নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ১২
(আগের অংশের পর থেকে...)
সিংহ রায় প্যালেসের বিশাল ডাইনিং টেবিলটা এখন রাজকীয় ধ্বংসাবশেষের মতো পড়ে আছে। রুপোর থালায় আধখাওয়া লবস্টার থার্মিডর আর জাফরানি বিরিয়ানির সুবাস তখনো বাতাসে ভাসছে। সবাই এবার ধীর পায়ে প্যালেসের পেছনের বিশাল বাগানটার দিকে এগিয়ে গেল। বাগানের মখমলের মতো ঘাসের ওপর দামী মেহগনি কাঠের কার্ভিং করা সোফা সেট রাখা। চারদিকে ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের ল্যাম্পপোস্টের আলো গাছগুলোর পাতায় এক রহস্যময় ছায়া তৈরি করছে।
ব্রিজেশ সিংহ রায় তাঁর হাতে দামী 'সিগন্যাল' ব্র্যান্ডের একটা হাভানা চুরুট ধরালেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে তিনি মেঘাদিত্যের দিকে তাকালেন।
তনুশ্রী সেন আর দেবারতি সিংহ রায় নিচু স্বরে কিছু একটা হাসাহাসি করছেন, আর নিরব তাঁদের সাথেই বসে নিজের দামী হাতঘড়িটা বারবার দেখছে।তারা বাগানের অপর প্রান্তে সোফা আর ছোট গোল টেবিল ঘিরে বসেছে।অনুশ্রী লক্ষ্য করল তার ছোট ভাই দীক্ষিতকে আজ কেমন যেন বিষণ্ণ লাগছে, যেন বুকের ভেতর অনেক চাপা আর্তনাদ জমিয়ে রেখেছে সে। দীক্ষিত বাড়ির পেছনে পুল এরিয়ার সামনে একলা দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরাল।
বাগানের সেই ভিক্টোরিয়ান ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ব্রিজেশ সিংহ রায় চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে সেই সরকারি নোটিশের একটা প্রিন্টআউট মেঘাদিত্যের দিকে এগিয়ে দিলেন। নোটিশের ওপর বড় বড় হরফে লেখা— "REF NO: MHFW/PROC/2026/EMER-09... PROCUREMENT VALUE: ₹2,000 Crores"।
ব্রিজেশ এক ক্রুর হাসি হেসে মেঘাদিত্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আদিত্য, দেশের অবস্থা তো বেশ সঙ্গীন! মহামারীটা তো আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এল। আমি জানতাম ওই ২০০০ কোটি টাকার ডিলটা আমাদের হাতের বাইরে যাবে না। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের এই এমার্জেন্সি প্রোকিউরমেন্ট তুমি আমাকে জানানোর পরেই... আমি সব গুছিয়ে রেখেছিলাম।"
মেঘাদিত্য সেন নোটিশটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে সোফায় আয়েশ করে বসলেন। তাঁর চোখে তখন হাজার কোটি টাকার নেশা। তিনি হাসিমুখে বললেন, "একদম ঠিক বলেছ ব্রিজেশ। সাপ্লাই চেইন অলরেডি মুভ করতে শুরু করেছে। 'সেন জেনিক্স'-এর ল্যাবে রাতদিন কাজ চলছে। অ্যান্টিপাইরেটিক্স আর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রথম লটটা কাল সকালেই ডিসপ্যাচ হবে।"
ব্রিজেশ চুরুটে একটা শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা মেঘাদিত্যের মুখের কাছে ছেড়ে বললেন, "লজিস্টিকস নিয়ে তোমার কোনো চিন্তা নেই তো আদিত্য?"
মেঘাদিত্য আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলেন, "বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই ব্রিজেশ। কারণ লজিস্টিকস তো সামলাচ্ছে তোমার 'সিংহ রায় কনগ্লোমারেট'। তোমার ওই হাই-টেক কন্টেইনার ট্রাকগুলো এখন দেশের কোণায় কোণায় পৌঁছে যাচ্ছে। তোমার স্ট্রং লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকলে আমি এক সপ্তাহের মধ্যে এত বড় সাপ্লাই চেইন মেইনটেইন করতে পারতাম না।"
ব্রিজেশ একটু ঝুঁকে বসে নিচু স্বরে বললেন, "গুড।" তিনি একটু ভেবে নিয়ে আবার বললেন, "ওয়েস্ট বেঙ্গল-উড়িষ্যা বর্ডারে একটা পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা গ্রাম আছে— অহিরাজপুর। নিরব প্রজেক্টটা হ্যান্ডেল করছে... কিন্তু সেখানে আমার একটা আলাদা ইন্টারেস্ট আছে, তাই ওটা নিজের হাতে না নিয়ে ওকে দিয়েছি। আমার জিওলজিক্যাল সার্ভে টিম আমাকে একটা নিউজ দিয়েছে... সেখানে এক ধরণের খনিজ পদার্থের সন্ধান পাওয়া গেছে পাহাড়ের এক কোণায়, তাদের বিশ্বাস— ওই গ্রামের নিচে আরও এরকম অনেক অজানা মিনারেল আছে... ঠিক যেমনটা আমরা পেয়েছিলাম 'কালবন'-এ।"
মেঘাদিত্য শুনে অবাক হলেন, এক মুহূর্তের জন্য যেন তাঁর গা শিউরে উঠল। "কী! কালবনে যেটা পেয়েছিলাম... যার জোরে আজ আমার এই বিশাল মেডিকেল এম্পায়ার...?"
ব্রিজেশ বললেন, "ইয়েস আদিত্য... হিস্ট্রি রিপিটস। কিন্তু এখন আর আগের মতো কাঁচা কাজ করা যাবে না। এবার একটু আলাদা ভাবে এগোতে হবে।"
মেঘাদিত্য উত্তেজিত হয়ে বললেন, "ব্রিজেশ, এই মিনারেল ইনফরমেশন জানাজানি হওয়ার আগেই আমাদের ওখানে পৌঁছাতে হবে।"
ব্রিজেশ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "তা নিয়ে চিন্তা নেই, এ ব্যাপারে কেউ জানবে না। গভর্নমেন্ট আমাকে সেই রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট দিয়েছে... তারা আমার শর্ত মেনে নিয়েছে যে ওখানে যদি কোনো মিনারেল পাওয়া যায়, তবে তার মালিকানা হবে 'সিংহ রায় কনগ্লোমারেট'-এর।"
মেঘাদিত্য ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দিয়ে ব্রিজেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "দ্যাটস হাউ আ প্রপার ক্লেভার বিজনেসম্যান থিঙ্কস! গুড জব ব্রিজেশ... তুমি তো অলরেডি ৯০ পারসেন্ট কাজ আমাদের ফেভারে এনে দিয়েছ।"
ব্রিজেশ লম্বা একটা টান দিয়ে বললেন, "না আদিত্য, একটা প্রবলেম আছে। লোকাল ট্রাইবাল ল্যান্ড অ্যাকুইজিশনে একটু ঝামেলা হচ্ছে... তারা কোনোভাবেই জমি ছাড়তে চাইছে না।"
মেঘাদিত্য ভ্রু কুঁচকে বললেন, "তাহলে কি... কালবোনের মতোই?"
ব্রিজেশ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "না না, সেই যুগ এখন আর নেই। এখন সময় অনেক মডার্ন। নিরবের কাছে একটা ভালো আইডিয়া আছে।"
ব্রিজেশ চুরুটটা ফেলে দিয়ে ডাকলেন, "নিরব, এদিকে এসো। আর তোমার মা আর আন্টিকেও নিয়ে এসো।"
দীক্ষিতের হাতের সিগারেটের আগুনটা অন্ধকারের বুকে একটা লাল বিন্দুর মতো জ্বলছে। সে একদৃষ্টে দূর থেকে পুলের নীল জলের দিকে তাকিয়ে আছে। রাতের নিস্তব্ধতায় অনুশ্রীর পায়ের নূপুরের শব্দ দীক্ষিতের কানে গেল। সে তাড়াহুড়ো করে মুখ থেকে এক গাদা ধোঁয়া বের করে সিগারেটটা দূরে ফেলে দিয়ে অপ্রস্তুত গলায় বলল, "দিদি? তুই এখানে কী করছিস?"
অনুশ্রী মৃদু স্বরে বলল, "ভাই... তুই এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? পুল সাইডে অত আলো থাকতেও এই অন্ধকারে... কী ভাবছিস? অন্ধকারে থাকলে কেউ বুঝতে পারবে না যে তুই সিগারেট টানছিস?"
দীক্ষিত দিদির দিকে তাকিয়ে বলল, "না দিদি... এখন অন্ধকারই ভালো লাগে। আলো আমার জন্য না।" তার গলার স্বরে এক অদ্ভুত শীতলতা।
অনুশ্রী দীক্ষিতের কথা শুনে অবাক হলো। মাত্র ২০ বছর বয়স, অথচ দীক্ষিতের সেই কিউট, চার্মিং পার্সোনালিটি যেন কোথায় উধাও হয়ে গেছে। ওর মুখে হালকা দাড়ি, যা ও আগে নিয়মিত শেভ করে রাখত। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। অনুশ্রী তার হাতটা ধরে টেনে পুল সাইডের বেঞ্চে এনে বসাল। এখানে আলো অনেক স্পষ্ট।
অনুশ্রী ওর হাতে হাত রেখে শক্ত করে ধরে বলল, "আমার ভাই অনেক বড় হয়ে গেছে দেখছি।" তারপর আবেগঘন স্বরে বলল, "ভাই, আমি তোর দিদি। আমরা তোকে হাসিখুশি মেডিকেল কলেজ টপার, জিম অবসেসড হিসেবেই জানি। আমি আমার ভাইকে ওভাবেই দেখতে চাই রে। এভাবে না যে দিদির কাছে লুকিয়ে সিগারেট খাবে।"
দীক্ষিত বেঞ্চে বসে দিদির দিকে তাকাল। তার চোখে জল ছলছল করছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোর ঝলকে অনুশ্রীর ল্যাভেন্ডার-পিঙ্ক শেডের অর্গ্যাঞ্জা শাড়িটা এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। রাতের আলোয় এই রঙটা কখনো হালকা গোলাপি আবার কখনো হালকা বেগুনি আভা দিচ্ছে। পাতলা শাড়ির নিচ দিয়ে অনুশ্রীর ছিপছিপে শরীর আর তার নাভি হালকা দেখা যাচ্ছিল। সে অপরাধবোধে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দীক্ষিত তার নিজের চাপা বিষণ্ণতা আর ধরে রাখতে পারল না। সে যেন মনে মনে এটাই চেয়েছিল যে কেউ তাকে আদর করে বলুক— "আমি আছি তোর পাশে।"
দীক্ষিত ধরা গলায় বলল, "দিদি, ভালোবাসা খুব বাজে রে... কাউকে বেশি বিশ্বাস করতে নেই।"
অনুশ্রী বলল, "কেন? কী হয়েছে? মধুশ্রী কি আর দেখা করতে আসছে না? নাকি ও তোকে চিট করেছে? বল আমাকে পুরোটা।"
দীক্ষিত অবাক হয়ে দিদির দিকে তাকাল। তার দিদি তবে আগে থেকেই জানে যে সে তার দিদির বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ায়? অনুশ্রী দীক্ষিতের অবাক চোখ দেখে হেসে ফেলল। "ভাই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার ভাই যদি কোনো মেয়ের সাথে হ্যাপি থাকে, তবে তো ভালোই। আর তোর খবর আমি রাখব না? আমি সব খেয়াল রাখি ভাই।" বলে সে দীক্ষিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
দীক্ষিত মনে মনে বলল— "না, সব এখনই বলা যাবে না।" সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা দিদি, মধুশ্রী তো তোর ফ্রেন্ড। সে আমাকে নিজের ব্যাপারে কোনোদিন কিছু বলেনি। ওর কি আগে কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিল?"
অনুশ্রী একটু ভেবে বলল, "না, আমার সাথে পড়ার সময় তো ওর কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিল না। ওর বাবা-মা নেই, কাকুর কাছে বড় হয়েছে মেয়েটা। ও যখন এমবিএ কমপ্লিট করে কোথাও জব পেয়েছিল, তখন আমাকে কিছু বলেনি। তারপর আর ওর দেখা পাইনি। সেদিন আমাদের অ্যানিভার্সারি পার্টিতেই আবার দেখলাম।"
দীক্ষিত দিদির কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল। মধুশ্রীর সেই নিষ্পাপ মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মধুশ্রী কি তবে কোনো বিপদে আছে? সে জানে, 'রক্তনগর'-এ টিকে থাকতে হলে শুধু টাকা নয়, অগাধ টাকার দরকার হয়। দীক্ষিত নিচু স্বরে বলল, "দিদি, তবুও আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে মিথ্যে বলতে পারি না। মিথ্যা বলা মানে শুধু ভুল নয়, এটা বিশ্বাস ভেঙে দেয়।"
অনুশ্রী বুঝল তার ভাই মধুশ্রীকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে। সে বলল, "দীক্ষিত, ভালোবাসা মানে শুধু ঘুরে বেড়ানো বা টাইম স্পেন্ড করা নয় রে। ভালোবাসা মানে ধৈর্য (Patience)। অনেকটা পথ একসাথে চলতে হয়, পথে অনেক বাধা আসবে। সবসময় নিজের চিন্তা দিয়ে সবটা বিচার করিস না। তুই যদি ওকে ভালোবাসিস, তবে তোর দায়িত্ব আর ধৈর্য দুটোই থাকতে হবে। যেদিন তুই এটা বুঝবি, সেদিন জীবনটা সহজ হবে।"
দীক্ষিত দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার অনেক দিনের জমানো কান্না এবার বাঁধ ভেঙে গেল। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে নামল। অনুশ্রী ভাইয়ের চোখে জল দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে নিল। "ভাই, কান্না কর... এভাবে গুমরে থাকিস না, নাহলে পাথর হয়ে যাবি।"
দীক্ষিত তার দিদিকে জড়িয়ে ধরে গলার কাছে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। অনুশ্রীর চোখেও হালকা জল এল। সে ভাইয়ের চুলে আঙুল চালিয়ে আদর করে দিতে লাগলো ।
দীক্ষিত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে করতেই অনুশ্রীকে জড়িয়ে ধরে বলল, "দিদি, অনেক থ্যাঙ্ক ইউ রে... এখন বুকটা অনেক হালকা লাগছে।"
অনুশ্রী নিজের চোখের কোণের জল হাত দিয়ে মুছে এক চিলতে হাসল। পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য সে দীক্ষিতের মুখটা নিজের গলা থেকে তুলে দু-হাত দিয়ে ধরল। আদুরে ধমক দিয়ে বলল, "আচ্ছা! আমাকে তুই থ্যাঙ্ক ইউ বলছিস? আর কান্না করিস না, এবার চুপ কর তো। নাহলে সবাই আমাকে কী বলবে জানিস? বলবে— আমার ভাইটা একটা আস্ত ক্রাই বেবি (Cry Baby)!"
দীক্ষিতের চোখ-মুখ কান্নায় লাল হয়ে গেছে। সে গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, "না... আমি কান্না করছি না তো! এটা কান্না না দিদি..."
অনুশ্রী হেসে ফেলল। দীক্ষিতের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, "হ্যাঁ রে জানি, আমার ভাই কোনোদিন কান্না করবে না। শোন, তুই একবার মধুশ্রীর সাথে দেখা করে নিস। তোদের মধ্যে ঠিক কী হয়েছে বা ও কী ভুল করেছে, আমি জানি না। কিন্তু তোর পুরোটা জানা দরকার ভাই। তুই তাকে ভালোবাসিস, আর সত্যিটা জানার অধিকার তোর আছে।"
দীক্ষিত দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। তার মনের ভেতর জমে থাকা মেঘগুলো যেন অনুশ্রীর স্নেহের পরশে এক নিমেষে কেটে গেল।
নিরব দূর থেকে এই ভাই-বোনের ইমোশনাল মোমেন্টটা দেখছিল। আজ সে মনে মনে ভীষণ খুশি। বাবা-মা, মেঘাদিত্য আঙ্কেল আর তনুশ্রী আন্টি—সবাই তার দেওয়া প্রজেক্ট প্ল্যানে সহমত হয়েছে। নিজেকে এখন অনেক বেশি পাওয়ারফুল লাগছে নিরবের। আর এই সবকিছুর পেছনে তার স্ত্রী অনুশ্রীর একটা বড় অনুপ্রেরণা আছে বলে সে মনে করে।
নিরব ধীর পায়ে এগিয়ে এল এবং অনুশ্রী ও দীক্ষিতকে পেছন থেকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, "কী চলছে এই দুই ভাই-বোনের মধ্যে? এত চুপিচুপি কী কথা হচ্ছে?"
দীক্ষিত নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলল, "আমি দিদিকে বলছিলাম নিরব দাকে একটু ভালো করে আগলে রাখতে। তুমি তো দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছ মনে হচ্ছে!"
দীক্ষিতের কথা শুনে তিনজনেই হোহো করে হেসে উঠল। নিরব লক্ষ্য করল দীক্ষিতের চোখ-মুখ কান্নায় একটু লাল হয়ে আছে। সে ভাবল, এই ভাই-বোনের একান্ত মুহূর্তের মাঝে বেশি ঢোকা ঠিক হবে না। সে অনুশ্রীর দিকে তাকিয়ে একটু রসিকতা করে বলল, "হুমম... তা আমাকে নিয়ে পরে ভেবো, কিন্তু তোমার দিদিকে দেখছ? আজ কেমন গ্লো করছে! আমার তো ভয় হচ্ছে কারো নজর না লেগে যায় আবার।"
দীক্ষিত দিদির দিকে একবার ভালো করে তাকাল। সত্যি, আজ অনুশ্রীর মধ্যে একটা অন্যরকম উজ্জ্বলতা বা 'উওম্যান গ্লো' কাজ করছে, যেটা আগে ওরকম দেখা যায়নি। ল্যাভেন্ডার-পিঙ্ক শাড়ির সেই রাজকীয় আবহে অনুশ্রীকে এক অপূর্ব নারীমূর্তি মনে হচ্ছিল। দীক্ষিত পরম আদরে দিদির কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, "কার দিদি দেখতে হবে না? দীক্ষিত সেনের দিদি... সুন্দর তো হবেই!"
নিরব হেসে দীক্ষিতের পিঠ চাপড়ে বলল, "আচ্ছা শ্যালক বাবু, তোমাদের দুই 'বিউটিফুল' ভাই-বোনের মিটিং শেষ হলে এবার ওদিকে চলো। বাবা-মা তোমার জন্য বাইরে ওয়েট করছে, ওরা এখনই বেরোবে।"
দীক্ষিত দিদির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল, "দিদি, আসছি তাহলে।" বলে সে আবার অনুশ্রীর কপালে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে মূল গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
আলমের সেই স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘর। ঘরের এক কোণে একটা ডিম-নীল রঙের আবছা আলো জ্বলছে, যা অন্ধকারের সাথে মিশে এক বীভৎস মায়া তৈরি করেছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ভেতরে আলমের ভারী নিশ্বাসের শব্দ।
আলম তার খাটে আধশোয়া হয়ে হাতে সস্তা স্মার্টফোনটা ধরে আছে। পুরো নেংটো। তার ভেজা স্যাঁতসেঁতে ঘরে শুয়ে আছে,
তার দেহ থেকে কয়েক দিনের না ধোয়া এক উৎকট ঘাম আর পুরুষত্বের তিতকুটে গন্ধ বের হচ্ছে। তার বিশাল আর ভারী লিঙ্গটা পেটের ওপর শুয়ে আছে, সাথে ঝুলে থাকা বড় অণ্ডকোষ। আলম তার সস্তা স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে ইন্টারনেটে সার্ফ করতে শুরু করল।
নীরবের ব্যাগে দেখা সেই জার্মান বইটার কথা তার মাথায় ঘুরছিল। সেটার কভার পেজের নিচে লেখা সেই বাংলা লাইনটা সে সার্চ করল— “বিবাহের কালো মাকড়সা — হস্তমৈথুন ধ্বংসের গোপন প্রোটোকল”।
গুগল ট্রান্সলেটে জার্মান নামটা খুঁজে পেতেই আলমের লিঙ্গটা একবার সজোরে কেঁপে উঠল— "Das Protokoll der ehelichen Hölle" (বিবাহিত নরকের প্রোটোকল)। আর সাবটাইটেলটা পড়তেই তার চোখে এক জান্তব তৃপ্তি ফুটে উঠল— "Geheime Scham- und Demütigungsübungen zur vollständigen Zerstörung der Onanie" (হস্তমৈথুন ধ্বংসের গোপন লজ্জা ও অপমানের প্রোটোকল)।
বইয়ের পাতাগুলো স্ক্রল করতে করতে আলম অবাক হয়ে গেল। কী বীভৎস সব পজিশন আর লজ্জা দেওয়ার বিধান লেখা আছে এখানে! অতিরিক্ত হস্তমৈথুনের ফলে হওয়া 'ক্যাম্পস' (CAMPHS) রোগ সারাতে স্বামীকে তার স্ত্রীর সামনে চরম অপমানিত হতে হবে, লজ্জায় মরতে হবে, কান্নাকাটি করতে হবে। আলম মনে মনে হাসল। যদি এই এক মাস প্র্যাকটিস করার পর কাজ না হয়, তবে তো হিতে বিপরীত হয়ে যাবে!
আলম নিজের মনে হেসে ফেলল। তার বড়ো লিঙ্গটা হঠাৎ কেঁপে উঠল, আরও শক্ত হয়ে উঠতে শুরু করল।
সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল। মাথায় ঘুরছে নীরব স্যারের সেই করুণ, নপুংসক মুখটা। সে বিড়বিড় করে বলল, "শালা নপুংসক! বউরে দামী দামী ফুল দিস, আর বিছানায় গিয়া বমি করিস। তোর বউ এর মাখন শরীরটা তো আমার মতো মরদের জন্য তৈরি হইছে রে... ছিঃ! নীরব শালা... তুই আমার স্যার হওয়ার যোগ্য না। নিজের বউরে চুইদা শান্ত করতে পারিস না? ইশশ... শালা অনুশ্রী ম্যাডামের সেই মাখনের মতো তুলতুলে শরীর! ম্যাডামরে দেইখা মনে হয় এখনো তারে কেউ ঠিকমতো নিঙড়াইয়া রস বের করে নাই।"
সে পাশে থাকা তার রক্ষিতা চামেলির দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "চামেলি, জানিস এই বইয়ে কী লেখা আছে? নীরব তো শালা আস্ত এক নামর্দ নিকলা রে! ও ম্যাডামরে বিছানায় সুখ দিতে পারে না, বমি করে দেয়। ও আমার কাছে তোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিল... শালা তোর ওই বড় গুদ কি আর ও সামলাইতে পারবে? ও তো হাত মাইরা মাইরা এখন চোদার আগেই মাল আউট কইরা দেয়।"
চামেলি আলমের সেই গন্ধযুক্ত লিঙ্গের মাথায় একটা চুমু দিতেই আলম উত্তেজনায় ফুঁসে উঠল।
আলম চোখ বন্ধ করে বলল, “উফফফ চামেলি… জানিস এই বইয়ে লিঙ্গের বীর্যপাত নিয়ন্ত্রণ করার কত টিপস লেখা আছে…
স্যালাইভা ফোরপ্লে (Saliva Tease)…
আউটার রাবিং (Yoni Rub without Penetration)…
কক সাকিং ট্রেনিং (Cock Sucking Desensitization)…
নিপল প্লে + লিঙ্গ রাব (Nipple & Rub Combo)…
শেমফুল কনফেশন (Verbal Humiliation Exercise)…
কন্ট্রোলড থ্রাস্ট (Slow Thrust Training)…
এজিং + কনফেশন (Edging with Confession)…
এরকম হাজার হাজার টিপস… উফফফ… একবার ভেবে দেখ অনুশ্রী ম্যাডাম… উফফফ…”
আলমের লিঙ্গটা চামেলির ঠোঁটের ছোঁয়ায় আরও শক্ত হয়ে উঠল, তার নোংরা গন্ধটা ঘরের ভেতর আরও ছড়িয়ে পড়ল।
তার মনে পড়ে গেল — অনুশ্রী, নীরবের বউ, সেই মাখনের মতো তুলতুলে ম্যাডাম। সে তার সামনে গাড়ির পিছনে বসে নোংরা গল্পের বই পড়ে গরম হয়ে যায়। বইয়ের পাতায় চোখ রেখে তার নাকের পাতা ফুলে ওঠা, শ্বাস ভারী হয়ে আসা, ঠোঁট কামড়ে ধরা। গাড়ির সিটে বসে থাকা অবস্থায় তার শরীরটা অল্প অল্প কাঁপতে ছিল।
সেই দৃশ্যটা মনে পড়তেই আলমের লিঙ্গটা আরও শক্ত হয়ে উঠল।
কালোঘাট বস্তির মেস বাড়ির নিচে হঠাৎ ‘ঠন’ করে একটা শব্দ হলো—হয়তো কোনো কাঁচের বোতল ভেঙে পড়েছে। বাইরের নর্দমার দুর্গন্ধ আর অন্ধকারের মাঝে সেই শব্দটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি করল।
জানলার ধারে দাঁড়িয়ে একটা বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল অনিকেত। জানলার গ্রাস ঘেঁষে একটা বড় কালো অ্যান্টেনা লাগানো, যা বাইরের সিগন্যাল ধরার জন্য অর্ক সেট করেছে। অনিকেত বিড়িতে শেষ টান দিয়ে তৃপ্তির স্বরে বলল, "উফফ! কী সুখের টান! আজ সারাদিন বাইরে দামী দামী সিগারেট খেয়েও কোনো মজা নেই রে ভাই। এই বিড়িতেই আসল সুখ।"
সে বিড়ির ধোঁয়ার আড়ালে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কাদের সাহেব কিন্তু খুব ডেঞ্জারাস লোক অর্ক, সাবধানে থাকিস।"
অর্কদেব তখনো পাথরের মতো ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখে চরম হতাশা আর বিরক্তি। দাঁতে দাঁত চিপে সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে।
অনিকেত ওর কাঁধে হাত রেখে একটু মজা করেই বলল, "কীরে? তোর এই হাজার হাজার কোড ল্যাপটপে দৌড়াচ্ছে, এগুলো কি কোনো কাজে আসবে ভাই?"
অর্ক ল্যাপটপটা সজোরে বন্ধ করে জানলার কাছে এসে অনিকেতের হাত থেকে একটা বিড়ি নিয়ে ধরিয়ে বলল, "দাদা, অনেক বড় প্রবলেম। এদের ডিজিটাল দেয়াল ভেদ করা ইম্পসিবল। সিংহ রায় বা সেন ফ্যামিলির মেম্বারদের হাতে যে মোবাইলগুলো দেখছিস, ওগুলো কোনো সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোন নয় দাদা। ওগুলো সব 'Hardened Devices'।"
অনিকেত একটু অবাক হয়ে তাকাল।
অর্ক ধোঁয়া ছেড়ে বলতে লাগল, "এগুলো Quantum-Resistant Encryption (কোয়ান্টাম-রেজিস্ট্যান্ট এনক্রিপশন) দিয়ে মোড়া। বর্তমানে প্রচলিত সব এনক্রিপশন কোড ভাঙা সম্ভব, কিন্তু এটা এমন এক অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্যাল অ্যালগরিদম যা সুপার-কম্পিউটার দিয়ে ভাঙতেও কয়েক হাজার বছর লাগবে। আমি যখনই ওদের সিস্টেমে ঢোকার চেষ্টা করছি, দেখছি কোডগুলো প্রতি সেকেন্ডে নিজেকে বদলে ফেলছে।"
অনিকেত কিছুই না বুঝে হা করে তাকিয়ে রইল। অর্ক থামল না, "ওদের পুরো কনগ্লোমারেট কোম্পানির ডেটা Zero-Knowledge Protocol (জিরো-নলেজ প্রোটোকল) দিয়ে প্রোটেক্ট করা। এমন সিকিউরিটি যেখানে সার্ভারও জানে না ইউজারের পাসওয়ার্ড কী। ডেটা ট্রান্সফার হওয়ার সময় সেটা ছোট ছোট টুকরো হয়ে আলাদা আলাদা ডামি সার্ভারে চলে যায়। আমি যদি ওদের অ্যাড্রেসে ঢোকার চেষ্টা করি, তবে উল্টে আমাদের আইডেন্টিটি রিভিল হয়ে যাবে।"
অনিকেত এবার একটা বাঁকা হাসি হেসে বলল, "জানিস অর্ক, মানুষ কখন এই বড় বড় খটোমটো টার্মগুলো ব্যবহার করে? যখন সে জানে যে কাজটা তার দ্বারা হবে না।"
অর্ক চোখ রাঙিয়ে অনিকেতের দিকে তাকাল। কথাটা গায়ে লাগল তার। সত্তিই সে আজ হার মেনেছে, কিন্তু বড় বড় টেকনিক্যাল কথা বলে নিজের ইগোটা বাঁচাতে চাইছিল।
অনিকেত ওকে খোঁচা দিয়ে আবার বলল, "সোজা কথা হলো—ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওদের তুই বালটাও ছিঁড়তে পারবি না, তাই তো?"
অর্ক মাথা নিচু করে বিড়িটা জানলার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধরা গলায় বলল, "হ্যাঁ দাদা। দিস ইজ নেক্সট টু ইম্পসিবল। কোনো অনেক বড় অ্যাডভান্সড টিম ওদের ডেটা প্রোটেক্ট করছে। সিংহ রায়রা ওয়ার্ল্ড ক্লাস ইঞ্জিনিয়ারিং আর এমবিএ কলেজ চালায় , স্বাভাবিকভাবেই ওদের সিকিউরিটি টিম টপ আইআইটি লেভেলের। আর ওদের কাছে যে ফোনগুলো আছে, সেগুলো আসলে ডামি ফোন। সেগুলো হ্যাক করলেও আমাদের আসল আইডেন্টিটি ধরা পড়ে যাবে। আমি তাও চেষ্টা করছি কোনো একটা লুপহোল (Loophole) যদি পাই..."
অনিকেত অর্কদেবের পিঠে একটা জোরে চাপড় মেরে হাসল। "ঠিক আছে ভাই, ভেঙে পড়িস না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওদের বালটাও যদি না ছিঁড়তে পারিস, ফিজিক্যাল লুপহোল তো আমাদের হাতে আছেই। এই শহরে সিংহ রায়দের একটা খুব ফেমাস কফি শপ আছে না? নামটা যেন কী?"
অর্ক ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে ক্লান্ত চোখে তাকাল। তারপর পটাপট কীবোর্ডে আঙুল চালিয়ে একটা গোল্ডেন লাক্সারি লোগো বের করে বলল, "D’ORO COUTURE & VELVET BREW।"
"সাবাশ!" অনিকেত বিড়িতে একটা শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা জানলার বাইরে ছেড়ে দিল। "আমার মনে হয় ওখানে শুধু মানি লন্ডারিং হয় না রে অর্ক, তার থেকেও বেশি কিছু আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে শহরের সবথেকে দামী আর প্রিমিয়াম কফি শপ, যেখানে যে কেউ ঢুকে কফি খেতে পারে। কিন্তু আসল খেলাটা শুরু হয় এর পেছনে।"
অর্ক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "পেছনে মানে? তুই কী দেখলি ওখানে আজ?"
অনিকেত অর্কদেবের ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে এসে চাপা স্বরে বলল, "আমি আজ সকালেই গিয়েছিলাম এই স্পটটা ভিজিট করতে। কফি শপের ভিড়ের আড়ালে পেছনের দিকে একটা সরু অন্ধকার সিঁড়ি আছে যা সরাসরি ওপরের তলায় উঠে গেছে। সেখানে সিংহ রায়দের লাক্সারি ফ্যাশন ব্র্যান্ড আর একটা Luxury Spa আছে। ওখানে সাধারণ মানুষের ঢোকার কোনো পারমিশন নেই। শুধু ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ডিজিটাল পাস দেওয়া হয়।"
সে একটু থেমে রহস্যময়ভাবে হাসল। "আমি আজই দেখেছি শহরের বড় বড় নেতা, মন্ত্রী আর প্রভাবশালী আমলারা মেইন কফি শপে না ঢুকে সোজা ওই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যাচ্ছে। ওখানে কী চলছে এটা আমাদের জানতে হবে! দেবারতি সিংহ রায় ওই কফি শপটাকে শুধু একটা রঙিন পর্দা হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে পেছনের নোংরামিগুলো কেউ দেখতে না পায়।"
অর্কদেব এবার নড়েচড়ে বসল।
অর্ক ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, আর Aaloyan Foundation-এর কোনো নিউজ পেলি?"
অনিকেত মেস বাড়ির ভাঙাচোরা বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। জানলা দিয়ে আসা কালোঘাটের স্যাঁতসেঁতে হাওয়াটা গায়ে মাখতে মাখতে সে বলল, "আলোয়ন ফাউন্ডেশন দেখে তো বোঝা মুশকিল রে অর্ক। আজ বিকেলের একটু আগে যখন ওই এনজিও বিল্ডিংয়ের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য রাখছিলাম, বেশি ক্ষণ ছিলাম না সেখানে। সিংহ রায়দের কফি শপে এক ঘণ্টায় যা বিল আর যা জাঁকজমক দেখেছি, আলোয়ন ফাউন্ডেশনে তেমন কিছু চোখে পড়ল না। বাইরে থেকে জায়গাটা খুব সাদামাটা আর শান্ত মনে হচ্ছে।"
সে একটা বিড়ি ধরাতে ধরাতে বলতে লাগল, "বিকেলের দিকে দেখলাম একজন পাতলা চেহারার লোক, চোখে চশমা। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম, সেও এসে ঠিক আমার পাশেই একটা সিগারেট ধরাল। লোকটাকে দেখে খুব ইনট্রোভার্ট আর কেমন যেন বিরক্ত আর টেন্সড লাগছিল। নামটা জানলাম— অরুণাভ চ্যাটার্জি।"
অর্ক এবার ল্যাপটপ ছেড়ে অনিকেতের দিকে ঘুরে বসল। "অরুণাভ চ্যাটার্জি? লোকটার সাথে কথা হলো তোর?"
অনিকেত ধোঁয়া ছেড়ে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ। আমি একটু ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম — 'দাদা, আলোয়ন ফাউন্ডেশনে কি কোনো জব হবে? শুনেছি এখানে নাকি সবাইকে হেল্প করে।'
লোকটা ঝট করে আমার দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল— 'কে আপনি?' আমি একটা ফেক ডিটেইলস দিয়ে নিজের নামটা বললাম। সে আমার নম্বরটা নিয়েছে, বলেছে কল করবে। নাহলে কালকে আমি আবার যাব ওখানে।"
অনিকেত একটু গম্ভীর হয়ে জানলার অন্ধকারের দিকে তাকাল। "অর্ক, আমার মনে হয় ওই হাই-প্রোফাইল কফি শপের চেয়ে এই আলোয়ন ফাউন্ডেশনে ঢুকতে পারলে সবথেকে ভালো হয়। কারণ আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, তলে তলে সবথেকে বড় এভিডেন্স আমরা ওখান থেকেই পেতে পারি। ওই শান্ত বিল্ডিংটার ভেতরেই আসল রহস্য চাপা দেওয়া আছে।"
অর্কদেব মাথা নিচু করে কী যেন ভাবল। "তার মানে আমাদের ইনভেস্টিগেশনের দুটো দিক—একটা লাক্সারি সিঁড়ি, আর একটা সাধারণ এনজিও-র গেট।
কাঁচের বোতল ভেঙে পড়ে আছে মেঝেতে। বাইরের নর্দমার দুর্গন্ধ আর এই ভাঙা কাচের বোতল থেকে বেরোনো সূক্ষ্ম, তীব্র, কাচা রাসায়নিক গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভ্যাপসা পরিবেশ তৈরি করেছে। আবছা আলোয় কাদের আলী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানেন, এই গন্ধ খুব বেশি দূর ছড়াবে না। এই গন্ধে কিছু হবে না।
তাঁর পায়ের কাছে একটা ওষুধের শিশি ভেঙে পড়ে আছে, কিন্তু সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁর স্থির চোখ দুটো আটকে আছে একটা দামি সিগারেটের প্যাকেটের দিকে।
তিনি ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়লেন। লুঙ্গির কোঁচা সামলে নিয়ে একটা সিরিঞ্জ তুলে নিলেন। পাশের টেবিলে রাখা ছোট্ট শিশিটা থেকে সিরিঞ্জের সূচটা ঢুকিয়ে টেনে নিলেন ঘন, সাদা, আঠালো তরল।
কাদের আলি খুব সাবধানে একটা নতুন ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ নিলেন। শিশি থেকে সেই বিষাক্ত গাঢ় সাদা তরলটা টেনে নিলেন সিরিঞ্জে। তারপর অত্যন্ত নিখুঁত হাতে সিগারেট প্যাকেট থেকে একটা একটা করে সিগারেট বের করতে লাগলেন। প্রতিটি সিগারেটের ফিল্টারের ঠিক নিচে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে মেপে মেপে সেই তরল পুশ করছেন তিনি। তার কপালে ঘাম জমেছে, কিন্তু হাত একটুকুও কাঁপছে না।
তিনি জানেন, এই তরলটার পরিমাণ যদি একটু বেশি হয়ে যায়, তবে তামাক ভিজে যাবে বা গন্ধ বদলে যাবে। তাই কাজটা করতে হচ্ছে ল্যাবরেটরির কোনো দক্ষ বিজ্ঞানীর মতো।
প্রতিটা সিগারেটের ফিল্টারের ঠিক নিচে সূচটা ঢুকিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এক ফোঁটা করে তরল ঢেলে দিলেন। হাত কাঁপছে না। চোখ স্থির। যেন এটা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
প্রতিটা সিগারেটে একই কাজ। এক ফোঁটা। ঠিক এক ফোঁটা। বেশি হলে গন্ধ বেরিয়ে যাবে। কম হলে কাজ হবে না।
শেষ সিগারেটটায় তরল ঢোকানোর পর তিনি সিরিঞ্জটা টেবিলে রেখে দিলেন।
কাদের আলি সযত্নে সিগারেটের প্যাকেটটা বন্ধ করে ঠিক আগের মতোই সাজিয়ে রাখলেন।
তাঁর চোখ পড়ল শিশিটার দিকে। শিশির গায়ে সাদা লেবেলে লেখা আছে:
ফ্যালোটিনটন শিরা-সংকোচন সিরাম
(PhalloTinton VeinCrusher Serum)
End of Chapter 3
To be continued...