নিঃশব্দ বাড়ির গোপন অতিথি - অধ্যায় ৪
ফাইজাকে ঘুম পাড়িয়ে জেরিন ধীরে ধীরে ড্রইংরুমে ফিরে এলো। বাড়ির ভেতরটা অন্ধকারে ডুবে আছে, বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টাখানেক ধরে, শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছে টেবিলের ওপর—তার হলদে, কাঁপা আলোয় ঘরটা যেন এক অদ্ভুত জগতে পরিণত হয়েছে। যুবকটি স্থির হয়ে বসে আছে সোফায়, হাতে মোমবাতিটা ধরে রেখেছে যেন কোনো পুরনো সাধু বা নির্জন সন্ন্যাসী। তার কালো, রুক্ষ মুখটা আলো-ছায়ার খেলায় আরও গভীর দেখাচ্ছে, চোখ দুটো অন্ধকারে ডুবে গেছে কিন্তু তার মধ্যে একটা অদ্ভুত উত্তাপ লুকিয়ে আছে। জেরিনকে দেখামাত্র তার চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল—হালকা নীল ম্যাক্সি পরা জেরিন মোমবাতির আলোয় যেন কোনো স্বপ্নের ছবি, তার শরীরের বাঁকগুলো আলোর সঙ্গে মিশে এক অপার্থিব সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। জেরিন একটু অস্বস্তি বোধ করল সেই দৃষ্টিতে, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। সে নরম গলায় বলল, “আপনি বসুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।” যুবকটি গভীর, ভারী স্বরে শুধু বলল, “হুম...”
রান্নাঘরে গিয়ে জেরিন দেখল ঘরে ভাত আছে কিন্তু ঠান্ডা হয়ে গেছে, তরকারি কিছু নেই। তার মনটা উদার, বাবা ছোটবেলায় শিখিয়েছিলেন—ঘরে এক টুকরো রুটি থাকলেও মেহমানকে দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এই শ্বশুরবাড়িতে সবকিছু ভিন্ন। শাশুড়ির কথাই এখানে চূড়ান্ত, এক টাকা ভিক্ষুককে দিলেও তিনি কেড়ে নিয়ে আসতেন। শ্বশুর ভালো মানুষ, শাহাদাতকেও তেমনই গড়ে তুলেছেন—ভদ্র, দায়িত্বশীল। কিন্তু জেরিন জানে, আজ রাতে এই অচেনা যুবককে খাবার না দিলে তার নিজের মনই শান্তি পাবে না। সে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, “ঘরে ভাত আছে, গরম করে দিচ্ছি। আপনি কি ডিম ভাজা খান?” যুবকটি মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” তার গলায় কৃতজ্ঞতা, কিন্তু সে আর কিছু বলল না—কীভাবে বলবে যে তার জন্য তরকারি করে দিন? এমন একজন মহিলার কাছ থেকে যা পাচ্ছে তাই যেন স্বর্গ।
জেরিন রান্নাঘরে ফিরে গেল। বৃষ্টির দিনে ডিম ভাজা একদম উপযুক্ত—গরম গরম ভাতের সঙ্গে কয়েকটা ডিম ভেজে, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে। সে ভাত গরম করতে দিল, ডিম ভাজতে লাগল। তেলে ডিম পড়তেই ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ, ঘরে একটা সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। মোমবাতি হাতে নিয়ে সে একবারে সব আনতে পারছে না, তাই এক এক করে নিয়ে আসছে—প্রথমে প্লেটে ভাত, তারপর ডিম ভাজা, পাশে একটা কাঁচা মরিচ। যুবকটির বুকের ভেতর কেমন এক ঝড় উঠল। সে কুন্দর—তিরিশ বছর বয়স, তার জীবন কেটেছে একা, পড়াশোনা শেখানোর কাজে। কালো শরীর, রুক্ষ চেহারা দেখে কেউ বিয়ে দিতে চায়নি, সারাজীবন নিঃসঙ্গ। কিন্তু আজ এই অচেনা বাড়িতে জেরিনের এই যত্ন—যেন তার বুক ভরে গেল এক অজানা উষ্ণতায়। সে খাবারের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল, হঠাৎ জেরিনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “থামুন...” কুন্দর থমকে গেল। কী হলো? খাবার সামনে নিয়ে অপমান করবে নাকি?
জেরিন বলল, “আগে হাত ধুয়ে নিন। খাবার খাওয়ার আগে হাত ধোয়া উচিত।” সে একটা বাটি করে পানি নিয়ে এলো, কুন্দরের হাতের ওপর রাখতে বলল। কুন্দর তাই করল। জেরিন ধীরে ধীরে পানি ঢালতে লাগল তার হাতের ওপর, আঙুল দিয়ে হালকা ঘষে দিচ্ছে যেন সাবান লাগিয়ে। তার গলায় একটা শিক্ষকীয় সুর, “আপনি একজন ওস্তাদ, বাচ্চাদের শেখান—অবশ্যই তাদের বলবেন খাবারের আগে হাত ধোয়া দরকার। সেখানে আপনি...” এসময় জেরিন একটু ঝুঁকে পানি ঢালছিল, তার ম্যাক্সিটা শরীরের সঙ্গে লেগে গিয়ে বুকের ভরাট রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ম্যাক্সির গলার কাপড়টা একটু সরে গেল, তার স্তনযুগলের খাঁজ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছিল—মোমবাতির আলোয় ত্বক যেন দুধের মতো সাদা, উষ্ণ। জেরিন তাড়াতাড়ি ঠিক করে নিল, কিন্তু চোখ তুলে দেখল কুন্দর সেদিকেই তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ঘরে নিস্তব্ধতা, দুজনেই লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। জেরিনের মনে রাগ আর অপমান জাগল—কী খারাপ লোক! আশ্রয় দিলাম, যত্ন করছি, আর সে এভাবে দেখছে?
ঠিক সেই মুহূর্তে বেডরুম থেকে মোবাইল বেজে উঠল। জেরিন তাড়াতাড়ি উঠে গেল কল ধরতে। যেতে যেতে তার পিছনের দিকটা—কোমরের বাঁক, নিতম্বের গতি—মোমবাতির আলোয় আরও আবেদনময়ী হয়ে উঠল। কুন্দর চেয়ে চেয়ে দেখল, তার মনে ভাত খাওয়ার চেয়ে জেরিনের সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছে বেশি জেগে উঠেছে। জেরিন বেডরুমে গিয়ে ফোন তুলে দেখল শাহাদাতের নম্বর। তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল—স্বামীর সঙ্গে কথা বলা তার সবচেয়ে প্রিয় সময়। সে রিসিভ করল, “হ্যালো, আব্বু... এখন সময় হলো ফোন দেওয়ার?” শাহাদাতের গলা ভারী, “হ্যাঁ জানু, সময় তো হলোই। তুমি দেরি করলে কল ধরতে, ব্যস্ত ছিলে নাকি? রাখি তাহলে।” জেরিন তাড়াতাড়ি বলল, “আরে না, ব্যস্ত না... আমি তো ওই যে...” সে আটকে গেল। কী বলবে? অচেনা লোককে আশ্রয় দেওয়ার কথা? শাহাদাত দূরে আছে, জানলে রাগ করবে, চিন্তা করবে। বৃষ্টি থামলেই তো পাঠিয়ে দেব। শাহাদাত বলল, “কী হলো, কথা থেমে গেল যে?” জেরিন হাসল, “কিছু না, তুমি বলো।”
শাহাদাতের গলা গম্ভীর হয়ে উঠল, “শোনো, এখানে একটা মার্ডার হয়েছে। তোমাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। সাবধানে থেকো।” জেরিনের বুকটা ধক করে উঠল, “মার্ডার? কী বলছ?” “হ্যাঁ, একটা লোক—আকবর আলী নামে—তার বাড়িতে। খুনি নাকি কুন্দর নামে এক যুবক। পড়াশোনা শেখাতো। পরে জানা গেছে সে ছোট মেয়েদের অভিভাবকদের ফোন দিয়ে বিরক্ত করতো। এ নিয়ে অপমান করা হয় তাকে। প্রতিশোধ নিতে আকবর আলীকে মেরে ফেলেছে। আর আকবর আলীর মেয়ে নাকি মিসিং—মনে হয় সঙ্গে নিয়ে গেছে, জিম্মি করে ছাড়া পাওয়ার জন্য। পুলিশ খুঁজছে, তার সঙ্গে বন্দুকও আছে নাকি।”
জেরিনের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল। সবকিছু মিলে গেল—কুন্দর, ফাইজা এতিম আর তার সঙ্গে, বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ আসা। এই লোকটাই সেই খুনি? যাকে সে আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিচ্ছে, হাত ধোওয়াচ্ছে? তার পরিবারকে বিপদে ফেলেছে? সে চুপ করে রইল, কথা বলতে পারছে না। শাহাদাত বলল, “আচ্ছা, আমি রাখি। কাজ আছে। বাই, আই লাভ ইউ সোনা।” ফোন কেটে গেল। জেরিন উত্তর দেওয়ার অবস্থায় ছিল না। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে, বুক ধড়ফড় করছে। কী করবে এখন? চিৎকার করবে? শাশুড়ি-শ্বশুরকে জাগাবে? নাকি পুলিশে ফোন করবে? কিন্তু ফাইজা ঘুমোচ্ছে শাইরিনের পাশে—যদি কুন্দর রেগে যায়?
হঠাৎ পিছন থেকে একটা ভারী কণ্ঠস্বর এলো, “খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে... আপু?” জেরিনের শরীর শিউরে উঠল। কুন্দর দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে, মোমবাতির আলোয় তার ছায়া দেওয়ালে লম্বা হয়ে পড়েছে। তার চোখে সেই অদ্ভুত ঝিলিক, কিন্তু এবার তার মধ্যে একটা অন্যরকম অন্ধকার মিশে গেছে। জেরিন ধীরে ধীরে ঘুরল, তার গলা শুকিয়ে গেছে...
ক্রমশঃ প্রকাশ্য….