নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ২১

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73118-post-6190749.html#pid6190749

🕰️ Posted on April 21, 2026 by ✍️ Vritra Shahryar (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2670 words / 12 min read

Parent
[ আগের অংশের পর থেকে... ] দুপুরবেলাতেই হঠাত করে আকাশ কালো করে কালবৈশাখীর মেঘে পুরো শহর ঢেকে গেছে। দিনের আলো মরে গিয়ে এমন এক অন্ধকার নেমে এসেছে, যেন মেঘ ফুঁড়ে এখনই অজোরে বৃষ্টি নামবে। শহরের একদম শেষ প্রান্তে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে 'স্ট্রাইড লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক'—যেটা ব্রিজেশ সিংহ রায়ের ‘সিংহ রায় কনগ্লোমারেট’-এর নিজস্ব কোম্পানি। সার সার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে লজিস্টিক ইয়ার্ডে। ঠিক এর পেছনের দিকে একটা ছোট সাধারণ কেবিন। চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে একটা লোক দ্রুতপায়ে কেবিনের ভেতর ঢুকল এবং ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। লোকটা দেওয়ালের একটা গোপন প্যানেলে পাসওয়ার্ড লক টিপতেই যান্ত্রিক শব্দে একটা লিফট খুলে গেল। সে ভেতরে ঢুকে নিচে নেমে যেতে লাগল মাটির অনেক গভীরে। ওপর থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এই লজিস্টিকস ডিপোর নিচেই লুকিয়ে আছে ব্রিজেশ সিংহ রায়ের নরক— ‘ভলকান কেমিক্যালস’। লিফটের দরজা খুলতেই নীলচে ম্লান আলোয় ভরা এক কাঁচের কেবিন। মেঘাদিত্য সেন রিভলভিং চেয়ারে পাথরের মতো বসে আছেন। চারদিকে কেমিক্যালের তীব্র গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। তাঁর চোখে এক ঠান্ডা, নির্মম আতঙ্ক। সামনে দাঁড়িয়ে ডাঃ লাহা—‘সেন কিওর হসপিটাল’-এর হেড। তিনি দরদর করে ঘামছেন, হাত দুটো ভয়ে কাঁপছে। গলা পরিষ্কার করে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “স্যার… ডাঃ বিমল… সে আমাদের সেক্সোলজি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র এক্সপার্ট ছিল। কিন্তু সে নিজের লোভে… ‘সাবজেক্ট’দের সেনসিটিভিটি চেকের নাম করে ভিডিও রেকর্ড করেছে। শুধু তাই নয়, সেই ভিডিওগুলো সে আড়ালে কিছু পারভার্টেড ক্লায়েন্টের সাথে শেয়ার করত।” মেঘাদিত্য সেন চোখ না সরিয়ে, অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো স্বরে বললেন, “ডাঃ লাহা… দিস ইজ মাই আইডিয়া। মাই প্রজেক্ট। আর ওই মাদারচোদ আমাকে ডাবল ক্রস করার সাহস পেল কোত্থেকে?” ডাঃ লাহার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কাঁচের বাইরে লাল আলোয় একটা চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় ডাঃ বিমলের ছটফটানি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওপরের লাল আলোর মায়ায় দৃশ্যটা বীভৎস ঠেকছে। মেঘাদিত্য আবার বললেন, “ওর মোবাইল, ল্যাপটপ, ক্লাউড—সবকিছু আমার চাই। প্রতিটা ভিডিও, প্রতিটা কন্ট্যাক্ট। আর হ্যাঁ… আমাদের নতুন সেক্সোলজিস্ট কে? তার ফাইল আর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড এখনই আমার টেবিলে চাই।” ডাঃ লাহা মাথা নিচু করে বললেন, “স্যার, তার নাম ডাঃ সায়ক সিনহা। খুবই ট্যালেন্টেড… কিন্তু এখনো পুরোপুরি আমাদের এই প্রজেক্ট সম্পর্কে কিছু জানে না।” মেঘাদিত্যের ঠোঁটে একটা হিমশীতল হাসি ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “তাহলে এবার জানানোর সময় হয়েছে।” সেই ছেলেটা আস্তে আস্তে কাঁচের কেবিনের সামনে এসে দরজা খুলে অনুচ্চ স্বরে বলল, “স্যার, আসব?” মেঘাদিত্য সেন চশমা মুছতে মুছতে নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “এসো রাকা...।” রাকাকে দেখলে মনে হবে ১৯-২০ বছরের সাধারণ কোনো কিশোর, কিন্তু ওর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ঠান্ডা মাথার অপরাধী। সে ভেতরে এসে মেঘাদিত্য সেনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, “স্যার, ওই ডাক্তারের নাম ডাঃ সায়ক সিনহা। ওর ছেলে সার্থক সিনহা—মেডিক্যাল এন্ট্রান্সের প্রিপারেশন নিচ্ছে। আর ওর ওয়াইফ... আর মেয়ে...।” মেঘাদিত্য সেন হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “থাক, বেশি জেনে লাভ নেই। একটা লুপহোল পেয়েছি, ওটাই এনাফ। ডাঃ লাহা, আপনি এবার আসতে পারেন। ডাঃ সায়ক সিনহার সাথে কথা বলুন আর আজ রাত্রে ওকে ল্যাবে নিয়ে আসুন। আর হ্যাঁ, হসপিটাল থেকে যখন নেক্সট ‘সাবজেক্ট’ পাঠাবেন, এবার একটু ভালো মানের পাঠাবেন।” ডাঃ লাহা যেন ফাঁসির দড়ি থেকে রেহাই পেলেন। তিনি ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, “ওকে স্যার... আমি আসছি।” ডাঃ লাহা দ্রুতপায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। ডাঃ লাহা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মেঘাদিত্য সেন উঠে দাঁড়ালেন। কাঁচের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে এক কোণে রাখা একটা পাতলা, লম্বা চাবুক তুলে নিলেন তিনি। চাবুকের গায়ে ছোট ছোট অসংখ্য ধারালো কাঁটা লাগানো। তিনি চাবুকটা এক হাতে শক্ত করে মুঠোয় ধরলেন। চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা ডাঃ বিমলের সামনে এসে দাঁড়ালেন মেঘাদিত্য। পরের মুহূর্তেই সজোরে চাবুক চালালেন। “আআআহহহ!!” ডাঃ বিমলের মুখে চাবুকের ঘা পড়তেই সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে চিৎকার করে উঠল। ধারালো কাঁটাগুলো তাঁর গাল আর ঠোঁটে গেঁথে গিয়েছিল। চাবুকটা সরাতেই সেই ক্ষতস্থান থেকে টপটপ করে রক্ত পড়তে শুরু করল। মেঘাদিত্য সেন ঠান্ডা গলায় বললেন, “রাকা, ওদের নিয়ে আয়।” রাকা তিনজনকে ভেতরে নিয়ে এল। একজন সুন্দরী বিবাহিত মহিলা, তার পাশে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে এরকম একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। তিনজনেই ডাঃ বিমলকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মেঘাদিত্য সেন তাদের দিকে তাকিয়ে একটা নিষ্ঠুর হাসি দিলেন। তারপর গেঁথে থাকা চাবুকটা আরও জোরে টেনে ধরলেন। চাবুকটা ডাঃ বিমলের মুখ থেকে ঘষতে ঘষতে উঠে এল; গালের চামড়া ছিঁড়ে গেল, মুখটা পুরো রক্তে ভরে গেল বিমলের। ডাঃ বিমল যন্ত্রণায় চোখ খুলতেই সামনে নিজের স্ত্রী, ছেলে আর মেয়েকে দেখতে পেল। সে কাঁপা কাঁপা, রক্তমাখা গলায় চিৎকার করে বলল, “স্যার… ওদের ছেড়ে দিন… প্লিজ… দোষ আমি করেছি… আমাকে যা খুশি করুন… কিন্তু ওদের ছেড়ে দিন!” মেঘাদিত্য সেন চাবুকটা হাতে ঘুরিয়ে নিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে, চোখে আগুন নিয়ে বললেন, “ছেড়ে দেব? শালা হারামজাদা মাদারচোদ… তোকে টাকা দিতাম, তোর ওই ছোট্ট লোভে হলো না? বেশি টাকা চাইছিলি? এখন তোর বউ, তোর মেয়ে, তোর ছেলে—সবাই জানবে তুই কীভাবে টাকা কামাতিস, কীভাবে নোংরা ভিডিও বানিয়ে বিক্রি করতিস।” মেঘাদিত্য একটু ঝুঁকে বিমলের রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক স্বরে বললেন, “তোর বউ আর তোর মেয়েকে আমার নতুন ‘সাবজেক্ট’ বানাব। ওদেরকে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে যা যা করব… সেটা তুই স্বপ্নেও ভাবতে পারবি না। প্রথমে তোর মেয়েকে… তারপর তোর বউকে।” বিমলের স্ত্রী আর মেয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করতে লাগল। মেঘাদিত্য থামলেন না, তিনি আরও নিষ্ঠুরভাবে বলে চললেন, “তোর মেয়ের চিৎকার শুনে তোর বউ পাগল হয়ে যাবে… আর তোর বউয়ের চিৎকার শুনে তোর ছেলে মরে যাবে লজ্জায়। তুই শুধু চোখ খুলে দেখবি। প্রতিটা মুহূর্ত দেখবি। তোর বউয়ের শরীরে আমার লোকেরা যখন হাত দেবে, তখন তুই কাঁদবি। তোর মেয়ের জামা খুলে ফেলার সময় তুই চিৎকার করবি। কিন্তু কিছুই করতে পারবি না। কারণ তুই একটা নোংরা, লোভী, বিশ্বাসঘাতক কুকুর। আর এখন তোর পরিবার… আমার খেলনা!” ডাঃ বিমলের চোখ দিয়ে রক্ত আর জল একসাথে গড়িয়ে পড়তে লাগল। ছেলেটা ফ্যাকাসে মুখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, যেন কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। মেঘাদিত্য সেন চাবুকটা আরেকবার শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে কোনো দয়া নেই, শুধু নির্মম আনন্দ আর ঠান্ডা রাগ। ঠিক সেই মুহূর্তেই টানেল দিয়ে একটা বিশাল ট্রাক গোঁ গোঁ শব্দে ভেতরে ঢুকে এল। ট্রাকটা একদম তাদের সামনে এসে ব্রেক কষল। ট্রাকের পেছনের ডালাটা খুলতেই দেখা গেল এক বীভৎস দৃশ্য—অর্ধেক ট্রাক ভর্তি মরা মানুষের স্তূপ। সেখানে নারী, পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ—সবার নগ্ন দেহগুলো জঞ্জালের মতো স্তূপাকার করে রাখা। তাদের শরীরে ক্ষত, রক্ত, পোড়া দাগ আর কেমিক্যালের ছাপ। কেউ কেউ এখনো হালকা নড়ছে, কেউ একদম স্থির হয়ে পড়ে আছে। গন্ধে বমি আসার মতো অবস্থা।সেই দৃশ্য দেখে ডাঃ বিমলের স্ত্রী আর মেয়ে আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল। ট্রাক থেকে দুজন লোক নেমে এল। তারা একটা যুবতী মহিলার সম্পূর্ণ ন্যাংটো, অচেতন দেহটা ধরে টেনে নিয়ে এল। মহিলার শরীরটা এখনো গরম, কিন্তু চোখ খোলা। তারা সেটাকে চ্যাংদোলা করে একটা বড় কেমিক্যালের ভাটের মুখে নিয়ে গেল। “ফেল!” ভাটের ভেতরে ফেলতেই ফোঁস করে ভয়ংকর শব্দ হলো। মহিলার দেহটা তীব্র অ্যাসিডে পড়ামাত্র তার চামড়া গলে যেতে শুরু করল। মাংস ফুটতে ফুটতে হাড় বেরিয়ে পড়ল। চোখ গলে গেল, চুল পুড়ে গেল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো দেহটা গলে একটা লালচে-সাদা তরল হয়ে গেল। হাড়গুলোও ধীরে ধীরে গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভাট থেকে ভয়ংকর পোড়া-গলা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ডাঃ বিমলের স্ত্রীর পা আরও জোরে কাঁপতে লাগল। তিনজনেই ভয়ে একদম গুটিয়ে গিয়ে একে অপরের সাথে সেঁটে দাঁড়াল।তারা তিনজনই ভয়ে আর গুমোট কেমিক্যালের গন্ধে প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছে। মেঘাদিত্য সেন ঠোঁট বাঁকিয়ে নিষ্ঠুর হাসি দিলেন। “যাক… অ্যানেস্থেসিয়ার ডোজ বেঁচে গেল। রাকা, আজ রাতে এদের তিনজনকেই ল্যাবে পাঠিয়ে দিস। আর তার আগে…” রাকা একটা অসভ্য, নোংরা হাসি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ স্যার… পুরোপুরি বুঝে গেছি।” বলে সে সোজা ডাঃ বিমলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ডাঃ বিমলের স্ত্রী, মেয়ে আর ছেলের সামনে এসে একে একে তাদের সব কাপড় ছিঁড়ে খুলে ফেলল। একদম ন্যাংটো করে দিল। তিনজনের শরীরই এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। বিমলের সামনেই তার পুরো পরিবার এখন অপমানে আর ভয়ে কুঁকড়ে আছে। ডাঃ বিমল গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলল, “সরি স্যার! প্লিজ ক্ষমা করে দিন! ওদের এভাবে অপমান করবেন না... স্যার!” মেঘাদিত্য সেন একবার ঘুরে তাকালেন। তাঁর চোখে হিমশীতল শূন্যতা। তিনি নিস্পৃহ গলায় বললেন, “অনেক লেট হয়ে গেছে বিমল। দেখা হবে ল্যাবে, আজ রাতেই। আর মনে রাখিস—আমার সাথে বেইমানি করলে তার এটাই হাল হয়।” আকাশে কালো মেঘ জমে আছে অনেকক্ষণ। অর্কদেব তার কালো বাইক নিয়ে শহরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এল—যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। বৃষ্টির তোড় এত জোরে যে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অর্কদেব বাইক থামিয়ে পাশের ফুটপাতে দাঁড় করাল। চোখ তুলে দেখল—ঠিক সামনেই শহরের বিখ্যাত পুরনো লাইব্রেরি ‘গ্রন্থভবন’। সে দ্রুত বাইক লক করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। লাইব্রেরির ভেতরটা শান্ত, ঠান্ডা আর পুরনো বইয়ের মিষ্টি গন্ধে ভরা। অর্কদেব জামা থেকে পানি ঝেড়ে ফেলল। ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সাথে তার সম্পর্ক ছিল গভীর। সে আস্তে আস্তে শেল্ফের সামনে দিয়ে হাঁটতে লাগল। একটা লম্বা, পুরনো শেল্ফের সামনে এসে থেমে গেল। বইয়ের নাম— “The Construction of Raktanogor: The New Legacy”। বইটা নিয়ে অর্কদেব লাইব্রেরির এক কোণের টেবিলে বসল। মাথা নিচু করে গভীর মনোযোগ দিয়ে ও ব্লুপ্রিন্টগুলো দেখতে লাগল। হঠাৎ সামনের চেয়ারে বসে থাকা একটা মেয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল— “এই বইটা… পড়া উচিত। আস্তে আস্তে। যেন প্রতিটা শব্দ মনে গেঁথে যায়।” অর্কদেব চোখ তুলে তাকাল। সামনে বসে আছে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। তার ঠোঁটে একটা নরম, লাজুক হাসি। মেয়েটি আবার নরম গলায় বলল, “এই বইয়ে এই শহরের সবকিছু লেখা আছে। কোথায় কীভাবে তৈরি হয়েছে… পুরো রক্তনগরের ব্লুপ্রিন্ট। আপনি যদি শহরটাকে সত্যি করে চিনতে চান, তাহলে এই বইটা পড়ুন।” অর্কদেবের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। সে কোনোমতে বলল, “আপনি… এই বইটা পড়েছেন?” মেয়েটা হালকা হেসে বলল, “না... এক-দুবার পড়েছি।” বলেই সে আবার নিজের বইয়ের পাতায় মন দিল। অর্কদেব ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়েই পাথর হয়ে গেল। এই মুখটা ও চেনে। ল্যাপটপে সিংহ রায় আর সেন ফ্যামিলির যে ছবিগুলো ও মুখস্থ করেছিল, এই মেয়েটা তাদেরই একজন— অনুশ্রী সেন। মেঘাদিত্য আর তনুশ্রী সেনের মেয়ে, ব্রিজেশ সিংহ রায়ের পুত্রবধূ। অনুশ্রীকে দেখে মনে হচ্ছে না যে সে এখানে কাউকে চেনে। সে অর্কদেবকে স্রেফ একজন সাধারণ পাঠক হিসেবেই দেখছে। অর্কদেব বইয়ের পাতা উল্টে উল্টে ‘ভলকান কেমিক্যালস’ আর ‘প্রিজম বায়োসায়েন্স ল্যাব’-এর হদিস খুঁজতে লাগল, কিন্তু না—এই বইয়ে ওসবের কোনো উল্লেখ নেই। সে একবার অনুশ্রীর দিকে তাকাল। সত্যিই অনুশ্রী দেখতে অসম্ভব সুন্দর। অর্কদেবের নিজের কলেজের কথা মনে পড়ে গেল; সেখানে একটা মেয়েকে ওর খুব ভালো লাগত, কিন্তু বলতে পারেনি। কারণ ‘বাবাসাহেব’ বলেছিলেন প্রেম থেকে হাজার হাত দূরে থাকতে। অনুশ্রীকে দেখে অর্কদেব ভাবল— যারা বই পড়ে, তারা কি সত্যিই খারাপ হয়? আজ মনটা খুব ভারী হয়ে আছে ওর। দাদাকে ও ঘুষি মেরেছে, আবার ওর দাদা—যে ওকে ছোটবেলা থেকে আগলে রাখত—সে আজ ওর ওপর গুলি চালাতে এক সেকেন্ড ভাবেনি। কথাগুলো মনে হতেই অর্কদেবের চোখটা ছলছল করে উঠল। সে টেবিল ছেড়ে উঠে যাচ্ছিল। বইটা শেল্ফে রাখার সময় দেখল অনুশ্রী একমনে বাইরের ঘন অন্ধকার আর অবিরাম বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। বইটা শেল্ফে রেখে অর্কদেব বলল, “আপনি বললেন এই বইটা এই শহরের ব্লুপ্রিন্ট... কিন্তু বই থেকে জানতে আমার ভালো লাগে না। শহর ঘুরে আমি এক্সপ্লোর করতে পছন্দ করি।” অনুশ্রী বই থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল, “বেস্ট অফ লাক!” অনুশ্রী আবার নিজের বইয়ের পাতায় ডুবে গেল। অর্কদেব চলে যাওয়ার বদলে অন্য আর একটা বই নিয়ে এসে আবার অনুশ্রীর সামনের চেয়ারটাতে বসল। বইটা চোখের সামনে ধরে সে আড়চোখে অনুশ্রীকে দেখতে লাগল। বাইরের বৃষ্টি আর ভেতরের এই নিস্তব্ধতায় শত্রু পরিবারের মেয়ের পাশে বসে অর্কদেব এক অদ্ভুত দোটানায় পড়ে গেল। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব চলছে, আর লাইব্রেরির ভেতরটা এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় মোড়া। অর্কদেবের চোখের সামনে কলেজের লাইব্রেরিটা ভেসে উঠল। ঠিক এভাবেই একটা মেয়েকে ওর ভালো লেগেছিল, কিন্তু বাবাসাহেবের সেই কঠিন অনুশাসন—"প্রেম করা চলবে না"—ওকে পাথর করে দিয়েছিল। আজ বড় জেদ হচ্ছে ওর। ছোটবেলা থেকে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে ও আর ওর দাদা, বাবাসাহেব বছরে বড়জোর এক-দুবার দেখা করতে আসতেন। আজ দাদার, বাবাসাহেবের ওই অবিচার আর নিজের জীবনের এই বন্দিদশা অর্কদেবকে বিদ্রোহী করে তুলছে। ও আজ আর কারও কথা শুনবে না। অর্কদেব একবার জানলার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অনুশ্রীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। অর্কদেব: "একটা কথা বলব? মাইন্ড করবেন না তো?" অনুশ্রী: (হালকা ভ্রু কুঁচকে, কিন্তু ঠোঁটে সেই ম্লান হাসি) "বইয়ের শহরে কেউ কাউকে মাইন্ড করে না। বলুন?" অর্কদেব: "আপনি শহরের ব্লুপ্রিন্ট পড়তে বললেন, কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই শহরের চেয়েও আপনার হাতের বইটা অনেক বেশি রহস্যময়। সেটা কীসের বই?" অনুশ্রী: (বইয়ের মলাটটা দেখাল—একটা ট্র্যাজেডি উপন্যাস) "এটা এক রাজকন্যার গল্প। যে নিজের প্রাসাদে থেকেও আসলে বন্দিনী। ব্লুপ্রিন্টে দেয়ালের মাপ থাকে, কিন্তু দেয়ালের পেছনের কান্নার শব্দ থাকে না।" অর্কদেব: (একটু ঝুঁকে বসল, গলার স্বর নিচু) "তাহলে তো আমাদের মিল আছে। আমি দেয়াল ভাঙতে পছন্দ করি, আর আপনি দেয়ালের পেছনের গল্প পড়তে। আচ্ছা, এই রাজকন্যা কি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়?" অনুশ্রী: (অর্কদেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল, চাউনিতে একটা অদ্ভুত শিহরণ) "সেটা শেষ পাতায় লেখা আছে। কিন্তু শেষ পাতা পর্যন্ত যাওয়ার ধৈর্য সবার থাকে না। আপনার আছে?" অর্কদেব: "আমি খুব পেশেন্ট একজন মানুষ। বিশেষ করে যখন কোনো কিছু আমার মন ছুঁয়ে যায়... আমি সেটার শেষ দেখে ছাড়ি। সেটা শহরের রহস্য হোক, বা কোনো গল্পের রাজকন্যা।" অনুশ্রী: (একটু লজ্জা পেল, কিন্তু সামলে নিয়ে বইটা বন্ধ করল) "আপনার কথাগুলো বড্ড গোলমেলে। আপনি কি সবার সাথেই এভাবে কথা বলেন?" অর্কদেব: (মুচকি হেসে) "না। সবার চোখের দিকে তাকালে তো আর কালবৈশাখী থমে যায় না। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো বাইরে বৃষ্টি পড়াটা একদম সার্থক।" অনুশ্রী: (হেসে ফেলল, এবার হাসিটা একদম অকৃত্রিম) "বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! এবার বইয়ে মন দিন। নাহলে লাইব্রেরিয়ান আমাদের দুজনকে বের করে দেবে।" অর্কদেব: (একটু বাঁকা হেসে) "তাহলে তো ভালোই হয়! বেরিয়ে গেলে এই বৃষ্টিতে অন্য কোথাও গিয়ে বসা যাবে আপনার সাথে। আসলে... জানতে খুব ইচ্ছে করছে, এই ট্র্যাজেডি বই পড়া রাজকন্যাটির নাম কী?" অনুশ্রী: (এক মুহূর্ত চুপ থেকে, টেবিলের ওপর রাখা নিজের আঙুলগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে) "নাম দিয়ে কী হবে? নাম তো একটা পরিচয় মাত্র। এই বইয়ের রাজকন্যার মতো আমারও হয়তো কোনো নাম নেই, শুধু একটা টাইটেল আছে যা লোকে ভয় পায়।" অর্কদেব: "টাইটেল তো মানুষের তৈরি করা খাঁচা। আমি খাঁচা নয়, খাঁচার ভেতরের মানুষটাকে দেখতে চাই। আমার নাম অর্ক। আপনার নামটা যদি বলতেন, বৃষ্টির শব্দটা শুনতে আরও ভালো লাগত।" অনুশ্রী: (মৃদু স্বরে) "অনুশ্রী। কিন্তু এই নামটা বাইরে না চলাই ভালো। এখানে আমি শুধু একজন পাঠক।" অর্কদেব: "অনুশ্রী... সুন্দর নাম। তবে আপনি ঠিকই বলেছেন, এখানে আপনি পাঠক, আর আমি একজন পথহারানো মুসাফির। আচ্ছা অনুশ্রী, এই যে আপনি বললেন রাজকন্যা বন্দিনী—সে কি স্বেচ্ছায় বন্দিনী, নাকি কেউ তাকে জোর করে আটকে রেখেছে?" অনুশ্রী: (জানলার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে) "মাঝে মাঝে মায়ার বাঁধন লোহার শিকলের চেয়েও শক্ত হয়, অর্ক। আপনি দেয়াল ভাঙার কথা বলছিলেন না? কিছু দেয়াল থাকে অদৃশ্য, যা ভাঙলে নিজের ঘরটাই ধসে পড়ে।" অর্কদেব: "তাহলে ধসে পড়ুক। নতুন কিছু গড়তে গেলে পুরনো ধ্বংসস্তূপ সরাতেই হয়। আপনার ওই রাজকন্যাকে বলবেন, ঝড় চিরকাল থাকে না। আকাশ পরিষ্কার হলে সে যেন একবার বাইরের পৃথিবীটা দেখে।" অনুশ্রী অবাক হয়ে অর্কদেবের দিকে তাকিয়ে রইল। এই সাধারণ ছেলেটার কথার মধ্যে এমন এক তেজ আছে যা ও ওর প্রাসাদের ভেতর কোনোদিন শোনেনি। ঠিক সেই সময় লাইব্রেরির ঘণ্টা বেজে উঠল—বন্ধ হওয়ার সময় হয়েছে। অনুশ্রী: "সময় শেষ। আমাকে যেতে হবে।" অর্কদেব: "আবার কি দেখা হবে? কোনো বইয়ের পাতায়? নাকি এই শহরের ব্লুপ্রিন্টগুলোর আড়ালে?" অনুশ্রী উত্তর দিল না, শুধু একটা রহস্যময় হাসি হেসে নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল। ও বেরিয়ে যাওয়ার সময় অর্কদেব দেখল বাইরে বৃষ্টিটা একটু কমে এসেছে, কিন্তু ওর মনের ভেতর এক নতুন ঝড়ের সূচনা হয়ে গেছে। ‘আলোকায়ন ফাউন্ডেশন’-এর বাইরে বাইকটা স্ট্যান্ড করিয়ে পার্সেল বক্সটা হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকল অনিকেত। বাইরে তাকিয়ে দেখল অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টিতে ও নিজে ভিজে একদম চুপসে গেছে, কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যেই ওকে আসতে হয়েছে কারণ লেট এমনিতেই হয়ে গেছিল। ভিজে সপসপ অবস্থায় ও যখন রিসেপশনের দিকে এগোচ্ছে, দেখল রাজীব বোস দাঁড়িয়ে আছে। অনিকেতকে ওই অবস্থায় দেখে রাজীব একটু রাগের স্বরেই বলে উঠল, “আপনি কি অনিকেত?” অনিকেত একবার রাজীবের দিকে তাকাল। চোখেমুখে হালকা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে ভাব নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি অনিকেত। কেন, কী হয়েছে?” রাজীব বোস বেশ চড়া গলায় বলল, “আপনি কি জানেন না যে ম্যাডাম কোনো কাজ দিলে সেটা টাইম মতো করতে হয়? নাহলে এইরকম ওয়ার্ক এথিক্স নিয়ে চললে তো এখানে আর বেশিদিন থাকতে পারবেন না!” অনিকেত দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে পাল্টা তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিয়ে বলল, “সেটা দেখা যাবে। এটা ম্যাডামের পার্সেল... আমি দিয়ে আসব নাকি আপনি নিয়ে যাবেন?” রাজীব বোস গম্ভীর হয়ে বলল, “ম্যাডাম এখন নেই। বক্সটা আপনি ওনার কেবিনে রেখে দিন।” অনিকেত মনে মনে একটু অবাক হলো। ম্যাডাম নেই? এই পার্সেলটা তো আজই ওনাকে দিতেই হবে, না দিলে তো পুরো প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে। সে রাজীবকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ম্যাডাম কি আবার আসবেন? নাহলে কি আমি ওনার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব?” রাজীব বোস এবার বেশ বিরক্ত হয়ে ধমকের সুরে বলল, “বেশি বাড়াবাড়ি না করে পার্সেলটা ম্যাডামের কেবিনে রেখে দিন। যা বলা হয়েছে সেটুকুই করুন।” অনিকেত আর কথা বাড়াল না। মনে মনে একটা গালি দিয়ে সে সোজা তনুশ্রী সেনের কেবিনে ঢুকল। ফাঁকা কেবিন, সেই দামী সুগন্ধিটা তখনও বাতাসে ভাসছে। অনিকেত তনুশ্রীর টেবিলের ওপর সেই মডিফাইড পার্সেল বক্সটা রাখল। এক মুহূর্ত বক্সটার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি হাসল ও। তারপর ভিজে কাপড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারে এসে একটা সিগারেট ধরাল অনিকেত। বৃষ্টির গুড়ি হালকা হালকা ওর মুখে লাগছে, কিন্তু জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ও ভাবল— ম্যাডাম যেখানেই থাকুক, এই উপহার তাঁর কাছে পৌঁছাবেই।
Parent