নিঃশব্দ বাড়ির গোপন অতিথি - অধ্যায় ২
ঝড়ের রিমঝিম কমতে শুরু করেছে, কিন্তু বাইরে এখনো বৃষ্টির ফোঁটা ছাদের টিনে আর জানালার কাঁচে পড়ছে, টুপটুপ শব্দে, যেন কেউ আলতো করে আঙুল দিয়ে ডাকছে। বাতাস অদ্ভুত ঠাণ্ডা, ভিজে ভিজে, ঘরের ভেতরে ধীরে ধীরে একটা চাপা উত্তেজনা জমে উঠছে—যে উত্তেজনা কথায় প্রকাশ করা যায় না, শুধু শরীরে টের পাওয়া যায়। জেরিন টেবিলের পাশের চেয়ারটি টেনে বসল, দুহাতে চায়ের কাপ ধরে রেখেছে যেন সেই গরমটা তার হাতের তালু থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে পারে। সামনে বসে আছে কুন্দর—লোকটা এখনো বেজায় শান্ত, কিন্তু তার দৃষ্টিতে কোনো আবেগের ছাপ নেই, শুধু একটা গভীর সংযম, যেন সে নিজের ভেতরের সবকিছু লোহার দরজায় আটকে রেখেছে। তার পাশে শিশুটি—যার নাম এখনো জানা হয়নি—নীরব, কিন্তু তার ছোট্ট হাতটা এখনো কুন্দরের বাহুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, যেন সেই বাহুই তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
জেরিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন দোল খাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, শিশুটি কেবল নিরাপত্তা খুঁজছে, আর কুন্দরের কাছে সেই দায়িত্বটা অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক লাগছে। কিন্তু তার মন জোর করে বলতে চাইছে—এই অচেনা মানুষটির সঙ্গে এক রাতের সহাবস্থান কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। শাহাদাত বিদেশে, আট বছরের বিয়ের সংসারে এখন পুরো দায়িত্ব তার একার। শাইরিন ঘুমিয়ে পড়েছে উপরের ঘরে, শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের নিজেদের ঘরে—কেউ জানে না নিচের বসার ঘরে এই দুটি অতিথি বসে আছে। জেরিন জানে না এই লোকটির অতীত কী, কেন সে এই ঝড়ের রাতে তার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, আর সবচেয়ে বড় কথা—এই শিশুটি তার কাছে সত্যিই নিরাপদ কি না।
ঘরের আলোটা হালকা হলুদ, টেবিল ল্যাম্পের নরম আলোয় কুন্দরের মুখের রেখাগুলো আরও গভীর দেখাচ্ছে। তার চোখদুটো গাঢ় কালো, কিন্তু ভেতরে যেন একটা অন্ধকার জ্বলছে—নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু জ্বলছে। জেরিনের দৃষ্টি তার ঠোঁটের দিকে চলে গেল এক মুহূর্তের জন্য—শুকনো, কিন্তু পুরুষ্টু। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর ঘড়ির টিকটিক। তারপর জেরিন ধীরে ধীরে প্রশ্ন করল, “আপনার নাম কী? কোথা থেকে এসেছেন?”
কুন্দর চোখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্ত স্থির। তারপর ধীর স্বরে বলল, “আমার নাম কুন্দর। আমি শিক্ষক। তবে আজকের জন্য… আমাদের জন্য এক রাতের নিরাপত্তা দরকার। শুধু রাতটা। বৃষ্টি থামলেই আমরা চলে যাব।”
জেরিনের মন অদ্ভুতভাবে দোলা দিল। শব্দগুলো সরল, কিন্তু চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল—এই মানুষটির মধ্যে কিছু লুকানো আছে। কিছু যা সে এখনো বলতে চায় না। শিশুটি তখনো তার হাতে মাথা রেখে বসে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম আসেনি পুরোপুরি। জেরিন হালকা স্বরে আবার জিজ্ঞেস করল, “কেন বাচ্চাটিকে সঙ্গে এনেছেন?”
কুন্দর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখদুটো শিশুটির মাথার চুলের উপর দিয়ে বুলিয়ে নিল ধীরে ধীরে। তারপর বলল, “এটা… সে আমার পরিচয়ের অংশ নয়। তবে আমি তাকে বাইরে ফেলে যেতে পারিনি। ঝড়, বৃষ্টি, আর নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে…” তার গলায় একটা অদ্ভুত ভারী ছায়া পড়ল। চোখে একটা স্থিরতা, যা ভয়ে ভরা হলেও কিছুটা সহানুভূতিশীল।
জেরিনের মনে হলো, এই রাতটা বিশেষ। একটা অজানা শক্তি যেন ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। শিশুটি চুপচাপ বসে, কুন্দর তার পাশে দাঁড়িয়ে। বাড়ির ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধ চাপ। ছাদে পানির শব্দ, জানালার বাইরে বাতাসের হাহাকার—সব মিলিয়ে রাতটা এক অদ্ভুত মোহ তৈরি করছে। জেরিন নিজের ভেতরের ভয়টা টের পেল। “আমার সিদ্ধান্ত কি ঠিক হবে?” কিন্তু শিশুটি কাঁপছে। আর কুন্দর এতটাই সংযত যে কোনো অশান্তি ছড়াচ্ছে না। যেন সে নিজেই জানে—এখন সাহায্য ছাড়া তার কোনো পথ নেই।
জেরিন উঠে রান্নাঘরে গেল। চা বানিয়ে আনার সময় তার হাত কাঁপছিল সামান্য। সে দুটো কাপে চা ঢেলে এনে টেবিলে রাখল। কুন্দর একটা কাপ তুলে নিল, শিশুটির জন্য একটু ঠান্ডা করে ছোট কাপে ঢেলে দিল। শিশুটি চায়ে চুমুক দিতে দিতে কুন্দরকে আরও কাছে টেনে নিল। কুন্দর তার দিকে তাকাল, ধীরে ধীরে হাসল—একটা অল্প, অনির্দিষ্ট হাসি। জেরিন বুঝতে পারল—এই হাসি শুধু শিশুটিকে শান্ত করার জন্য নয়। এই হাসির মধ্যে লুকিয়ে আছে অতীতের কষ্ট, একটা নীরব প্রতিশোধ, আর হয়তো কিছু গোপন আকাঙ্ক্ষা।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে। ঝড় কমলেও ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ক্রমশ বাড়ছে। জেরিন হঠাৎ টের পেল—কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কিছু যা তাকে অবাক করবে, হয়তো ভয় পাওয়াবে, আর হয়তো তার শরীরের ভেতরে একটা অচেনা আগুন জ্বালিয়ে দেবে। শিশুটি কুন্দরকে ধরে বসে। কুন্দর হঠাৎ বলল, “তুমি ভয় পাবে না। আমি শুধু রাতটা কাটাতে চাই।”
জেরিন শুনল, কিন্তু কিছু বুঝতে পারল না। কেন একজন ভয়ঙ্কর সুন্দর মানুষ এত শান্ত? কেন শিশুটি তার সঙ্গে এত নিরাপদ বোধ করছে? সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি এখনো পড়ছে, রাস্তায় জমে গেছে পানি। দূরে পুলিশের লাল-নীল লাইট ঝলকাচ্ছে মাঝে মাঝে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। যেন শহরটাও ঘুমিয়ে পড়েছে।
কুন্দর আর শিশুটি এখন স্থির। শিশুটি কুন্দরের কোলে মাথা রেখে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল। কুন্দর তার চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। জেরিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে দ্বিধা, ভয়, কৌতূহল—সব মিলে একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি হয়েছে। ঝড়ের শব্দ এখন কিছুটা কমেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে আরেক ধরনের ঝড় জেগে উঠেছে—অদ্ভুত উত্তেজনা, অচেনা ভয়, আর একটা নিষিদ্ধ আকর্ষণ।
জেরিন টের পেল—এই রাত শুধু বৃষ্টির নয়। এই রাত তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেবে। নিঃশব্দ রাত, ভিজে বাড়ি, অচেনা অতিথি—সব মিলে একটা অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়েছে। সে জানে, আগামীকাল সকাল হলে এই রাতের স্মৃতি, এই মানুষ, এই অদ্ভুত সম্পর্ক তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যাবে।
শিশুটি শেষমেষ কুন্দরের বুকে মাথা রেখে পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ল। কুন্দর ধীরে ধীরে তার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে শিশুটির পিঠে। জেরিন তাকিয়ে আছে। তার শরীরে একটা অদ্ভুত শিহরন খেলে যাচ্ছে। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে—যৌনতা, ভয়, আর কৌতূহলের মিশ্রণে। সে জানে না কেন, কিন্তু তার শরীর কুন্দরের দিকে টানছে। যেন একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে।
কুন্দর চোখ তুলে জেরিনের দিকে তাকাল। এবার তার চোখে সেই সংযমটা আর নেই। আছে একটা গভীর, কালো আগুন। সে ধীরে ধীরে বলল, “তোমার চোখে ভয় আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আরও কিছু আছে।”
জেরিনের গলা শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল। রাত আরও গভীর হচ্ছে। আর ঘরের ভেতরের উত্তাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
ক্রমশঃ প্রকাশ্য...