জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১৮
পর্ব ১৮ যমরাজ
রোদটা মাথার উপর খাড়া। আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে মকবুলের রক্তমাখা পিঠে।
কুদ্দুস মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। গতকাল রাতেই সে রং বদলেছে — সতেরো বছর আওয়ামী লীগের ছায়ায় থেকে যে মানুষটা এলাকাকে চুষে খেয়েছে, সে-ই এখন গলায় ধানের শীষের গামছা ঝুলিয়ে বিএনপি’র নেতা। কাল রাতে টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ে মিরা-মকবুলের ভিডিওটা সে-ই প্রথম দেখিয়েছে। জেলা নেতাদের সাথে বৈঠক, চোখের ইশারা, আর একশো কোটি টাকার ডিল — “মকবুলকে রাস্তা থেকে সরাতে হবে। এলাকা আমাদের।”
কুদ্দুস আসতেই পুরো ময়দান উঠে দাঁড়ায়।
“আসসালামু আলাইকুম, কুদ্দুস ভাই।”
“বসেন, বসেন চাচা।”
সে গিয়ে বসে ঠিক সেই দামী কাঠের চেয়ারটায়, যে চেয়ারে বসে গত সপ্তাহেও মকবুল মানুষের তালাক-জরিমানার রায় দিত। নিয়তি — আজ আসামির কাঠগড়ায় সেই চেয়ারের মালিক।
সব আগে থেকেই ঠিক করা। এটা বিচার না, এটা মঞ্চনাটক। শুধু আনুষ্ঠানিকতাটা বাকি।
হুজুর হাত তুলে বলে, “অন্য দোষী মিরাকে সামনে আনা হোক।”
ভিড় ঠেলে মিরা আসে। পরনে বিবর্ণ, মলিন কাপড়। মুখে কালো মাস্ক, চোখ দুটো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। মাথা নিচু। পায়ে ধুলো। সাত দিন আগের সেই রূপবতী মিরা আর এই মিরার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।
হুজুর গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে, “আমরা আজ এখানে এক লজ্জাজনক, ঘৃণ্য ঘটনার বিচারের জন্য জড়ো হয়েছি। দোষী মকবুল আর মিরা — দুজনেই আমাদের সামনে হাজির।”
‘মিরা’ নামটা শুনে মকবুল ধীরে ধীরে মুখ তোলে। চোখে রক্ত, ঠোঁট ফাটা, তবুও সেই চোখে খুঁজে বেড়ায় একটা মুখ। মিরা একবারও তাকায় না তার দিকে।
মকবুল শুধু মিরার চোখের একটা পাশ দেখতে পায়। আর তাতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
মনে মনে বলে, “মাফ করে দিও, হে রূপবতী। তোমার রূপের বর্ণনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। এই চাবুক, এই জুতা, এই অপমান — এগুলো কিছুই না। তোমাকে একবার ছুঁয়ে যদি নরকেও যেতে হয়, আমি রাজি। আমি সেখানে নরকের রাজা হব, আর তুমি হবে আমার নরকের রানী।
হায়... আমার কপালে শান্তি কেন সয় না? যৌবনটা দিলাম দলের পিছে। বউ-পোলাপানের মুখ দেখার সময় পাই নাই। ভাবলাম শেষ বয়সে একটু সুখ পাব, তোমার কাছে। সেটাও কেড়ে নিল। হে উপরওয়ালা, আমি কি একটুও শান্তির যোগ্য না?”
হুজুরের ইশারায় দুজন লোক এগিয়ে আসে। মিরার হাত দুটো শক্ত করে ধরে। একজন পেছন থেকে মোটা বেত দিয়ে গুনে গুনে একশোটা বাড়ি মারে। মিরা একটা শব্দও করে না। শুধু শরীরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। মাস্কের নিচে ঠোঁট কামড়ে ধরে রক্ত বের করে ফেলে। দশ বাড়ির পর তার পা টলতে থাকে, পঞ্চাশের পর হাঁটু ভেঙে আসে। একশো শেষ হলে তাকে দুজন ধরে পাশে বসায়।
এবার মকবুলের পালা।
গাছের সাথে বাঁধা দড়ি খুলে দিতেই মকবুল ধপ করে হাঁটু গেড়ে মাটিতে পড়ে যায়। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই।
কুদ্দুস মিয়া চোখের ইশারা করে। পেছন থেকে হুজুরের লোকটা এগিয়ে আসে — হাতে মোটা চামড়ার চাবুক, ডগায় গিঁট বাঁধা।
সপাং... সপাং... সপাং...
প্রথম চাবুকেই মকবুলের পিঠের চামড়া ফেটে রক্ত ছিটকে ওঠে। সে গলা দিয়ে গোঙায়। দশটা শেষ হতে না হতেই তার চিৎকার থেমে যায়। বিশটার পর শরীর অবশ। পঞ্চাশের পর সে আর মানুষ না, একটা মাংসের দলা।
নব্বইটা চাবুক খাওয়ার পর মকবুল মাটিতে পড়ে থাকে। পিঠটা জুড়ে শুধু লম্বা লম্বা রক্তের দাগ, মাংস ফেটে বের হয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবি এখন লাল। তবুও মার থামে না। একানব্বই... বিরানব্বই...
মকবুলের চোখ দুটো খোলা। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যথা আর লাগছে না। শরীর সাড়া দিচ্ছে না। শুধু মাথার ভেতর সিনেমার মতো ভেসে ওঠে মুখগুলো।
“এই লোকগুলো কত অকৃতজ্ঞ... ওই যে রানার বাপ — ঝড়ে টিনের চাল উড়ে গিয়েছিল, আমি নিজের টাকায় নতুন টিন লাগিয়ে দিয়েছি। ওই যে রিতুর নানী — ছেলে-মেয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল, আমি জমি দিয়ে ঘর তুলে দিয়েছি। কার ছেলের কিডনি নষ্ট, আমি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে লাখ টাকা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি।
এই মাদারচোদের দল... তোদের জন্য যা করেছি, নিজের বউ-পোলাপানের জন্যও তা করি নাই। আমার পকেটের টাকা, আমার সময়, আমার রাতের ঘুম — সব তোদের দিয়েছি।
আর আজ? আমার একটা ভুলের জন্য তোরা আমাকে কুকুরের মতো বেঁধে পিটাচ্ছিস? বিচার বসাইছিস? বাহ... বাহ...”
একশো নম্বর চাবুকটা যখন পিঠে পড়ে, মকবুলের চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। কানে শুধু বাজে জনতার উল্লাস, আর কুদ্দুস মিয়ার ভারী গলা — “এই হলো সমাজের কীটদের পরিণতি।”
আমগাছের নিচে পড়ে থাকে রক্তাক্ত, নিথর একটা শরীর। সকালের মাতব্বর, বিকেলের আসামি, সন্ধ্যার লাশ।
বিচার তখন শেষের দিকে। রোদ পড়ে এসেছে, আমগাছের ছায়া লম্বা হয়ে মাঠ ছুঁয়েছে।
ভিড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে লোকনাথ। মাথায় গামছা পেঁচানো, মুখের অর্ধেক ঢাকা। কেউ চিনতে পারছে না। কিন্তু লোকনাথের বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটাচ্ছে। গাছের সাথে বাঁধা, রক্তাক্ত মকবুলকে দেখে তার গলা শুকিয়ে আসে।
লোকনাথ নিজেকে মকবুলের জায়গায় কল্পনা করে। না, সে মকবুলের মতো কাণ্ড করেনি। কিন্তু সেদিন বাসের ভিড়ে চৈতির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল সে-ও। এক মুহূর্তের দুর্বলতায় চৈতির কোমরটা চেপে ধরেছিল। চৈতি কিছু বলেনি, শুধু চোখ তুলে তাকিয়েছিল।
যদি চৈতি কুদ্দুসকে বলে দেয়? যদি রাজীব জানতে পারে? রাজীবের রাগ লোকনাথ জানে। ও ছেলে এক কথায় গলা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে।
লোকনাথ আর দাঁড়ায় না। ভিড়ের ফাঁক গলে পিছন দিয়ে হাঁটা দেয়। একবারও পেছনে তাকায় না। পালাতে হবে। এই গ্রাম, এই মাঠ, এই বিচার — সব থেকে দূরে।
আস্তে আস্তে মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। যারা এসেছিল তামাশা দেখতে, তারা মোবাইলে ভিডিও তুলে, গালি দিয়ে, থুথু ফেলে চলে যায়। পড়ে থাকে শুধু রক্তমাখা মাটি, ছেঁড়া জুতা, আর আমগাছের নিচে একটা ভাঙা শরীর।
মকবুলের নিঃশ্বাস চলে, কিন্তু চোখ আধবোজা। কানে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
হঠাৎ পায়ের শব্দ। কেউ একজন এসে তার মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে। মকবুলের ঘোলা চোখে শুধু একজোড়া চকচকে কালো পাম্প-শু দেখা যায়। ধুলো লেগে আছে।
থুউ...
এক দলা থুথু এসে পড়ে মকবুলের ফাটা গালে। গরম, আঠালো। গড়িয়ে ঠোঁটের কোণে চলে যায়।
একটা ঠান্ডা, চেনা গলা ফিসফিস করে বলে, “কেমন লাগল চাবুকের বাড়ি, মকবুল সাহেব?”
গলাটা শুনেই মকবুলের শরীরটা শেষবারের মতো কেঁপে ওঠে। এই গলা সে হাজারবার শুনেছে কলেজ কমিটির মিটিংয়ে। এ আর কেউ না, কলেজের হেডমাস্টার। সাদা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা, মুখে বাঁকা হাসি।
মকবুলের মনে পড়ে যায়। পিকনিকের একটু আগে বাসে সে আর কবির মিয়া মিলে প্ল্যান করেছিল — এই হেডমাস্টারকে কলেজ থেকে সরাবে। দুর্নীতির দায়ে ফাঁসাবে। কথাটা কোনোভাবে হেডমাস্টারের কানে গিয়েছিল।
আর তার বদলা? চৈতির বদলে ঘুমের ওষুধ মেশানো চা মিরার হাতে পৌঁছে দেওয়া। যদিও মিরা দুই কাপ চাই খায়, কিন্তু ঘুমের ঔষধ মিরার চায়েই থাকে। যাতে ভুল রাতে, ভুল ঘরে, ভুল মানুষ ঢোকে। সব এই লোকটার নিখুঁত চাল।
মকবুল কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া কিছু বের হয় না। হাত তুলতে গিয়েও পারে না। শরীরে এক ফোঁটা শক্তি নেই।
হেডমাস্টার উঠে দাঁড়ায়, জুতার ডগা দিয়ে মকবুলের রক্তাক্ত পিঠে একটা লাথি মারে। “কলেজটা আমার ছিল, আমারই থাকবে। তোর মতো কুত্তা দিয়ে রাজনীতি হয় না রে, মকবুল।” বলে হাঁটা দেয়।
এদিকে, বিচারে দাঁড়ানো মিরা...
সে মিরা ছিল না।
আসল মিরা তখন ঢাকার শাহজালাল এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জে। পাশে রাহাদ, কোলে ঘুমন্ত মেরাজ।
যেদিন ভিডিওটা ভাইরাল হয়, তার একদিন আগেই বিএনপির কার্যালয় থেকে তাকে সতর্ক করে এবং কিন্তু এত পরিমান টাকা দাবি করে যে যা তার মতোও ধনী লোকের দেয়া অসম্ভব। সেদিন রাতেই কবির মিয়া রাহাদের পা জড়িয়ে ধরেছিল। “বাবা, আমার মেয়েটা ভুল করেছে। তুমি ওরে তালাক দিও না। আমার নাতিটা এতিম হয়ে যাবে।”
রাহাদ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। “যে মেয়ে অন্য পুরুষের সাথে... তারে আমি ঘরে তুলব?”
তখন মেরাজের দোহাই দেয় কবির। কাজ হয় না। শেষে মিরার মা — রাহাদের শাশুড়ি — এসে রাহাদের পা ধরে কাঁদতে থাকে। রাহাদ ছোটবেলায় মা হারিয়েছে। শাশুড়িকে সে নিজের মায়ের মতো দেখত।
তার চোখের পানি, মেরাজের নিষ্পাপ মুখ — রাহাদ আর পারে না। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ঠিক আছে। শুধু আপনার জন্যই।”
কবির মিয়া এক রাতের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে। জার্মানিতে তার ভাই থাকে। তিনটা টিকিট, তিনটা ভিসা, নতুন পাসপোর্ট। ভোরের ফ্লাইটে মিরা, রাহাদ আর মেরাজ দেশ ছাড়ে। বিচারে যে মাস্ক পরা মেয়েটাকে একশো জুতার বাড়ি মারা হয়েছিল, সে ছিল কবিরের কাজের মেয়ে — টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করানো।
চৈতীদের বাড়ি...
উঠানে সামিয়ানা টানানো। হাঁড়িতে বিরিয়ানি চড়েছে। কুদ্দুস মিয়া আর রাজীব আসছে । নতুন দল, নতুন ক্ষমতা, তার উদযাপন।
কিন্তু ঘরের ভেতর চৈতি চুপচাপ বসে। হাতে মেহেদি, পরনে নতুন শাড়ি, তবুও মুখে হাসি নেই।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে — “মিরা কেন এটা করল? রাহাদ ভাইয়ের হক কেন নষ্ট করল?”
সে একবার ভেবেছিল শ্বশুরকে গিয়ে বলবে, “আব্বা, বিচারটা থামান। মিরা আমার বান্ধবী।” কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে — বিচারকের চেয়ারে বসা মানুষটা তারই শ্বশুর, কুদ্দুস মিয়া। এই রাজনীতির খেলায় তার কথা কে শুনবে?
কিন্তু সে এটা ভেবেও নিশ্চিত হয় যে - রাজীবের সাথে পালিয়ে দেখা করতে হবে না। এখন তারা একই ছাদের নিচে আবা
চৈতি চোখ বন্ধ করে। তার চোখের কোণে পানি। মিরার জন্য, নাকি নিজের জন্য — সে নিজেও জানে না।
চৈতি জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। দূরে কলেজ মাঠে তখনও আমগাছটা দাঁড়িয়ে আছে।