ভাববি, আমি তত সুখ পাব। তুই আমাকে যত সস্তা ভাববি, আমার তত ভালো লাগবে। এই যে বললাম পাবলিক টয়লেটের কথা, ট্রেনের কথা, সমুদ্র সৈকতের কথা—এগুলো আমার ফ্যান্টাসি। কারণ ওইসব জায়গায় আমি ‘টয়া’ থাকব না। ওইসব জায়গায় আমি হব শুধুই একটা শরীর। তোর শরীর।”
ইশতি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। টয়ার কথাগুলো তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে কিছুটা, কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে টয়ার ভেতরের হাহাকারটা। এই নারী সব পেয়েও কিছু পায়নি। আর সেই না-পাওয়াটুকু পূরণ করার ক্ষমতা প্রকৃতি ইশতিকে দিয়েছে। এই ভাবনাই ইশতির বুকটা গর্বে ফুলিয়ে দিল।
“ম্যাডাম...”
“আবার ম্যাডাম?” টয়া ধমক দিল।
“সরি... টয়া। একটা কথা বলি?”
“বল।”
“তুমি চাইলে আমি তোমাকে ওইসব জায়গায় নিয়ে যাব। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
টয়া ভুরু কুঁচকাল। “শর্ত? ড্রাইভার হয়ে মালকিনকে শর্ত দিস?”
ইশতি এবার একটু সাহস দেখাল। সে টয়ার কোমরে হাত দিয়ে কাছে টেনে আনল।
“এখন আমি ড্রাইভার না, এখন আমি তোমার পুরুষ। শর্ত হলো—শাওন ভাই বা অন্য কেউ যেন আমাদের মাঝখানে না আসে। তুমি শুধু আমার থাকবা। দিনে তুমি অভিনয় করো, যা খুশি করো। কিন্তু রাতে... রাতে তুমি শুধু ইশতির।”
টয়া ইশতির ঠোঁটে চুমু খেল। “মেনে নিলাম। রাতে আমি তোর। আর আমার ওই শখগুলো?” ইশতি হাসল। “সব হবে। পাবলিক টয়লেট, ট্রেন, সমুদ্র... সব। তুমি যা চাইবা তাই। তোমার এই শরীরটাকে আমি এমন সুখ দেব যে তুমি আর কোনোদিন ওই মৌসুমি বা পরিমনির মতো অসুস্থ হতে চাইবা না। আমাদের প্রেম হবে নোংরা, কিন্তু খাঁটি।”
টয়া ইশতির বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। ড্রয়িংরুমের নীলচে আলোয় সিগারেটের ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠছে। বাইরের পৃথিবী তাদের বিচার করুক, সমাজ তাদের ছি ছি করুক—তাতে টয়ার কিছু আসে যায় না। সে জানে, এই চার দেয়ালের ভেতর, এই সস্তা সিগারেটের গন্ধ আর ইশতির ঘামের গন্ধের মাঝেই সে তার নিজের স্বর্গ খুঁজে পেয়েছে। এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ, কিন্তু পরম শান্তির স্বর্গ।