প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ২১

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73447-post-6262026.html#pid6262026

🕰️ Posted on July 13, 2026 by ✍️ sghosh2100sg1900 (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1782 words / 8 min read

Parent
বিংশ পর্ব:- বিকেলের ম্লান আলোটা জানালার গ্রিল ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে। প্রতিমা স্থির হয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে, যেখানে কোনো নোটিফিকেশন নেই, কোনো মেসেজ নেই। ঠিক এক মাস। সৌম্যর ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো যেন ভারী হয়ে এসেছে। সেবার শেষবার কথা হয়েছিল খুব অদ্ভুতভাবে। তারপর হঠাৎ নীরবতা। বুকের ভেতরটা একটা শূন্য গর্তের মতো হয়ে গেছে। প্রতিমা চোখ বুজল। মনে পড়ল সেই রাতগুলোর কথা। সৌম্যর শরীরের ঘাম, তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস, আর সেই দাবি— "তুমি শুধু আমার।" সে নিজেকে বোঝালো, "সে চলে গেছে। সে আর ফিরবে না। ওর শরীরটাই শুধু চেয়েছিল আমার। ভালোবাসা? তা কি কোনোদিন ছিল?" প্রতিমা একবার ফোনটা হাতে নিল, তারপর সজোরে টেবিলের ওপর রাখল। ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তিক্ত হাসি। সে তাকে অভিশাপ দিয়েছে, কেঁদেছে, চিৎকার করেছে এই নিঃশব্দ ঘরে। কিন্তু শরীরটা যেন অন্য কোনো গল্প লিখছে। পরদিন সকালে রান্নাঘর থেকে আসা তেলের কড়া গন্ধে প্রতিমার ভেতরটা উল্টে এল। সে দ্রুত মুখে হাত দিয়ে বাথরুমে দৌড়ে গেল। বমির তীব্রতায় শরীর কাঁপছিল। যখন সে ফিরে এল, তার মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কপালে চিন্তার ভাঁজ। "মা, তোর কী হয়েছে? গত কয়েকদিন ধরে দেখছি তুই সকালে উঠেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিস। শরীরটা কি খুব খারাপ?" প্রতিমা ফ্যাকাশে মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে দ্রুত চোখে চোখ মিলিয়ে বলল, "কিছু না, মা। হয়তো বাজারের কিছু খাবার ঠিক ছিল না। পেটে একটু গোলমাল হয়েছে।" মা সন্দিহান চোখে তাকালেন। "পেটের গোলমাল এতদিন ধরে চলে? তুই কি ঠিক আছিস?" "আছি তো মা, তুমি চিন্তা করো না। একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাব।" কিন্তু দিনগুলো কাটাতে লাগল। প্রতিটা সকাল এখন এক নতুন যন্ত্রণার শুরু। রান্নার গন্ধ, সাবানের গন্ধ, এমনকি বাতাসের সামান্য পরিবর্তনও প্রতিমাকে অসুস্থ করে তুলছে। এক সকালে সে ড্রয়িংরুমে হাঁটছিল, হঠাৎ মনে হলো চারপাশের দেয়ালগুলো ঘুরছে। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। সে ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার বাবা দ্রুত এগিয়ে এলেন। প্রতিমার হাত ধরে চিৎকার করে বললেন, "প্রতিমা! প্রতিমা! কথা বল! কী হয়েছে তোর?" মা দৌড়ে এলেন, দুজনের চেহারায় চরম আতঙ্ক। প্রতিমা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার মনে হলো সে অনেক গভীর কোনো গর্ত থেকে ভেসে উঠেছে। বাবা তার কাঁধ ধরে ঝাঁকালেন। "চল, এখনই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তোর শরীরটা খুব খারাপ, এটা অগ্রাহ্য করা উচিত হবে না।" শহরের পুরনো ক্লিনিকে বৃদ্ধ ডাক্তারবাবু বসে ছিলেন। তার চোখে অভিজ্ঞতার ছাপ, হাতে একটা পুরনো স্টেথোস্কোপ। তিনি প্রতিমার ফ্যাকাশে মুখটা একবার দেখলেন, তারপর কিছু পরীক্ষা করলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, "মা, তুমি প্রেগন্যান্ট। প্রায় দুই মাসের গর্ভ।" প্রতিমার মনে হলো পৃথিবীর সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু বাতাস আর পৌঁছাচ্ছে না তার কাছে। ডাক্তারের কণ্ঠস্বরটা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি। সে শুনতে পেল না তার বাবা কী বললেন, শুনতে পেল না মায়ের কথা। সে শুধু নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেখানে এখন কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু এক জীবন্ত প্রাণ বেড়ে উঠছে। সৌম্যের প্রাণ। বাড়ি ফিরে পরিবেশটা হয়ে গেল গুমোট। বাবা ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। মা সোফায় চুপচাপ বসে রয়েছেন। বাবা প্রতিমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখ দুটো রাগে আর বিস্ময়ে জ্বলছে। "প্রতিমা, তুই তো বিধবা! তোর স্বামী সুবীর মারা গেছে কুড়ি বছর আগে! এই বাচ্চা কার? বল আমাদের! এটা কার সন্তান?" প্রতিমা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো সে এক বিশাল খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। সত্যটা বললে হবে কী? "বাবা, এই বাচ্চাটা আমার নিজের ছেলে সৌম্যের।" এই কথাটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে যেন আকাশ ভেঙে পড়বে। সুবীরের সম্মান, তার নিজের মর্যাদা, আর সবচেয়ে বড় কথা—এই নিষ্পাপ শিশুটির ভবিষ্যৎ। সে জানত, এই সত্য পৃথিবীর কোনো মানুষের সামনে আনা যাবে না। সে মাথা নিচু করল। মাটিতে তার ছায়াটা কাঁপছিল। ফিসফিস করে সে বলতে শুরু করল, "বাবা... আমি... আমি বলতে চেয়েছিলাম..." "কী বলতে চেয়েছিলে? কথা বল!" বাবার কণ্ঠস্বর এখন বজ্রের মতো। প্রতিমা চোখের জল মুছে নিল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু সে এক মিথ্যে জাল বুনতে শুরু করল। "সুবীরের মৃত্যুর পর আমি অনেকদিন একা ছিলাম। কিছুদিন আগে, আমি এখানে আসার ৬ মাস আগে যখন আমি পুরুলিয়ায় ছিলাম—সৌম্যের সঙ্গে থাকার সময় — বাজারে সৌম্যের দোকানে আসাযাওয়ার সময় এক পরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হতো। আমরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। ধীরে ধীরে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। সে আমাকে কথা দিয়েছিল যে সে আমাকে বিয়ে করবে।" মা কথার মাঝেই মাথা তুললেন। "কে ছিল সে? কোথায় সে এখন?" প্রতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, মা। আমরা একসাথে কিছুদিন ছিলাম, যখন সৌম্য কিছুদিন ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলো। আমি জানতাম না যে এমন কিছু হবে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো কিছু হবে না, কিন্তু এখন..." বাবা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলেন। মা কেঁদে উঠলেন। প্রতিমা নিজের কাঁপতে থাকা হাতের দিকে তাকাল। এই বিরাট মিথ্যেটা তার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করছিল, কিন্তু সে জানত এই মিথ্যেই নিরাপদ। সুবীরের নামে কলঙ্ক লাগবে না। সমাজ ভাববে এক বিধবা নারী এক অজ্ঞাত ব্যক্তির দ্বারা প্রতারিত হয়েছে। সৌম্যর নাম এখানে আসবে না। বাবা বললেন, "ঠিক আছে। অনেক হয়েছে। এই বাচ্চাটা নষ্ট করে দাও। এখনই ডাক্তারের কাছে যাই। তুই বিধবা হয়ে এই বাচ্চা মানুষ করবি কী করে? সমাজে মুখ দেখাবি কী করে? লোক জানলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না!" প্রতিমা প্রথমবার মাথা তুলে তাকালো। তার চোখে এখন জল নেই, আছে এক অদ্ভুত আগুন। "না, বাবা। আমি এটা নষ্ট করব না।" মা আর্তনাদ করে উঠলেন, "পাগল হয়েছিস তুই? এই বাচ্চা নিয়ে তুই কোথায় যাবি? সমাজে বাচ্চাটি নিজের বাবার পরিচয় কি দেবে?" "যেখানেই যাই, মা। একা যাই। কিন্তু এই বাচ্চা আমার শরীরের অংশ। এর কোনো দোষ নেই। ওর বাবা যেই হোক, ও আমার সন্তান। আমি ওকে ফেলে দিতে পারব না।" প্রতিমা জানত, এই শিশুটি কেবল তার সন্তান নয়। এটি সৌম্যর সাথে তার সেই নিষিদ্ধ প্রেমের শেষ স্মৃতি। সৌম্য তাকে ছেড়ে চলে গেছে, হয়তো তাকে প্রতারিত করেছে, কিন্তু এই শিশুটি তার কাছে থেকে যাবে। সৌম্যর চোখ, সৌম্যর নাক, সৌম্যর সেই অবাধ্য হাসি—সবকিছু এই শিশুর মধ্যে বেঁচে থাকবে। দিন যেতে লাগল। প্রতিমার পেট ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল। সে ঢিলেঢালা শাড়ি পরতে শুরু করল, কিন্তু প্রতিবেশীদের তীক্ষ্ণ চোখ ফাঁকি দেওয়া কঠিন ছিল। বাবা-মা লোকলজ্জার ভয়ে তাকে ঘরের ভেতরেই আটকে রাখতেন। কিন্তু বাইরে তারা এক নতুন গল্প তৈরি করলেন। পাড়ার প্রতিবেশীদের প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমার বাবা বললেন, "প্রতিমার স্বামী মাত্র এক মাস আগে মারা গেছে। খুব হঠাৎ। প্রতিমার শ্বশুরবাড়িতে কেউ নেই বলে সে একা হয়ে আমাদের কাছে চলে এসেছে। এখানে আসার কিছুদিন পর জানতে পারলাম সে প্রেগন্যান্ট। বেচারি, স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলাচ্ছে।" প্রতিবেশীরা সহানুভূতি দেখাল। তারা ভাবল, এই সন্তানটি মৃত স্বামীর স্মৃতি। প্রতিমার জন্য এটি ছিল এক অদ্ভুত সুরক্ষা কবচ। রাতের বেলা প্রতিমা একা জানালার পাশে বসে থাকতো। বাইরে অন্ধকারের বুক চিরে চাঁদের আলো আসত। সে তার পেটের ওপর হাত বুলিয়ে দিত। হঠাৎ ভেতর থেকে একটা মৃদু নড়াচড়া অনুভব করল সে। শিশুটি লাথি মারছিল। প্রতিমা ফিসফিস করে বলে উঠল, "তোর বাবা কোথায় জানিস? অনেক দূরে। মুম্বাইতে। তোকে কোনোদিন দেখতে পারবে না হয়তো। কিন্তু আমি আছি। আমি সবসময় থাকব।" সে শিশুটির সাথে সৌম্যর কথা বলত। "তোর চোখ হবে সৌম্যর মতো। তোর নাক হবে ঠিক ওর মতো। আমি যত কষ্ট পেয়েছি, তুই যেন তার একটা কণাও না পাস।" মা মাঝে মাঝে ঘরে এসে বসতেন। একদিন তিনি প্রতিমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলেন, "মা, তুই কি সত্যিই ওই লোকটাকে ভালোবাসতি? তোর কি এখনও তার প্রতি কোনো আকর্ষণ আছে?" প্রতিমা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। "না, মা। আমার এখন আর কাউকে প্রয়োজন নেই। আমার শুধু এই বাচ্চাটা আছে। আমি ওর জন্যই বাঁচব।" মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তোর কপালটাই খারাপ। ওই বদমাশটা তোকে ব্যবহার করে চলে গেল। তুই এখনও ওর কথা ভাবিস, তাই না?" প্রতিমা শুধু হাসল। মা বুঝতে পারলেন না যে তার মেয়ে কোনো অজ্ঞাত বদমাশের জন্য নয়, বরং তার নিজের ছেলের জন্য পাগল। যে তার গর্ভের সন্তানের পিতা। নয় মাস কেটে গেল। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ প্রতিমার প্রসব বেদনা শুরু হলো। যন্ত্রণায় সে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মনে তখন একটাই চিন্তা—এই শিশুটিকে পৃথিবীতে আনবই। বাবা-মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। প্রতিমা যন্ত্রণায় কাঁপছিল, তার গাল বেয়ে ঘাম আর জল মিশে যাচ্ছিল। অবশেষে, একটি নবজাতকের উচ্চস্বরে কান্না পুরো ঘর ভরিয়ে দিল। নার্স শিশুটিকে মুছিয়ে প্রতিমার কোলে এনে দিয়ে বললেন, "ম্যাডাম, আপনার ছেলে হয়েছে। খুব সুন্দর ছেলে।" প্রতিমার হাত কাঁপছিল। যখন সে শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরল, পৃথিবীর সব কষ্ট, সব অপমান, সব দীর্ঘশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সে শিশুর মুখের দিকে তাকালো। তার চোখগুলো বড় বড়, নাকটা তীক্ষ্ণ। প্রতিমার বুক কেঁপে উঠল। "সৌম্য..." সে ফিসফিস করে বলল। যেন সৌম্য নিজেই ছোট্ট একটি সংস্করণে তার কোলে ফিরে এসেছে। প্রতিমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল শিশুর কপালে। সে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আমার সোনা। তোকে আমি কখনও একা হতে দেব না।" ছেলেটির নাম রাখা হলো অর্ণব। নামটা সুন্দর, মার্জিত। কারো সন্দেহ জাগল না। বাবা-মা ধীরে ধীরে মেনে নিলেন। তারা ভাবলেন, মেয়েটি এখন একা, এই সন্তানই তার একমাত্র ভরসা। অর্ণব বড় হতে লাগল। সে হামাগুড়ি দেয়, কথা বলতে শেখে, হাসে। প্রতিবার অর্ণবের হাসির শব্দ শুনলে প্রতিমার মনে পড়ে যায় সৌম্যর সেই হাসি—যেদিন সে প্রথমবার তাকে স্পর্শ করেছিল, যেদিন সে বলেছিল, "আমি তোমাকে কখনও ছেড়ে যাব না।" কিন্তু সৌম্য আর ফিরে আসেনি। তার কোনো খোঁজ নেই। প্রতিমা রাতে অর্ণবকে কোলে নিয়ে দোলা দেয়। ঘরে অন্ধকার, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে অর্ণবের মুখে পড়ে। প্রতিমা গুনগুন করে গান গায়—সেই গান যা সৌম্য শুনতে ভালোবাসত। "আমার সোনা, তোর বাবা অনেক দূরে। কিন্তু তুই আমার কাছে। আমি তোকে সব দেব। তোর বাবার মতো করে তোকে ভালোবাসব। তোর বাবার মতো করে তোকে আগলে রাখব।" অর্ণব ঘুমের ঘোরে একবার হাত নাড়ল। প্রতিমা তার কপালে চুমু খেল। তার মন ভীষণ একা, কিন্তু এই শিশুটির মধ্যেই সে তার পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে। পাড়ার মানুষ জানে—প্রতিমা এক বিধবা, তার একটি ছেলে আছে, এই সন্তানটি মৃত স্বামীর স্মৃতি। তারা নানা কথা বলে, কানাঘুষো করে, কিন্তু প্রতিমা এখন সেসব শোনে না। সে শুধু অর্ণবকে নিয়ে ব্যস্ত। এক বছর কেটে গেছে অর্ণবের জন্মের পর। প্রতিমা প্রতিদিন তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু মাঝরাতে যখন অর্ণব ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে আবার সেই পুরনো শূন্যতায় ফিরে যায়। সে জানে না, দূর কোনো জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সৌম্য প্রতিদিন তার মায়ের নাম ফিসফিস করে বলে। সে জানে না, সৌম্যর চোখে এখনও শুধু সে—শুধু প্রতিমা। প্রতিমা প্রতিরাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সৌম্যর নাম মনে করে। দূরত্ব, সময়, আর ভুল বোঝাবুঝি তাদের চারপাশে এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করেছে। তবুও প্রতিমার মনে হয়, হয়তো কোনোদিন সৌম্য ফিরে আসবে। হয়তো সে তার ছেলেকে দেখবে। "তোর বাবা ফিরে আসবে, সোনা। আমি জানি। ও আসবে। আমাদের জন্য।" সৌম্য জেলে। প্রতিমা বাবা-মায়ের কাছে। দুজনের মাঝে এক গভীর ক্ষত, বিশ্বাসঘাতকতার জ্বালা। কিন্তু প্রতিমা জানে না—সৌম্য তাকে ভালোবেসেই চুপ করে আছে। তাকে রক্ষা করতেই সে নিজের দুঃখ লুকিয়ে রেখেছে। অন্ধকার এক রাতে, প্রতিমা জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখে এখন আর জল নেই, কারণ শেষ ফোঁটাও শুকিয়ে গেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, "হয়তো ভালোবাসা আসলেই ছিল না। হয়তো সৌম্য শুধু আমার শরীর চেয়েছিল, আর এখন তার শরীর আর দরকার নেই।" কিন্তু অনেক দূরে, জেলের সেই স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে সৌম্য আঙুল দিয়ে প্রতিমার নাম লিখে রাখছে। সে লিখে রাখছে তার অন্তরের সমস্ত আকুতি। তারা দুজনেই ভুল পথে হাঁটছে। একজন জানে না যে অপরজন আসলে কতটা ভালোবাসে। প্রতিমা অর্ণবকে কোলে তুলে নিল। ছেলেটি হাসল। প্রতিমা তার গালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, "তোর বাবা আসবে, সোনা। আমি জানি ও আসবে।" বাইরে বাতাস বইছে, আর অন্ধকারের গভীরে দুটি মন একে অপরকে খুঁজছে, অথচ তারা জানে না যে তাদের সংযোগ এখন কেবল একটি নিষ্পাপ শিশুর হাসিতে বেঁচে আছে।
Parent