নিঃশব্দ বাড়ির গোপন অতিথি - অধ্যায় ১
গুজরানওয়ালার আকাশে সেদিন সকাল থেকেই যেন অস্বাভাবিক কিছু জমে ছিল। মেঘ এমনভাবে জড়ো হচ্ছিল যে দিনদুপুরেও আলো মলিন লাগছিল। বিকেলের দিকে দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে যায়, ভয়ানক বজ্রপাত আর শিস দেওয়া বাতাসে মানুষজন দ্রুত ঘরে ফিরতে বাধ্য হয়। কিন্তু রাত যত গভীর হতে থাকে, বৃষ্টি যেন প্রতিশোধের মতো নেমে আসে—অবিরাম, ভারী, চারপাশ ভাসিয়ে দেওয়া এক অদ্ভুত রাগে। রাত তখন প্রায় বারোটা। হোসেন বাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে ঘরের ভেতরের প্রতিটি ছোট শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়—ঘড়ির টিকটিক, জানালার কাঁচে বাতাসের ধাক্কা, কাঠের মেঝের হালকা শব্দ। দুইতলা এই বাড়িটা বছরের বেশিরভাগ সময়ই এমন শান্ত থাকে। নিচতলায় থাকে জেরিন, তার আব্বু–আম্মু আর ছোট্ট মেয়ে শাইরিন। উপরের তলাটা খালি পড়ে থাকে, কেবল অতিথি এলেই সেখানে আলো জ্বলে।
সন্ধ্যার পর থেকেই বিদ্যুৎ নেই। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে আছে। বসার ঘরে একটি মোমবাতির হলদে আলো দুলছে, দেয়ালের ছায়াগুলোকে অস্বস্তিকরভাবে নড়াচড়া করাচ্ছে। শ্বশুর আব্বু, শাশুড়ি আম্মু আর পাঁচ বছর বয়সী শাইরিন অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু জেরিনই জেগে আছে। সামনে টেবিলে বসে সে মেয়ের হোমওয়ার্কের খাতা উল্টেপাল্টে দেখছিল। মোমবাতির আলোয় পাতাগুলোতে অদ্ভুত ছায়া পড়ছে। মাঝে মাঝে সে থামে, হিসেব করে দেখে, আবার পাতা ওল্টায়। মায়ের মন—মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে ভাবনা থামে না। ঘরে অন্য কোনো শব্দ নেই—শুধু ঘড়ির টিকটিক, আর মাঝে মাঝে দূরে কোনও কুকুরের হালকা ডাক। হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটায় জানালাটা একটু খুলে যায়। জেরিন মাথা তুলে বাইরে তাকায়। বৃষ্টি টুপটাপ করে পড়ছে, দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ। সে আবার খাতার দিকে মন ফেরায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক কণ্ঠ ভেসে আসে—“ঘরে কেউ আছেন?” শব্দটা এত কাছ থেকে, এত স্পষ্টভাবে আসে যে জেরিন চমকে ওঠে। মনে হয় যেন বারান্দার ঠিক পাশ থেকেই কেউ ডেকেছে। তার হাত অন্যমনস্ক হয়ে থেমে গেল খাতার ওপর। বুকের ভিতরটা যেন হঠাৎ ধক করে উঠল। এত রাতে হোসেন বাড়িতে সাধারণত কেউ ডাকাডাকি করে না। এই এলাকা শান্ত, নিরিবিলি… এমন ভররাতে কারো আসার প্রশ্নই আসে না। মোমবাতিটা হাতে নিয়ে সে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগোয়। বুকের ভেতর অজানা ধুকপুকানি—এই গভীর রাতে কে ডাকে?
রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাতেই সে দেখে গেটের পাশে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। অচেনা, ভিজে, ক্লান্ত। লোকটা ভিজে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা—জেরিন বুঝতে পারল সে অন্য দর্শনের। বয়স চল্লিশের মতো। কিন্তু তার মুখে একটা অদ্ভুত কঠোরতা, যেন বহু বছর ধরে কষ্টে পুড়ে তৈরি হওয়া একটা অস্পষ্ট কাঠামো। দাড়ি গজানো মুখ, ভেজা চাদর কাঁধে ঝুলছে, চোখ নামানো। বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীরে পড়ছে টুপটাপ শব্দ তুলে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মেয়ে। ঠাণ্ডায় কাঁপছে সে, ভেজা জামাকাপড় শরীরে লেপ্টে আছে, দু’হাতে লোকটার পোশাক শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। লোকটি আবার ডাকে, “কেউ আছেন ভেতরে?” জেরিনের কয়েক সেকেন্ড শ্বাস আটকে থাকে। এই রাতের বেলা, অচেনা একজন মানুষ, সঙ্গে একটা বাচ্চা—সব মিলিয়ে তার ভেতরে ভয় আর দ্বিধা একসঙ্গে জেগে ওঠে।
প্রথমেই তার মনে পড়ে আম্মুর কথা। অচেনা লোক দেখলেই যিনি কত প্রশ্ন করেন, কত সন্দেহ। আজ যদি জানেন, জেরিন বৃষ্টির রাতে কাউকে ঘরে ঢুকিয়েছে, তাহলে সংসারে অশান্তি নিশ্চিত। এক মুহূর্তের জন্য সে ভাবে, উত্তর না দিলেই হয়। চুপচাপ ভেতরে ফিরে গেলে হয়তো লোকটা চলে যাবে। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেয়েটার কাঁপতে থাকা শরীর, যেভাবে সে লোকটার কাপড় আঁকড়ে ধরে আছে। মেয়েটা তো শাইরিনের বয়সী। যদি তার নিজের মেয়েটা এমন বৃষ্টির রাতে রাস্তায় থাকত? সেই ভাবনাটা বুকের ভেতর তীব্রভাবে বিঁধে যায়।
ভেতরে ফিরে এলো জেরিন। মোমবাতির কমলা আলোতে তার মুখে অনিশ্চয়তা আর কোমলতার দ্বন্দ্ব ফুটে উঠল। সে জানে—শাশুড়ি আম্মু এমন পরিস্থিতিতে কখনোই সম্মতি দেবেন না। তাদের পরিবারে অন্য মাজহাবের মানুষকে ঘরে প্রবেশ করানো অশুভ মনে করা হয়। আর সামনে যদি আব্বু জানতে পারেন যে একটি অচেনা মানুষকে গভীর রাতে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে—তবে সেটি আরও বড় সমস্যা ডেকে আনবে। কিন্তু মেয়েটির ভেজা চোখ…তার ঠাণ্ডায় কাঁপা ছোট হাত…এইসব ছবি যেন জেরিনের মন থেকে সরতেই চাইল না। কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে সে সিদ্ধান্ত নেয়—কিছুক্ষণ আশ্রয় দিলে ক্ষতি নেই। বৃষ্টি থামলেই তারা চলে যাবে। হালকা শ্বাস ফেলে সে মোমবাতি নিয়ে মেইন দরজার দিকে এগোয়।
দরজা অল্প করে খুলতেই আলো গেটের দিকে পড়ে। যুবকটির মুখ আরও স্পষ্ট হয়—ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, চোখে এক ধরনের শূন্যতা। সে হাত তুলে সালাম দেয়। কণ্ঠে কাঁপুনি, “ভাবি, একটু আশ্রয় দেবেন? সকালে চলে যাব।” জেরিন লক্ষ্য করে, কথা বলতে লোকটার যেন কষ্ট হচ্ছে। মেয়েটা তখনও তাকে শক্ত করে ধরে আছে। জেরিন নরম গলায় বলে ওঠে, “ভেতরে আসুন।” লোকটি প্রথমে আপত্তি করে বলে, মেয়েটা ঢুকুক, সে বাইরে থাকবে। কিন্তু মেয়েটা তাকে ছাড়ে না। তখন জেরিন বুঝতে পারে, শুধু বাচ্চাকে ভেতরে নেওয়াটা অস্বাভাবিক দেখাবে। সে দৃঢ়ভাবে বলে, “দুজনেই আসুন।”
তারা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে। ভেজা কাপড় থেকে মেঝেতে পানি পড়তে থাকে। জেরিন তাদের একপাশে দাঁড়াতে বলে, যেন ঘর নোংরা না হয়। তারপর তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে গামছা আনে, আর শাইরিনের একটা পুরোনো জামা বের করে মেয়েটার জন্য। যুবকটির জন্য কিছু আনতে গিয়ে সে থেমে যায়। হাতে পড়ে শুধু নিজের ব্যবহৃত গামছা। এক মুহূর্ত দ্বিধা—অচেনা একজন পরপুরুষকে নিজের ব্যবহার করা গামছা দেওয়া কি ঠিক? ঠিক তখনই জেরিন টের পায়—লোকটার চোখে হঠাৎ এক ঝলক অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কিন্তু মোমবাতির আলো কেঁপে ওঠায় সে নিজেকেই বোঝায়, হয়তো আলোতেই ভুল দেখেছে।
মেয়েটার গায়ে শাইরিনের পুরোনো জামাটা জড়িয়ে দিয়ে, লোকটিকে গামছা এগিয়ে দেয়। গামছা নিতে গিয়ে লোকটি এক মুহূর্ত থেমে যায়, তারপর মাথা নিচু করে নেয়। সেই সামান্য নড়াচড়ায় জেরিনের চোখে পড়ে তার কাঁধের শক্ত রেখা, ভেজা কাপড়ের নিচে জমে থাকা ক্লান্তি, আর চোখের কোণে চাপা এক অচেনা স্থিরতা। সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে—এটা শুধু বিপদের মুহূর্তের নির্ভরতা। তবু কোথাও একটা প্রশ্ন মাথা তুলতে চায়, যেটাকে সে শক্ত করে চেপে রাখে।
সে ভাবে, উপরের তলায় তাদের উঠিয়ে দেবে। সেখানে খালি ঘর আছে, দরজাটা বন্ধ থাকলে আম্মুর ঘুম ভাঙার সম্ভাবনাও কম। মোমবাতি হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে সে অনুভব করে, লোকটার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য তার পিঠে এসে থামে। কোনো শব্দ নেই, কোনো স্পর্শ নেই—তবু সেই নীরব উপস্থিতি তাকে সচেতন করে তোলে নিজের শরীর, নিজের চলাফেরা নিয়ে।
তারা দোতলার দিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। জেরিন সামনে, মোমবাতির আলো দুলছে, দেওয়ালে ছায়া তৈরি করছে। আর পেছনে সেই লোকটি ভারী পায়ের শব্দ ফেলে এগোচ্ছে। শিশুটি চুপচাপ। দোতলায় পৌঁছে জেরিন যে ঘর দেখিয়ে দিল সেটি প্রায় খালি—পুরোনো বিছানা, ধুলোমাখা চাদর, কিন্তু আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট।
“এই ঘরটা পরিষ্কার না,” জেরিন বলল। “কিন্তু আপাতত… থাকলে অসুবিধা হবে?” লোকটা এক ঝলক তাকাল। “আমাদের এটা-ই যথেষ্ট। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।” শিশুটি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। জেরিন নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “নাম কী তোমার?” মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—“ইশমত।” নামটি অচেনা। জেরিন বলল, “আচ্ছা ইশমত, তোমরা একটু বিশ্রাম নাও। আমি চা করে পাঠালাম।”
নিচে নেমে দরজা বন্ধ করতেই তার মনে অস্বস্তির ঢেউ উঠল। “লোকটি কে? কেন এত রাতে একটি ছোট মেয়েকে নিয়ে ঘুরছে?” রান্নাঘরে ঢুকে কেতলি বসাতে বসাতে সে অনুভব করল তার হাত কাঁপছে। “হয়তো পথের যাত্রীই… অত চিন্তা কেন?” কিন্তু মন মানছিল না। চা নিয়ে দোতলায় গিয়ে দরজায় টোকা দেয়। ভেতর থেকে লোকটির কণ্ঠ—“আসুন।” জেরিন দরজা খুলে দেখে—লোকটি মেঝেতে বসে আছে, মেয়েটিকে চাদরে মুড়ে দিয়েছে। জেরিন ট্রেটা এগিয়ে দেয়। লোকটির চোখ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকে জেরিনের ওপর—গভীর, অদ্ভুত, অচেনা।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে জেরিন টের পেল—দোতলার ঘরটায় যেন একটা অশুভ নীরবতা জমে আছে। নিজের ঘরে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সে হঠাৎ এক অদ্ভুত ভয় অনুভব করল। “আজ রাতে যাকে আশ্রয় দিলাম… সে কে?”
বাইরে আবার বৃষ্টি। দোতলার দরজা নিঃশব্দে বন্ধ। ভেতরে এক অচেনা পুরুষ আর একটি ছোট মেয়ে। আর জেরিন বুঝতে পারল—এই বাড়ির নিস্তব্ধতা আজ থেকে আর আগের মতো থাকবে না।
ক্রমশঃ প্রকাশ্য….