সুদীপ্তা - এক কল গার্ল এর আত্মজীবনী (সকল পর্ব একসঙ্গে) - অধ্যায় ৬
পর্ব -৬
সুদীপ্তা কি করবে ঠিক বুঝতে পারলো না। একটা গোটা রাত সুদীপ্তা বাড়ির বাইরে কাটায়নি কখনও। কিন্তু বুকিং যখন হয়ে গেছে যেতে তো ওকে হবেই। তাছাড়া একেবারে কুড়ি হাজার টাকা পাওয়া যাবে এক রাতে! সুদীপ্তার মাইনের প্রায় ডবল সেটা! ঠাণ্ডা হয়ে আসা বিরিয়ানি থেকে চামচে করে একটু একটু করে রাইস তুলে নিলো সুদীপ্তা। এই প্রফেশনে যখন ও এসেই পড়েছে, পিছয়ে আসার কোনো জায়গা নেই। বাড়িতে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করতে হবে। খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে গেল সুদীপ্তা।
কাঁকুরগাছি ক্রসিংয়ের একটু দূরে সিআইটি রোডের ওপরে একটা পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুদীপ্তা। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা মতো বাজে। একটু আগেই ওদের ড্রাইভার ওকে নামিয়ে দিয়েছে এখানে। বলেছে এখানেই অপেক্ষা করতে। সুদীপ্তা অপেক্ষা করতে লাগলো।
সুদীপ্তার ওপরে দুপুরের সেই ব্ল্যাক হট ড্রেসটা। তবে কাঁধে একটা কালো রংয়ের ভ্যানিটি ব্যাগ হয়েছে। অফিস থেকেই দিয়ে দিয়েছে এটা। টুকটাক জিনিস আছে ওতে। মেকাপ কিট, টিস্যু, নানা ফ্লেভারের কনডম.. এইসব। কাস্টমারদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হয় এগুলো। এখানে আসার আগে লিপিদি আবার ভালো করে মেকআপ করে দিয়েছে। দুপুরের মতোই সেক্সি লাগছে ওকে দেখতে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুদীপ্তা এইসবে বেশ মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। এখন আর ওর আনকমফোর্টেবল মনে হচ্ছে না, বরং মনে মনে এনজয় করছে বিষয়গুলো। আশেপাশে ভিড় আছে রাস্তায়, তবে এইদিকটা ফাঁকাই। পথচলতি লোকজন মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে ওর দিকে, আট থেকে আশি চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে ওর সেক্সি কমনীয় শরীরটা। সুদীপ্তা ভ্রুক্ষেপ করছে না তেমন। সুদীপ্তা অপেক্ষা করছে ওর ক্লায়েন্টের।
খেয়ে দেয়ে তখন সুদীপ্তা সোজা অফিসে চলে গিয়েছিল ওদের। লিপিদি ছিল ওখানে। সুদীপ্তাকে দেখে বললো, “তোমার বুকিং আছে কিন্তু হোলনাইট। মল্লিকাদি বলেছে তো তোমায়?"
সম্মতি জানিয়েছিল সুদীপ্তা। লিপি বলেছিল, “তাহলে এখন চেঞ্জ করে রেস্ট নিয়ে নাও একটু। ওদিকে বাথরুম আছে। মেকআপ ধুয়ে গেলে অসুবিধে নেই, আমি আবার করে দেব। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি খেয়ে এসেছ তো?” এবারও সম্মতি জানিয়েছিল সুদীপ্তা। তারপর চেঞ্জ করে রেস্ট নিয়ে নিয়েছিল ঘন্টাখানেক।
রেস্ট নেওয়ার পরে লিপিদিই আবার ডেকে নিয়েছিল সুদীপ্তাকে। মেকআপ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রাইভার চলে এসেছিল ওর। এর মাঝে অবশ্য বাড়িতে ফোন করে সুদীপ্তা জানিয়ে দিয়েছিল রাতে ফিরতে পারবে না। লিপিও মেকআপের ফাঁকে ফাঁকে বলে দিয়েছিল কি কি জিনিস পছন্দ করেন সমুদ্র স্যার, কিভাবে কিভাবে খুশি করতে হবে ওনাকে। সুদীপ্তা মন দিয়ে শুনেছিল কথাগুলো। তারপর মেকআপ শেষে লিপি নিজেই ব্যাগটা গুছিয়ে ওকে দিয়ে বলেছিল রেখে দিতে, কাজে লাগবে।
হঠাৎ একটা দামী গাড়ি জোরে হর্ন দিল সুদীপ্তার সামনে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ঝলসে উঠলো সুদীপ্তার চোখমুখ। সুদীপ্তা দেখলো গাড়ির ড্রাইভার সিটের গ্লাসটা নেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে, ভেতর থেকে একজন কমবয়সী ভদ্রলোক হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সুদীপ্তা চিনতে পারলো, এটাই সমুদ্র সিংহ। আজ গোটা রাতটার জন্য ইনিই বুক করেছেন সুদীপ্তাকে।
সমুদ্র গাড়িটা নিজেই চালাচ্ছিল। সুদীপ্তাকে দেখতে পেয়ে সমুদ্র ওকে ইশারা করলো গাড়িতে উঠে আসার জন্য। সুদীপ্তা দেরী করলো না, ও উঠে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসলো। সমুদ্র গাড়িটা স্টার্ট দিলো। কালো রংয়ের গাড়িটা কলকাতার রাস্তায় চলতে লাগলো সন্ধ্যার জ্যাম কাটিয়ে।
গাড়ি চলার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফোন এলো সুদীপ্তার ফোনে। সুদীপ্তা দেখলো সৌম্য ফোন করেছে। ইস! ওর তো সৌম্যর সাথে দেখা করার প্ল্যান ছিল আজ! নিশ্চই রবীন্দ্র সরোবরের গেটে পৌঁছে গেছে সৌম্য! সুদীপ্তার মনেই ছিল না সৌম্যর কথা। সৌম্য সাউথে এখন, সুদীপ্তা নর্থে। কী করবে ও এখন! সুদীপ্তা ভেবে পেল না। তাছাড়া ওর ক্লায়েন্টের সামনে তো ওর বয়ফ্রেন্ডের ফোন ধরতেও পারবেনা সুদীপ্তা! সুদীপ্তা টুক করে ফোনটাকে সাইলেন্ট করে দিলো।
সৌম্য অবশ্য থামলো না, ও পরপর ফোন করেই যেতে লাগলো সুদীপ্তাকে। আওয়াজ না হলেও স্ক্রিনের আলোটা জ্বলতে লাগলো ক্রমাগত। বাধ্য হয়ে সুদীপ্তা ফোনটাকে ঢুকিয়ে দিলো ব্যাগের ভেতরে।
সমুদ্র এখনো পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি সুদীপ্তার সাথে। সুদীপ্তাকে ফোনটা ব্যাগে ঢোকাতে দেখে সমুদ্র জিজ্ঞেস করলো, “কে ফোন করছে? বাড়ি থেকে?”
“না মানে.. ঠিক বাড়ি থেকে নয়..” সুদীপ্তা কি বলবে বুঝতে পারলো না।
“তবে কে? বয়ফ্রেন্ড?” রাস্তায় সোজাসুজি চোখ রেখেই কথাটা বললো সমুদ্র।
সুদীপ্তা চুপ করে রইলো কিছুক্ষন, তারপর মৃদু স্বরে বলল, “হ্যাঁ”।
“ঠিক আছে, ফোনটা ধরো তাহলে, কথা বলে নাও।”
সুদীপ্তা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলো না কথাটা। কোনো ক্লায়েন্ট যে এভাবে কথা বলতে পারে ধারণা ছিল না সুদীপ্তার। উনি আবার কোনো রসিকতা করছেন না তো??
“কি হলো! কথা বলে নাও, আমি ডিস্টার্ব করবো না। নয়তো সে আবার চিন্তা করবে হয়তো।”
সুদীপ্তা ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কল লিস্ট ওপেন করলো। এগারোটা মিস কল করেছে সৌম্য। সুদীপ্তা একবার সমুদ্রর দিকে তাকিয়ে কল ব্যাক করলো সৌম্যকে।
“কোথায় তুমি?” রিং হওয়ার প্রায় সাথে সাথে সৌম্য রিসিভ করলো ফোনটা।
“আমি.. আমি আসলে এখনো বেরোতে পারিনি গো! তোমায় বললাম না! আজ অফিসে কাজ আছে অনেক, অফিসার এসেছে। আমি ফিল্ডেই আছি এখনো।”
“ওহ, কখন ছুটি হবে তোমার?” সৌম্য শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো সুদীপ্তাকে।
“আমার মনেহয় রাত হবে জানোতো, তুমি বরং আজ বাড়ি চলে যাও। আমরা অন্য কোনোদিন দেখা করে নেবো।” আড়চোখে সমুদ্রর দিকে তাকাতে তাকাতে বললো সুদীপ্তা।
“তুমি কোথায় এখন?”
“আমি.. আমি আসলে নর্থের দিকে আছি গো। তুমি তো ঐদিকে। তাই আমি বলছিলাম আরকি। এতটা ডিসটেন্স.. আমার কভার করতে সমস্যা হবে।”
“শোনো, তুমি মন দিয়ে কাজ করো, কেমন? কাজ শেষ হলে তুমি বরং বাগবাজার ঘাটে চলে এসো, তোমার ওখান থেকে কাছে হবে ওটা। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে আজ। দেরী হলেও অসুবিধে নেই, আমি অপেক্ষা করবো। যত রাতই হোক আমি অপেক্ষা করবো। মিস কোরোনা, রাখলাম, বাই।" সৌম্য ফোনেই একটা চুমু দিয়ে ফোনটা কেটে দিলো।
সুদীপ্তা স্তব্ধ হয়ে গেল। সৌম্য.. সৌম্য এতটা ভালবাসে ওকে! কাজের চাপে, অভাবের চাপে সুদীপ্তা ভুলেই গিয়েছিল ওদের সম্পর্কের কথা, ওদের ভালোবাসার কথা। ভালোবাসার থেকে অভাবটাই মুখ্য হয়ে গিয়েছিল সুদীপ্তার কাছে। কিন্তু সৌম্য! সৌম্যকে এতোটা ইগনোর করার পর, এতো খারাপ ব্যবহার করার পরেও কতটা যত্ন করে সৌম্য ওকে! হঠাৎ করে একটা ভীষন খারাপলাগা গ্রাস করতে লাগলো সুদীপ্তাকে। ও কি ঠকাচ্ছে সৌম্যকে! এই ভালবাসার বিনিময়ে কি প্রতিদান দিচ্ছে ও সৌম্যকে! এতো ভালোবাসার পরিবর্তে সৌম্য একটুও কি বিশ্বাস আশা করতে পারেনা! সুদীপ্তা খেয়াল করলো আজ প্রায় সারাদিন ও মিথ্যে বলেছে সৌম্যকে। না না না.. ও ভুল করছে এটা। ওর যৌবনের পুরোটা কেবল সৌম্যর প্রাপ্য! সৌম্য চাইলে বহুদিন আগেই ওর এই ফুলের মতো যৌবন ভোগ করতে পারতো, নষ্ট করতে পারত ওর পবিত্রতা। কিন্তু সেটা করেনি সৌম্য, বরং বিশ্বাস করে সেটাকে আগলে রাখার দায়িত্ব দিয়েছে সুদীপ্তার কাছে। সেটাকে এভাবে টাকা দিয়ে সেটাকে বিক্রি করতে পারেনা সুদীপ্তা।
সমুদ্র তখন একমনে ড্রাইভ করছে। হাইরোডের ওপর দিয়ে বেশ ভালোই গতিতে চলছে গাড়িটা। দুপাশের দৃশ্য বদলে যাচ্ছে দ্রুত। সুদীপ্তা হঠাৎ মৃদু অথচ দৃঢ় গলায় বলে উঠলো, “গাড়ি থামান।”
চলবে... গল্পটা কেমন লাগছে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন...
ভালো লাগলে লাইক আর রেপুটেশন দেবেন।।।